কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট : আড়ালে ভয়াবহ মাফিয়াবাজি

কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট : আড়ালে ভয়াবহ মাফিয়াবাজি

উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ২১ জুলাই ২০২৩ । আপডেট ১৪:৩০

দেশে কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট নিয়ে ব্যবসা করছে একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র। তারা নানা সাধারন মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে নানা প্রলোভন দেখিয়ে কামিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। সেই সঙ্গে কিডনি দাতারাও নিজেদের জন্য বিপর্যয় ডেকে নিয়ে আসছেন। এই চক্রগুলোর কার্যক্রম নিয়ে আবদুল্লাহ সাদিত’র প্রতিবেদন

কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গের অবৈধ ট্রান্সপ্লান্ট: দেশে সক্রিয় বহু চক্র

সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে প্রথমবারের মতো কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয় এবং তা সফল হয়। দেশের গণমাধ্যমগুলোতে তা ফলাও করে প্রচারও করা হয়। কিন্তু এর পেছনে বড় ধরনের ‘অনিয়ম’, কিডনি দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে সম্পর্কের মিথ্যা তথ্য ও অবৈধ আর্থিক লেনদেন অভিযোগ মেলে। এরপরই বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ ওই ঘটনা তদন্তে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। দেশের বর্তমান আইন অনুযায়ী নিকটাত্মীয় ছাড়া কাউকে কিডনি দেয়া যায় না। কিন্তু বর্তমানে দেশে সংঘবদ্ধ বেশ কিছু চক্র এই কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট নিয়ে জমজমাট ব্যবসা করে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সোচ্চার থাকলেও তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রতারণা করে চলছে চক্রগুলো।

মূলত কিডনি রোগীদের অসহায়ত্বের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দেশের নিম্নবিত্ত-দরিদ্র মানুষদের টার্গেট করে কিডনি সংগ্রহ করছে চক্রগুলো। আর তাতে কিডনি দাতারা অচিরেই নিজেদের জীবন শেষ করে চলছে আর চক্রগুলো হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এ রকমই এক চক্রের মূলহোতাকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-১। তাতে দেখা যায় ওই চক্রের হোতা একাই ৫০টির অধিক কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ ধরণের আরও চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে জানিয়েছে র‍্যাব। লে. কর্নেল মোস্তাক আহমেদ বলেন, প্রতারণার মাধ্যমে কিডনিসহ মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের অবৈধ ট্রান্সপ্লান্টের সঙ্গে সক্রিয় রয়েছে কয়েকটি চক্র। এসব চক্রের ফাঁদে প্রলুব্ধ হয়ে সর্বহারা হচ্ছে অসহায় নিম্নআয়ের অনেক মানুষ। আইনবহির্ভূত, স্পর্শকাতর ও অবৈধ ট্রান্সপ্লান্টের এ কার্যক্রমে চক্রের সদস্যরা অর্থের লোভে অমানবিক কার্যক্রমে যুক্ত।

বিদেশ যাওয়ার প্রলোভন: সেই সুমিত এখন কী করবেন?

অমিত হাওলাদার-সুমিত হালদার দুই জমজ ভাই, বাড়ি ঝালকাঠি। রাজধানীর বিএসএমএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে প্রথমবারের মতো কিডনি প্রতিস্থাপন করার সংবাদ টেলিভিশনে দেখতে পেয়েই থমকে যান অমিত, কেননা কিডনিদাতা যেই মানুষটি কথা বরা হয়েছিলো তাকে নিজের চেনা মনে হয়। আর সেখান থেকেই হাসপাতালে গিয়ে শনাক্ত হয় যে ওই দাতা আর কেউই নয় তার আপন ভাই সুমিত। যার ছদ্মনাম দেয়া হয় সুসেন। ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, সুমিত থেকে সুসেন হওয়ার নেপথ্যের কাহিনী। হাসপাতালের একটি ‘চক্রের’ কাছে গ্রীসে যাওয়ার প্রলোভন পেয়ে সুমিত কিডনি দিতে ইচ্ছুক হয়েছিলেন। যেখানে ওই চক্র কিডনিগ্রহীতাদের কাছ থেকে ৩ লক্ষ টাকার চুক্তিও হয়েছিলো।

