দ্য বাইসাইকেল থিফ: যে চলচ্চিত্র বদলে দিয়েছিল সিনেমার ভবিষ্যৎ
উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ১৭ জুলাই ২০২৩ । আপডেট ১২:৩০
বিশ্বের সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘দ্য বাইসাইকেল থিফ’। ইতালিয়ান ভাষার এই চলচ্চিত্রটির পরিচালক ভিত্তোরিও ডি সিকা। ১৯৪৮ সালে তিনি এ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন। এই চলচ্চিত্রটির কাহিনী নেয়া হয়েছে লুইজি বার্তোলিনির ‘বাইসাইকেল থিভস’ উপন্যাস থেকে।
ভিত্তোরিও ডি সিকার অমর সৃষ্টি এই “দ্য বাইসাইকেল থিফ” মূলত নিও-রিয়্যালিস্ট চলচ্চিত্র। নিও-রিয়্যালিস্ট চলচ্চিত্রগুলো দর্শকদের কাছে যেসব মুহূর্ত উপস্থাপন করে তা যেন মনে হয় বাস্তব জীবন থেকে নেয়া, বাস্তব ঘটনা ও মানুষের চিত্রায়ন। এসব চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলো বাস্তব মানুষের মতোই এবং এ ধরনের সিনেমাতে দৃশ্যায়িত হয় বাস্তবে দেখা প্রাকৃতিক ও অভ্যন্তরীণ দৃশ্যাবলী।
নিও রিয়ালিজম চলচ্চিত্রের সূচনার ইতিহাস ঘাটতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে অনেক বছর আগে। চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চল্লিশের দশকের শেষে জন্ম নেয় এই শিল্পধারা। শিল্প মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রের বয়স তখন ৫০ ছাড়িয়েছে, একটি প্রভাবশালী মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্র যখন প্রতিষ্ঠিত, ঠিক সেই সময় ইতালিতে জন্ম নিয়েছে চলচ্চিত্রের এই নতুন শিল্পমন্ত্র নিও-রিয়্যালিজম।
ইতালিয়ান নিও-রিয়্যালিস্ট চলচ্চিত্রে ফুটে উঠেছে মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইতালির প্রতিকূল সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং আদর্শিক প্রেক্ষাপটের দৃশ্য। এই নিও-রিয়্যালিজম শিল্পধারার মূল শ্লোগান ছিল ‘টেক দ্য ক্যামেরা আউট ইনটু দ্য স্ট্রিট’। অর্থাৎ স্টুডিওর মেকি এবং কৃত্রিম পরিবেশ ছেড়ে ক্যামেরা নিয়ে রাস্তায় বেড়িয়ে পড়ো।
মানুষের সাধারণ জীবনে ঘটে যাওয়া দৃশ্যগুলো তুলে ধরো ক্যমেরায়। জীবন যেখানে যেমন তাকে সেখানে তেমন করেই তুলে ধরো রুপালী পর্দায়। এরকম নতুন কিছু সৃষ্টির আহবান প্রবলভাবে আকৃষ্ট করেছিলো কয়েকজন ইতালীয় পরিচালককে, যারা স্টুডিওর সাজানো মেকি পরিবেশ ছেড়ে নেমে এসেছিলেন পথের ধুলোয়। তাদেরই একজন ভিত্তোরিও ডি সিকা।
‘দ্য বাইসাইকেল থিফ’ চলচ্চিত্রের দৃশ্যপটে উঠে এসেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইতালি। ফুটে উঠেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইতালির অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার চিত্র।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে কয়েক বছর হলো। পরাজিত শক্তি ইতালি তখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বেশ দুর্বল। চারদিকে বেকারত্ব। কাজের সন্ধানে প্রতিদিন হাজার হাজার লোক ছোটাছুটি করছে এদিক-সেদিক। এন্টোনিও রিকিও তাদের মতো একজন। তাকে ঘিরেই পুরো চলচ্চিত্রের কাহিনী।
স্ত্রী ও দুই পুত্র নিয়ে তার পরিবার। হতাশায় নিমজ্জিত বেকার এন্টনিও রিকি একদিন হঠাৎ করে বিভিন্ন জায়গায় পোস্টার লাগানোর একটি চাকরি পেয়ে যায়। কিন্তু এই কাজের জন্য প্রয়োজন একটি বাইসাইকেল। চাকরিদাতাদের কঠিন শর্ত- বাইসাইকেল জোগাড় করতে না পারলে চাকরি হবে না। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে যেখানে হাজার হাজার লোক একটি চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে, সেখানে এরকম একটি চাকরি পাওয়া বিশাল ব্যাপার। কাজেই চাকরি হাতছাড়া করা যাবে না।
কিন্তু বাধ সাধলো বাইসাইকেল। অবশেষে ‘সাইকেল জোগাড় করা যাবে’ এই শর্তে সে চাকরিটি নিয়ে নেয় সে। কিন্তু তাকে ঘিরে ধরে আরেক চিন্তা; কথা তো দিলো, কিন্তু সাইকেল পাবে কোথায়? এ সময় এগিয়ে আসে রিকির স্ত্রী মারিয়া। বিয়েতে পাওয়া দামি চাদরগুলো বিক্রি করে সাইকেল কেনা হয়।
সাইকেল কেনার পর থেকেই বাবা ছেলের মাঝে অন্যরকম এক উদ্দীপনা। কাজের প্রথমদিন সকালে রিকি তার ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, ওই দিনই সাইকেলটি চুরি যায়। এরপর ছবির কাহিনি আবর্তিত হয়েছে সাইকেলটি পাওয়া আর না পাওয়ার দোলাচলের মধ্যে। ছয়-সাত বছরের শিশুপুত্র নিয়ে সে রোমের রাস্তায় রাস্তায় সাইকেলটা খোঁজে। কিন্তু পায় না। এদিকে সংসার চালানো খুব কষ্ট।
সাইকেল হারানোর বেদনায় রিকির স্ত্রী যখন ক্রন্দনরত তখন এগিয়ে আসে রিকির এক বন্ধু। সে রিকিকে আর তার ছেলেকে নিয়ে সাইকেল উদ্ধারের চেষ্টায় বেরিয়ে সাইকেলটির খোঁজ পায়, কিন্তু প্রমাণের অভাবে উদ্ধার করতে পারে না। নদীর ঘাট, খেলার মাঠের বাইরে সে তার চুরি যাওয়া বাইসাইকেল খুঁজতে থাকে। একসময় এক চোরের পিছনে কিছুটা পথ ধাওয়া করে তার হারিয়া যাওয়া সাইকেলের তথ্য পাওয়ার জন্য। কিন্তু তাতেও ব্যর্থ হয়, হারিয়ে ফেলে সেই চোরকে। (সংক্ষিপ্ত)
লেখক: নূর এ সাফি আহনাফ
ইউডি/এ

