তরুণদের টার্গেট করে নতুন সংগঠন: উগ্রবাদ-শেকড় কোথায়?
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ১১ অক্টোবর ২০২২ । আপডেট ১২:৪০
বিদেশে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে উগ্রবাদে জড়াচ্ছে তরুণরা। তাদেরকে বিভিন্ন ধর্মীয় অপব্যাখ্যা ও তাত্ত্বিক জ্ঞান দিয়ে বিপথে নিয়ে যাচ্ছে উগ্রবাদী একটি সংগঠন। বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদের কোনো স্থান নেই, সেক্ষেত্রে কীভাবে এ ধরণের সংগঠনগুলো নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে? আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার মধ্যেও দেশের বিভিন্ন স্থানে চলছে এদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ। সমাজে যারা ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন পেশার ছদ্মবেশে। বিস্তারিত লিখেছেন মিলন গাজী
বাংলাদেশে উগ্রবাদ তথা জঙ্গিবাদের কোনো স্থান নেই। উগ্রবাদে সরকারের পক্ষ থেকে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করা হয়েছে শুরু থেকেই। আলোচিত গুলশান ট্র্যাজেডির পর থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ও কঠোর অবস্থানের কারনে এই ধরণের ভয়ঙ্কর কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়েই গেছে। কিন্তু গোপনে কিছু গোষ্ঠি তাদের কার্যত্রম পরিচালনা করে চলেছে। তাদের মূল টার্গেট দেশের সাধারণ তরুণ। তরুণদের বিভিন্ন ভাবে ব্রেন-ওয়াশ তথা তাদের মস্তিস্কে ধর্মীয় অনুভূতি ও অপব্যাখা ঢুকিয়ে তাদেরকে বিপথগামী করার পায়তারা করে চলেছে ওই গোষ্ঠি। এমনই নতুন একটি সংগঠনের নাম আলোচনায় এসেছে। ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’ নামের এই জঙ্গি সংগঠনটি জেএমবি ও আনসার আল ইসলাম থেকে বেরিয়ে আসা জঙ্গিরা মিলিতভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সরকার তথা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যদিও সর্বোচ্চ নজরদারি রাখছে এদের ওপর। কিন্তু এদের শেকড় উপড়ে না ফেলা পর্যন্ত এদের শাখা-প্রশাখা ছড়াতেই থাকবে। দেশ থেকে উগ্রবাদের শেকড় তুলে ফেলতে হবে, তাতে নতুন কের কোনো তরুণ বিপথগামী হওয়ার সুযোগ পাবে না।
ধর্মীয় অপব্যাখায় ব্রেন-ওয়াশ, টার্গেটে তরুণরা: দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কোমলমতি তরুণদের সংগঠনের সদস্যরা টার্গেট করে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন নিপীড়নের বিভিন্ন ভিডিও দেখিয়ে ও বিভিন্ন অপব্যাখ্যা দেওয়ার মাধ্যমে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ করতো। উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ তরুণদের বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যরা রাজনীতি, সমাজ ব্যবস্থা সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়ম, ধর্মীয় অপব্যাখ্যা ও বিভিন্ন তাত্ত্বিক জ্ঞান দিতো। সশস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিতে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়ে উৎসাহী করে তুলতো। জানা যায় যে, নিখোঁজ হওয়া তরুণদের সশস্ত্র হামলার প্রস্তুতির জন্য প্রশিক্ষণ নিতে পটুয়াখালী ও ভোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়। নিরুদ্দেশ হওয়া তরুণদের পটুয়াখালী এলাকার বিভিন্ন ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে রেখে পটুয়াখালী ও ভোলার বিভিন্ন চর এলাকায় শারীরিক কসরত ও জঙ্গিবাদ বিষয়ক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করতো। এছাড়াও আত্মগোপনে থাকার কৌশল হিসেবে তাদের রাজমিস্ত্রী, রং মিস্ত্রী, ইলেক্ট্রিশিয়ানসহ বিভিন্ন পেশার কারিগরী প্রশিক্ষণও দেওয়া হতো।