জানা যায়, সুমিতের স্ত্রী রাজধানীর পান্থপথের একটি বেসরকারি হাসপাতালের নার্স। সুমিত স্ত্রীকে নিয়ে ফার্মগেট এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন। তিনি বনানীতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সুমিতের স্ত্রী জানান, সুমিত দুই দিন আগে বাসা থেকে বেরিয়েছেন। বের হওয়ার আগে বলেছিলেন, বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর অংশ হিসেবে একটি প্রশিক্ষণের জন্য বরিশাল যাচ্ছেন। বিশ্লেষকগণ বলছেন, এ ধরণের হাজারো সুমিত প্রতিনিয়ত প্রলোভনের শিকার হচ্ছেন। কেউ বিদেশ যাওয়ার জন্য, কেউবা অর্থের লোভে নিজেদের তিলে তিলে নিঃশেষ করছেন।

অসহায়দের টার্গেট করে প্রতারণার ফাঁদ, পাচার হয় বিদেশেও

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা অসহায় মানুষকে টার্গেট করে প্রতারণার ফাঁদ পাতে কিডনি ক্রয়-বিক্রয় চক্র। কখনও তারা বলে সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে একটির বেশি কিডনি দরকার নেই, কখনও মিথ্যা আশ্বাস দেয় যে চিকিৎসার খরচ তারা বহন করবে। টাকার লোভে কিডনি হারিয়ে প্রায়ই অকর্মণ্য হয়ে গিয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে অসহায় মানুষগুলো।এমন একটি চক্রের মূলহোতা হলো আনিছুর রহমান। তার সঙ্গে আরও অনেকে চক্রে জড়িত রয়েছে। র‌্যাব ইতোমধ্যেই পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

চক্রটির কার্যক্রম সম্পর্কে র‍্যাব-১ অধিনায়ক লে. কর্নেল মোস্তাক আহমেদ বলেন, চক্রটি চারটি ভাগে বিভক্ত হয়ে কাজ করে। প্রথম গ্রুপ বিদেশে অবস্থান করে। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট প্রয়োজন এমন বিত্তশালী রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। মূলহোতা আনিছ ঢাকায় বসে বিদেশে ডোনার পাঠানোর বিষয়টি তদারকি করে। কিডনি ক্রয়-বিক্রয় চক্রের অন্যতম মূলহোতা মো. আনিছুর রহমানসহ (২৯) পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব-১। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আনিছুর র‍্যাবকে জানিয়েছে, চার বছরে তার মাধ্যমে ৫০টির বেশি কিডনি বিক্রি হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২০ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‍্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‍্যাব-১ অধিনায়ক (সিও) লে. কর্নেল মোস্তাক আহমেদ।

র‍্যাব-১ অধিনায়ক লে. কর্নেল মোস্তাক আহমেদ

গ্রেপ্তারকৃত অন্যরা হলেন- মো. আরিফুল ইসলাম ওরফে রাজিব (৩৩), সালাউদ্দিন তুহিন (২৭), এনামুল হোসেন পারভেজ (ডোনার) এবং সাইফুল ইসলাম। জানা যায়, বিদেশে অবস্থানরত অনেকে জীবন বাঁচাতে ৪৫-৫০ লাখ টাকা খরচ করে কিডনি ক্রয় করেন। এই টাকার মাত্র ৪-৫ লাখ টাকা পায় ডোনার। ৫-১০ লাখ টাকার ভাগবাটোয়ারা হয় দেশের ভেতরে সক্রিয় দালাল, অসাধু ট্রাভেল এজেন্ট এবং অন্যান্য প্রতারকদের মধ্যে। বাকি প্রায় ৩০ লাখ টাকা ভোগ করে বিদেশে অবস্থানরত কিডনি পাচার সিন্ডিকেট। একেক জনের সঙ্গে একেক ধরনের চুক্তি করে কিডনি প্রতিস্থাপন করত, সেই টাকা কীভাবে ভাগ হতো? এমন প্রশ্নের উত্তরে মোস্তাক আহমেদ বলেন, জানা গেছে প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ টাকার চুক্তি হতো। সেই টাকার মধ্যে যিনি কিডনি দিতেন তিনি চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পেতেন। বাকি টাকা চক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে বণ্টন হতো।

মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে প্রতারণার কাজ করে আসছে চক্র

