লাফিয়ে বাড়ছে খেলাপি ঋণ: কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই
তাওহিদ জামিল । বুধবার, ১৬ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ০৮:০০
বিশেষ ছাড়ের পরও লাগামহীন খেলাপি ঋণ। ৩ মাসে বেড়েছে ৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি। সেপ্টেম্বর শেষে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা ছড়িয়েছে। বিতরণ করা ঋণের ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশই খেলাপি। করোনায় কিছু প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অনেকেই সক্ষমতা থাকার পরও ঋণ পরিশোধ করছে না। যে কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১৪ লাখ ৩৬ হাজার ১৯৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এরমধ্যে খেলাপি ঋণ এক লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি কোটি টাকা। ৩ মাস আগেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ ২৫ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়াত্ত্ব ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ২৩ শতাংশের বেশি খেলাপি। মোট খেলাপি ঋণ ৬০ হাজর ৫০১ কোটি টাকা। আর বেসরকিারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬৬ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা। মোট ঋণের ৬ দশমিক ২০ শতাংশ খেলাপি। এছাড়া বিশেষায়িত ৩ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা। আর বিদেশি ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা।
বিশেষ ছাড় দেওয়ার পরও ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ লাগামহীন থাকার বিষয়টি উদ্বেগজনক। উল্লেখ্য, করোনা ও বৈশ্বিক মন্দার নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় ব্যাংক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তারপরও চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেল কেন-এ প্রশ্নের সদুত্তর খোঁজা জরুরি। সংকট মোকাবিলায় আইএমএফের কাছে সরকারের ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় খেলাপি ঋণের নীতিতে পরিবর্তন আনার তাগিদ দিয়েছে আইএমএফ। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের এশিয়াবিষয়ক এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত নিয়ে একই ধরনের মন্তব্য করে বলা হয়েছিল, ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে গ্রাহককে অব্যাহতভাবে ছাড় দেওয়া হলে ব্যাংকের সম্পদ বা ঋণের মান কমে যাবে। উপরন্তু গ্রাহকরা ঋণ পরিশোধে অনাগ্রহী হয়ে উঠবেন।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুয়ায়ী, কোনো ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধের শেষদিন থেকে তিন মাস অতিক্রম হলেই তাকে খেলাপি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। তবে বাংলাদেশে ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা ছয় মাস করা হয়েছে। করোনা মহামারির কারণে ২০২০ সাল থেকেই মূলত ঋণ পরিশোধে ছাড় দেওয়া হচ্ছে, যা ২০২১ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এরপর ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে বৈশ্বিক মন্দা প্রকট হওয়ার প্রেক্ষাপটে উদ্যোক্তাদের দাবির মুখে ঋণ পরিশোধে বিভিন্ন খাতে ছাড় দেওয়া হয়েছে, যা আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে। এ প্রেক্ষাপটে প্রায় তিন বছর ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে ঋণ আদায় করতে পারছে না। বলার অপেক্ষা রাখে না, গ্রাহকদের মধ্যে ঋণ পরিশোধের চাপ না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই এক্ষেত্রে তারা শিথিলতা দেখাতে পারেন, যা পরবর্তী সময়ে ঋণ পরিশোধে গ্রাহকদের সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। এ অবস্থায় ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরতে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।
ইতঃপূর্বে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ১১ দশমিক ৪ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে দেশে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় সাড়ে চারগুণ। খেলাপি ঋণ না কমে বরং দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া। এছাড়া ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে থাকা লোকজনের দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণেও ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম-জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে, যা কঠোরভাবে রোধ করা প্রয়োজন। বস্তুত ঋণখেলাপিদের আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধতে ব্যাংক কোম্পানি আইন কঠোর করার পাশাপাশি এটি বাস্তবায়নে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। খেলাপি ঋণমুক্ত দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি সামনে রেখে সরকার এ ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে, এটাই প্রত্যাশা।
ব্যাংক খাত সংস্কার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু সরকার করছে না। বাজেটে ব্যাংক সংস্কারের ঘোষণা দিয়েও তা বাস্তবায়ন করেনি। এখন আইএমএফ ব্যাংক খাত সংস্কারে বেশকিছু পরামর্শ দিয়েছে। এগুলো বাস্তবায়নের কথা বলে ঋণ পেতে যাচ্ছে। এখন দেখা যাক সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক সেগুলো আমলে নেয় কিনা। তা না হলে ক্রমশই পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে। এখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। খেলাপি ঋণের যে চিত্র কেন্দ্রীয় তথ্যে বেরিয়ে এসেছে এটা বলতে গেলে কিছুই না। প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ হবে। কারণ একদিকে ঋণ আদায় হচ্ছে না। অন্যদিকে ঋণ বিতরণও চলছে। এভাবে ব্যাংক চলতে পারে না। করোনা ও বৈশ্বিক মন্দার বিশেষ ছাড় তুলে নিলেই খেলাপি ঋণ আরও বেড়ে যাবে। কারণ খেলাপি ঋণ বন্ধে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। নেই কোনো কার্যকর পদক্ষেপ।
লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক।
ইউডি/কেএস

