প্রযুক্তি বিশ্বে নতুন লড়াই ‘চিপ যুদ্ধ’
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৩ । আপডেট ১৪:৩০
প্রযুক্তিবিশ্ব নিজেদের করতলে আনতে দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিযোগিতা করছে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী আমেরিকা ও চীন। যদিও বিশ্বের সেরা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আমেরিকার মালিকানাধীন, কিন্তু সময়ের ব্যবধানে চীন বিশ্বের প্রযুক্তিজগতে বড় খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি শিল্পের মৌলিক পণ্য সেমিকন্ডাক্টর ও মাইক্রোচিপ উৎপাদনে তারা এখন আমেরিকার ঘোর প্রতিযোগি। সামনের দিনে তথ্যপ্রযুক্তিশিল্পে আধিপত্য নিয়ে আরেফিন বাঁধনের প্রতিবেদন
অধিপত্য বিস্তারে মরিয়া আমেরিকা: চীনের কাছে প্রযুক্তিশিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কার কথা অনেক দিন ধরেই শোনা যাচ্ছে। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরুর একপর্যায়ে প্রযুক্তিযুদ্ধও শুরু করেন। এমন বাস্তবতায় চিপ তৈরির প্রযুক্তিতে চীনের প্রবেশ ঠেকানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে বাইডেন প্রশাসন। মোট ২৮০ বিলিয়ন বা ২৮ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হবে এ খাতে। প্রণয়ন করা হয়েছে নতুন আইন। যার আওতায় উচ্চ প্রযুক্তির পণ্য উদ্ভাবন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এ অর্থ ব্যয় করা হবে। শুধু তাই নয়, যারা আমেরিকায় কম্পিউটার চিপ তৈরির লক্ষ্যে কারখানা তৈরি করবেন, তাঁদের কর ছাড় দেওয়া হবে। রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের ফলে কোম্পানিগুলোর জন্য চীনের কাছে চিপস, চিপ তৈরির যন্ত্রপাতি এবং মার্কিন সফটওয়্যার বসানো প্রযুক্তি বিক্রি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ ছাড়াও ওই আইনে মার্কিন নাগরিক ও স্থায়ী বাসিন্দাদের জন্য চীনের বিশেষ বিশেষ কিছু ফ্যাক্টরিতে “চিপ উন্নয়ন বা উৎপাদনে” সহায়তা দেয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র নিজেও এখন আরো বেশি চিপ তৈরি করতে চায়। তাইওয়ানের টিএসএমসি আমেরিকায় দুটি প্ল্যান্ট তৈরির জন্য ৪০০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে যা তাদের নিজ দেশের বাইরে একমাত্র কারখানা।

বাজির ঘোড়া তাইওয়ান: তাইওয়ান নিয়ে আমেরিকা-চীন দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে রয়েছে তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি (টিএসএমসি)। স্মার্টফোন থেকে শুরু করে মেডিকেল ডিভাইস, কার এবং ফাইটার জেট সবকিছুতেই এ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ব্যবহৃত হয়। ট্রেন্ডফোর্সের তথ্য অনুযায়ী, স্বশাসিত এ দ্বীপের সেমিকন্ডাক্টর বাজারের ৬৪ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। অ্যাপল, টেসলার মত আমেরিকান জায়ান্ট কোম্পানিগুলোর চিপ সরবরাহ হয় তাইওয়ান থেকে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতির দেশ চীনের সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা যার ৯০ শতাংশের বেশি পূরণ হয় আমদানির মাধ্যমে। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তাইওয়ানের ওপর বিধিনিষেধ জারি করলেও গুরুত্বপূর্ণ খাতটিকে তাই বিধিনিষেধের বাইরে রেখেছে চীন। দ্বীপটিকে নিজের ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে যদি বলপ্রয়োগের প্রয়োজন হয় তবে তাও পিছপা হবে না বেইজিং। অন্যদিকে তাইওয়ানের স্বাধীনতা রক্ষায় আমেরিকার দৃঢ় সমর্থন প্রমাণ করে কোনোমতেই এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের নিয়ন্ত্রণ- চীনের হাতে চলে যেতে দেবে না ওয়াশিংটন। তাইওয়ান চীন ও আমেরিকার কাছে তাই তুরুপের তাস।

দৌড়ে এগিয়ে থাকতে চীনের উদ্যোগ: আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা চীনের দুর্বল জায়গাতেই আঘাত করেছে। নিষেধাজ্ঞা জারির পর অ্যাপল চীনের অন্যতম সফল চিপ কোম্পানি ইয়াংজে মেমোরি টেকনোলজিস কর্প (ওয়াইএমটিসি) থেকে মেমরি চিপ কেনার একটি চুক্তি বাতিল করেছে বলে জানা গেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতির দেশ চীনের সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা বৈশ্বিক চাহিদার ৬০ শতাংশ। সে চাহিদার ৯০ শতাংশের বেশি আমদানির মাধ্যমে ও বিদেশি সংস্থা পূরণ করে দেশে উৎপাদনের মাধ্যমে। আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে চীন তার অভ্যন্তরীণ চিপনির্মাণ শিল্পের জন্য বিনিয়োগ এবং সমর্থন দ্বিগুণ করার কথা ভাবছে। এ খাতে স্বনির্ভরতা বাড়াতে প্রতিশ্রুতি বদ্ধ দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ইতোমধ্যে ‘মেড ইন চায়না’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে বেইজিং ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টরসহ হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিতে ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে তারা। টেকনডের গবেষণা অনুযায়ী, শুধু ২০২০ সালেই চীনের সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলো ২২৭.৬ বিলিয়ন ইউয়ান (৩৩.৭ বিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগ পেয়েছে। যা আগের বছরের তুলনায় চারগুণ বেশি। সরকারি তথ্য অনুসারে, গত বছর চীনের ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট উৎপাদন বেড়েছে ৩৫৯.৪ বিলিয়ন ইউনিট। যা আগের বছরের চেয়ে ৩৩.৩ তাংশ বেশি।
ইউডি/কেএস

