নারী গৃহকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে কবে ?
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ০১ আগস্ট ২০২৩ । আপডেট ১৪:৫০
দেশে ও বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীরাও নানা ভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অনেকে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মানসিক চাপে আত্মহত্যা করছেন। তাদের সুরক্ষায় নীতি তৈরি হলেও তা কার্যকর হয়নি। এ সুরক্ষা নীতি দ্রুত কার্যকরের দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ নিয়ে মিলন গাজী’র প্রতিবেদন
মজুরি বৈষম্য, শোষণ-নিপীড়ন নিত্তনৈমত্তিক ঘটনা
ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির কারণে নগর জীবনে এখন গৃহকর্মীর চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়েছে। বিশ্লেষকগণের মতে, নগরকেন্দ্রিক গৃহকর্মীর সংখ্যা বর্তমানে ১৪ লক্ষের অধিক। যাদের সিংহভাগই নারী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী, দেশে গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা আনুমানিক এক লাখ ২০ হাজার। বাংলাদেশ থেকে গৃহকর্মী/গৃহশ্রমিক হিসেবে অভিবাসন করা নারী কর্মীদের সংখ্যা কম নয়।
বিএমইটি’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ এর জুন পর্যন্ত ৪২ হাজারের অধিক নারী বিদেশে অভিবাসন করেছেন। সবমিলিয়ে দেশ থেকে প্রায় ৮০ শতাংশের অধিক নারীরা চুক্তিভিত্তিক গৃহকর্মী হিসেবেই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, লেবানন, জর্ডান ইত্যাদি দেশে অভিবাসন করে থাকে, যাদের প্রায় ৮০ শতাংশই অদক্ষ। এই শ্রম জাতীয় পর্যায়ে মূল শ্রমধারাতে ও মানদণ্ডে স্বীকৃত নয়। এর ফলে দেশে গৃহকর্মীদের প্রতি মজুরি বৈষম্য, শোষণ-নিপীড়ন ও নির্যাতন এখন নিত্তনৈমত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সোমবার (৩১ জুলাই) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বাংলাদেশি অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশন (বমসা) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী অভিবাসী নারী কর্মীরা
নারী অভিবাসী কর্মীরা সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী উল্লেখ করে বমসা’র উপদেষ্টা আমিনুল হক তুষার বলেন, বিশেষ করে অভিবাসী গৃহকর্মীরা ভুক্তভোগী ছিলেন। তিনি বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশি নারী কর্মী মৃত্যুর সংখ্যা ২০২২ এ ছিল ১১৭ জন, যা ২০২১ এ ছিল ১২২, ২০২০ এ ছিল ৮০ এবং ২০১৯ এ ছিল ১৩৯ জন- যাদের বেশিরভাগই ছিল গৃহকর্মী। তাদের মৃত্যুর কারণগুলো খুবই গতানুগতিক ছিল। এরমধ্যে স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে ৩৭ শতাংশের, ব্রেন স্ট্রোকে ১৯ শতাংশের, আত্মহত্যা করেছেন ১৬ শতাংশ, দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ১৫ শতাংশ এবং অন্যান্য কারণে ১৩ শতাংশ নারীর মৃত্যু হয়েছে। যারমধ্যে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক মারা গিয়েছিল সৌদি আরবে। তারপর জর্ডান, লেবানন ও ওমানে সবচেয়ে বেশি নারীর মৃত্যু হয়েছে।
আমিনুল হক তুষার আরও বলেন, করোনা অতিমারির সময়ে বিপুল সংখ্যক অভিবাসী কর্মী (নারী-পুরুষ উভয়ই) চাকরি হারিয়ে বা নিয়োগকর্তা কর্তৃক জোরপূর্বক দেশে ফেরত এসেছেন, যাদের অনেকেই আর বিদেশে যেতে পারেননি। যারাই ফেরত এসেছেন বা অতিমারিকালীন সময়ে বিদেশে কর্মস্থলে অবস্থান করছিলেন, তাদের অনেকেই তাদের প্রাপ্য মজুরি বা বেতন পাননি এবং বিভিন্নভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শিকার হয়েছেন। এমনকি তাদের লকডাউনের সময় পর্যাপ্ত খাবার, চিকিৎসা সেবা ও সুরক্ষা টিকাও দেওয়া হয়নি। গবেষণা থেকে জানা যায় অভিবাসীদের মজুরি বকেয়া রেখে জোরপূর্বক দেশে পাঠানো, চুক্তিপত্র অনুসারে মজুরি না দেওয়া বা কম দেওয়া, ওভারটাইম না দেওয়া, অধিক কাজ করানো, মজুরি বকেয়া রাখা, শারীরিক, যৌন ও মানসিক নির্যাতন ইত্যাদি হচ্ছে কাঠামোগত মজুরি চুরির অন্তর্ভুক্ত। নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে দেখা যায় একাধিক বাসায় কাজ করানো হচ্ছে, কোনোপ্রকার ছুটি দিচ্ছে না, মারধর করছে, চিকিৎসা করে না, খাবার দিচ্ছে না, এমনকি তাদের চাকরির যে শর্ত রয়েছে তার বেশিরভাগই মানা হচ্ছে না।
অধিকার রক্ষায় বমসা’র সাত সুপারিশ
দেশে ও প্রবাসে কর্মরত নারী গৃহকর্মীদের নির্যাতন-নিপীড়ন ও মজুরি চুরি প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোতে সুরক্ষা নিশ্চিতসহ সাত দফা সুপারিশ জানিয়েছে বাংলাদেশি অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশন (বমসা)। সুপারিশগুলো হচ্ছে- আইএলও সনদ ১৮৯ ও ১৯০ দ্রুত অনুসমর্থন ও অনুস্বাক্ষর করে সুস্পষ্ট আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে কর্মরত গৃহকর্মীদের বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং বৈষম্য, হয়রানি ও নিপীড়ন বন্ধ করা। অভিবাসী শ্রমিকের মজুরি চুরি ও অভিবাসীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন প্রস্তাবিত একটি ‘আন্তর্জাতিক বিচার প্রক্রিয়া’ প্রতিষ্ঠা করা। এবং, এর মাধ্যমে বিদেশে নিয়োগকারী কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অভিবাসী শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি আদায়, নির্যাতিত কর্মীদের জন্য ক্ষতিপূরণ আদায় ও নির্যাতনকারীদের আইনের আওতায় আনা। ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি ২০১৫’তে কিছু বিষয়ে সংশোধন, পরিমার্জন, সংযোজন ও পরিবর্তন আনয়ন করা, যার মাধ্যমে গৃহকর্মীর সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা যাবে।

প্রবাসে কর্মরত অবস্থায় কোন কর্মীর মৃত্যু হলে বাংলাদেশের দূতাবাসের সহায়তায় ওই দেশে একটি এবং মরদেহ দেশে আনার পরে সরকারি খরচে আরও একটি ময়নাতদন্ত করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। দেশে যেসব নারী ও শিশু গৃহকর্মী নির্যাতন, আত্মহত্যা, হত্যা ও ধর্ষণের শিকার হয়েছে তার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের শান্তি নিশ্চিত করা। দেশের অর্থনীতিতে দেশ এবং দেশের বাইরে কর্মরত সব গৃহশ্রমিকদের অধিকতর অবদান নিশ্চিতে তাদের আর্থিক প্রশিক্ষণ ও অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি সংশোধনের পাশাপাশি একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়ন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (যেমন- মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, শ্রম মন্ত্রণালয়, আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নীতি বাস্তবায়নের কৌশল প্রণয়ন এবং কর্ম পরিকল্পনা করা।
আইন কঠিনভাবে বাস্তবায়ন হোক, বলছেন বিশেষজ্ঞগণ
দেশের সংবিধান অনুসারে (১৫.খ. যুক্তিসঙ্গত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার, ও ৩৪ নং অনুচ্ছেদ অনুসারে জনসাধারণের প্রতি সকল প্রকার ভাবাদতি-এ নিষিদ্ধ) রাষ্ট্র গৃহকর্মীসহ কর্মক্ষম সকল নাগরিককে সুরক্ষা দিতে বাধ্য। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ও বর্তমান সরকারের উদ্যোগে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘গৃহশ্রমিক সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি ২০১৫’। বমসা জানায়, অনেক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান, কর্মীদের এমনকি বমসা’র মতেও গৃহকর্মীদের অধিকার নিশ্চিতে ও সুরক্ষা প্রদানে এই নীতি সম্পূর্ণরূপে কার্যকর নয়। সাম্প্রতিক সময়ে অনেক গৃহকর্মীই নিয়োগকর্তা দ্বারা নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছেন। অনেকে আবার নির্যাতনের মাত্রা সহ্য না করতে পেরে ও অন্যান্য মানসিক চাপের কারণে আত্মহত্যা করে থাকেন। আবার বিদেশগামী ও বিদেশে অবস্থানরত নারী কর্মীদের সুরক্ষার জন্য বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন ২০১৩-এ নেই সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা।

দৈনিক উত্তরদিক্ষণ । ০১ আগস্ট ২০২৩ । প্রথম পৃষ্ঠা
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের তথ্য অনুসারে, ২০২২ সালে প্রবাসে ১১৭ জন নারী কর্মী মারা গেছেন। এর মধ্যে ১৬ শতাংশ আত্মহত্যা। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ, মজুরি চুরির ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। এর প্রতিকার নেই। এটা দেখার কথা সরকারের, তারা খুব একটা ভাবছে না এটা নিয়ে। কঠিন আইন দরকার নেই। আইন একটু দুর্বল হোক, কিন্তু তা কঠিনভাবে বাস্তবায়ন হোক। বিশ্লেষকগণ বলছেন, গৃহকর্মী নির্যাতন রোধে সমাজের মানসিকতা বদলাতে হবে। এ জন্য রাষ্ট্র, সরকারকে আরও সক্রিয় ভ‚মিকা রাখতে হবে। দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সঙ্গে দরকার গণসচেতনতা বাড়ানো। গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে বাড়িতে থেকে কাজ করার চেয়ে চুক্তিভিত্তিক কাজ করাটাই বেশি ভালো। এ ক্ষেত্রে অন্য চাকরির মতোই প্রতিদিন কাজ করে তারা চলে যাবেন। তাদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান এখন প্রশিক্ষণ শুরু করেছে। এর সঙ্গে মনিটরিং ও সচেতনতা কার্যক্রম শক্তিশালী করা সম্ভব হলে এমন নির্যাতন অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব।
গৃহশ্রমিকের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছেন ভুক্তভোগীরা দীর্ঘদিন ধরে। তারা বলছেন, দেশব্যাপী গৃহশ্রমিকদের সুরক্ষায় প্রণীত গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি ২০১৫ বাস্তবায়ন না হওয়ায় দেশে একের পর এক গৃহশ্রমিকের মৃত্যু ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে।তারা বলেন, বিচারহীনতার কারণে দোষীরা বারবার গৃহশ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের সাহস পায়। যদি এসব ঘটনায় দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়, তাহলে সেই ভয়ে আর কেউ গৃহশ্রমিকদের নির্যাতনের সাহস দেখাবে না।
ইউডি/এজেএস

