মেয়র নির্বাচিত হলেন মা: জিতলেন ছেলে
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ২৭ মে ২০২৩ । আপডেট ১৪:৩০
বহুল আলোচিত গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে নির্বাচিত হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুন। তার এই জয়ের নেপথ্যের কারণ ও বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া নিয়ে সাদিত কবির’র প্রতিবেদন
গাজীপুর সিটির নির্বাচনও জাহাঙ্গীরের ‘চমক’ : আওয়ামী লীগ থেকে মেয়র পদে মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হয়ে ‘বিদ্রোহী’ হয়ে মনোনয়নপত্র ফরম জমা দিলেও প্রার্থিতা টেকেনি গাজীপুরের সাবেক মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলমের। উপরন্তু দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়ায় কেন্দ্র স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে তাকে। তবে এবারের নির্বাচনে জাহাঙ্গীর ট্রামকার্ড হিসেবে তার মা জায়েদা খাতুনকে ভোটের মাঠে নিয়ে এসেছিলেন। আর শেষ পর্যন্ত নিজে লড়াইয়ের সুযোগ না পেলেও মাকে সামনে রেখে ঠিকই লড়ে যান ভোটের মাঠে এবং শেষ পর্যন্ত মাকে নির্বাচিত করে জয়ের হাসি নিয়ে ফেরেন। বহুল আলোচিত গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মা স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুন ঘড়ি প্রতীকে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৯৩৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আজমত উল্লা খান নৌকা প্রতীকে পেয়েছেন ২ লাখ ২২ হাজার ৭৩৭ ভোট। এই নির্বাচনে তিনি প্রমাণ করতে পেরেছেন যে গাজীপুরে তার সমর্থক এখনও রয়েছে এবং সেই চ্যালেঞ্জ উৎরে জয়ের পর তিনি জানিয়েছেন যে তিনি আওয়ামী লীগেরই কর্মী। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, ছেলে জাহাঙ্গীর আলমের জন্যই পরিচিতি অর্জন এবং নির্বাচন-রাজনীতিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন জায়েদা। এমনকি জাহাঙ্গীরের জনপ্রিয়তাকেই ভিত্তি করে চমক দেখিয়েছেন মা জায়েদা খাতুন। এছাড়া তার নির্বাচনী কার্যক্রমের প্রধান সমন্বয়কারীও ছিলেন জাহাঙ্গীর আলম।
দেশের দ্বিতীয় নারী মেয়র জায়েদা খাতুন: দেশের প্রথম নারী সিটি মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন তিনি। এরপর দেশের দ্বিতীয় নারী মেয়র হলেন জায়েদা খাতুন। আর গাজীপুরবাসী পেল তাদের প্রথম নগরমাতা। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে মেয়র পদে বিজয়ের পর জায়েদা খাতুন সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, আমি ওনাকে ধন্যবাদ জানাই। ভোটটা আমার সুষ্ঠু হয়েছে। আমি আমার ভোটের হিসাব পেয়েছি। জায়েদা খাতুন বলেন, এই বিজয় আমি গাজীপুরবাসীকে দেব এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও দেব। গাজীপুরবাসীর ঋণ আমি শোধ করার চেষ্টা করব। তিনি বলেন, আমি গাজীপুরের কাজ করেই ঋণ শোধ করব। কাজটা যেহেতু আমি একা করতে পারব না। তাই আমার ছেলেকে নিয়ে করব, যে আগে থেকেই আমার পাশে ছিল। তিনি আরও বলেন, গাজীপুরের মানুষকে এতো ভালোবাসছি এবার দেখি তারা আমারে কেমন ভালোবাসে? এই ভালোবাসা প্রমাণ করার জন্যই ভোটে আসা। আমি গাজীপুরবাসীর ভালোবাসা পেয়েছি।জায়েদা খাতুন যখন গাজীপুর নির্বাচনে প্রার্থী হবার জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন তখন বিষয়টিকে অনেকে গুরুত্ব দেননি। তার পরিচিতি ছিল ‘জাহাঙ্গীরের মা’ হিসেবে। একথা সবার জানা ছিল যে নির্বাচনের নানা জটিল সমীকরণ জায়েদা খাতুনের কাছে পুরোপুরি অজানা ছিল। দৃশ্যপট খানিকটা বদলাতে থাকে যখন সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যায়। বিরোধী দল বিহীন এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সামনে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেন জায়েদা খাতুন।
