পরাশক্তি হয়ে উঠবে বাংলাদেশ: ক্রিকেট-পাগল বাঙালির প্রত্যাশা
মহসিনা মান্নান এলমা । বুধবার, ১৬ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ১২:৪৫
বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স দেখলে মনে হবে পুরো দল যেন এক স্রোতবিহীন শৈবাল জমা নদী! গত কয়েকটি সিরিজের টি-২০ পারফরম্যান্স মূল্যায়ণ করলে দেখা যায়- জিম্বাবুয়ে সঙ্গে একটি, ইউএইর সঙ্গে দুটি আর নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে একটি ম্যাচ জিতলেও জেতা হয়নি বড় কোনো দলের সঙ্গে। বিশেষ করে এশিয়া কাপের হতাশাজনক পারফরম্যান্স, জিম্বাবুয়ের মাটিতে সিরিজ হার, নিউজিল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে ৪টি ম্যাচেই পরাজয়। সবকিছু মিলে বলা যায়, পরাজয়ই যেন এখন নিত্যসঙ্গী। নতুন নতুন অনেক শব্দই যোগ হয়েছে, আমাদের ক্রিকেট ডিকশোনারীতে, এ যেমন পাওয়ার হিটিং, ইমপ্যাক্ট, ইনট্যান্ট; কিন্তু তা শুধু কাগজে-কলমে। বাস্তবে নেই তার ছিটে ফোঁটাও। পরাজয়ের বৃত্ত থেকে যেন বের হওয়া যাচ্ছে না কোনোভাবে।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের গত ৬ থেকে ৭ বছরে যতটুকু সাফল্য এসেছে, তা শুধু ওডিয়াই ফরমেটে। দুটি ওডিয়াই ফরমেটের এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলা, কিংবা চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনাল খেলা, আর মাত্র একবার টি-২০ ফরমেটের এশিয়া কাপের ফাইনাল, দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ অর্জন বলতে এতটুকুই। না এখন অব্দি মেনস ক্রিকেটের বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের কোনো শিরোপা এখনও ছোঁয়া হয়নি লাল সবুজ বাহিনীর। অথচ ওডিয়াই অভিষেকের পর কেটে গেছে অনেকটা সময়, টেস্ট স্টাটাস পাওয়ার পর ২২ বছর কেটে গেলেও সাফল্য যেন সোনার হরিণ। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে তাদের বিপক্ষে একটি টেস্ট জয়, আর অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নিজেদের মাটিতে একটি করে টেস্ট ম্যাচ জয়, বলার মতো এতটুকুই। টেস্টে নিজেদের মাটিতে আফগানিস্তানের সঙ্গে হারার মতো লজ্জাও আছে সেখানে, অথচ যেটি কি না আফগানিস্তানের টেস্ট ইতিহাসের ২য় ম্যাচ ছিল! টেস্ট আর টি-২০ পারফরম্যান্সের বিচার টেস্ট স্টাটাস পাওয়া দলগুলোর মধ্যে গত দশকের সব থেকে হতাশাজনক পারফরম করা দলটির নাম বাংলাদেশ।
গত কয়েক বছর ধরে ওডিয়াইতে ভালো পারফরম করার বড় কারণ ছিল সিনিয়র ক্রিকেটারদের অতিমানবীয় পারফরম্যান্স। বিশেষ করে ২০১৫ ওডিয়াই বিশ্বকাপে মাহামুদুল্লার দুটি শতকে ভর করে বাংলাদেশ ইংল্যান্ডকে পেছনে ফেলে সুপার এইট পর্ব নিশ্চিত করে। ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে সাকিব ও মাহামুদুল্লাহ দুটি অসাধারণ শতকের কল্যাণে অসম্ভব এক ম্যাচ জিতে সেমিফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশ। এরপর ২০১৯ বিশ্বকাপে সাকিবের অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের পরও বাকিদের ব্যর্থতার কারণে কোনো সাফল্য আসেনি। এছাড়াও সিনিয়র ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সের কল্যাণে এশিয়াকাপে মোট তিনবার ফাইনাল খেলে বাংলাদেশ। সিনিয়র ক্রিকেটারদের একেকজনের বিদায়ের পর দেশের ক্রিকেটের আসল চরিত্র যেন সামনে চলে আসছে। মাশরাফি, মাহামুদুল্লাহ, তামিম আর মুশফিক টি-২০-কে বিদায় বলে দিয়েছেন, তামিম আর মুশফিক থাকছেন টেস্ট ও ওডিয়াইতে। তবে মুশফিক আর সাকিব হয়তো ২ থেকে ৩ বছরের মধ্যে সব ফরমেটকেই বিদায় জানাবেন। কিন্তু বড় প্রশ্ন হচ্ছে- এদের বিকল্প তৈরি আছে কি?
আমাদের ক্রিকেটারদের ভয়ডরহীন ক্রিকেটের কথা অনেকদিন ধরেই বলা হচ্ছে। খেলায় হার-জিত থাকবেই। তা মেনে নিতেও হবে। কিন্তু খেলার কোনো একটা পরিস্থিতিতে পিছিয়ে পড়লে জয়ের জন্য চেষ্টা না করে সম্মানজনক হারার চেষ্টা করাটা দেশীয় ক্রিকেট পাগল জনতার জন্য খুবই বেদনাদায়ক। ক্রিকেটার ও সংগঠকদের কাছে একটা মেসেজ পৌঁছানো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, শুধু মধ্যমসারির দল বার্ যাংকিংয়ে পিছিয়ে থাকা দলগুলোর সঙ্গে জিতে প্রাপ্তির ঢেঁকুর তুললেই হবে না বরং বড় দলগুলোর সঙ্গে বড় মঞ্চে লড়াই করে জেতার অভ্যাস করতে হবে। দর্শকরা এখন আর বাংলাদেশের ফাইট করে সম্মানজনক হার দেখতে চায় না। সবদিক বিবেচনায় আমাদের ক্রিকেট আগায়নি, আমরা দিন দিন পিছিয়েছি। কিন্তু দর্শকরা চায় অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে আকবর আলীর হাত ধরে যেমন বিশ্বকাপ এসেছে সেরকম বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন ট্রফি উঠুক সাকিব-তাসকিনদের হাতে। আর সে অনুযায়ীই ক্রিকেট সংশ্লিষ্টরা পরবর্তীতে কাজ করে যাবেন এবং অচিরেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বিশ্বের পরাশক্তি হিসেবে নাম লেখাবে সাধারণ ক্রিকেট পাগল দর্শকদের এমনটাই প্রত্যাশা।
লেখক: কলামিস্ট।
ইউডি/কেএস

