মাদকের করাল গ্রাসে যুবসমাজ: বাঁচতে হলে কঠোর হতেই হবে
আতিকুর রহমান । রবিবার, ২০ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ১০:০০
যুবসমাজ হল পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। এদের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে উন্নতির অনন্ত সম্ভাবনা। সম্ভাবনাময় এই ভবিষ্যতের শরীর তথা মন যদি মাদকের রসে বিষাক্ত হয়ে ওঠে তাহলে সমাজ, রাষ্ট্র তথা পৃথিবীর ভাগ্য অন্ধকারের অতলে নিমজ্জিত হয়। স্বাভাবিকভাবে সভ্যতার উন্নতি ব্যাহত হয়। দেশ গড়ার কারিগর সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে মাদক। তাই যুবসমাজকে নিজ থেকে মাদককে না বলার অভ্যাস আগে তৈরী করতে হবে।
যদিও বাস্তবতা, সৃষ্টির সেই আদি লগ্ন থেকে মাদকাসক্তি সমাজের জন্য একটি অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই অভিশাপ সমাজের অগ্রগতিকে প্রতিহত করে। সমাজে মূল্যবোধ গড়ে উঠতে বাধা দেয়। ফলে আমাদের সকলের সুন্দর ও নির্মল এক সমাজের স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। আধুনিককালে বিজ্ঞানের এই সর্বময় জয়যাত্রার যুগে আমাদের চেষ্টা করতে হবে বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে সমাজের এই সমস্যাকে নির্মূল করার। বিজ্ঞান যাতে আর এলএসডি কিংবা কোকেনের মতো ভয়ঙ্কর মাদকদ্রব্য তৈরিতে ব্যবহার না হয় সেই দিকে খেয়াল রাখতে হবে আমাদের সকলের। সমাজের নিম্নতম স্তর থেকে সকলে একসাথে এই অভিশাপের বিরুদ্ধে লড়াই করলে নিশ্চয়ই একদিন আমরা মাদকাসক্তি মুক্ত পৃথিবী উপহার দিতে পারব আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মেকে।
ছাত্রজীবনে অজানা অনুভূতির প্রতি অদম্য উৎসাহ থেকে বহু যুবক-যুবতী মাদক গ্রহণে প্রবৃত্ত হয়। আবার নানা সময়ে মাদকাসক্ত বিভিন্ন বন্ধু-বান্ধবের সংসর্গের কারণেও অনাসক্ত ব্যক্তির মাদকের প্রতি আসক্তি জন্মায়। এইসবের ওপরে বিভিন্ন অসাধু চক্রের প্ররোচনা তো রয়েইছে। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন মাদক চক্র ক্রমাগত নিজেদের ব্যবসায়ীর সমৃদ্ধি এবং আর্থিক লাভের জন্য মানুষকে মাদক গ্রহণে প্ররোচিত করে চলেছে। যদিও বাস্তবতা, মাদকাসক্ত ব্যক্তির পরিবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়। মাদকাসক্ত ব্যক্তির স্বাভাবিক জৈবিক কার্যকলাপ ব্যাহত হওয়ার দরুন পরিবারে অশান্তির মেঘ নেমে আসে। অনেক সময় আসক্ত ব্যক্তি মাদকের অর্থ জোগাড় করার জন্য চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো অসাধু কাজেও প্রবৃত্ত হয়, যা দুঃখজনক। শুধু তাই নয়, এমনও দেখা গেছে মাদক গ্রহণের অর্থ না পাওয়ার ফলে জন্মদাতা পিতা-মাতাকে খুন করতে দ্বিধা করছে না মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা, যা ভয়াবহ ভীতির কারণ বলে মনে করি।যদিও এই মাদক প্রতিরোধে অতীত কাল থেকেই বিভিন্ন ধর্মীয় অনুশাসন দ্বারাও মাদকাসক্তির প্রতিকারের প্রচেষ্টা চালিয়েছে সমাজ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এতে তেমন কোনো পরিবর্তন সাধন হয়নি।
অন্যদিকে যে সমস্ত মানুষেরা ইতোমধ্যেই নেশার কবলে জর্জরিত তাদের সুস্থ করে তোলার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আরো বেশি করে গড়ে তুলতে হবে নেশা মুক্তি কেন্দ্র। মানুষকে শিখতে হবে মাদককে ঘৃণা করতে, মাদকাসক্তকে নয়। বুঝতে হবে মাদকাসক্তি কোন ট্যাবু নয়, নিছকই একটি সামাজিক রোগ। মাদকাসক্ত ব্যক্তির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে উঠলে তবেই সে সমাজের মূলস্রোতে ফিরে আসতে চাইবে। সমাজের সর্বস্তরে খেলাধুলা, যোগব্যায়াম, জিমনাস্টিক, ধ্যানচর্চা ইত্যাদি শরীর গঠনমূলক কার্যক্রমের ব্যাপক প্রসার ঘটাতে হবে। সীমান্তে মাদক-চোরাচালান রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো তৎপর, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। কারণ, আমাদের দেশ মাদক-চোরাচালানের রুটগুলোর মাঝামাঝি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে অবস্থিত। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের (১৯৯০) ধারাগুলো সময়োপযোগী করে এর যথাযথ প্রয়োগ ও কঠোর বাস্তবায়ন করা গেলে মাদকের অপব্যবহার অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব। মাদক-ব্যবসায়ী ও চোরাচালানকারীরা দেশ ও জাতির সবচেয়ে বড় শত্রু। এদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধে সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। মাদকাসক্ত অভ্যাস নির্মূলের জন্য যুব সমাজের একটি সিদ্ধান্ত যথেষ্ট। যুব সমাজের একটি দৃপ্ত শপথই পারে তাদের মাদকের অন্ধকার থেকে ফেরাতে। মাদকাসক্ত হয়ে পৃথিবীতে কেউ কিছুই করতে পারেনি নিজেকে ধ্বংস ছাড়া। তাই আসুন মাদক মুক্ত সমাজ গঠনে সামাজিক আন্দোলন শুরু করি। মাদকমুক্ত সমাজই হোক তারণ্যের অহঙ্কার। পরিবার থেকে শুরু করে সমাজে সর্বস্তরে মাদক প্রতিরোধে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরী বলে মনে করি। মাদকাসক্তি শুধু ব্যক্তির শারীরিক অবস্থারই অবনতি ঘটায় না বরং একটি সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও সভ্যতাকেও ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে। তাই আমাদের উচিত মাদকবিরোধী তীব্র আন্দোলনে সোচ্চার হওয়ার মধ্য দিয়ে যুবসমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা করা। নয়ত মাদকের ভয়ঙ্কর থাবায় ধ্বংস হবে আমাদের সমাজব্যবস্থা সর্বোপরি রাষ্ট্রব্যবস্থা।
লেখকঃ সাংবাদিক।
ইউডি/কেএস

