বিলুপ্তির পথে দেশীয় মাছ: আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই
কিফায়েত সুস্মিত । বৃহস্পতিবার, ০৩ আগস্ট ২০২৩ । আপডেট ১১:২০
আগে বর্ষায় পুরো চলনবিল কয়েক ফুট পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে হয়ে যেত সমুদ্র। তখন নদী এবং দহ আর পৃথক করে চেনা যেত না। ভাদ্র আশ্বিনেও পানি জমে থাকত উঁচু জমির পাশে। সেই পানিতে অজস্র চেলা, কাঁকাল প্রভৃতি ছিল। ছিপে উঠত রাশি রাশি। আলপিন বাঁকিয়ে বড়শি তৈরি করত লোকজন। আশ্বিনের শেষে চলনবিলের পানি নেমে যেত। দেখা যেত পানিতে টুইটম্বুর সেই নদী এবং দহ। কার্তিকে আসত মাছের ব্যবসায়ীরা। কার্তিকে শুরু হতো মাছ ধরার পালা। কত রকম যে মাছ। রুই, কাতলা, কালবাউস, সরপুঁটি, বিথে, বোয়াল, আড়, চিতল, পাবদা, চিংড়ি, বাচা, ফলি আরও কত রকমের মাছ। কী বিশাল তাদের আয়তন। দশ-পনেরো কিলোর রুই, কাতলা দেখেছি। দেখেছি পাঁচ-সাত কিলোর আড়, বোয়াল এবং চিতল। দেখেছি খয়রা মাছ-রূপোর মতো ঝক্ঝকে। কাঠের বাক্স এবং বাঁশের চাঁচ দিয়ে তৈরি ডোলে পুরে সেই মাছ চালান হতো ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে প্রতিদিন ফাল্গুনের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত। সে সময় নাকি কুড়ি-পঁচিশ কিলোর কাছিমও পাওয়া যেত। পানি কমলে শুরু হতো মাগুর, শিঙ্গি, ভেদা এবং কই মাছ ধরার পালা। সেসব এখন গল্প। এক সময় এ অঞ্চলটি ছিল মাছের আকর। এখন মাছ শূন্য।
জমির অতিরিক্ত সার বর্ষার পানির তোড়ে পুকুর খাল বিল নদীতে পড়ে। সেই সার জলজ গাছপালা দারুণভাবে বাড়ায়। জলজ গাছপালার জঙ্গলে মাছের পক্ষে বাস করা শক্ত হয়। অতিরিক্ত গাছের দরুন পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে। এমন অবস্থায় মাছের বাচ্চা, ডিম, এমনকি বয়স্ক মাছও মারা পড়ে। বাড়তে পারে না। অতিরিক্ত চাষের দরুন জমির মাটি আলগা হয়। বাতাস এবং পানির প্রবাহে সেই মাটি জলাশয়ে পড়ে। এর ফলে বহু নদী-নালা-বিল, পুকুর মজে যায়। মাছের বাস করার ঠাঁইটুকুও এখন গেছে কমে। প্লাবন রোধ করতে তৈরি হয়েছে প্রচুর বাঁধ-রাস্তা। এর ফলে বর্ষার সময় পানির স্রোতে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মাছ, মাছের চারাপোনা এবং ডিম আগের মতো যাতায়াত করতে পারে না। তাই নদী, খাল, বিল, জলাশয়ে এখন মাছের এত অভাব। প্রাকৃতিক সুযোগ-সুবিধার উপর মানুষ যেমন নির্বাচন করে তার বাসস্থান, ঠিক তেমনি মাছও সুযোগ বেছে নেয় তাদের সহজে বাস করার মতো এক একটি অঞ্চল। কোনো কারণে সেখানে গোলমাল ঘটলেই উদ্বাস্তুর মতো তারা সেই জায়গাটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। নতুন অঞ্চলে গিয়ে কোনো কোনো মাছ কোনো রকমে নিজেদের টিকিয়ে রাখে, আবার অনেক মাছ বিলুপ্ত হয়। ইদানীং নদী এবং সমুদ্র উপকূলে তৈরি হয়েছে বন্দর। এখনও তৈরি হচ্ছে। সেইগুলোও মাছের বাসস্থানে বিপর্যয় ঘটায়। শুধু স্থলভাগই নয়।
