সলোমন আইল্যান্ড নিয়ে কেন প্রতিযোগিতা করছে চীন-আমেরিকা

সলোমন আইল্যান্ড নিয়ে কেন প্রতিযোগিতা করছে চীন-আমেরিকা

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ১২ জুলাই ২০২৩ । আপডেট ১০:১৫

প্রশান্ত মহাসাগরের একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ-রাষ্ট্র সলোমন আইল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী মানাসিহ সোগাভারে চীনের সঙ্গে একটি বিতর্কিত নিরাপত্তা চুক্তিতে সই করার পর সম্প্রতি বেইজিং সফর করেছেন। সোগাভারের এই সফরের লক্ষ্য চীনের সঙ্গে তার দেশের প্রতিরক্ষা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা।

কিন্তু এরই মধ্যে বেইজিংয়ের সঙ্গে তার দেশের এই ঘনিষ্ঠতা আমেরিকা এবং এর মিত্রদের মধ্যে মারাত্মক অস্বস্তি তৈরি করেছে। চীনের সঙ্গে সলোমন আইল্যান্ডস যে নিরাপত্তা চুক্তি করেছে তার অধীনে চীন ঐ দ্বীপরাষ্ট্রে তাদের দূতাবাসের নিরাপত্তা বাড়াতে নানা পদক্ষেপ নিতে পারবে। পশ্চিমা দেশগুলোর আশংকা, এর ফলে চীন প্রশান্ত মহাসাগরে তাদের প্রথম স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি তৈরির সুযোগ পাবে।

সলোমন আইল্যান্ডসকে ঘিরে চীন এবং আমেরিকার মধ্যে এই প্রতিযোগিতার ভেতর ওয়াশিংটন সেখানে তাদের দূতাবাস আবার চালু করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সলোমন আইল্যান্ডসের গুডালকানাল দ্বীপে আমেরিকার সামরিক বাহিনীর ঘাঁটি ছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী মানাসিহ সোগাভারে বলছেন, আমেরিকা এবং চীনের এই ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে তারা নিরপেক্ষ থাকতে চান এবং নিজ দেশের উন্নয়নকেই তিনি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

আমেরিকা অস্ট্রেলিয়ার দুশ্চিন্তা

পশ্চিমা বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, এই চুক্তি আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিকটবর্তী কিছু প্রতিবেশী দেশকে বেশ দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। সলোমন আইল্যান্ডসের অবস্থান প্রশান্ত মহাসাগরের এমন একটি জায়গায়, যা কৌশলগতভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

এই দ্বীপকে ঘিরে চীনের নৌবাহিনীর বড় কোনো পরিকল্পনা আছে বলে সন্দেহ করে পশ্চিমা দেশগুলো। চীনের সঙ্গে সলোমন আইল্যান্ডসের এই ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতায় উদ্বিগ্ন হয়ে ওয়াশিংটন বেশ তাড়াহুড়ো করে গত মাসে পাপুয়া নিউগিনির সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করে।

সলোমন আইল্যান্ডস ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা পায় ৪৫ বছর আগে। গত শুক্রবার স্বাধীনতার ৪৫ তম বার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী সোগাভারে তার ভাষণে বলেছেন, বড় দেশগুলো তার দেশে প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রতিযোগিতায় নেমেছে, কিন্তু তিনি তার দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা নিরপেক্ষ থাকতে চাই, কারণ কোন দেশের পক্ষ নেওয়া আমাদের দেশ বা জনগণের স্বার্থের জন্য ভালো হবে না। আমাদের জাতীয় স্বার্থ হচ্ছে আমাদের দেশের উন্নয়ন।’ তিনি বলেন, রাজধানী হোনিয়ারার বাইরে অন্য এলাকায় অবকাঠামোর উন্নয়নও বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের ঋণের ফাঁদ

