বিশ্বের বড় বড় কোম্পানিগুলোতে কর্মী ছাঁটাইয়ের হিড়িক: প্রযুক্তি খাতে কর্মীদের বেহাল দশা
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ । আপডেট ১১:২০
বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রকোপ কাটিয়ে শুরু হয়েছে বিশ্বজুড়ে ‘নিউ নরমাল লাইফ’। বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবের মধ্যেও সর্বত্রই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। আর এর মধ্যেই বিশ্বের জায়ান্ট কোম্পানিগুলো একের পর এক কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষকগণের মতে, অর্থনৈতিক মন্দার শঙ্কায় আগেভাগেই নিজেদের প্রস্তুত করার লক্ষ্যে এ ধরণের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কোম্পানিগুলো। এ নিয়ে আসাদ এফ রহমানের প্রতিবেদন
টালমাটাল পরিস্থিতি-ব্যয় কমানোর উদ্যোগ: বিভিন্ন কোম্পানি কর্মী ছাঁটাইয়ের জন্য আলাদা আলাদা কারণ দেখালেও মূলত প্রধান কারণগুলো হিসেবে তারা মনে করছেন ধীর প্রবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি রুখতে উচ্চমাত্রার সুদের হার, এবং আগামী বছরে সম্ভাব্য একটি মন্দার আশঙ্কা। ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদন বলছে, মহামারির সময়ে মানুষের মধ্যে প্রযুক্তির যে বিশেষ চাহিদা তৈরি হয়েছিল সেটি স্থায়ী হবে মনে করে যারা ব্যবসা বাড়িয়েছিল, তারাই মূলত এখন কর্মী ছাঁটাইয়ের দিকে ঝুঁকছে। ফোর্বস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে যেসব প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করছে, তার চেয়ে যারা ছাঁটাই করছে না তাদের তালিকা বরং ছোট হবে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বর্তমানে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম, যুদ্ধাবস্থা এবং এর সাথে জড়িত রাজনীতি- এসব বিষয়ের সাথে কোম্পানিগুলোর কর্মী ছাঁটাইয়ের একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। কারণ এসব অবস্থা বিভিন্ন অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধিকে একদিকে যেমন ধীর করে তুলেছে, অন্যদিকে মুদ্রাস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতেও প্রভাব ফেলেছে। একারণে মানুষের চাহিদা সংকুচিত হচ্ছে এবং তারা ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরতে বাধ্য হচ্ছে। তারা বলছেন, টালমাটাল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পার হওয়ার সময়টাকে টেক কোম্পানিগুলো ব্যয় কমানোর দিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে।
কোম্পানির ভুল-খেসারত দিচ্ছে কর্মীরা: বিশ্বজুড়ে একযোগে কর্মী ছাঁটাই ২০২২ সাল থেকে শুরু হয়ে ২০২৩ সালেও চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, আগামী এক থেকে দেড় বছর এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যেহেতু এখনো স্থিতিশীল হয়নি এবং জ্বালানির বাজার এখনো গরম, ডলারের দামও যেকোন মুদ্রার তুলনায় আকাশচুম্বী, ফলে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা আগামী আরো কিছু সময় ধরে চলতে পারে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। ফোর্বসের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বর্তমানে যে কর্মী ছাঁটাই করা হচ্ছে তা আসলে কোম্পানিগুলোর অতীতে একটি ভুলের ফল। মহামারির সময় ঘরে থাকার বাধ্যবাধকতার কারণে মানুষের জীবন ব্যাপকভাবে অনলাইনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। ফলে অফিসের কাজ তো বটেই, কেনাকাটা থেকে শুরু করে সিনেমা দেখার জন্যও মানুষের হাতে একমাত্র উপায় ছিল অনলাইন। ফোর্বস বলছে যে, এজন্য অনেক কোম্পানি তাদের যতো কর্মী দরকার তার চেয়ে বেশি কর্মী নিয়োগ করেছিল যা এখন আর তারা প্রয়োজনীয় বলে মনে করছে না।

প্রযুক্তি খাতে ছাঁটাই-দাঁড়াবে ৯ লাখে: ২০২০ সাল থেকে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কর্মী ছাঁটাই নিয়ে কাজ করছে এমন একটি ওয়েবসাইট লেঅফস ডট এফওয়াইআই বলছে যে, ২০২৩ সালে ২৯৭টি প্রযুক্তি কোম্পানি মিলে প্রায় ৯৫ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। এটা চলতে থাকলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ এই শিল্পে কর্মী ছাঁটাইয়ের সংখ্যা দাঁড়াবে ৯ লাখে। ২০২২ সালের তুলনায় এটি প্রায় ছয় গুণ বেশি। চলতি মাসের শুরুর দিকে গুগল বলেছে যে, তারা প্রায় ১২ হাজার কর্মী ছাঁটাই করবে যা কোম্পানির মোট কর্মী সংখ্যার প্রায় ৬%। মাইক্রোসফট প্রায় ১০ হাজার কর্মী ছাঁটাই করছে। আমাজন তাদের এক শতাংশ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। সে হিসেবে প্রায় ১৮ হাজার কর্মী ছাঁটাই করতে যাচ্ছে তারা। মিউজিক স্ট্রিমিং জায়ান্ট স্পটিফাই তাদের মোট কর্মীর ৬ শতাংশ বা ৬০০ কর্মী ছাঁটাই করবে। গত বছর নভেম্বরে ফেসবুকের প্যারেন্ট কোম্পানি মেটা ১১ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। গুগলের প্যারেন্ট কোম্পানি আলফাবেট ছাঁটাই করেছে ১২ হাজার কর্মী। এছাড়া মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানি কয়েনবেইজ, ফ্লেক্সপোর্ট এবং সেলসফোর্স বলেছে যে তারাও ১০ শতাংশ বা আরো বেশি সংখ্যক কর্মী ছাঁটাই করবে। চিপ তৈরির কোম্পানি ইনটেল কর্মী ছাঁটাই করেছে এবং তারা নতুন প্রকল্পে খরচও কমিয়ে দিয়েছে। তারা প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার খরচ কমাতে চাইছে। ২০২৫ সাল নাগাদ ১০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত খরচ কমানোর লক্ষ্য রয়েছে এদের। বাংলাদেশে শীর্ষস্থানীয় ই-কমার্স প্ল্যাটফরম দারাজ বাংলাদেশ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে যে, এই প্রতিষ্ঠানটির ৫০ জন পূর্ণকালীন কর্মী এরইমধ্যে ছাঁটাইয়ের চিঠি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
ইউডি/এজেএস

