হেপাটাইটিস নির্মূলের টার্গেট ২০৩০ সাল: বাস্তবতা কী বলছে?
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ২৮ জুলাই ২০২৩ । আপডেট ১৪:৩৫
বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও আজ শুক্রবার (২৮ জুলাই) ‘বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস ২০২৩’ পালিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিস নির্মূলের লক্ষ্যে দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘হেপাটাইটিস, আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা নয়’। এ নিয়ে বিনয় দাস’র প্রতিবেদন
‘বি’ এবং ‘সি’- ভাইরাস জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি
২০০৮ সালের ২৮ জুলাই ‘বিশ্ব হেপাটাইটিস অ্যালায়েন্স’ বিশ্ববাসীকে সচেতন করতে হেপাটাইটিস দিবস পালনের উদ্যোগ নেয়। এর পর থেকে প্রতিবছর ২৮ জুলাই দিবসটি পালন করা হচ্ছে। ২০১১ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দিবসটির স্বীকৃতি দেয়।আর ভাইরাল হেপাটাইটিস বর্তমান বিশ্বের একটি অন্যতম জনস্বাস্থ্য সমস্যা। প্রতি বছর ২৮ জুলাই হেপাটাইটিস বি ভাইরাস আবিষ্কারক নোবেল বিজয়ী আমেরিকান চিকিৎসক প্রফেসর বøম বার্গ এর জন্ম তারিখকে সম্মান জানিয়ে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালিত হয়। সাধারণ কথায় লিভার তথা যকৃতের প্রদাহকে বলা হয় হেপাটাইটিস। কোনো ব্যক্তির হেপাটাইটিস হওয়ার অসংখ্য কারণ থাকতে পারে। তবে এর মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো-বিভিন্ন ধরনের হেপাটোট্রপিক ভাইরাস। এ ধরনের ভাইরাস সরাসরি যকৃতকে সংক্রমিত করে এবং যকৃতেই বংশবৃদ্ধি করে।
হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি, ই, জি ইত্যাদি হলো বিভিন্ন ধরনের হেপাটোট্রপিক ভাইরাস; যা বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী হেপাটাইটিসের অন্যতম কারণ। বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার মানুষ ও প্রতি ৩০ সেকেন্ডে ১ জন হেপাটাইটিস বি ও সি এই দুই ভাইরাসের কারণে মৃত্যুবরণ করে। আর আমাদের দেশে প্রতি বছর ২০ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে এই রোগে। তবে আশার কথা, এই দুই নীরব প্রাণঘাতী ভাইরাস প্রতিরোধযোগ্য। হেপাটাইটিস ‘বি’ এবং ‘সি’-কে জনস্বাস্থ্যের হুমকি ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০৩০ সাল নাগাদ তা নির্মূল করার পরিকল্পনা নিয়েছে। লক্ষ্য হচ্ছে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ রোগীর সংখ্যা ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনা এবং মৃত্যুহার ৬৫ শতাংশে নামিয়ে আনা। সারা পৃথিবীতে ৩৫ কোটিরও বেশি মানুষ কোনো না কোনো হেপাটাইটিস ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বসবাস করছে। এই ভাইরাস সংক্রমণের ফলে সাধারণ জন্ডিস থেকে শুরু করে লিভার ফেইলিওর, লিভার সিরোসিস, লিভার ক্যান্সারের মতো জটিল ও দুরারোগ্য অসুখ হতে পারে।
দেশে প্রায় এক কোটি মানুষ হেপাটাইটিস রোগে আক্রান্ত
বিএসএমএমইউ’র ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজির বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় এক কোটি মানুষ হেপাটাইটিস রোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর এ রোগে মারা যায় প্রায় ২২ হাজার মানুষ। মহামারি করোনার মধ্যে এটি প্রকট হয়েছে। তিনি বলেন, এ রোগে আক্রান্ত ৫ শতাংশ মানুষ জানেই না যে তারা লিভারের এ রোগে আক্রান্ত। হেপাটাইটিস রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা, সস্তায় ওষুধ আর বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ জরুরি।
ডা. মামুন জানান, গত পাঁচ বছরে পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের মধ্যে হেপাটাইটিস-বির সংক্রমণ ১ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশীয় বিশেষজ্ঞরা ন্যাসভ্যাক নামে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের একটি নতুন ইমিউনোথেরাপি আবিষ্কার করেছেন। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মাধ্যমে ওষুধটি শিগগির বাজারে আসছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে এইডস, যক্ষা, ম্যালেরিয়া, হেপাটাইটিস, পানিবাহিত রোগ এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা বলা হয়েছে। সরকার এসডিজি অর্জনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