বিপর্যস্ত এখন সাগর মহাসাগরেরও মাছ। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সমুদ্রে চড়া মাছ এবং অপুষ্ট মাছ ধরা নিষিদ্ধ।দেশের নিজস্ব সমুদ্র অঞ্চলের কথা না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু উন্মুক্ত যেসব অঞ্চল, আন্তর্জাতিক সীমানার বাইরে সেখানে কোনো দেশই বাধা দিতে পারে না। ওইসব অঞ্চলে যেসব মাছ ধরার কথা নয়, তাদেরও ধরা হয়। ডিম পাড়ার বয়সের আগেই ধরা হয় নানান মাছ। গত কয়েক দশক ধরে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ আটকে ড্যাম ও ব্যারেজ নির্মাণ, নদীর ধারে ইটভাটা তৈরি ও নিজেদের প্রয়োজনে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ করে কলকারখানার নোংরা পানি নদীতে ফেলা ইত্যাদি কারণে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন স্থানগুলো বিনষ্ট প্রায়। মাছের ডিম ফোটার জন্য দরকার পানির স্রোত, সঠিক মাত্রার দ্রবীভূত অক্সিজেন ও নির্দিষ্ট কতকগুলো ভৌত রাসায়নিক গুণাবলিযুক্ত পানি। আমাদের দেশের অধিকাংশ বড় ও ছোট নদীতে এ অবস্থা বিদ্যমান নেই।
মাছ সংরক্ষণের জন্য ১৮৯৭ সালে ওহফরধহ ঋরঝযবৎরবঝ অপঃ নামে একটি আইন ব্রিটিশ সরকার প্রবর্তন করে, সেটি বর্তমানে পরিবর্তিত হয়ে নুতন নতুন আইন করা হচ্ছে, যাতে পানি দূষণের প্রতিরোধ, মাছ ধরার জালের নির্দিষ্ট মাপের কথা, বিস্ফোরক ও বিষাক্ত পদার্থ দিয়ে মাছ ধরা নিষেধ। এছাড়া প্রজনন ঋতুতেও মাছ ধরা নিষিদ্ধ। অপরিণত মাছ ধরা নিষেধ করা হলেও মানুষের লোভ এগুলোকে তোয়াক্কা করে না। আমাদের দেশে মাছ ধরার ব্যাপারে আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই। অবাধে চলে মাছের পোনা নিধন। তাহলে উপায় কী? বিশ্ব খাদ্য সংস্থা থেকে বলা হয়েছে, মাছ কমে যাচ্ছে। কমে গেছে কড, জ্যাক ম্যাকেরাল, আনকোডেটা, পিলকার্ড, হ্যাডসক ব্লফিন টুনা, ডগ ফিশ, সামুদ্রিক বোয়াল প্রভৃতি। অনেক জায়গায় এসব মাছ প্রায় বাড়ন্ত। সমুদ্র উপকূলে বন্দর তৈরির দরুন বহু মাছ উদ্বাস্ত। তা ছাড়া, পানি দূষণ তো আছেই। নানা রকম মাছকে এখন পশুখাদ্য হিসাবে কাজে লাগানো হচ্ছে। তাতেও সামুদ্রিক মাছের উপর প্রভাব পড়ছে। এই অবস্থা চললে পুকুর, জলাশয়, নদীতে ভবিষ্যতে দেশীয় মাছের আকালই শুধু নয়, সমুদ্রের বহু প্রজাতির মাছ কোনো কোনো অঞ্চলে প্রায় অবলুপ্তই হয়ে যাবে।
লেখক: সাংবাদিক।