চীনের বৃহৎ টেলিকম কোম্পানি হুয়াওয়ে এরই মধ্যে ছয় কোটি ৬০ লাখ ডলার ব্যয়ে সলোমন আইল্যান্ডসে একটি সেলুলার নেটওয়ার্ক তৈরি করছে। এতে অর্থায়ন করছে চীনের এক্সিম ব্যাংক। অন্যদিকে চীনের আরেকটি রাষ্ট্রীয় কোম্পানি হোনিয়ারা বন্দরের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ পেয়েছে। মাত্র সাত লাখ মানুষের এই দেশটি চীনের ঋণের ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে বলে আশংকা করছেন পশ্চিমা বিশ্লেষকরা।

চীনে সাত দিনের সফরের সময় সোগাভারে বেইজিং এ তার দেশের দূতাবাসের উদ্বোধন করবেন। তিনি বিভিন্ন চীনা কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন, এবং জিয়াংসু ও গুয়াংডং সফরে যাবেন বলে কথা রয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘চীন এবং সলোমন আইল্যান্ডস প্রশান্ত মহাসাগরের ঐ অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নে অবদান রেখেছে এবং এই সফরের সময় দুই দেশের নেতারা আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা করবেন।

একটি স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সোগাভারে বলেছেন, তার দেশ এক সময় অস্ট্রেলিয়ার সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু তারা এখন তাদের পররাষ্ট্রনীতির মনোযোগ অন্যদিকে নিবদ্ধ করতে চান। তারা চীন, ভারত এবং বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে সহযোগিতার নতুন পথ খুঁজতে চান। মানাসিহ সোগাভারে ক্ষমতায় আসেন ২০১৯ সালে। তিনি তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেন।

আলোচনায় প্যাসিফিক গেমস

সলোমন আইল্যান্ডসের রাজধানী হোনিয়ারাতে এবছরের নভেম্বরে প্যাসিফিক গেমস অনুষ্ঠিত হবে। এই গেমস আয়োজনের জন্য চীন সেখানে স্টেডিয়াম তৈরি করে দিয়েছে এবং গেমসের নিরাপত্তার আয়োজনেও তারা সাহায্য করছে। সলোমন আইল্যান্ডসের ৮০ জন অ্যাথলেট চীনে প্রশিক্ষণ নিতে যাবেন এ সপ্তাহে।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল বিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞ গ্রেয়াম স্মিথ বলেন, ‘প্যাসিফিক গেমসের কথা মনে রেখে এই সময়টায় এই সফরের আয়োজন করা হয়েছে এবং সেখানে অ্যাথলেটদের পাঠানো হচ্ছে এবং তারা তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে… চীনা পররাষ্ট্রনীতি কী অর্জন করেছে তা চীনের মানুষকে দেখানোও এর একটা উদ্দেশ্য।

তিনি বলেন, এই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটি যেভাবে আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস দেখিয়েছে সেজন্যে সোগাভারেকে চীনে বিরাট সম্মান দেখানো হবে।’

লোয়ি ইনস্টিটিউটের প্যাসিফিক আইল্যান্ডস প্রোগ্রামের পরিচালক মেগ কিন বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরের ঐ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সলোমন আইল্যান্ডসের সঙ্গেই চীনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। প্যাসিফিক গেমস এবং নির্বাচন সামনে রেখে সোগাভারে জাতীয় এবং রাজনৈতিক স্বার্থ আদায়ের লক্ষ্যে চীনের কাছ থেকে আরও সহায়তা চাইবেন।

তবে মেগ কিন বলছেন, সোগাভারে তার দেশকে নিয়ে যে ভু-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়েছে তার সুযোগ নিয়ে হয়তো আমেরিকা এবং জাপানের দেয়া সাহায্যও গ্রহণ করবেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সেপ্টেম্বরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের নেতাদের একটি শীর্ষ সম্মেলন আহ্বান করেছিলেন; যেখানে একটি কৌশল উন্মোচন করা হয় যার মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং অতিরিক্ত মাছ ধরা প্রতিরোধ অন্তর্ভুক্ত ছিল। বাইডেন আগামী দশকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপের দেশগুলির জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় ১৩০ মিলিয়ন ডলারসহ নতুন সাহায্যের জন্য আরও ৮১০ মিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

ইউডি/এ

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading