জলবায়ু পরিবর্তন: কোমলমতি শিশুরাও মুক্ত নয়
আসমাউল হুসনা । শুক্রবার, ২১ অক্টোবর ২০২২। আপডেট ২২:০০
বিশ্বের সামনে এখন যেসব হুমকি রয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন সেগুলোর একটি। বিশ্বে ইতোমধ্যেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে, আর তার শিকার হচ্ছে শিশুরাও। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির কারণে প্রায় ১০০ কোটি শিশু বর্তমানে ‘অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে’ রয়েছে বলে এক মানবাধিকার গোষ্ঠী সতর্ক করেছে। বুধবার এই গোষ্ঠীটি আরও বলেছে, অল্পবয়সিদের জীবনযাত্রার মান গত দশকে উন্নতি করেনি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শিশুদের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকার বিষয়টি সামনে এনেছে কিডসরাইটস ফাউন্ডেশন নামে একটি সংস্থা। নেদারল্যান্ডের আমস্টারডামভিত্তিক এই সংস্থাটি শিশুদের নিয়ে কাজ করে থাকে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সরবরাহ করা পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে কিডসরাইটস এই পরিসংখ্যান তৈরি করেছে। এতে আরও বলা হয়েছে, প্রায় ৮২ কোটি শিশু অর্থাৎ বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি শিশু বর্তমানে তাপপ্রবাহের সংস্পর্শে রয়েছে। পানির ঘাটতি বিশ্বব্যাপী ৯২ কোটি শিশুকে প্রভাবিত করেছে। এছাড়া ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গুর মতো রোগগুলো প্রায় ৬০ কোটি শিশুকে বা প্রতি চারজনের মধ্যে একজন শিশুকে প্রভাবিত করেছে। বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিশুদের জন্য বিষয়টি উদ্বেগজনক। দ্রম্নত পরিবর্তনশীল জলবায়ু এখন তাদের (শিশুদের) ভবিষ্যৎ এবং তাদের মৌলিক অধিকারকে হুমকির মুখে ফেলছে। দশকে শিশুদের জীবনের মানদন্ডে কোনো উলেস্নখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি এবং তার ওপর করোনাভাইরাস মহামারিতে শিশুদের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়েছে।
এটা ঠিক, উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে সারাবিশ্বে ব্যাপকভাবে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটেছে। এর প্রভাবে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জোয়ার-জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টি, নদীভাঙনসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম শিকার হবে। চলতি বছর দফায় দফায় বন্যা, মে মাসে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের আঘাত, অতিবৃষ্টি, নজিরবিহীন জোয়ারে উপকূলীয় এলাকা পস্নাবিত হওয়ার ঘটনা এবং গত কয়েক বছরের বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও দুর্যোগ পরিস্থিতি এ সত্যতাই প্রমাণ করে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও তার প্রভাবে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ক্ষয়ক্ষতির কারণে আগামী দশকগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মধ্যে সংঘাত বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। জলবায়ু পরিবর্তন ও তার প্রভাবে উষ্ণতা বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ খাদ্য ও পানীয়জলের সংকটে পড়েছেন এবং দিন দিন এই সংকটের আওতা বাড়ছে। তাছাড়া, বিভিন্ন দেশে জনসংখ্যার বৃদ্ধির কারণে অতিরিক্তমাত্রায় ব্যবহার করা হচ্ছে জীবাশ্ম জ্বালানি, ধ্বংস করা হচ্ছে বনাঞ্চল- যা জলবায়ু পরিবর্তনের গতি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দশকগুলোতে প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পানীয়জলের অভাবে থাকা মানুষের সংখ্যা আরও বাড়বে, সেই সঙ্গে পালস্না দিয়ে বাড়বে বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যা। এসব কারণে অদূরভবিষ্যতে দেশে-দেশে, জাতিতে-জাতিতে এবং মানুষে-মানুষে সংঘাত ছড়িয়ে পড়বে। গত একদশকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপর্যয় সবচেয়ে বেশি ঘটেছে ৩০টি দেশে। এসব বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে বন্যা, খরা ও উষ্ণতা বৃদ্ধি। ফলে, এসব দেশে বসবাসকারী ১২৬ কোটি মানুষের একটি বিরাট অংশ ইতোমধ্যে খাদ্য ও পানীয়জলের নিরাপত্তাহীনতা ও আবাসন সংকটের মধ্যে পড়েছেন এবং তার প্রভাবে সংঘাতও বাড়ছে তাদের মধ্যে। এর প্রভাব থেকে আমাদের কোমলমতি শিশুরাও মুক্ত নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার জন্য সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
লেখক: কলামিস্ট।
ইউডি/সিফাত

