হুন্ডি চক্রে বন্দি রেমিট্যান্স: কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি
বুশরা বিনতে কবির । রবিবার, ১৩ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ১৩:৪০
দেশে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স কয়েকমাস ধরে ঊর্ধ্বমূখী থাকলেও হঠাৎ করে ধস নেমেছে রেমিট্যান্স প্রবাহে। চলতি অর্থবছরের অক্টোবরে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে ১.৫২ বিলিয়ন ডলার। গত অক্টোবরের তুলনায় এবার রেমিট্যান্স কমেছে ৭.৪ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরের অক্টোবরে রেমিট্যান্সের প্রবাহ ছিল ১.৬৪ বিলিয়ন ডলার। ফরমাল মার্কেটের তুলনায় ইনফরমাল মার্কেটে বেশি রেট পাওয়ায় রেমিট্যান্সে ধাক্কা এসেছে বলে মনে করছে ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা। এদিকে সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স এসেছে ১.৫৪ বিলিয়ন ডলার। সেপ্টেম্বরেও আগের অর্থবছরের একই মাসের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ রেমিট্যান্স কম এসেছে। এর আগে জুলাই ও আগস্টে রেটিম্যন্সের পরিমাণ ছিল চার বিলিয়নের বেশি।
দেশের ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেটকে স্থিতিশীল রাখতে সেপ্টেম্বরের শুরুতে অ্যাসোসিয়েশন অফ ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) ও বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ অথরাইজড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা) কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর সব ব্যাংকে ডলারের একক রেট নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। যেখানে রেমিট্যান্স আনতে প্রতি ডলারের সর্বোচ্চ দর নির্ধারণ করা হয় ১০৮ টাকা ও রপ্তানি বিল নগদায়নের রেট ঠিক করা হয় ৯৯ টাকায়। যদিও পরে রেমিট্যান্সের দর এক টাকা কমিয়ে ১০৭ টাকা ও রপ্তানি আয় এনক্যাশমেন্ট ৯৯ টাকা ৫০ পয়সা করা হয়। এ সিদ্ধান্তের পর প্রথম মাসেই রেমিট্যান্সে ধাক্কা আসে। আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে রেটিম্যান্স প্রায় ৪৯৭ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স কম আসে।প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে হুন্ডি তৎপরতা বেড়ে গেছে। আর এর ফলে ব্যাংকিং চ্যানেলের রেমিট্যান্সে বড় পতন হচ্ছে। ব্যাংকের চেয়ে ভালো রেট পাওয়া এবং খরচ কম হওয়ায় প্রবাসীদের একটি অংশ অবৈধ পন্থা জেনেও হুন্ডির দিকে ঝুঁকছে। হুন্ডি চক্রে বন্দি হয়ে পড়েছে বৈধপথের রেমিট্যান্স। এর ফলে অর্থ পাচারও বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নানা উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণে আগ্রহ বাড়ানো যাচ্ছে না। তাদের উপার্জিত অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেশে প্রেরণ করা হচ্ছে হুন্ডির মাধ্যমে। অদ্যাবধি তা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। রেমিট্যান্স বাড়াতে একের পর এক বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলেও মিলছে না ইতিবাচক ফল। বরং নির্বিঘ্নে ‘হুন্ডির পেটে’ যাচ্ছে রেমিট্যান্স। মূলত ডলারের দর বেঁধে দেওয়ার কারণেই হুন্ডিতে লেনদেনে উৎসাহিত হচ্ছেন প্রবাসীরা। ডলারের বিনিময়ে ব্যাংক দিচ্ছে কম টাকা; ব্যাংকের বাইরে দিচ্ছে বেশি। সহজে সেবা পাওয়ার কারণেও প্রবাসীরা হুন্ডিতে অর্থ প্রেরণ করে থাকেন। নানা উদ্যোগ নিয়েও বাংলাদেশ ব্যাংক কেন রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়াতে পারছে না, তা গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার।
বস্তুত অর্থনীতির এ সূচকটির নেতিবাচক গতি দুশ্চিন্তায় ফেলেছে সংশ্লিষ্টদের। এমন পরিস্থিতিতে বৈধ পথে রেমিট্যান্স বাড়াতে বিভিন্ন শর্ত শিথিল, চার্জ ফি মওকুফসহ বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে আগামীতে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়বে, এমনটিই আশা করা হচ্ছে। প্রবাসী বাংলাদেশি, যারা রেমিট্যান্সের মূল প্রেরক, তাদের একটি বড় অংশ স্বল্পশিক্ষিত। তাদের অনেকে ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পর্কে অবহিত নন, যে কারণে হুন্ডিতে রেমিট্যান্স পাঠান। দেশের বিপুলসংখ্যক গরিব-স্বল্পশিক্ষিত মানুষ ব্যাংকের সেবাপ্রাপ্তিকে জটিল বিষয় হিসাবেই দেখে। ব্যাংকগুলো এসব মানুষের কাছে সহজে সেবা পৌঁছে দিতে না পারলে যত উদ্যোগই নেওয়া হোক, রেমিট্যান্সপ্রবাহ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়বে কিনা, সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
হুন্ডির হোম সার্ভিসের আদলে ব্যাংকগুলোকেও উন্নত ও দ্রুত সেবা প্রদানের পদক্ষেপ নিতে হবে। একইসঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকের শাখা-উপশাখা খোলার পদক্ষেপও নেওয়া দরকার। অভিযোগ আছে, হুন্ডি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রভাবশালীদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। এই অভিযোগ যে অমূলক নয় তা স্পষ্ট হয় হুন্ডি ব্যবসায়ীদের প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা থেকে। হুন্ডি ব্যবসায়ীদের যারা সহযোগিতা দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মী প্রেরণের ওপর জোর দেওয়া দরকার। এ জন্য সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। প্রবাসীরা যাতে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ দেশে পাঠাতে আগ্রহী হন, সে জন্য দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। আমরা বলতে চাই, প্রবাসীদের সামনে বৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রেরণের গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি তাদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার পদক্ষেপ নিতে হবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ।
ইউডি/আতা/সুপ্ত

