সস্ত্রীক দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা: ইমরানকে চাপে রাখতে মরিয়া পাক-সরকার
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ২৭ মে ২০২৩ । আপডেট ১৭:১৫
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) চেয়ারম্যান ইমরান খানের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। সেই সঙ্গে বিদেশে যেতে পারবেন না ইমরান খানের স্ত্রী বুশরা বিবি এবং পিটিআইয়ের কয়েকজন শীর্ষ নেতা ও সাবেক আইনপ্রণেতা। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য পর্যায়ের কয়েকটি দপ্তরের অনুরোধে এ নিষেধাজ্ঞার তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশ ছাড়াও কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফআইএ ও ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিবিলিটি ব্যুরো (এনএবি) রয়েছে। পুলিশ, কেন্দ্রীয় সন্ত্রাসবাদবিরোধী দপ্তর, প্রাদেশিক দুর্নীতিবিরোধী দপ্তর, এনএবি এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে এ তালিকার জন্য নাম পাঠানো হয়েছে। শুক্রবার (২৬ মে) পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ডন’র প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা যায়। প্রভিশনাল ন্যাশনাল আইডেন্টিফিকেশন লিস্ট (পিএনআইএল) নামের এ তালিকায় ইমরান ও বুশরা বিবি ছাড়াও পিটিআইয়ের নেতা আসাদ ওমর, ফাওয়াদ চৌধুরী, মালেকা বুখারি, কাসিম সুরি, আসাদ কায়সার, মুরাদ সায়েদ, হাম্মাদ আজহার, ইয়াসমিন রশিদ, মিয়া আসলাম ইকবালসহ কয়েকজনের নাম রয়েছে। ৯ মে ইমরান খানকে গ্রেপ্তারের পর পাকিস্তানজুড়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছিল। এসব ঘটনায় পিটিআইয়ের এসব নেতা সম্পৃক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া পিটিআইয়ের এসব নেতা ও সাবেক আইনপ্রণেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তাই ইমরান, বুশরা বিবিসহ এসব রাজনীতিকের নামসহ পিএনআইএল তালিকা পাকিস্তানের সব কটি বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা এ তথ্য সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন। পাকিস্তানজুড়ে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে পিটিআইয়ের নেতাদের ব্যাপক ধরপাকড় চালাচ্ছে পুলিশ। এর পরিপ্রেক্ষিতে দলটির অনেক নেতা বিদেশে পাড়ি দেওয়া চেষ্টা করেছেন। কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাদের দেশ ছাড়ার সেসব চেষ্টা ঠেকানো হয়েছে।
আপোস করতে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চান ইমরান
দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করার পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার (২৬ মে) একটি টুইট করেছেন ইমরান খান। এতে তিনি বলেছেন, পাকিস্তান ছাড়ার কোনো পরিকল্পনা আপাতত তার নেই। এ ছাড়া ইমরান লিখেছেন, বিদেশে কোনো সম্পত্তি কিংবা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তার নেই। এরপরও এ তালিকায় নাম দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাতে চেয়েছেন ইমরান খান। এর আগে গত বুধবার লাহোরে জামান পার্কের বাসভবন থেকে ভার্চ্যুয়ালি বক্তব্য দেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের চেয়ারম্যান ইমরান খান। ভাষণে ইমরান বলেন, দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে তিনি সেনাবাহিনীর সঙ্গে আলোচনার জন্য একটি কমিটি গঠন করে দিতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, আমাকে কিছু আভাস দিন, আমি এক দিনের মধ্যে কমিটি ঘোষণা করে দেব। এ সময় তিনি তার আগের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, তার গঠন করা কমিটিকে যদি সেনাবাহিনী বোঝাতে পারে যে রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে তিনি সরে গেলে দেশের কীভাবে ভালো হবে, তবে তিনি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াবেন। পিটিআই চেয়ারম্যান প্রশ্ন করেন, আগামী অক্টোবরে সারা দেশে একযোগে নির্বাচন হলে তা কীভাবে দেশের স্বার্থ নিশ্চিত করবে? তিনি অভিযোগ করেন, সময়ক্ষেপণ করে তার দল পিটিআইকে নিশ্চিহ্ন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশ যখন নানা সমস্যায় ডুবছে, তখন মানুষ কেন নির্বাচনের জন্য অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করবে? ইমরান তার বক্তব্যে বলেন, সেনাবাহিনী যদি তার কমিটিকে বোঝাতে ব্যর্থ হন, তবে তিনি শেষ বল পর্যন্ত ব্যাট করে যাবেন। তিনি দেশের সাবেক সেনাপ্রধানকে সতর্ক করে বলেন, রাজনীতি