ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে: উচ্চঝুঁকিতে শিশুরা
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ১৫ জুলাই ২০২৩ । আপডেট ১৪:২০
দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দিনকে দিন বেড়েইে চলেছে। রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকগণ। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে শিশুরা। চিকিৎসকরা বলছেন, সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন না করলে শঙ্কা বাড়বে আরও। এ নিয়ে মিলন গাজী’র প্রতিবেদন
ডেঙ্গু আক্রান্ত প্রতি চারজনে একজন শিশু
প্রতিদিনই রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর ভিড় বাড়ছে। মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু। আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যার হিসাবে ২০২২ সালের প্রথম ৭ মাসের তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়েছে ৭ গুণের বেশি। আক্রান্তের হার আরও বেশি, ১১ গুণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিলো ১ হাজার ৫৭১। এই সময়কালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যান ১০ জন। অথচ চলতি বছরের ৯ জুলাই পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৮৩১ জন। আর মারা গেছেন ৯৩ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ডেঙ্গু আক্রান্ত প্রতি চারজনে একজন শিশু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক থেকে ১০ বছরের শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এক বছরের কম বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। এসব শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক রিজওয়ান আহসান বিপুল গণমাধ্যমকে বলেন, প্রতিদিন শিশুরা ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। বাচ্চাদের শরীর খুব দ্রুত অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। এই বিষয়টি আমাদেরকে চিন্তিত করে তুলছে। চিকিৎসার কোনো পরিবর্তন এখন পর্যন্ত আসেনি। তাই আমরা প্রচলিত চিকিৎসাই দিয়ে যাচ্ছি।
গত একদিনে (বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ৪৪৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৮৪ জন। আর ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৬৫ জন। তবে এই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে কারও মৃত্যু হয়নি। শুক্রবার (১৪ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মোট ৪ হাজার ২২০ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন আছেন। ঢাকার ৫৩টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে ২ হাজার ৭৫৫ জন এবং অন্যান্য বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ৪৬৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৭ হাজার ৮৩১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকায় ১১ হাজার ৯৪১ জন এবং ঢাকার বাইরে চিকিৎসা নিয়েছেন ৫ হাজার ৮৯০ জন। আক্রান্তদের মধ্যে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৩ হাজার ৫১৮ জন। ঢাকায় ৯ হাজার ১১২ এবং ঢাকার বাইরে ৪ হাজার ৪০৬ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত ৯৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

হাসপাতালে বাড়ছে শিশু রোগীর চাপ/ফাইল ফটো
মাত্রাতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল
রাজধানীতে ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এতে অস্থির হয়ে উঠছে শিশু হাসপাতালের পরিবেশ। চিকিৎসক, নার্সের পাশাপাশি সেখানে দেখা দিয়েছে শয্যার সংকট। এদিকে মাত্রাতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। শিশু রোগীদের পরিবারের অভিযোগ, শয্যা পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। হাসপাতালের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ৪২ শয্যা ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমাদের শয্যা কখনও খালি থাকে না। একটা খালি হলে অন্য এক রোগীকে ভর্তি করাই। তবে আমরা অন্যান্য রোগীদের থেকে ডেঙ্গু রোগীদের বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। আমারা প্রাণপণে চেষ্টা করছি একজন রোগীও যেন ফিরে না যায়। আমাদের ২ নম্বর ওয়ার্ড ছাড়াও আইসিইউ, সিসিইউসহ বিভিন্ন জায়গায় একটু ক্রিটিক্যাল ডেঙ্গু রোগীদের রাখা হচ্ছে। রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে তাই অপেক্ষা করতে হয়। ফাঁকা হলে তারপর দ্রুত অন্য একজনকে সেই শয্যায় তুলি। একই চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর অন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতেও। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, মুগদা মেডিকেল কলেজসহ সব হাসপাতালের চিত্র একই। বিশেষ করে শিশু রোগীদের চাপ প্রতিনিয়তই বাড়ছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালগুলোর কর্তৃপক্ষ।
শিশুদের নিয়ে বড় ভয় ‘শক সিনড্রোম’
অধিকাংশ শিশু জ্বর ছাড়াই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। এ কারণে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাদের শারীরিক অবস্থা জটিল হয়ে পড়ছে। হাসপাতালে দেরিতে আসায় অধিকাংশ শিশুর ‘শক সিনড্রোম’ দেখা দিচ্ছে। আগের বছরগুলোর চেয়ে এ প্রবণতা এবার অনেক বেশি; যা নিয়ে উদ্বিগ্ন চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ে যারা হাসপাতালে আসছেন, তারা শুরুতে আসছেন না। ডেঙ্গু হয়েছে কিনা বুঝতে না পেরে, জ্বরের নানা চিকিৎসা নিতে থাকেন। ফলে অবস্থা জটিল হয়ে যায়, এরপর তারা হাসপাতালে আসেন। যে কারণে শারীরিক অবস্থা অনেক খারাপ থাকে। হঠাৎ ‘শক সিনড্রোম’ দেখা দিলে রোগী বাঁচানো কঠিন হয়ে যায়। অনেককে আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) নিতে হচ্ছে। সুস্থ হতে বেশিরভাগ রোগীর ৬ থেকে ৮ দিন থাকতে হচ্ছে। কারও কারও ১০ দিনও লেগে যাচ্ছে।
শিশু হাসপাতালের সহাকারী অধ্যাপক ডা. মো. কামরুজ্জামান কামরুল গণমাধ্যমকে বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে যারা অন্য রোগে আক্রান্ত, তাদের হাসপাতালে বেশি ভর্তি থাকতে হচ্ছে। এক থেকে ১০ বছরের শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এক বছরের কম বয়সী শিশুরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে। এসব শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। তিনি বলেন, বেশির ভাগ রোগী আসছে জ্বর বা ডায়রিয়া হওয়ার চার-পাঁচ দিন পর। এতে রোগী গুরুতর পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। দেখা যায় কারো ফুসফুসে পানি চলে আসছে, পেটে পানি চলে আসছে কিংবা রক্তক্ষরণ হচ্ছে। অনেকের আসার পরপরই আইসিইউ সাপোর্ট লাগছে। এসব রোগী ১০ থেকে ১৫ দিনের চিকিৎসায় সুস্থ হচ্ছে। ডা. মো. কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, শিশুর জ্বর এলে দ্রুতচিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। ডাক্তার নিশ্চিত করবেন শিশুর ডেঙ্গু হয়েছে কি না। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাওয়া যাবে না। মনে রাখতে হবে, কোনো ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক বা ব্যথার ওষুধ সেবন করা যাবে না। এতে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি রয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের যত পদক্ষেপ
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার (জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিস বাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি এবং প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ব্যান-ম্যাল ও ডেঙ্গু রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা) ইকরামুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা আগেও বলেছি যে এডিস মশার বংশ বিস্তারে পরিবেশের ভ‚মিকা মুখ্য। এ বছর তাপমাত্রা বৃদ্ধি এডিস মশার বংশবিস্তারকে অনেক বেশি প্রভাবিত করেছে। বিগত ৫০ বছরের ইতিহাসে শীর্ষ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে এ বছরের মার্চ-এপ্রিলে। গবেষণা বলছে, দেশের গড় যে তাপমাত্রা তার চেয়ে এক ডিগ্রি বাড়লে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা চার থেকে পাঁচ গুণ বাড়তে পারে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ফজলে শামসুল কবির গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা মোবাইল কোর্ট নিয়ে যখন মানুষের বাসায় যাই তখন তাদের ফ্রিজের ট্রের পানি, বেডরুম, ছাদবাগান, বেসমেন্ট এসব জায়গায় এডিস মশার লার্ভা পাচ্ছি। মানুষ সচেতন না হলে সিটি করপোরেশনের পক্ষে সম্ভব না প্রত্যেকের ঘরে ঘরে গিয়ে এডিসের লার্ভা নিধন করা। গত বছরের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ এতোটা বেশি কেন- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি বলব এবারই এডিস সঠিক সময়ে এসেছে৷ গত বছর অনেক দেরিতে এসেছিল। তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এডিসের আচরণে পরিবর্তন এসেছে। এতে প্রকোপ বেড়েছে।উদ্ভ‚ত পরিস্থিতিতে মানুষের সচেতনতা না বাড়লে এটা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এডিস মশা যেন বংশবিস্তারের জায়গা না পায় সে ব্যাপারে আমাদের সবাইকে সতর্ক হতে হবে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম রেজা গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা জনগণের সঙ্গে সংযোগ বাড়াচ্ছি। যেসব বাড়িতে ছাদবাগান আছে সেখানে ড্রোন সার্ভে করে দেশের বাইরে থেকে আনা ওষুধ প্রয়োগ করছি। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করছেন। মাইকিং করেও জনগণকে সচেতন করা হচ্ছে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১৫ জুলাই, ২০২৩ । প্রথম পৃষ্ঠা
শিশুদের আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি ও ঝুঁকির কারণ জানালেন বিশেষজ্ঞরা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুরা বেশি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার কয়েকটা কারণ আছে। যেমন- শিশুদের ত্বক নরম। মশা খুব সহজেই কামড়াতে পারে। বড়দের মতো মশার কামড় থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে না শিশুরা। শিশুরা বলতে পারে না। শিশুরা যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন মশা কামড়াতে পারে। এসব কারণে শিশুদের ডেঙ্গুতে আক্রান্তের হার বেশি। তবে এখন দিন-রাত সবসময়ই কামড়ায় ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা। এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। কারণগুলো বিশ্লেষণ করে দেখেছিÍ বিশ্বব্যাপী আলোর দূষণ হচ্ছে, আলোর ব্যবহার বেড়েছে। রাতে এখন প্রচুর আলো ব্যবহার হয়। আলোর ব্যবহার ও আলোর দূষণের কারণে মশার চরিত্র পরিবর্তন হয়েছে। এখন দিনে বা রাতে সবসময়ই এডিস মশা কামড়ায়।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, পরিষ্কার পানিতেই শুধুমাত্র এডিস মশা হয় এমন না, যেকোনো পানিতেই এডিস মশা হয়। আমরা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করেছি, আমরা দেখেছি যে সুয়ারেজের পানি, ড্রেনের পানি এমনকি নোনা পানিতেও এডিস মশা তার জীবনচক্র সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারে। এডিস মশা যেকোনো পরিবেশে খাপ খাইয়ে টিকে থাকতে পারে। তাই এই মৌসুমে জ্বর হলেই প্রথমে ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে হবে। জ্বরের প্রথম দিনে এ পরীক্ষা করলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। জ্বর হলে বাচ্চাকে পরিপূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে। শিশুকে পর্যাপ্ত পানি, খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি পান করাতে হবে, যেন অন্তত ৬ বার করে প্রস্রাব করে। জ্বরে প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোন ব্যথার ওষুধ দেওয়া যাবে না। কুসুম গরম পানি দিয়ে শরীর মুছে দেওয়া যেতে পারে। সেই সঙ্গে ডেঙ্গুর বিপদচিহ্নগুলোর দিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিপদচিহ্ন দেখলে শিশুকে নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে হবে। কারণ, এ সময় শিশুর শিরাপথে স্যালাইন লাগতে পারে।
ইউডি/এজেএস

