আ-মরি বাংলা ভাষা
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ । আপডেট ১১:৫৫
আজ একুশে ফেব্রুয়ারি মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। মাতৃভাষা আন্দোলনের পূর্ণ হলো ৭১ বছর। বাঙালি জাতির জন্য এই দিবসটি হচ্ছে চরম শোক ও বেদনার। মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় পৃথিবীতে বিরল, তাইতো ইউনেস্কো মহান একুশের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দিবসটি পালিত হচ্ছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে এখনও দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন নিশ্চিত করা যায়নি, বাংলা ভাষার প্রতি অবহেলা পরতে পরতে। এ নিয়ে আসাদ এফ রহমান’র প্রতিবেদন
নতুন প্রজন্মের মাঝে বায়ান্ন’র চেতনা : বাঙালি জাতির আত্মোপলব্ধির উত্তরণ ঘটে ভাষা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার ক্রমবিকাশ ও অবাধ প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলাতে গিয়ে তরুণ প্রজন্মের মাঝে সৃষ্টি হয়ে এক নতুন সংস্কৃতির ধারা। যা তাদের শেকড় থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে এবং বিচ্ছিন্ন করছে মৌলিক চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতি থেকে। অথচ, ১৯৫২ সালের আজকের দিনে ‘বাংলাকে’ রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বাংলার ছাত্র ও যুবসমাজসহ সর্বস্তরের মানুষ সে সময়ের শাসকগোষ্ঠির চোখ-রাঙ্গানি ও প্রশাসনের ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে রাজপথে নেমে আসে। মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে দুর্বার গতি পাকিস্তানি শাসকদের শঙ্কিত করে তোলায় সেদিন ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিক গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। এই ভাষার মান রক্ষার জন্য তরুণরা বুক পেতে নিয়েছিল পুলিশের গুলি। কিন্তু সেই গৌরবোদীপ্ত অহংকারের ভাষা সংগ্রামী বাঙালি চেতনাহীন, সংস্কৃতিহীন অভিভাবক ও তরুণ প্রজন্মের অবজ্ঞায় রক্তঝরা বাংলা ভাষা হারাচ্ছে তার যথাযোগ্য সম্মান। বিশ্লেষকগণ বলছেন, তরুণ প্রজন্মের মাঝে মাতৃভাষাকেন্দ্রিক সাহিত্যের মননশীল চর্চা বৃদ্ধি করতে হবে। ভালোবেসে মাতৃভাষা ও বাঙালির জাতীয় সংস্কৃতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ছড়িয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত। রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং বিভিন্ন স্থানে আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতি একুশের মহান শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে। শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

‘মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর অবদান’: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভাষা আন্দোলনের জন্য বারবার কারাবরণ করলেও তার অবদান ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর যে অবদান, সেই অবদানটুকু কিন্তু মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল। অনেক বিজ্ঞজন, আমি কারো নাম বলতে চাই না, চিনি তো সবাইকে। অনেকে বলেছেন, ওনার আবার কী অবদান ছিল? উনি তো জেলেই ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু জেলে ছিলেন বলে উনার কোন অবদান নেই? তাহলে উনি জেলে ছিলেন কেন? এই ভাষা আন্দোলন করতে গিয়েই তো তিনি বারবার কারাগারে গিয়েছেন। সেই গুরুত্ব কিন্তু কেউ দিতে চায়নি। সোমবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘একুশে পদক-২০২৩’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের ভাষা মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের আন্দোলন সূচনা করেছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তারই উদ্যোগে ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় এবং আমাদের ভাষার জন্য আন্দোলন শুরু হয় ১৯৪৮ সাল থেকে। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা অর্জন।

ভাষার সঠিক ব্যবহার-দরকার তদারকি: এখনও দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন নিশ্চিত করা যায়নি। ১৯৮৪ সালে এক নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছিল, সব সাইনবোর্ড এবং গাড়ির ফলক বাংলায় হতে হবে। তবে কেউ প্রয়োজন মনে করলে নিচে ছোট করে ইংরেজিতে লিখতে পারবে। বর্তমানে গাড়ির নম্বর ফলক এখন শতভাগই বাংলায় হচ্ছে কিন্তু সাইনবোর্ড লেখার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। বিশ্লেষকগণ মনে করে, কঠিন আইন ও জরিমানার মাধ্যমে এ অনিয়মের পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। তারা বলেন, বর্তমান সময়ে বাংলার সঙ্গে ইংরেজি মিশিয়ে এক অদ্ভুত ভাষা তৈরি হচ্ছে। এ ভুলের কারণে যে অনেক শব্দের অর্থ পরিবর্তন হয়ে যায়, তা সবাইকে বুঝতে হবে। অন্যদিকে, বাংলার সঠিক উচ্চারণেও রয়েছে অনেক সমস্যা। এটি নিঃসন্দেহে জন্য দুর্ভাগ্যজনক ও লজ্জাজনক। শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, ভাষাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। বাংলা ভাষাকে রক্ষা করার জন্য এর সঠিক ব্যবহার ও প্রচলন দরকার। গোটা জাতি যেন রক্তের বিনিময়ে আনা বাংলা ভাষাকে অন্তর থেকে সঠিকভাবে ব্যবহার ও রক্ষা করতে পারে, সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। প্রশ্ন হলো, বাংলা ভাষাকে সঠিকভাবে ব্যবহার না করা, বাংলাকে অবহেলা করা কিংবা অন্য ভাষার প্রতি ব্যাপক আগ্রহ আমাদের কি আদৌ সঠিক পথে নিয়ে যাচ্ছে?
ইউডি/এজেএস