নৌকার বিরুদ্ধে নয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে জয়, বললেন জাহাঙ্গীর: মা জায়েদা খাতুনের জয় নিশ্চিত হওয়ার পরপরই জাহাঙ্গীর আলম তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছিলেন গাজীপুরের নির্বাচনে নৌকার জয় হয়েছে, ব্যক্তির পরাজয় হয়েছে। নিজের কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেছেন, নির্বাচনে আপনাদের জয় হয়েছে, আর যারা অপরাধী তারা অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সে হিসেবে তাদের আর কিছু বলার নেই। কেউ আঘাত করলে তাকে পাল্টা আঘাত করতে হয় না। তিনি বলেন, শহরের মালিক যে জনগণ এটা আপনাদের ভোটে বিজয়ের মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী থেকে শুরু করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলব, সবার পারিবারিক একটা মর্যাদা আছে। সবাই যেন সবাইকে সহযোগিতা করে। শুক্রবার (২৬ মে) গাজীপুর শহরের ছয়দানা এলাকার নিজ বাসভবনে উৎসুক জনতা ও কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি এসব কথা বলেন। জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমার মা মানে আপনাদের মা। আমার বাড়িঘর আপনাদের সবার জন্য উš§ুক্ত। যেকোনো সময়, যেকোনো প্রয়োজনে আপনারা আসবেন। আমার মা এবং আমি মিলে আপনাদের সার্বিকভাবে সহযোগিতা করব। সবার জন্য এ শহর। আমরা কারও সঙ্গে দ্বন্দ্ব চাই না। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে চাই। নবনির্বাচিত মেয়র জায়েদা খাতুনের ছেলে সবার উদ্দেশে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ পরিচালনা করছেন। উনি আমাদের অভিভাবক, উনাকে সহযোগিতা করব। আমাদের নেতাকর্মীদের যারা হয়রানি করছে, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তা বন্ধ করতে হবে।
জায়েদাকে অভিনন্দন জানিয়ে আজমত উল্লা বললেন নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছেনির্বাচনে পরাজয় মেনে নিয়ে বিজয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আজমত উল্লা খান। নৌকার প্রার্থী বলেছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। কিছু কিছু ক্রটি ছিল, ইভিএমের কারণে, অনেকে ভোট দিতে পারেনি। আমার রেজাল্ট যা হয়েছে, আমি রেজাল্ট মেনে নিয়েছি এবং যিনি বিজয়ী হয়েছেন আমি তাকে অভিনন্দন জানাই। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বিজয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। নির্বাচনে বেসরকারি ফলাফলে আজমত উল্লা খান স্বতন্ত্র প্রার্থী টেবিল ঘড়ি প্রতীকের জায়েদা খাতুনের কাছে ১৬ হাজার ভোটে পরাজিত হন।জাহাঙ্গীরের সহযোগিতার ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আজমত উল্লা বলেন, যদি চায় এটা তো তার ব্যাপার। দেখা যাক, উনি কী ধরনের সহযোগিতা চান। নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ সম্পর্কে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আজমত উল্লা খান বলেন, আমি যেহেতু দলীয় প্রার্থী ছিলাম; দলীয় কিছু বিষয় আছে। একটু চুলচেরা বিশ্লেষণ করে, এটা বসে আমরা পর্যালোচনা করব। পর্যালোচনার পর আমি আমার মতামত দেব। এ সময় গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রশ্নও রাখেন, আমি আগেও বলেছি যে, যেটা প্রপাগান্ডা ছিল; আমি নির্বাচনের রায় মেনে নিয়েছি। এটা যদি অন্য কারও বিপক্ষে যেতেন তিনি কি মেনে নিতেন? এখন তিনি (জাহাঙ্গীর) বলবেন, সুষ্ঠু। কিন্তু আমি একটা নীতি অনুসরণ করে চলি। আমি একটা নৈতিকতা মনে চলি। সুতরাং নির্বাচন আমার বিপক্ষে গেলেই আমি এর বিপক্ষে বলব এটা সঠিক না। এ থেকে দেশবাসীকে বেরিয়ে আসতে হবে ।