নিখোঁজ অর্ধশতাধিক, তালিকাভুক্ত ৩৮ জন : র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) দেশের ১৯ জেলার ৩৮ তরুণের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে যেখানে ওই তরুণরা উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বেচ্ছায় বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হয়েছে। অথচ ওই সকল তরুণদের পরিবার জানেন তারা বিদেশে আছে, এবং প্রতিনিয়ত তাদের মধ্যে অর্থ লেনদেন ও যোগাযোগও ছিলো। দুই দফায় নিরুদ্দেশ হওয়া ৬ তরুণসহ মোট ১২ জনকে আটকের পর র্যাব বলছে, অন্তত ৫৫ জন কথিত হিজরতের নামে বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হয়েছেন। যাদের মধ্যে ৩৮ জন পার্বত্য চট্টগ্রাম দুর্গম এলাকায় অবস্থান করছেন। তাদের অনেককে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ ও বোমা বিস্ফোরণের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। সোমবার (১০ অক্টোবর) র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক খন্দকার আল মঈন বলেন, গত ২৩ আগস্ট কুমিল্লা সদর এলাকা হতে ৮ তরুণ নিখোঁজের ঘটনা ঘটে। নিখোঁজের বিষয়ে গত ২৫ আগস্ট কুমিল্লার কোতয়ালী থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন স্বজনরা। ওই ঘটনায় র্যাব নিখোঁজ ও ভুক্তভোগীদের উদ্ধারে ও জড়িতদের আটকে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে। আটকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নিরুদ্দেশ হওয়া তরুণের সংখ্যা ৫০ এর বেশি। যারা প্রায় দেড় মাস থেকে দুই বছরের অধিক সময় ধরে নিরুদ্দেশ বা নিখোঁজ। এদের মধ্যে কয়েকজনের পরিবার জানেন যে, তারা চাকরির জন্য বিদেশে অবস্থান করছেন এবং নিয়মিত পরিবারকে অর্থ দিতো। কমান্ডার মঈন বলেন, প্রাথমিকভাবে সংগঠনের আটক সদস্যদের মাধ্যমে আমরা ৩৮ জনের তথ্য পেয়েছি, যাদের নাম ও ঠিকানা পাওয়া গেছে; ক্ষেত্র বিশেষে নাম ও ঠিকানায় কিছুটা তারতম্য থাকতে পারে।গত ১ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা থেকে নিখোঁজ হওয়া ৮ তরুণের মধ্যে শারতাজ ইসলাম নিলয় (২২) নামে এক তরুণ রাজধানীর কল্যাণপুরের নিজ বাড়িতে ফিরে আসে। নিলয় থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ৬ অক্টোবর মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে জঙ্গি সংগঠনের দাওয়াতি, তত্ত্বাবধানকারী, আশ্রয় প্রদান কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ৩ জন ও নিরুদ্দেশ ৪ তরুণসহ ৭ জনকে আটক করে র্যাব। আটকরা উগ্রবাদী সংগঠনটির সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-১০ এর যৌথ অভিযানে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও কেরাণীগঞ্জ এলাকা থেকে কুমিল্লার শাহ মো. হাবিবুল্লাহ ওরফে হাবিব (৩২) ও নেয়ামত উল্লাহ (৪৩), ঢাকার মোহাম্মদপুরের মো. হোসাইন (২২), ঢাকার সূত্রাপুরের রাকিব হাসনাত ওরফে নিলয় (২৮) এবং নোয়াখালীর সাইফুল ইসলাম ওরফে রনি ওরফে জায়দ চৌধুরীকে (১৯) আটক করে র্যাব। উদ্ধার করা হয় ৫টি উগ্রবাদী বই, প্রায় তিনশ লিফলেট ও ৫টি ব্যাগ।
দুর্গম এলাকায় স্বশস্ত্র প্রশিক্ষণ, নেপথ্যে কী : ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’ নামের নতুন এই জঙ্গি সংগঠনটি তরুণদের নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম অঞ্চলে অবস্থান করে। সেখানে তারা বিভিন্ন সংগঠনের ছত্রছায়ায় আত্মগোপনে থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং সংগঠনটির বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত এ তথ্যগুলো দেশের সব গোয়েন্দা সংস্থাসহ বিভিন্ন বাহিনীকে জানানো হয়েছে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় সম্মিলিত অভিযান চলমান রয়েছে। কিন্তু নতুন এই জঙ্গি সংগঠনটির উদ্দেশ্য কী। নতুন করে কোনো ষড়যন্ত্রের পায়তারা তারা করছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখা এখন জরুরি। গুলশানের হলি আর্টিজানে যে ৫ জঙ্গি ২২ জন দেশি-বিদেশির প্রাণ নিয়েছিলো তারা সবাই তরুণ ছিলো এবং শিক্ষিত ছিলো। নতুন এই জঙ্গি সংগঠনের টার্গেটও শিক্ষিত তরুণরাই। তাদেরকে নিয়ে নতুন কোনো ষড়তন্ত্রের পায়তারা করছে কিনা তা দ্রুত বেরিয়ে আসা উচিৎ এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উচিৎ যত দ্রুত সম্ভব এদের শেকড় খুঁজে বের করা।

মাদ্রাসায় শিক্ষকতার আড়ালে জঙ্গিদের অর্থায়ন: আটক হাবিবুল্লাহ কুমিল্লায় কুবা মসজিদে নামাজ পড়াতেন। এছাড়াও তিনি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন, তিনি ২০২০ সালে নেয়ামত উল্লাহর মাধ্যমে ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’ (পূর্বাঞ্চলীয় হিন্দের জামাতুল আনসার) সংগঠনটিতে যুক্ত হন। তিনি সংগঠনটির অন্যতম অর্থ সরবরাহকারী। তার নেতৃত্বে কুমিল্লা অঞ্চলে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালিত হতো। তিনি সংগঠনের জন্য বিভিন্নভাবে অর্থ সংগ্রহ করতেন ও উগ্রবাদী কার্যক্রমে অর্থ সরবরাহ করতেন। তিনি পার্বত্য অঞ্চলের নাইক্ষ্যংছড়িতে তিনি প্রায় দুই বছর ধরে একটি মাদ্রাসা পরিচালনা করছেন। তিনি পাহাড়ের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছাত্র সংগ্রহ করে তার মাদ্রাসায় রাখতেন। ১৫-২০ জন সদস্য সংগ্রহ ও প্রশিক্ষণে প্রেরণ করেছেন বলে জানায়।
আটক নেয়ামত উল্লাহ কুমিল্লার একটি মহিলা মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। ২০১৯ সালে স্থানীয় একটি ব্যক্তির মাধ্যমে সংগঠনে যুক্ত হয়। তিনি সংগঠনের দাওয়াতি কার্যক্রমে যুক্ত থাকার পাশাপাশি নিরুদ্দেশ হওয়া তরুণদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বেও জড়িত ছিলেন। বাড়ি ছেড়ে যাওয়া সদস্যদের তিনি বিভিন্ন পর্যায়ে আশ্রয় দিতেন বলে জানায়। কমান্ডার মঈন বলেন, আটক হাবিবুল্লাহ বিভিন্ন নামে বেনামে মাদ্রাসা মসজিদের জন্য চাঁদা সংগ্রহ করে জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার (পূর্বাঞ্চলীয় হিন্দের জামাতুল আনসার) জন্য অর্থায়ন করতেন। আমরা এখনো প্রাথমিক স্তরে কাজ করছি। সংগঠনের কে বা কারা নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে রয়েছে তা এখনো জানা সম্ভব হয়নি।
নতুন হুমকি ও ঝুঁকির পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকা চাই : বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে ধর্মীয় জঙ্গিদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সাময়িকভাবে স্তিমিত হলেও এতে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। বরং দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন হুমকি ও ঝুঁকির পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। সাইবার উগ্রবাদ, নবীন উগ্রবাদ, নারী উগ্রবাদের মতো বিপদ বাড়ছে। কারাগারে আটক জঙ্গিদের উগ্র মতাদর্শ বিস্তারের নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও বিভিন্ন তৎপরতা দেখা গেছে। এই জনগোষ্ঠীর অসহায়ত্বকে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো কাজে লাগাতে পারে।তারা বলছেন, বাংলাদেশে জঙ্গি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি শুধু ‘কাইনেটিক’ অপারেশন বা শক্তি প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে এখনই পাল্টা উগ্রবাদ কৌশল প্রণয়নের প্রয়োজন আছে। পুরো সমাজ ও বিভিন্ন গোষ্ঠীকে যুক্ত করে এবং সরকারের সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে উগ্রবাদ মোকাবিলার প্রস্তুতি থাকতে হবে।
ইউডি/সুপ্ত

