নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে দূষণমুক্ত পরিবেশ আবশ্যক
শরিফ করিম । বৃহস্পতিবার, ১৭ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ১৫:২৫
দেশে এখনো শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ নিউমোনিয়া। এ রোগের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। গত কয়েক দশকের তুলনায় দেশে বর্তমানে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা কমেছে। তবে এখনো দেশে প্রতিবছর এ রোগে বহু শিশু মৃত্যুবরণ করে। গত বছর ঢাকার শিশু হাসপাতালে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছিল দুই হাজারের কিছু বেশি শিশু, চলতি বছর এরই মধ্যে দুই হাজারের বেশি আক্রান্ত শিশু ভর্তি হয়েছে। যারা দীর্ঘদিন বিভিন্ন রোগে ভুগছেন বা যাদের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, এ ধরনের ব্যক্তির নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি।
এ রোগের প্রধান লক্ষণ জ্বর হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে জ্বরের লক্ষণ থাকে অস্পষ্ট। এ কারণে কাশি, শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
বায়ুদূষণে শিশুরা নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে পড়ে। শিশুমৃত্যু ঠেকাতে এক বছর বয়সি শিশুদের নিউমোনিয়ার টিকাসহ অন্যসব টিকা সময়মতো দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে। এ রোগে আক্রান্ত হওয়া অনেক শিশুকে স্বীকৃত সেবাপ্রতিষ্ঠানে না নিয়ে নিকটবর্তী ওষুধের দোকান বা হাতুড়ে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। কোনো কোনো হাতুড়ে চিকিৎসক যে ক্ষেত্রে প্রয়োজন নেই, সে ক্ষেত্রেও অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করে থাকেন। এতে রোগ আরও জটিল আকার ধারণ করে। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক হতে হবে। এ রোগ থেকে রেহাই পেতে সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। ধূমপান পরিহার করতে হবে। যাদের ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো জটিল রোগ আছে, তাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
দেশের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের কাঠামো অনুযায়ী মাধ্যমিক স্তরের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে নিউমোনিয়ার সমস্যা নিয়ে আসা শিশুদের প্রায় ৪২ শতাংশ রক্তে অক্সিজেনস্বল্পতায় ভোগে। হাসপাতালে আসা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত যেসব শিশুর অক্সিজেনস্বল্পতা থাকে, তাদের মৃত্যুর আশঙ্কা অক্সিজেনস্বল্পতা না থাকা শিশুদের তুলনায় অনেকগুণ বেশি। কাজেই প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পর্যাপ্ত অক্সিজেনের ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমানে সহজেই কোনো ব্যক্তির শরীরে অক্সিজেনের স্বল্পতা নির্ণয় করা সম্ভব। তবে দরিদ্র মানুষের কাছে এসব স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত উপকরণ সুলভ নয়। কাজেই গরিব মানুষের কাছে এ ধরনের স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত উপকরণ সুলভ করার পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে অক্সিজেন সম্পর্কিত সরঞ্জামের অভাব দূর করা না হলে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুসংখ্যা বাড়বে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে বিভিন্ন রোগে শিশুমৃত্যু বাড়ে। কাজেই নিউমোনিয়া ও অন্যান্য রোগে শিশুমৃত্যু কমাতে দূষণমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
সুস্থ পরিবেশগত পরিস্থিতি সুরক্ষা তথা সংরক্ষণে গৃহীত পরিবেশনীতির আলোকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার জন্য কালক্ষেপণের কোনো অবকাশ নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গোটা বিশ্বে পরিবেশগত অবক্ষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের কারণে উপযোগী পরিবেশনীতি প্রণয়ন ও তার নীতি ও লক্ষ্যগুলো কার্যকরভাবে বা¯তবায়নের গুরুত্ব বেশির ভাগ দেশই দেয়া শুরু করেছে। শিল্পোন্নত দেশগুলো যাতে তাদের পরিবেশগত সমস্যাগুলো ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে কমিয়ে আনে তার জন্য বিশ্বব্যাপী চাপ সৃষ্টি হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো পরিবেশনীতি প্রণয়নের কৌশল অভিজ্ঞতাহীন একটি সাম্প্রতিক বিষয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রশাসন ও পরিবেশগত অগ্রাধিকারগুলো শিল্পোন্নত বিশ্বেও অনুরূপ বিষয় থেকে অনেকটা ভিন্ন। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নীতি প্রণয়ন ও কার্যকর করা নিয়ে সমস্যায় রয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত এবং আন্তঃবিষয়ক জ্ঞানের তীব্র অভাব এই কাজটিকে কঠিনতর করেছে। ভৌত ও আর্থ-সামাজিক বৈশিষ্ট্যের নিরিখে বাংলাদেশকে টেকসই ব্যবস্থাপনার একটি পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র হিসেবে অভিহিত করা যায়। এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে পরিবেশ নীতির গুরুত্ব ও তার বাস্তবায়ন করা কঠিন হলেও তা থেকে পিছপা হলে তা হবে আত্মঘাতী। কেননা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিবেশ সুরক্ষা পরিস্থিতির কারণে একটি অগ্রাধিকার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। শহুরে এবং গ্রামীণ জনপদে পরিবেশের দ্রুত অবক্ষয় অবনতি নিয়ে পরিবেশ আন্দোলনকারীদের উদ্বেগ উৎকণ্ঠা বেড়েছে। একে গুরুত্ব দিয়ে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।
লেখক: সমাজ গবেষক।
ইউডি/কেএস

