রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধ বৃদ্ধি: প্রত্যাবাসনেই সংকটের সমাধান

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধ বৃদ্ধি: প্রত্যাবাসনেই সংকটের সমাধান

সাদেকুল আরেফিন । রবিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২২ । আপডেট ১৭:৪৫

রোহিঙ্গাদের জন্য উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের কর্মকাণ্ডে দিন দিন সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। জড়িয়ে পড়ছে গুরুতর অপরাধে। একের পর এক ঘটে যাওয়া ঘটনা আমাদেরকে সংকট, ভয় ও নিরাপত্তার ঝুঁকিতে ফেলছে। টনক নড়ে যাচ্ছে আমাদের। রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের পাশে বসবাস করা বাঙালিরা আতঙ্কিত জীবন যাপন করছে। তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য আমাদের আন্তর্জাতিক মান সম্মান কমে আসছে। অর্থের লোভে তাদেরকে সহায়তা করছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ পাশে বসবাস করা কিছু সাধারণ মানুষ। যা আমাদের জন্য খুবই উদ্বেগ ও চিন্তাশীলতার বিষয়।

২০১৭ সালের ৫ আগস্ট শত থেকে হাজার, হাজার থেকে লাখো রোহিঙ্গা নিরাপদ আশ্রয়ের খুঁজে বাংলাদেশে আসে। বাংলাদেশও তাদের নিরাশ করেনি। সাদরে গ্রহণ করে তাদের খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিয়েছে এবং এখনো দিচ্ছে। মিয়ানমারের সেনাদের হাতে নির্মূল উচ্ছেদের মুখে এবং ধর্ষণ, হত্যা ও বাড়িঘর জালিয়ে দেওয়ার পর প্রাণ রক্ষায় লাখো লাখো রোহিঙ্গাদের ঢল নেমে আসে এই ছোট্ট একটি দেশে। পরম মানবাধিকার মানবতার দেওয়াল হিসাবে সর্বস্তরের বাঙালি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। সেই নিরুপায় বাস্তুচ্যুতদের নিয়ে নানান ভয়ভীতিতে দিন পার করতে হচ্ছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ২৪টি ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের অমানবিক নির্যাতন করেছে। মায়ের সামনে মেয়ের লাশ বাবা ভাইয়ের সামনে মেয়ে, বোনের ধর্ষণের স্বীকার। ছোট্ট শিশু মৃত মায়ের বুকে হামাগুড়ির চিত্র পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। যার রেশ রোহিঙ্গাসহ বাংলাদেশিদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১০-১১ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। প্রতি বছর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পায় ৩০-৩৫ হাজার শিশু জন্ম নিচ্ছে। জনসংখ্যা গণহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের মধ্যে পারিবারিক পরিকল্পনাও নেই। শিক্ষিত হারও নেই। এই লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের এতোদিন বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিকভাবে খাবারের ব্যবস্থা করে যাচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপীয়দের থেকে খাবারের একটা বড় যোগান আসত। কিন্তু সাম্প্রতিক রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে এখন ইউক্রেনীয়দের দিকে তাকাতে হচ্ছে। আফগানিস্তানেও খাদ্যের সংকট রয়েছে। ফিলিস্তিনেও বাস্তুচ্যুত রয়েছে যাদের খাবারের যোগান দিতে হয় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে। পাকিস্তানের বন্যায় হাজার হাজার পরিবারও রাস্তায় নেমে গেল। তাদের খাবারের যোগানও দিতে হবে। ফলে রোহিঙ্গাদের জন্য খাদ্যের সংকটে পড়তে হবে। খাবারের অভাবেও তারা নানান গর্হিত কাজে অংশ নিচ্ছে এবং নিবে।

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে। জানা গেছে, মাদকের কারবার, দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পের ভেতরে-বাইরে অন্তত অর্ধশতাধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ গড়ে উঠেছে। এতে ক্যাম্পের অভ্যন্তরে প্রায় প্রতিদিনই তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোলাগুলি ও খুনাখুনির মতো ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি উখিয়ার ১৮নং ক্যাম্পে সন্ত্রাসীরা নিরাপত্তায় নিয়োজিত এপিবিএন পুলিশ ও সাধারণ রোহিঙ্গাদের ওপর এলোপাতাড়িভাবে অতর্কিত গুলি ছুঁড়লে এক রোহিঙ্গা শিশু নিহত ও এক রোহিঙ্গা নারী গুলিবিদ্ধ হয়। উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের পর থেকে ক্যাম্পে এ পর্যন্ত ১২০টিরও বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক বেশিরভাগ সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গে মিয়ানমার সরকারের সেনাবাহিনীর প্রতিনিধিদের যোগসাজশ থাকার অভিযোগ রয়েছে।

সূত্রমতে, ক্যাম্প অশান্ত করার জন্য সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে বিনামূল্যে কোটি কোটি টাকার ইয়াবা দিচ্ছে মিয়ানমার সরকার। মূলত বিশ্বের দরবারে রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী হিসাবে তুলে ধরে আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার মাধ্যমে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বাধাগ্রস্ত করার লক্ষ্য নিয়ে এসব করছে মিয়ানমার। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বস্তুত, নিজ বাসভূমি থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী শুরু থেকেই বাংলাদেশের জন্য মূর্তিমান সমস্যা হিসাবে বিরাজ করছে। তাদের আইনশৃঙ্খলা বিরোধী কার্যক্রমে স্থানীয়রা আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছে, যা মোটেই কাম্য নয়। দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, উত্তরোত্তর সংকটের মাত্রা বাড়লেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনোরকম অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না; বরং আশ্রয় শিবিরগুলোকে তারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের আখড়ায় পরিণত করেছে।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান শুরু হলে সেখানকার সংখ্যালঘু মুসলমান জনগোষ্ঠীর সাত লাখেরও বেশি মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে কয়েক দশকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছে আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা। অবৈধ অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের কারণে আমাদের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় আর্থ-সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটছে।

অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশ গিয়ে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে এবং এর দায়ভার বর্তাচ্ছে বাংলাদেশের ওপর। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার বাসস্থান ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। সরকার ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের একাংশকে নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তর করেছে, যেখানে উন্নত বাসস্থান ও যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ স্ব-কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে আমরা মনে করি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মধ্যেই যাবতীয় সমস্যার সমাধান নিহিত রয়েছে। সর্বোপরি বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের নানান সমস্যা, খাদ্যের সংকট, শিক্ষা, চিকিৎসা, বস্ত্র এবং তাদের অপরাধের কর্মকাণ্ডগুলো তুলে ধরে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকেও চাপে রাখতে হবে। নইলে বাংলাদেশ বড় ঝুঁকিত পড়বে।

লেখক- সমাজ বিশ্লেষক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading