বাইডেন-পুতিনের সঙ্গে সম্পর্ক, নির্বাচন-সিরিয়া নিয়ে অকপট এরদোয়ান
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ২১ মে ২০২৩ । আপডেট ১৫:০০
রানঅফ তথা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চূড়ান্ত ধাপে তুরস্কের ভোটাররা গণতন্ত্রের দৃঢ় চেতনা দেখাবে বলে মনে করেন প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে বৈদেশিক নীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি। ২৮ মে তুরস্কে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চূড়ান্ত ধাপ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে জয়ের বিষয়ে আত্মবিশাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে এরদোয়ান বলেন, গত ২০ বছরে জয়ী হওয়ার ও রেকর্ড ভাঙার সফল ট্র্যাক রেকর্ড রয়েছে তার। তিনি মনে করেন, সাধারণ মানুষের শক্তিশালী গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা রয়েছে। জনগণ তাকে নিরাশ করবে না বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এরদোয়ান।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার নির্বাচনী প্রচারের সময় এরদোয়ানকে স্বৈরাচারী হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে এরদোয়ান বলেন, নির্বাচনের প্রথম রাউন্ডে তিনি জয়ী হতে পারেননি। এর জন্য তাকে দ্বিতীয় রাউন্ডে লড়তে হচ্ছে। তাকে কীভাবে স্বৈরশাসক হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এরদোয়ান বলেন, একে পার্টির জোট পিপলস অ্যালায়েন্স ৩২২ আসনে জয়লাভ করে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। জোটের নেতৃত্বদানকারী (এরদোয়ান) দ্বিতীয় রাউন্ডে জয়ের জন্য লড়ছেন। পাল্টা প্রশ্ন করে এরদোয়ান বলেন, এটি কী ধরনের একনায়কত্ব?
পুনঃনির্বাচিত হলে তিনি বাইডেন প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করবেন কি না জানতে চাইলে এরদোয়ান জানান, তিনি প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সঙ্গে কাজ করবেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। এছাড়া পরবর্তী নির্বাচনে বাইডেন প্রশাসন পরিবর্তন হলে তিনি নতুন প্রশাসনের সঙ্গেও কাজ করবেন।
রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক: ইউক্রেন সংঘাতে রাশিয়ার প্রতি পশ্চিমের অবস্থান সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে ফের নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বলেন, পশ্চিমারা এই বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করেনি। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, রাশিয়ার মতো একটি দেশের প্রতি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি আরও উপযুক্ত হবে। তিনি বিশ্বে পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার ইতিবাচক সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। পশ্চিমাদেরও অনুরূপ পন্থা অবলম্বনের পরামর্শ দেন এরদোয়ান।
সাক্ষাৎকারে এরদোয়ান ‘ব্ল্যাক সি গ্রেইন’ করিডোরের কথা উল্লেখ করেছেন। ইউক্রেন থেকে শস্য আফ্রিকায় রফতানি প্রক্রিয়া চালু রাখতে মধ্যস্ততা করছে তুরস্ক। এ বিষয়ে পুতিনের সঙ্গে তার বিশেষ সম্পর্কের জন্য ধন্যবাদ জানান এরদোয়ান। এরদোয়ানের পিপলস অ্যালায়েন্স পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা জিতেছে। দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফাইনাল রাউন্ড ২৮ মে অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে ১৪ মে অনুষ্ঠিত প্রথম রাউন্ডে এরদোয়ান অনেক এগিয়ে থাকলেও কোনো প্রার্থী সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেননি। রান অফ ভোটে এরদোয়ান প্রধান বিরোধী দল সিএইচপির প্রধান এবং ছয় দলের বিরোধী দল নেশন অ্যালায়েন্সের যৌথ প্রার্থী কেমাল কিলিচদারুগ্লু মুখোমুখি হবেন।
সিরীয় শরণার্থীর সমাধান: তুরস্কের বিরোধী দলগুলো দেশটিতে থাকা লাখ লাখ সিরিয়ান উদ্বাস্তুকে নির্বাসনের আহ্বান জানিয়ে আসছে। তবে এরদোয়ান উল্লেখ করেছেন যে, এর সাথে একমত হওয়া অসম্ভব। তবে এরদোয়ান বলেন, সিরিয়ায় তুর্কি এনজিওগুলো এখন উত্তর সিরিয়ায় পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে গুরুতর কাজ করছে। তারা বাড়ি তৈরি করছে। এই বাড়িগুলো তৈরি করা হয়েছে যাতে তুরস্কে থাকা সিরিয়ানরা তাদের দেশে ফিরে যেতে পারে।
তিনি বলেন, এখন আমরা আরও একটি পদক্ষেপ নিচ্ছি। আসলে আমরা প্রায় এক মিলিয়ন শরণার্থীকে তাদের জমিতে ফেরত দেওয়ার জন্য সিরিয়ায় আবাসন নির্মাণ সম্পর্কিত কিছু প্রকল্প প্রস্তুত করেছি। এগুলো বেশ দুর্দান্ত প্রকল্প। এই প্রকল্পগুলোর পাশাপাশি আমরা নিশ্চিত করব যে সিরিয়ার শরণার্থীরা তাদের নিজ দেশে ফিরে যায়। সিরিয়ার সরকার প্রধান বাশার আল আসাদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করা সম্ভব কি না এমন প্রশ্নের জবাবে এরদোয়ান বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু মন্তব্য করেছি। আসাদ পরিবারের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব ছিল। আমরা পারিবারিকভাবে দেখা করতাম। দুর্ভাগ্যবশত, পরবর্তী কিছু ঘটনার কারণে আমাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটেছিল। এই বিচ্ছেদ আমাদেরও বিরক্ত করেছিল।’
এরদোয়ান বলেন, ‘(প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে) আমার বন্ধুত্বের মাধ্যমে ভেবেছিলাম যে আমরা একটি দরজা খুলতে পারি। বিশেষ করে সিরিয়ার উত্তর অংশে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইয়ে, যার জন্য ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা এবং সংহতি প্রয়োজন।’ সিরিয়া থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে দাবি সম্পর্কে এরদোয়ান বলেন, আমাদের ৯০০ কিলোমিটারের সীমান্ত রয়েছে। সীমান্তগুলো থেকে আমাদের দেশে ক্রমাগত সন্ত্রাসের হুমকি রয়েছে। একমাত্র সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যই সীমান্তে সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। এটিই একমাত্র কারণ। এরদোয়ান স্পষ্ট করে বলেন যে, তুরস্ক সিরিয়া থেকে সরে আসবে না কারণ ‘সন্ত্রাস হুমকি অব্যাহত রয়েছে’।
দ্বিতীয় দফা ভোট ও সিনান ওগানের গুরুত্ব: প্রচলিত আইন অনুযায়ী, ভোটের ফল চূড়ান্ত হওয়ার পর যদি কোনো প্রার্থী ৫০ শতাংশ ভোট না পান, তবে দুই সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয় দফার নির্বাচন আয়োজন করা হয়। তুরস্কের নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এরকম পরিস্থিতিতে আগামী ২৮ মে দ্বিতীয় দফা নির্বাচন হবে এবং এতে শুধু ২ শীর্ষ প্রার্থী এরদোয়ান ও কিলিজদারগলু লড়বেন। সেক্ষেত্রে তৃতীয় স্থানে থাকা ন্যাশনালিস্ট প্রার্থী সিনান ওগান বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন। তিনি শীর্ষ দুই প্রার্থীর যেকোনো একজনের পক্ষে আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানাবেন। ওগান যাকে সমর্থন দেবেন, সেই অনুযায়ী তার দলের সমর্থকরাও যদি একই ব্যক্তিকে ভোট দেন, তাহলে সেই প্রার্থীই হতে পারবেন দেশটির পরবর্তী প্রেসিডেন্ট।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিন পার্লামেন্টের ৬০০ আসনেরও ভোটগ্রহণ হয়েছে। সেই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় পেয়েছে এরদোয়ানের দল একে পার্টির নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোট পিপলস অ্যালায়েন্স। ৯৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ ভোটগণনা শেষে দেখা গেছে, পিপলস অ্যালায়েন্স পেয়েছে ৩২১টি আসন। এর মধ্যে এরদোয়ানের একে পার্টি একাই জয়ী হয়েছে ২৬৬টি আসনে। ক্ষমতাসীন জোটের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স জয়ী হয়েছে ২১৩ আসনে। আর অন্যান্য দল ৬৬ আসনে জয়ী হয়েছে।
ইউডি/এ