যেভাবে চলে সংঘবদ্ধ চক্রের অবৈধ কার্যক্রম

মূলত এসব চক্র মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে প্রতারণার কাজ করে আসছে। র‌্যাব বলছে, আমরা বেশকিছু পেজ নজরদারি করছি; ধারণা করছি এসব কাজে আরও বেশকিছু চক্র জড়িত। তাদেরকে ধরার পরই আইনের হাতে সোপর্দ করা হবে। কোনো সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা অন্য কেউ চক্রের সঙ্গে জড়িত আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে র‍্যাব-১ এর অধিনায়ক বলেন, না আমরা এমন কাউকে পাইনি। তাদের কাছে যেসব কাগজপত্র পেয়েছি সেগুলো জাল। এগুলো জাল-জালিয়াতির মাধ্যমেই তৈরি করেছে, যা দিয়ে ভিসা পাওয়ার ব্যবস্থা করত। এর সঙ্গে কোনো হাসপাতালের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। গ্রেপ্তারকৃত চক্রের সদস্যদের ভাষ্য, চাহিদা অনুযায়ী দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরিব মানুষদের চিহ্নিত করে এবং তাদের অর্থনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অর্থের বিনিময়ে কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের জন্য ডোনার হতে প্রলুব্ধ করে ঢাকায় নিয়ে আসে। পরে ঢাকার বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট প্রত্যাশী রোগীর সঙ্গে ব্লাড ম্যাচিং এবং অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে। এসব বিষয় নিশ্চিত হলে কিডনি ডোনারদের পাসপোর্ট, ভিসা প্রসেসিং এবং ভুয়া কাগজপত্র তৈরির মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী দেশে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করে। পরে ডোনারদের বৈধভাবে প্লেনে করে কিংবা অবৈধভাবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত এলাকা দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। জানা যায়, ইন্ডিয়ার কিডনি কেনাবেচা চক্রের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রায় শতাধিক মানুষকে সে দেশে পাচার করে যাচ্ছে বেশ ক’টি চক্র।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২১ জুলাই ২০২৩ । প্রথম পৃষ্ঠা

কিডনি প্রতিস্থাপন: দেশের আইন কী বলছে?

কে কাকে কিডনি দান করতে পারবেন। এই সংক্রান্ত আইন দেশে করা হয় ১৯৯৯ সালে। মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-১৯৯৯। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে আইনটি সংশোধন করা হয়। আইনে ‘নিকট আত্মীয়’ বলতে উল্লেখ করা হয়েছে- পিতা, মাতা, পুত্র, কন্যা, ভাই, বোন, স্বামী, স্ত্রী ও রক্ত সম্পর্কিত আপন চাচা, ফুফু, মামা, খালা, নানা, নানি, দাদা, দাদি, নাতি, নাতনি, আপন চাচাতো, মামাতো, ফুপাতো, খালাতো ভাই বা বোন। এছাড়া আইন অনুযায়ী, সুস্থ ও স্বাভাবিক বুদ্ধিসম্পন্ন কোনো জীবিত ব্যক্তি যদি কিডনি দেবার কারণে যদি তার স্বাভাবিক জীবন যাপনে বাধা না থাকে তাহলে তিনি তা দান করতে পারবেন তবে সেই অঙ্গ অবশ্যই নিকট আত্মীয়ের জন্য দান করতে হবে। অর্থ্যাৎ আইন অনুযায়ী শুধুমাত্র নিকট আত্মীয়রাই একে অপরকে কিডনি দান করতে পারবেন। এখানে কোনো আর্থিক লেনদেন হবে না।

আইনে উল্লেখ আছে, ১৮ বছরের কম অথবা ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বের জীবিত কোনো ব্যক্তি কিডনি দিতে পারবেন না। আইন অনুযায়ী গ্রহিতার বয়স ২ বছর হতে ৭০ বছর বয়সসীমার মধ্যে হতে হবে। তবে ২৫ থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত বয়সসীমার ব্যক্তিরা কিডনি গ্রহিতা হিসেবে অগ্রাধিকার পাবেন। এছাড়া কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য অবশ্যই সরকারের অনুমতি নিতে হবে।

আইন বলছে, কোনো ব্যক্তি নিকট আত্মীয় সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য প্রদান করলে বা তথ্য প্রদানে উৎসাহিত, প্ররোচিত বা ভীতি প্রদর্শন করলে তা হবে একটি অপরাধ এবং তিনি ২ বছরের সশ্রম কারাদø বা অনধিক ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। তবে, ২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর দেওয়া এক রায়ে আদালত বলেছিলেন, আত্মীয় না হয়েও কেউ আবেগের বশবর্তী হয়ে কাউকে কিডনি দান করতে চাইলে তা যেন তিনি করতে পারেন, তার জন্য আইন সংশোধন করতে হবে।

ইউডি/এজেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading