সপ্তাহে ৫০ ঘন্টা কাজ: শরীর ও মনের জন্য ভালো নাকি মন্দ?

সপ্তাহে ৫০ ঘন্টা কাজ: শরীর ও মনের জন্য ভালো নাকি মন্দ?

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ১৬ জুলাই ২০২৩ । আপডেট ১২:৩০

৪০ বা ৫০ ঘন্টা কাজ প্রতি সপ্তাহে! দিনে ৮-৯ ঘন্টা করে কাজ, সপ্তাহে ৫-৬ দিন। কথা শুনে মনে হতে পারে, আমরা এত কাজ করি? আদতে ৪০-৫০ ঘন্টার চেয়ে অনেক বেশি কাজ করা হয় আমাদের। আমরা যন্ত্রের মতো কাজ করেই যাচ্ছি, নাওয়া-খাওয়া কী তা তো প্রায় ভুলেই গেছি। অতিরিক্ত কাজের ফলে হওয়া ক্ষতির হিসেব আজ করব আমরা। আর কীভাবে আমরা এর সম্ভাব্য সমাধান করতে পারি, সেই হিসেবও করা হবে।

কী হতে পারে দীর্ঘ সময় কাজ করলে?

দীর্ঘ সময় কাজ করলে শরীরে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ইনসমনিয়া দেখা দেয়। অন্যদিকে, নানা মানসিক সমস্যা, কর্মক্ষেত্রে নানা অসুবিধা, যেমন- কাজ ঠিকভাবে না করে, আহত হওয়া, ক্ষুধামন্দাসহ অনেক দৃশ্যমান আর অদৃশ্য জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। আমরা এটা প্রায়ই এড়িয়ে যাই কিছু হবে না ভেবে। হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ডায়াবেটিসসহ নানা ধরনের শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি মৃত্যুঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। যেহেতু দীর্ঘসময়, দীর্ঘদিন কাজ করা হয়, কোনো বিরতি আমাদের শরীর পায় না, সেহেতু আমাদের ব্রেইন সেল, হার্ট ড্যামেজ হতে শুরু করে। এর অন্যতম কারণ মানসিক চাপ, অবসাদ, ও ক্লান্তি। এছাড়াও শারীরিক স্বাস্থ্যের অবনতির সাথে সাথে মানসিক স্বাস্থ্যেরও বেশ অবনতি ঘটে।

ক্ষুধামন্দা, অবসাদ, উদ্বিগ্নতা, বাইপোলার ডিজঅর্ডার, ইনসমনিয়াসহ নানা ধরনের মানসিক অসুস্থতা জেঁকে বসে। অনেক ক্ষেত্রে অসুস্থতা ক্রনিক আকার ধারণ করে, আত্মহত্যার চিন্তা বা প্রচেষ্টার সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। অতিরিক্ত কাজের চাপে আমাদের ঘুম হয় না। ফলে কাজে মনোযোগ কমে যায়, বিরক্তি আসে, সর্বদা শরীর ম্যাজ ম্যাজ করে। আবার, অনেকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঝুঁকি নেয়ার সাহস, খিটখিটে মেজাজ তৈরি হয়। সবকিছু মিলিয়ে মূলত কাজের ক্ষতি হয়, যা শারীরিক এবং মানসিকভাবে ক্ষতি করে। তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো- আপনি মনযোগী হতে পারবেন না, কাজও ঠিকভাবে করতে পারবেন না। কাজে প্রচুর ভুল হয়, ক্ষতি হয়, ফলশ্রুতিতে কাজ বার বার করার প্রয়োজন হতে পারে।

কাজের উৎপাদনশীলতা কমে যায়

দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার পরিণতি মোটেও ভালো ফল দেয় না। একটা সময় পর গিয়ে এটি আপনার কাজের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে ফেলতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করলে সেটি প্রথম কয়েক সপ্তাহ অনেক কাজ করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করলেও পরে গিয়ে কাজের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে ফেলে। কিন্তু প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সীমা রেখে কাজ করলে সেটি আপনার কাজের উৎপাদনশীলতা বজায় রাখতে পারে দীর্ঘ সময়।

