বৃক্ষরোপণের বৃহৎ কর্মযজ্ঞে সবার অংশগ্রহণ কাম্য
অভিরাজ নাথ । শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ০৯:৩৫
বৃক্ষ প্রকৃতি ও জীবজগতের অপরিহার্য অংশ। একদিকে বৃক্ষ প্রকৃতির শােভাবর্ধক অন্যদিকে প্রাণিকুলের প্রাণ প্রদায়ক। একদিকে সে প্রকৃতিকে দেয় রানির সাজ, অন্যদিকে প্রাণিকুলকে দেয় প্রাণধারণের জন্য অক্সিজেন । তাই বৃক্ষ ছাড়া পৃথিবীর বুকে প্রাণের অস্তিত্ব কল্পনাতীত। কিন্তু মানুষের নিষ্ঠুরতা প্রতিনিয়ত কুঠারাঘাত করছে প্রাণপ্রদায়ী বৃক্ষের মূলে। ফলে প্রকৃতির বুকে অরণ্যের যে শোভা তা দিন দিন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। নির্বিচারে বৃক্ষনিধন প্রকৃতিকে করছে বিপন্ন। জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ হয়ে পড়েছে হুমকির সম্মুখীন। এমতাবস্থায় পরিবেশকে রক্ষা করতে হলে, দেশকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে হলে সচেতনভাবে বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই।
বৃক্ষ প্রকৃতির বুক থেকে প্রাণিকুলের ত্যাগ করা কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেয় জীবনদানকারী অক্সিজেন। ফলে একদিকে বৃক্ষ প্রাণিকুল তথা মানুষকে উপহার দেয় বদ্বাসের উপযুক্ত পরিবেশ। অন্যদিকে, কার্বন ডাই অক্সাইড-এর আধিক্যের কারণে সৃষ্ট উষ্ণতা থেকে পরিবেশকে রক্ষা করে। কেননা প্রকৃতিতে কার্বন ডাই অক্সাইডের আধিক্য জন্ম দেবে জলোচ্ছ্বাস, বন্যা প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। যার ফলশ্রুতিতে বিলুপ্ত হবে অনেক প্রজাতির জীব, তাই মানুষের অর্থাৎ জীবজগতের বসবাসের উপযোগী ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টির জন্য বৃক্ষের কোনো বিকল্প নেই।
বৃক্ষহীনতার প্রতিক্রিয়া যে কী ভয়াবহ তার পরিচয় আজ পৃথিবীব্যাপী স্পষ্ট। আমাদের দেশেও এর প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে। বৃক্ষহীনতার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হচ্ছে ‘গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া’ অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠে কার্বন ডাই অক্সাইড আটকে পড়া। এর ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের হার অনেক বেড়ে যাবে। এর প্রমাণ ইতোমধ্যে আমাদের দেশে ও বিশ্বের অনেক দেশে পাওয়া যাচ্ছে। বাংলা প্রকৃতির ঐতিহ্যময় সবুজ-শ্যামল রূপ আজ মানুষের স্বেচ্ছাচারিতা ও নির্মমতার আঘাতে বিলীন হতে বসেছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য যেকোনো দেশের মোট জমির অন্তত ২৫ শতাংশ দরকার, সেখানে সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আমাদের দেশের বনভূমির পরিমাণ মাত্র ১৭ শতাংশ। ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস বনভূমি ইনস্টিটিউটের মতে, মাত্র পাঁচ শতাংশ, যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। উপরন্তু অধিক জনসংখ্যার চাপে তাও দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। দেশের সর্বত্র বৃক্ষ নিধনের ব্যাপকতা লক্ষ্যণীয়। কিন্তু বৃক্ষ লাগানোতে যেন সবারই অনীহা। ফলে বনজসম্পদে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বন উজাড়ের মাধ্যমে ধারণ করেছে কাঙালরূপ। বৃক্ষের ক্রমনিধন বাংলাদেশের আবহাওয়াতে সৃষ্টি করেছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া।
পর্যাপ্ত বনভূমির অভাবে সৃষ্ট অনাবৃষ্টির কারণে দেশের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দিনের পর দিন নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য, জীবনোপযোগী পরিবেশের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক গাছ। লাগানো আজ অবশ্য পালনীয় দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে রয়েছে বনায়নের বিপুল সম্ভাবনা। তাই পরিকল্পিত উপায়ে বৃক্ষরোপণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে । সামাজিকভাবে এ কর্মকাণ্ডে সবাইকে অংশগ্রহণ করতে হবে। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের জন্য অর্থনৈতিক প্রণোদনা অর্থাৎ অতিরিক্ত আয়ের উৎস প্রদান করতে হবে। সুপরিকল্পিতভাবে সরকারি ও বেসরকারি সহায়তার আওতায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ও পরিচর্যার ভার গ্রহণ করতে হবে। বহুদিনের অবিবেচনা প্রসূত বৃক্ষ নিধনের ফলে পরিবেশ যে বিপর্যস্ত রূপ ধারণ করেছে তা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে সরকারের পাশাপাশি জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে। সাধারণ জনমনে এ প্রসঙ্গে সচেতনতার সৃষ্টি করতে হবে। কেননা সাধারণ জনগণ পরিবেশের ভারসাম্যহীনতার ভয়াবহতা সম্পর্কে অবহিত হলেই বৃক্ষরোপণের তাগিদ অনুভব করবে। আর তখনই পরিবেশকে বাঁচানোর এ মহৎ ও বৃহৎ প্রচেষ্টা সফল হবে।
মনে রাখতে হবে গাছ মানুষ ও পরিবেশের অকৃত্রিম বন্ধু । মানবজীবনে গাছের রয়েছে নানামুখী ও ব্যাপক অবদান। তেমনি সুস্থ, সুন্দর, সুবিন্যস্ত পরিবেশের ক্ষেত্রেও রয়েছে এর বিরাট সহায়ক ভূমিকা। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় আসবাব, খাদ্য, জ্বালানি, আয় ও কর্মসংস্থান অনেক কিছুর চাহিদা পূরণ করে গাছপালা। বিশেষত গ্রামীণ দরিদ্র জনজীবনে গাছের ভূমিকা যেন আশীর্বাদস্বরূপ। তাই বিপন্ন পরিবেশকে বাঁচাতে এবং সাধারণ জনজীবনকে সমৃদ্ধ করতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বর্তমান সময়ের অনিবার্য দাবি। তাই ‘গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান’- এ আন্দোলনে শরিক হয়ে বৃক্ষরোপণের বৃহৎ কর্মযজ্ঞে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে।
লেখক: ছড়াকার।
ইউডি/সুস্মিত