আজমত উল্লা’র পরাজয়ের নেপথ্যে: এই নির্বাচনে জায়েদা খাতুনের জয় ও আজমত উল্লা’র পরাজয়ের পেছনে কারণ কি, এমন প্রশ্ন অনেকের মধ্যেই রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর অন্যতম বড় একটি কারণ ছিল প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নির্বাচনে অংশ না নেয়া। স্থানীয়রা বলছেন, এই নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করলে পরিস্থিতি ভিন্ন রকম হতে পারতো। বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলেও তারা চেয়েছিল আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পরাজয় হোক। এবারের নির্বাচনে বিএনপি কোনো প্রার্থীকে সমর্থন না করায় শুধু আওয়ামী লীগের নিজেদের ‘ভোট ভাগাভাগি’ হয়েছে বলে মনে করছেন বিএনপি নেতারা। অনেকে এটাও মনে করেন, এই ভাগাভাগির পাশাপাশি বিএনপি সমর্থকদের একটি অংশের ভোট জায়েদা খাতুনের পক্ষে গিয়েছে। গাজীপুরের এবারের নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন মোট ভোটারের প্রায় ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি ভোটার ভোট দেয়া থেকে বিরত থেকেছেন। গাজীপুরে ভোট গ্রহণের আগের দিন রাতে আমেরিকা বাংলাদেশের জন্য নতুন ‘ভিসা নীতি’ ঘোষণা করেছে। অনেকে মনে করেন এই ঘোষণার প্রভাব পড়েছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। জাহাঙ্গীর আলম দীর্ঘসময় গাজীপুরে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। জেলার মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। গাজীপুর আওয়ামী লীগের একটি অংশের মধ্যে তার সমর্থন রয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, জাহাঙ্গীর আলম যখন মেয়র ছিলেন তখন তার কাছ থেকে আওয়ামী লীগের একটি অংশ সুবিধাভোগী ছিলেন। এজন্য আওয়ামী লীগের প্রাপ্য ভোটের একটা বড় অংশ জাহাঙ্গীর আলমের মা জায়েদা খাতুনের পক্ষে গেছে। এছাড়াও আজমত উল্লা’র কথায় উঠে এসেছে তার পক্ষে থাকা অনেকেই ভোটের দিন ভিন্ন রূপ ধারণ করেছিলেন।

সরকার ও নির্বাচন কমিশন এ যাত্রায় উৎরে গেল: গাজীপুর সিটি করপোরেশনে সুষ্ঠু নির্বাচনে ‘সন্তুষ্টি’ প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংসদ নির্বাচনের আগে ট্রায়াল রানে নিজেদের উত্তীর্ণ দাবিও করেছে তারা। সিটি নির্বাচনের প্রথম দফার নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের কিছুটা হলেও নির্ভার ভাবতে শুরু করেছে এই সাংবিধানিক সংস্থাটি। নির্বাচন পর্যবেক্ষকরাও নির্বাচনকে ‘সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেছেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা নিয়েও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, সামগ্রিক ভাবে এই নির্বাচন অবাধ-সুষ্ঠু ও নিরপক্ষে হয়েছে। অবাধ নির্বাচনের প্রশ্নে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের যে চাপ ছিলো তা এই যাত্রায় উৎরে গেল বলছেন বিশ্লেষকগন। কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত তৃতীয় এই সিটি করপোরেশন নির্বাচনটি সুষ্ঠু ও সুন্দর হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা। তারা নির্বাচনটিকে ‘আইনানুগ ও গ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেছেন। নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলেও সংসদ নির্বাচনের আগে এটা ‘ট্রায়াল রান’ আখ্যায়িত করে ইসি যে সন্তুষ্টি প্রকাশ করছে সেটি ঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ। তারা বলছেন, এই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলেই আসন্ন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন তেমনটি হবে এটা বলা যাবে না। তাদের অভিমত, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না থাকা কোনও নির্বাচনকে সরকার পরিবর্তন সম্পর্কিত কোনও নির্বাচনের সাথে মেলানো যাবে না।
ইউডি/কেএস

