তীব্র গরম ও লোডশেডিংয়ে জনজীবনে হাঁসফাঁস
কিফায়েত সুস্মিত । বুধবার, ০৭ জুন ২০২৩ । আপডেট ১৩:১৫
টানা তাপপ্রবাহের মধ্যে তপ্ত আবহাওয়ায় দেশের সবখানেই তীব্র গরমে অস্থির হয়ে উঠেছে জনজীবন। এরমধ্যে বিদ্যুতের লোড শেডিংয়ে পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে অসহনীয়। ঘরে-বাইরে দিনে ও রাতে সমান ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সবাইকে। জ্যেষ্ঠের এ খরতাপ থেকে রক্ষা পেতে সবাই তাকিয়ে প্রকৃতির পানে; বৃষ্টি নামলে গরম থেকে মিলবে মুক্তি এমন প্রত্যাশা। তবে আবহাওয়ার গতি প্রকৃতি দেখে আগামী কয়েকদিনের পূর্বাভাসেও খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার মতো তথ্য নেই। গরম আর অসহনীয় তাপে যেন শরীর পুড়ে যাবার অবস্থা প্রায়। ফলে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন মানুষ। বিশেষ করে শিশু, নারী এবং বৃদ্ধরা তীব্র গরমে সীমাহীন কষ্ট পাচ্ছেন।
রাজধানীতে কাল বৃষ্টির আভাস, তবুও কমবে না তাপ…স্থির গরমের মধ্যে দুই দিন পর বৃষ্টির দেখা পেলেও পেতে পারে ঢাকাবাসী, এমন স্বস্তির পূর্বাভাসের সঙ্গে অবশ্য আরও কয়েকদিন তাপপ্রবাহে ধকল সইতে হবে বলেও আগাম জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। মঙ্গলবার আবহাওয়াবিদ মনোয়ার হোসেন আবহাওয়ার পূর্বাভাস তুলে ধরে আগামী বৃহস্পতিবার বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানান। তবে গণমাধ্যমকে তিনি এও বলেন, কিন্তু এতে খুশি হওয়ার খুব একটা অবকাশ নেই। কারণ ঢাকায় বৃহস্পতিবার যদি বৃষ্টি হয়ও, এটা তাপমাত্রা কমাতে পারবে না। এটার জন্য আরও চার থেকে পাঁচ দিন অপেক্ষা করতে হবে।আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বাতাসের আর্দ্রতা কমে বাতাস শুষ্ক হয়ে যাওয়ার ফলে সূর্যের তাপ শরীর থেকে পানি শুষে নিচ্ছে। ফলে আমাদের ত্বক জ্বালাপোড়া করছে। এরই মধ্যে গরম নিয়ে কোনো সুসংবাদ দিতে পারেনি তারা। আবহাওয়া অধিদফতর পক্ষ থেকে জানা যায়, আগামী সপ্তাহেও এই তীব্র গরম অব্যাহত থাকবে। গত কয়েক দিনে স্বাভাবিকের তুলনায় ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপদাহ রেকর্ড হয়েছ। আপাতত মুক্তি নেই এই গরম থেকে। বর্ষাবাহী মৌসুমি বায়ু এখনো প্রবেশ করেনি দেশে। মৌসুমী বায়ু প্রবেশের পর ক্রমশ তাপদাহ কমবে। মঙ্গলবার (০৬ জুন) দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল দিনাজপুর ও সৈয়দপুরে। আর ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৮ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
একটু ধৈর্য ধরুন, ১৫-১৬ দিনেই সমাধান: বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী
বিদ্যুতের সার্বিক চিত্র তুলে ধরে চলমান লোড শেডিংয়ের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে এই মাসের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতির আশার কথা শুনিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তিনি মঙ্গলবার সংসদে বলেছেন, আমরা মনে করি, ১৫ থেকে ১৬ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। আপনারা সকলেই একটু ধৈর্য ধরেন। বিশ্বের দিকে ও নিজের দেশের দিকে তাকিয়ে যদি আমরা ধৈর্য ধরি, তাহলে যে সমস্যাটা দেখতে পাচ্ছি, সেটা পার হতে পারব। কয়লার অভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া দেশের সর্ববৃহৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি এই মাসেই সচল করার আশা করছেন নসরুল। দেশে আরও বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর পাশাপাশি ভারত থেকে আমদানি বাড়ানোর কথাও বলেন তিনি। জাতীয় সংসদে ২০২২-২৩ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মঞ্জুরি দাবির উপর ছাঁটাই প্রস্তাবের উপর সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে চলমান বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, বেশিদিন আগের কথা নয়, ১৪ বছর আগের কথা। প্রায় ৬০% বাংলাদেশ অন্ধকারে ছিল। ১৬ ঘণ্টা, ১৮ ঘণ্টা, ১৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকত না।সেখান থেকে আমরা শতভাগ বিদ্যুতায়ন করেছি। সংসদ সদস্যরা স্বীকার করেছেন, বিদ্যুৎ গ্রাম-গঞ্জে ছড়িয়ে গেছে। আমরা সঞ্চালন লাইন করেছি। আমরা যে কোনো মুহূর্তে ২০ থেকে ২২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিতে পারি।
বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা, হাসপাতালে ভীড়: আবহাওয়ার এমন পরিবর্তনে বিপদে আছে শিশুরা। নানারকম রোগে কাবু হচ্ছে অপ্রাপ্ত বয়স্করা। এসব রোগের মধ্যে আছে টাইফয়েড, ডায়রিয়া, চিকেন পক্সের মতো রোগ। চিকিৎসকদের মতে, আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে জুন পর্যন্ত চিকেন পক্সের প্রকোপ দেখা দেয়। ৫ থেকে ৯ বছরের শিশু এবং ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিরা এতে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগের তথ্য বলছে, শিশুদের জন্য সেখানে আলাদা পাঁচটি বিভাগ রয়েছে। এসব বিভাগে দিনে গড়ে ৩০০-এর বেশি রোগী চিকিৎসা নেন। গত কয়েক দিন ধরে তীব্র গরমে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। এখন প্রতিদিন ৭০০-এর বেশি রোগী সেবা নিচ্ছ। এদের মধ্যে নিউমোনিয়া, জন্ডিস, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, জ্বর-কাশি, ডায়রিয়া, টাইফয়েড রোগী বেশি। ঢাকা শিশু হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. শফি আহমেদ মুয়াজ গণমাধ্যমকে বলেন, এখনকার শিশুদের জ্বর, মাথাব্যথা, ভাইরাল জ্বর, ডায়রিয়া, টাইফয়েড, আমাশয় এসব রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। এসময় শিশুদের বাইরে যেতে দেওয়া অনুচিত হবে। ঘামতে দেওয়া যাবে না, বিশুদ্ধ খাবার ও পানি দিতে হবে।
প্রসঙ্গত, মে মাসের শেষ দিক থেকে শুরু হয়েছে তীব্র গরম এবং তা এখনও চলছে। দেশের ওপর দিয়ে এখন মৃদু থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ চলছে। এটি আগামী পাঁচ থেকে ছয় দিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। বাতাসে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকায় গরম বেশি অনুভূত হচ্ছে। দেশব্যাপী চলমান তীব্র দাবদাহের কারণে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণি কার্যক্রম চার দিন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও প্রাথমিক শ্রেণি আগামী বৃহস্পতিবার (৮ জুন) পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। ছাত্রছাত্রীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