স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে

অতিরিক্ত কাজ করার ফলে আপনার স্বাস্থ্যের অনেক ক্ষতি হতে পারে। দীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে আপনার শরীরে বেশি ক্লান্তিভাব আসতে পারে। এ ছাড়া ঘুম বেশি পাওয়া, মাথাব্যথা, চাপ বৃদ্ধি পাওয়া, বিরক্তিবোধ কাজ করার মতো সমস্যাগুলো হতে পারে অতিরিক্ত কাজ করার ফলে। আর এগুলো আপনার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটানোর কারণ হতে পারে।

সামাজিক জীবনে প্রভাব

বেশি পরিমাণে কাজ করার মাধ্যমে আপনার সামাজিক জীবন থেকে অনেকটা অবহেলিত হতে পারেন। এটি সম্পর্কে দ্বন্দ্ব সৃষ্টির কারণ হতে পারে। এতে আপনি পরিবারকে সময় দিতে অনেক সময় অক্ষম হয়ে থাকেন। সব দিকে মানিয়ে চলে নির্দিষ্ট পরিমাণ সময় ব্যয় করা উচিত। এতে আপনার কাজের সঙ্গে সামাজিক জীবনও ভালো যাবে।

মস্তিষ্কের ক্ষতি

প্রতিবেদনে দেখা যায়, যারা সপ্তাহে ৪৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করেন, তাদের হার্টঅ্যাটাকের সম্ভাবনা প্রায় ৬৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া অতিরিক্ত কাজ করার ফলে সেটি মস্তিষ্কে চাপ প্রদান করে মস্তিস্কের ক্ষতি করে এবং পাশাপাশি হার্টকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

সমাধান

সংশ্লিষ্ট কোম্পানির লাঞ্চ ব্রেকসহ, টি ব্রেক দেয়া প্রয়োজন, যাতে দীর্ঘ ৭-৯ ঘন্টা বসে থাকতে না হয়। অফিস রুমে প্রয়োজনীয় আলো-বাতাসের ব্যবস্থা থাকতে হবে। স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। যেমন- খোলা জানালা বা পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো এবং অক্সিজেনের সরবরাহ থাকতে হবে। অপ্রয়োজনীয় মিটিংয়ের আয়োজন থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। অপ্রয়োজনে অফিসে কর্মীদের রাখা যাবে না।

অফিস স্টাফদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং সাময়িক বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন- গেমিং জোন বা বইপড়ার জন্য ছোট্ট একটা কর্ণার। ওভারটাইম কাজ না করানো, ছুটির দিনে খুব জরুরি না হলে কাজ না করানো। সবগুলোই যে মেনে চলতে হবে তা না, নিজের জন্য যেটা ভালো, নিজের যেটা সুবিধা হবে, ঠিক সেই কাজগুলোই করবেন। নিজের ভালোর জন্য যা করার সেটা করলেই টানা কাজের জন্য যে ক্ষতি হচ্ছে সেটা থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি পাবেন।

অতিরিক্ত কাজ করলে ট্যাক ভারী হয়তো হতেই পারে, কিন্তু শারীরিক অসুবিধাও পাল্লা দিয়ে বাড়ে। একদিকে যেমন কর্তৃপক্ষের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন, তেমনি দরকার কর্মীদের সচেতন হওয়া। বিগত তিন বছর ধরে হোম অফিস বা হাইব্রিড অফিস জনপ্রিয় হচ্ছে। এর ফলাফল কিন্তু মন্দ নয়। কিছুদিন আগেই রায়ান রোসলান্সকি, লিঙ্কড ইনের সিইও বলেছেন, অফিসের আসা-যাবার সময় হিসেবের দিন এখন আর নেই। তার মতে, কাজ ঠিকমতো হলেই হলো। কে কোথায় বসে কাজ করছে সেটা নয়।

লেখক: তাশফিয়া প্রমি

ইউডি/এ

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading