বাস রুট রেশনালাইজেশন: ফিরে আসুক গণপরিবহণে শৃঙ্খলা

বাস রুট রেশনালাইজেশন: ফিরে আসুক গণপরিবহণে শৃঙ্খলা

খশরু আহসান । রবিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২২ । আপডেট ১৭:০৫

রাজধানীতে গণপরিবহনের সংকট অনেক দিন ধরেই চলছে। যেটা এখন প্রকট আকার নিয়েছে। বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বিভিন্ন সড়কে দেখা যায় কর্মজীবী মানুষের ভিড়। অফিস ছুটি হওয়ার পরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয় পরিবহনের জন্য। এ সংকট কোনো মতেই কমছে না। যেসব বাস সার্ভিস আছে তারাও সিটিং সার্ভিসের ভাড়া নিয়ে ইচ্ছামতো যাত্রী ওঠায়-নামায়। ভাড়ার ব্যাপারে কোনো নিয়ম-নীতি মানে না কেউ। তারপরও পরিবহন সংকটের কারণে কেউ কথা না বলে পরিবহন শ্রমিকদের সব অনিয়ম মেনে নেয়। গণপরিবহনের এসব সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ২০১৫ সালের শেষের দিকে মেয়র আনিসুল হক গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সে সময় সংশ্লিষ্টরা আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে ১৬টি সুপারিশ করেন। সেসব সুপারিশ গ্রহণ করে পরিবহন মালিকরা সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন।

বিশ্বের উন্নত দেশের পরিবহন ব্যবস্থাপনার আদলে রাজধানী ঢাকায়ও ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন ও কোম্পানিভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থাপনা’ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর ৩৮৬টি রুট নেমে আসবে ৪২টি রুটে। আর ৩০০ বাস কোম্পানিকে নামিয়ে আনা হবে ২২টিতে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রথম নির্বাচিত মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুর পর কিছুদিন এই উদ্যোগ থমকে ছিল। এরপর ২০১৮ সালের জুলাই-আগস্টে নিরাপদ সড়ক দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনকে আহ্বায়ক করে ১০ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি কয়েকটি সভা করে ঢাকায় বিআরটিসির বাস চালু করে। তবে উদ্যোগ সফলতা বয়ে আনতে পারেনি।

২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে বাস রুট রেশনালাইজেশন শুরু হয়ে। এর লক্ষ্য হলো ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে যাত্রী হয়রানি কমানো। একইসঙ্গে বাসের মান ও সেবা উন্নত করা। বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমের অংশ হিসাবে গত বৃহস্পতিবার রাজধানীতে আরও ১০০টি নতুন বাস চালু করা হয়েছে। এগুলোর ৫০টি চলবে ২২ নম্বর রুটে এবং বাকি ৫০টি ২৬ নম্বর রুটে। গণপরিবহণ সংকট ও বিশৃঙ্খলায় জর্জরিত নগরবাসীকে এ কার্যক্রম কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে। উল্লেখ্য, গণপরিবহণে শৃঙ্খলা ফেরাতে গত বছর ডিসেম্বরে প্রথমবারের মতো ৫০টি বাস দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে এ কার্যক্রম শুরু করা হয়।

সেসময় জানা গিয়েছিল, এ কার্যক্রমের আওতায় ছয় কোম্পানির মাধ্যমে ছয় রঙের বাস দিয়ে সিটি সার্ভিস পরিচালনা করা হবে। কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার এ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া গেলে তা নগরীর গণপরিবহণে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা নিরসনে ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস। তাই এ কার্যক্রমকে স্বাগত জানাই আমরা। বর্তমানে রাজধানীর গণপরিবহণ খাতে বিরাজ করছে চরম বিশৃঙ্খলা। বস্তুত রাজধানীতে বাসের নামে যা চলছে তার সিংহভাগই মিনিবাস। এসব বাস রাস্তার মাঝখানে যত্রতত্র থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হয়। এতে সৃষ্টি হয় যানজট। আইনকানুন, নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কা এরা করে না। যাত্রী ভাড়ার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

এসব বাসের বেশিরভাগেরই যথাযথ ফিটনেস নেই। রঙচটা, এবড়োথেবড়ো বডির এসব বাস নগরবাসীর জন্য দৃষ্টিকটুও বটে। জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর কালো ধোঁয়া নির্গত করে রাজধানীতে বায়ুদূষণ ঘটায় অনেক বাস। অভিযোগ আছে, এসব বাসের অধিকাংশ চালকেরই প্রকৃত লাইসেন্স নেই। এসব কারণে বর্তমানে রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজধানীর সড়ক থেকে এসব বাস অপসারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। সেক্ষেত্রে বিকল্প অপরিহার্য। গণপরিবহণ খাতের বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটাতে পারে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রম। আমরা আশা করব, পর্যায়ক্রমে রাজধানীর সব রুটেই এ কার্যক্রম চালু করা হবে। সেক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নতুন বাস নামাতে হবে রাস্তায়। দক্ষ চালকদের দিতে হবে এসব বাস চালানোর দায়িত্ব। সবচেয়ে বড় কথা, যে উদ্দেশ্য নিয়ে চালু করা হয়েছে এ কার্যক্রম, অর্থাৎ গণপরিবহণে শৃঙ্খলা ফেরানো, তার বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে যথাযথভাবে। রাজধানীর গণপরিবহণে শৃঙ্খলা এলে নগরবাসীর যাতায়াতে দুর্ভোগ কমে আসবে। যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস পাবে। কমবে বায়ুদূষণ। তাই এ উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন চাই আমরা।

লেখক- কলামিস্ট।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading