নীরব ঘাতম মহামারি ডেঙ্গু: এডিস মশা থেকে সাবধান
শামিম আনসারি । বুধবার, ০২ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ১০:১০
ছোট্ট একটি প্রাণী মশা। এই মশা মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। মশার মধ্যে এডিস নামে এক প্রজাতির মশা রয়েছে- যা ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করে। এই মশার কামড়েই গণহারে ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু ভাইরাস। হঠাৎ করেই দেশে ডেঙ্গুর বিস্ফোরণ ঘটেছে। কোনোভাবেই কমছে না ডেঙ্গুর প্রকোপ। মশা কামড়ানোর সময় স্বাভাবিক মানুষ তা বুঝতে পারলেও শিশুরা মশাকে প্রতিহত করতে পারে না- ফলে শিশুদের ওপর ডেঙ্গুর প্রকোপও বেশি। প্রবীণদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি বেশি রয়েছে, কারণ নির্দিষ্ট বয়সের পর রক্তের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে ইতোমধ্যে ৫১ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু রোগী।
নতুন আক্রান্তদের নিয়ে চলতি বছর ইতোমধ্যেই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৮০২। প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যায় গড়ছে নতুন নতুন রেকর্ড। এটা সরকারি তথ্য হলেও এই সংখ্যা যে আরও বেশি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্বাভাবিকভাবেই জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হচ্ছে। তবে আতঙ্কিত না হয়ে যথাযথ সচেতনতা অবলম্বন করলে অতিক্ষুদ্র এই কীটকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এজন্য প্রথমেই ডেঙ্গু ভাইরাস প্রতিরোধে এডিস মশা নিধন ও মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করতে হবে। এই কাজ বছরের শুরুতেই করতে হবে। এ দুটি কাজে অবহেলার কারণেই ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রচারণা থাকলেও নেই কার্যকর ব্যবস্থা। এ ক্ষেত্রে সারাদেশের সিটি করপোরেশনগুলো ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ঢাকা সিটি করপোরেশনে কিছুদিন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বাসাবাড়ি, মার্কেট, কলকারখানায় অভিযান চালিয়ে, মশক নিধন স্প্রে করে, ড্রোন দিয়েও নজরদারি করা হয়েছে কিন্তু এটার ধারাবাহিকতা না থাকায় পরিস্থিতি আবার যে সেই হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে ময়লার ভাগাড়, খোলা ডাস্টবিন, উন্মুক্ত ড্রেন। এসব আগে বন্ধ করতে হবে। এর পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী জনগণেরও নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে এবং দীর্ঘায়িত হচ্ছে। মশাকে ক্ষুদ্র ভেবে অবহেলার কারণে দেশে ডেঙ্গুর নিরব মহামারি শুরু হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রশাসনের আরও সচেতন হতে হবে। শুধু দুই-একবার জরিমানা করলেই হবে না নিয়মিত তদারকি জারি রাখতে হবে। লোক দেখানো পদক্ষেপ নিয়ে ঘুমিয়ে গেলেও মশা কিন্তু ঘুমায় না। মশা তার কাজ ঠিকই করে যাচ্ছে। তার প্রমাণ ডেঙ্গুর এই মাত্রাতিরিক্ত প্রকোপ। এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে শুধু নির্দিষ্ট সময় নয় সারা বছরই ডেঙ্গু নিধন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। জনসাধারণের মধ্যে প্রচারণা বৃদ্ধি করতে হবে। এই কাজে জনগণেরও প্রশাসনকে সহায়তা করা হবে। শরীর যেহেতু নিজেরই সম্পদ তাই এক্ষেত্রে ব্যক্তি সচেতনতাই মুখ্য। এডিস মশা সাধারণত জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে। তাই বাড়ির ফুলের টব, বাড়িতে থাকা পরিত্যক্ত জিনিসে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। এডিস মশা সকালে ও সন্ধ্যায় কামড়ায়। তাই ডেঙ্গুর সিজনে গায়ে লম্বা হাতার শার্ট, ফুল প্যান্ট, মোজা ইত্যাদি পরিধান করে থাকাটা ভালো। এছাড়া মশা তাড়াবার ওষুধ (যাতে ডিইইটি আছে) যতটা সম্ভব ব্যবহার করা উচিত। এডিস মশার পাসহ সাড়া শরীরে সাদা কালো ডোরাকাটা দাগ থাকে। পরিবারের কারো ডেঙ্গু হলে বা উপসর্গ দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে যথাযথ নিময় মানতে হবে।
সাধারণত ডেঙ্গু রোগবাহী মশা কামড়াবার ৫ থেকে ৬ দিনের মধ্যে জ্বর দিয়ে রোগটি শুরু হয়। জ্বর প্রায় ১০৫ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠতে পারে, সে সঙ্গে ভীষণ মাথা ধরা, চোখের পেছনে ব্যথা, গ্রন্থি ও পেশিতে তীব্র যন্ত্রণা, বমি-বমি ভাব বা বমি হয়। জ্বর আরম্ভ হওয়ার তিন-চার দিনের মধ্যে গায়ে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। তবে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গুর এ উপসর্গগুলো নাও থাকতে পারে। এ পরিস্থিতিতে অনতিবিলম্বে ডাক্তার দেখাতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে। আমরা চাইলেই ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে পারি।
লেখক: কলামিস্ট।
ইউডি/সুস্মিত

