মাধ্যমিকে অনলাইনে ভর্তি প্রক্রিয়া: বিড়ম্বনাহীন কার্যক্রম সম্পন্ন হোক
শারমিন সুলতানা । রবিবার, ২০ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ১৭:১০
দেশের সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রম গত ১৬ নভেম্বর বুধবার থেকে শুরু হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সরাসরি তত্ত্বাবধানে এ ভর্তি কার্যক্রম চলবে আগামী ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এবারও বিভিন্ন শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে ডিজিটাল তথা অনলাইন লটারির মাধ্যমে। গত সোমবার প্রকাশিত এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে,‘ শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি ছাড়া অন্য কোনো পরীক্ষা নেওয়া হবে না। একজন শিক্ষার্থী পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে পারবে। ভর্তির কাজ শেষ করতে হবে ২৮ ডিসেম্বরের মধ্যে’। বস্তুত বিগত দুই শিক্ষাবর্ষে অর্থাৎ ২০২০ ও ২০২১ সালে এ প্রক্রিয়াতেই শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় ভর্তির একটি সুবিধা হলো ভর্তির জন্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আর আগের মতো দুর্ভোগ পোহাতে হবে না। আগে বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের যে ধরনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে হতো, তা রীতিমতো ভর্তিযুদ্ধের পর্যায়ে পড়ত। সংবাদপত্রে ভর্তিযুদ্ধের যে সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হতো তা রীতিমত কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করত।
কোনদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পা দেয়নি, অথচ হাজারো শিশু প্রতিযোগিতা করছে ভালো স্কুলে ভর্তির জন্য। এখানে ভালো রেজাল্ট করলে ভর্তি হওয়া যায় আর খারাপ করলে ভর্তি হতে না পারাটা শিশু শিক্ষার্থীকে মানস গঠনে মোটেই প্রতিকূল নয়। তাছাড়া এ ভর্তিকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিল অসাধু ব্যক্তিরা। অভিভাবকরা সংগত কারণেই সন্তানদের নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানোর জন্য উদগ্রীব থাকতেন আর ভর্তি কোচিং নামে এক মানসিক নিপীড়নে শিশুদের ঠেলে দিতেন। মূলত অভিভাকদের উচ্চাকাক্সক্ষার এ সুযোগটিই এতদিন গ্রহণ করেছে ভর্তি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত অসাধু ব্যক্তিরা। প্রতিবছর এভাবে অভিভাবকদের পকেট থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অশুভ সংস্কৃতি শিক্ষাঙ্গনকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিল।
এ কথা অস্বিকার করার বিন্দুমাত্র উপায় নেই যে, ভর্তি বাণিজ্যে জড়িতদের মধ্যে স্কুলগুলোর গভর্নিং বডির সদস্য ও শিক্ষক-কর্মচারী ছাড়াও অভিভাবক নেতা, রাজনৈতিক নেতা, এমনকি আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীদের নাম থাকার নজিরও সৃষ্টি হয়েছে। এ রকম একটি পরিস্থিতিতে সরকার অনিয়ম-দুর্নীতি রোধসহ শিক্ষার্থীদের অহেতুক হয়রানি থেকে বাঁচাতে যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। তবে গত দুই বছর এ প্রক্রিয়ায় উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল। যেমন, আবেদনপত্র গ্রহণের প্রথম দিনই পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী সকাল ৯টায় ভর্তিসংক্রান্ত ওয়েবসাইট উন্মুক্ত করার কথা থাকলেও সেটি খুলে দেওয়া হয় ২ ঘণ্টা পর। এবারও কিছুটা বিলম্ব হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আগের বছর বিলম্বে খোলা এ ওয়েবসাইট অপূর্ণাঙ্গ ছিল বলেও অভিযোগ ওঠে। এছাড়া সরকারি বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সব জেলার তথ্য আপলোড করা হয়নি।
উপরন্তু অন্তত ১ হাজার ৩০০ বেসরকারি উচ্চবিদ্যালয় এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, যার মধ্যে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের বেশকিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও ছিল। এবার সম্পাদকীয় লেখা পর্যন্ত এধরনের কোন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে কিনা জানা যায় নি। তবে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি যেন না হয়, সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকতে হবে। ‘ভর্তিযুদ্ধ’ নামের হয়রানি থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করার জন্য সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা শতভাগ দুর্ভোগমুক্ত হবে, স্বচ্ছতার সাথে ভর্তি কার্যক্রম যেন সুসম্পন্ন করা যায় সেই দিকে মনোযোগ দিতে হবে। আমরা মনে করি, সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে অনলাইনে ভর্তির এ কার্যক্রম একটি মাইলফলক। এছাড়া এবার যারা ৬ষ্ঠ ও ৭ম শ্রেণিতে ভর্তি হবে, তাদের নতুন শিক্ষাপাঠক্রমের আওতায় পাঠদান করা হবে। শিক্ষার্থী ও অভিভাকদের কাছে ভর্তির সাথে এটিও একটি কৌতুহলের বিষয়, কেমন হবে এ নতুন শিক্ষাপাঠক্রম! সুতরাং আশা করি, কোনরকম বিড়ম্বনা ছাড়া শিক্ষার্থীরা লটারির মাধ্যমে পাওয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে শিক্ষা জীবনের নতুন অধ্যায়ের সুচনা করতে সক্ষম হবে।
লেখক: কলামিস্ট।
ইউডি/আতা/কেএস