হেপাটাইটিস-বি ভ্যাকসিন প্রতিরোধযোগ্য রোগ এবং সি-এর কার্যকর চিকিৎসা আছে। তাই হেপাটাইটিস-বি নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক ও জাতীয় কর্মকৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। দেশে হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য পৃথক জাতীয় প্রোগ্রাম না থাকা, পর্যাপ্ত জনবল ও অর্থের অভাবে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রদান বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
গণসচেতনতা সৃষ্টিতে জোর রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন হেপাটাইটিস প্রতিরোধে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব আরোপ করে- এই লক্ষ্যে তৃণমূল পর্যায়ে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, মানবহিতৈষী সংগঠন ও গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে এগিয়ে আসার আহŸান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, জনগণের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে হেপাটাইটিস প্রতিরোধ সম্ভব। তিনি ‘বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস ২০২৩’ উপলক্ষ্যে এক বাণীতে এ আহবান জানান।রাষ্ট্রপতি বলেন, লিভার বা যকৃৎ মানবদেহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। লিভারের বিভিন্ন রোগ ও প্রতিরোধ সম্পর্কে জনসাধারণের মধ্যে সঠিক জ্ঞান না থাকায় এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ না করায় দেশে হেপাটাইটিসসহ লিভারের অন্যান্য রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকার হেপাটাইটিস ছাড়াও অন্যান্য ঘাতক রোগ ও সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধ এবং চিকিৎসাসেবার উন্নয়নে জনসচেতনতা সৃষ্টিসহ বিভিন্নমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। ‘বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস’ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (২৭ জুলাই) দেয়া এক বাণীতে তিনি একথা বলেন। তিনি বলেন, আমরা জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি-২০১১ অনুযায়ী ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা’-কে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছি। আমাদের সময়োচিত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নের ফলে গত সাড়ে ১৪ বছরে দেশের স্বাস্থ্যখাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বিশ্বে হেপাটাইটিস ভাইরাস বহনকারী প্রতি ১০ জনে ৯ জনই জানে না যে, সে হেপাটাইটিস ভাইরাসে আক্রান্ত।
তাই হেপাটাইটিস নির্মূলের লক্ষ্য অর্জনে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে পোলিও নির্মূল সার্টিফিকেট অর্জন করেছে। তাছাড়া, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)-এর সফলতার জন্য গ্লোবাল এলায়েন্স ফর ভ্যাকসিন এন্ড ইমুনাইজেশন (গ্যাভি) আমাকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ অ্যাওয়ার্ড দিয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ও দু’বার গ্যাভি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী হেপাটাইটিস নির্মূল এর যে লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে তা আমাদের সকলের প্রচেষ্টায় অর্জন করা সম্ভব। তিনি হেপাটাইটিস নির্মূলে সরকার গৃহীত পদক্ষেপের পাশাপাশি দেশের চিকিৎসক সমাজ, বেসরকারি ব্যক্তি, সংস্থা, প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লি¬ষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি হেপাটাইটিস প্রতিরোধে সচেতন হতে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথাও বলেন।
লক্ষ্য বাস্তবায়নে নিতে হবে সমন্বিত উদ্যোগ, বলছেন বিশেষজ্ঞরা
হেপাটাইটিস রোগ ২০৩০ সালের মধ্যে নির্মূলের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে অংশীজন নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পাশাপাশি অর্থ বরাদ্দ জরুরি। রোগ নির্মূলের চেয়ে প্রতিরোধই সহজ। তাই প্রতিরোধে সাধারণ জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। চিকিৎসার জন্য রোডম্যাপ প্রয়োজন। মফস্বল পর্যায়ে এ রোগের পরীক্ষা, টিকাদান এবং ওষুধ সহজলভ্য করে চিকিৎসা দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে সম্প্রতি ‘হেপাটাইটিস প্রতিরোধ ও প্রতিকারে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন। এতে আলোচকরা বলেন, এ রোগ প্রতিরোধে জাতীয় কর্মকৌশল ও আইন প্রণয়নে অংশীজনের মতামত শুনতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে একক প্রোগ্রাম নেওয়ার পাশাপাশি হেপাটোলজিস্টদের সংখ্যা বাড়াতে হবে। অন্তস্বত্ত্বা নারী ও শিশু জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টিকা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে হেপাটাইটিস নির্মূলে সচেতনতার পাশাপাশি জনগণের দোরগোড়ায় চিকিৎসার ব্যবস্থা পৌঁছাতে হবে।

গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ। অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের একমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে হেপাটাইটিস প্রতিরোধে এমডি হেপাটোলজিতে পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি দেওয়া হয়। এবারই প্রথম এখানে ইন্টারভেনশন হেপাটোলজি চালু করা হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের জনগণের তুলনায় হেপাটোলজিস্টের সংখ্যা অনেক কম। সরকারকে টার্গেট দিতে হবে কতজন হেপাটোলজিস্ট দরকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি লাখ জনগণের জন্য একজন হেপাটোলজিস্ট দরকার। আমাদের ১৬ কোটি জনসংখ্যার জন্য দরকার ১ হাজার ৬০০ জন। কিন্তু আমাদের দেশে হেপাটোলজিস্টের সংখ্যা ১১০। এ সংখ্যা পূরণ করতে ২০৩০ পর্যন্ত সময় লাগবে।
ভাইরাসের জীবাণু বহনকারী প্রতি ১০ জনের ৯ জনই জ্ঞাত নয়
বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, লিভার ক্যান্সারে মারা যাওয়া প্রতি ৩ জনের ২ জনই হেপাটাইটিস ‘বি’ বা ‘সি’-তে আক্রান্ত থাকেন। আমাদের দেশের প্রায় ১ কোটি মানুষ হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’তে আক্রান্ত। তাদের কারো কারো বিভিন্ন সময়ে ক্যান্সারসহ লিভারের অন্যান্য জটিল রোগ হচ্ছে। সারা বিশ্বে প্রতি ১০ জনে ৯ জন ব্যক্তি জানে না তারা হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের জীবাণু বহন করছে। ওয়ার্ল্ড হেপাটাইটিস অ্যালায়েন্স ২০৩০ সাল নাগাদ ৯৫ শতাংশ অনির্ণীত রোগীকে রোগনির্ণয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু, ২০৩০ সাল নাগাদ হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য দেশের প্রায় ৬৬ লাখ হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ৬ লাখ ৬০ হাজারে নামিয়ে নিয়ে আসতে হবে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২৮ জুলাই ২০২৩ । প্রথম পৃষ্ঠা
হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত জনসংখ্যা ৫ দশমিক ১ শতাংশ। বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের বাস। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ লাখ মানুষ হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত। আক্রান্ত পুরুষের সংখ্যা ৫৭ লাখ। নারীর সংখ্যা ২৮ লাখ ও শিশু রয়েছে ৪ লাখ। আক্রান্ত পরিবারের সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। লিভারের জন্য আরেকটি ক্ষতিকর ভাইরাস হলো হেপাটাইটিস সি। লিভার সিরোসিসের ৩০ শতাংশ ও লিভার ক্যানসারের জন্য ১৭ শতাংশ দায়ী হেপাটাইটিস সি ভাইরাস। আর হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা শূন্য দশমিক ২ থেকে ১ শতাংশ। তাঁদের বেশির ভাগের বয়স ২৮ বছরের বেশি।
ইউডি/এজেএস

