প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে সাগরপথে মানব পাচার
সাদিউজ্জামান রাফি । বৃহস্পতিবার, ১৭ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ১৫:৪৮
বিদেশে মানব পাচার ও অবৈধ প্রবাসী বাংলাদেশের শ্রম বাজারের জন্য সব থেকে বড় সমস্যা। যা দিন দিন প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। বাংলাদেশের মানব পাচার ও অবৈধ প্রবাসীদের বিষয়ে জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা উদ্বেগও প্রকাশ করেছে। হিউম্যান ট্রাফিকিং ও অবৈধ প্রবাসীদের সমস্যা নিয়ে এসব সংস্থা নিয়মিত তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে সর্তক করে আসছে। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের মানব পাচার বিষয়ক প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে টায়ার-২ ওয়াচ লিস্টেও রাখা হয়েছে। এত কিছুর পরেও টনক নড়ছে না বাংলাদেশ সরকারের। সময়ের প্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে সাগর প্রবাহে বেড়েই চলছে বাংলাদেশী মানবদের পাচার। এছাড়া বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে সাগর পথে মানব পাচারের সব থেকে বড় উৎস এখন বাংলাদেশ। মানব পাচার রোধে বাংলাদেশের কতটা উদাসীন এই একটি পরিসংখ্যান দেখলেই বুঝা যায়। মানব পাচার রোধে ২০১২ সালে দেশে একটি আইন হয়। এই আইন হওয়া থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১৫২ টি মামলা। কিন্তু এই মামলাগুলোর অভিযুক্তদের শাস্তি হয়নি। এই পরিসংখ্যানটিতেই প্রমাণ হয় সারা বিশ্বে মানব পাচার নিয়ে সর্তক দৃষ্টি রাখলেও রাষ্ট্রযন্ত্র এই বিষয়ে এখনো ঘুমিয়ে রয়েছে।
যতই দিন যাচ্ছে উদ্বেজনক হারে বাড়ছে মানব পাচার। কিছুতেই রোধ করা যাচ্ছে না এ পাচার। এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, পিরোজপুরের যুবক মো. শফিকুল ইসলাম ওরফে শফিউলস্না শেখ অনেক দিন ধরে ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর। সেই স্বপ্নকে ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করে প্রস্তাব দেন বাদশা। মোট ১৩ লাখ টাকার চুক্তিতে গত ৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে দুবাই পাঠানো হয় শফিকুলকে। সেখানে আরও ২০ বাংলাদেশির সঙ্গে একটি বাসায় নেওয়া হয়। সেখান থেকে সিরিয়া হয়ে লিবিয়া বিমানবন্দরের পাশে একটি বাসায় বন্দি করা হয় মোট ৪২ জনকে। এরপর শুরু হয় অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
সেখানে চক্রের সদস্যদের নির্যাতনে ইউরোপে যেতে বিভোর বাংলাদেশিদের স্বপ্নভঙ্গ হয়। নির্যাতনের কথা পরিবারকে জানিয়ে টাকা আদায় করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী, কারো কাছ থেকে ১০, ১২ ও ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। এ ব্যাপারে মামলা হলে, গোয়েন্দা তেজগাঁও বিভাগ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্রের দেশীয় দুই সদস্য বাদশা ও রাজিব মোলস্নাকে গ্রেপ্তার করে। গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, না জেনে, না বুঝে ইউরোপে যেতে উদগ্রীব তরুণ যুবকদের টার্গেট করে ফাঁদ পাতে দেশে ও লিবিয়ায় অবস্থানকারী চক্রের সদস্যরা। তাদের মাধ্যমে অনেককে অবৈধভাবে দুবাই থেকে নৌ, সড়ক পথ পাড়ি দিয়ে লিবিয়ায় নেওয়া হয়েছে। অনেকের মৃত্যুও হয়েছে। সারাদেশে অনেক থানাতেই মানব পাচারের অভিযোগে মামলা হচ্ছে। অনেক তরুণ-যুবক ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত চুক্তিতে ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যেতে অনিশ্চিত যাত্রা শুরু করে। তাদের অনেককে দুবাই নিয়েই জিম্মি করা হয়। বিভিন্ন মানবধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সৌদি আরব, লিবিয়া, লেবানন ও ওমানসহ বিভিন্ন গলফ দেশগুলোতে বাংলাদেশী শ্রমিকদের ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পরে তাদের নির্দিষ্ট কোম্পানিতে হস্তান্তর না করে কিংবা কাজ না দিয়ে দিনের পর দিন নির্যাতন চালানো হয়। এক সময় তাদের উন্নত দেশে নিয়ে যাওয়ার লোভ দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। পরে মধ্যপ্রাচ্য কিংবা আফ্রিকার কোনো দেশে জাহাজে কিংবা তেলের ট্যাংকারে করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি অভিবাসী রাস্তায় মারা যায়, আর যারা বেঁচে যান তাদের পোহাতে হয় সীমাহীন ভোগান্তি।
গত বছরের জুন মাসে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদনে মানব পাচার রোধে বাংলাদেশের এক ধাপ উন্নতির খবরটি ছিল আশাব্যঞ্জক। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ মানব পাচার নির্মূলের ন্যূনতম মান পুরোপুরি পূরণ করতে না পারলেও সার্বিক প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। কিন্তু সেই প্রতিবেদন প্রকাশের পর মানব পাচার কমেনি, এর ফলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক হলো দেশের ভেতরে এই পাচারকারী চক্রের অপরাধমূলক কর্মকান্ডের খবর আগেভাগে জানা যায় না। জানা যায় যখন পাচার ও প্রতারণার শিকার নারী-পুরুষ বিদেশে গিয়ে দুর্বিষহ পরিস্থিতির শিকার হন। গত বছর ভিয়েতনামে ২৭ বাংলাদেশির আটকে পড়ার ঘটনায় বেরিয়ে আসে, ২০১৮ সাল থেকে একটি চক্র সেখানকার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির নামে বহু বাংলাদেশি নাগরিককে পাচার করে আসছে। তারা গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে লোকজনকে মিথ্যা আশ্বাসের ফাঁদে ফেলে চাকরিপ্রার্থীদের ভিয়েতনামে নিয়ে যায়। তথ্য মতে, ৫ বছরে বাংলাদেশের ৫ লাখ নারী বিদেশে পাচার হয়েছে। যাদের গন্তব্য ভারত, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ। সব চেয়ে নেতিবাচক দিক হচ্ছে, দেশে ফিরে এলেও পাচার হওয়া নারীকে সমাজে কখনোই সহজভাবে গ্রহণ করে না। আত্মীয়স্বজনরাও তাদের দেখে খারাপ দৃষ্টিতে। আমরা মনে করি, এ ক্ষেত্রে নজর দেওয়া উচিত স্থানীয় প্রশাসনের। প্রশাসনের সাহায্য না পাওয়ায় পাচাররোধ সম্ভব হচ্ছে না।
লেখক: কলামিস্ট।
ইউডি/কেএস