থেকে আমাকে সরাতে দেশ ধ্বংসের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াবেন না। পিটিআই চেয়ারম্যান সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের মতপার্থক্য ভুলে দেশের গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার রক্ষায় একতাবদ্ধ থাকতে আহ্বান জানান। ইমরান খান অভিযোগ করে বলেন, তার দলের নেতাদের পদত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে। নেতৃত্ব ও দল ছাড়ার জন্য কর্মী-সমর্থকদের নানা রকম ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। পিটিআই নেতা ও দলের মহাসচিব আসাদ উমর গত বুধবার তার পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি এই পদে ১৭ মাস দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে তিনি দল ছাড়ার কথা বলেননি।
পদত্যাগে বাধ্য হচ্ছেন নেতারা, অভিযোগের তীর সেনাবাহিনীর দিকে
পদত্যাগের হিড়িক লেগেছে পিটিআইয়ে। সর্বশেষ পদত্যাগ করেছেন পিটিআইয়ের অন্যতম প্রভাবশালী নেত্রী শিরিন মাজারি। দলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতির পদত্যাগের ঘোষণা চাপে থাকা ইমরান খানের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে পিটিআই থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন মাজারি। তিনি বলেন, এখন থেকে তিনি পিটিআই কিংবা অন্য কোনো দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রাখবেন না। পিটিআই ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন দলটির নেতা ও পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য মিঞা জলিলও। তিনি ৯ মের সহিংসতার জন্য ইমরান খানকে দায়ী করেন। অন্যদেরও ইমরান খান, তার মতাদর্শ ও রাজনীতি থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এ ছাড়া পিটিআই ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইমরান খানের ‘ঘনিষ্ঠ সহযোগী’ হিসেবে পরিচিত ফাওয়াদ চৌধুরী, জাতীয় পরিষদের সদস্য আফতাব হোসাইন সিদ্দিকী, পিটিআই পশ্চিম পাঞ্জাবের সভাপতি ফায়জুল্লাহ কামোকা, পিটিআই থেকে নির্বাচিত পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য আবদুল রাজ্জাক খান নিয়াজীসহ কয়েক নেতা। পাকিস্তানে রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর অতি প্রভাবের সঙ্গে পিটিআই নেতাদের এভাবে দলত্যাগ করার সম্পর্ক দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। তারা বলছেন, পাকিস্তানে দলত্যাগ-দলবদল নতুন কোনো ঘটনা নয়। আর এসব ঘটনা ঘটে থাকে দেশটির সেনাবাহিনীর তৎপরতার মাধ্যমেই। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক হাসান আসকারি বলেন, এটা ইমরান খানকে একঘরে করে ফেলার প্রক্রিয়ার একটা অংশ। একই সঙ্গে ইমরান খানকে এটা বুঝিয়ে দেওয়া যে কেউ সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিবাদে জড়ালে পাকিস্তানে রাজনীতিতে তাকে ওপরে উঠতে দেওয়া হবে না।
বিক্ষোভের বিচার সামরিক আইনে: ৩৩ জনকে হস্তান্তর
চলতি মাসের শুরুর দিকে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে গ্রেপ্তারের পর সহিংস বিক্ষোভ চলাকালে সেনা স্থাপনায় হামলার সন্দেহে অন্তত ৩৩ জনকে বিচারের জন্য সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করেছে বেসামরিক কর্তৃপক্ষ। শুক্রবার (২৬ মে) পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রানা সানাউল্লাহ এ খবর জানিয়েছেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সামরিক বাহিনীর কাছে তাদেরকেই হস্তান্তর করা হচ্ছে যারা সংবেদনশীল প্রতিরক্ষা স্থাপনায় অনুপ্রবেশ করেছিল। সামরিক আদালতে রুদ্ধদ্বার বিচার হয়। বাইরের কারও সেখানে প্রবেশাধিকার নেই এবং কোনও গণমাধ্যমও থাকতে দেওয়া হয় না। এমন গোপন বিচার পক্রিয়ার সমালোচনা করে আসছে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো। গত ৯ মে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) প্রধান ইমরান খানকে কাদির খান ট্রাস্ট মামলায় ইসলামাবাদ হাইকোর্ট প্রাঙ্গন থেকে গ্রেপ্তার করা হলে দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয়। দলের কর্মী ও সমর্থকরা দেশজুড়ে প্রায় সব সরকারি ভবন এবং সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। সেদিনই সামরিক বাহিনী দিনটিকে ‘কালো অধ্যায়’ বলে মন্তব্য করেছিল এবং ঘটনার এক সপ্তাহ পর সামরিক আইনে দাঙ্গাকারীদের বিচার করার ঘোষণা দিয়েছিল। তখন থেকেই হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে। তাদের বেশির ভাগই ইমরান খানের সমর্থক।
ইউডি/কেএস

