সরে গেলেন জাপার কয়েকজন প্রার্থী: নেপথ্যে খরচাপাতি নাকি দরকষাকষি
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ০৩ জানুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১৫:১৫
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে জাতীয় পার্টির নাটকীয়তা যেন থামছেই না। নানা ঘটনার পর দলটি নির্বাচনে এলেও অনেক প্রার্থী সরে যাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ কেন্দ্র তাদের ‘খরচাপাতি’ দিচ্ছে না। দলীয় নেতাকর্মীদের অসহযোগিতার কথাও বলেছেন কেউ কেউ। এ নিয়ে শহীদ রানা’র প্রতিবেদন
বিজয় নিশ্চিত করার কৌশল না তো?: জাতীয় পার্টিকে যে ২৬টি আসন আওয়ামী লীগ ছেড়ে দিয়েছে; সেখানে তারা বিজয় নিশ্চিত করার নানা কৌশল নিয়েছিল। এরই অংশ হিসেবে তারা আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী সরিয়ে নিতে বলেছিল। কিন্তু সেটা সম্ভব নয় বলে সাফ জানিয়ে দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। দুদিন আগে জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, তারা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকবেন কি না, তা সময়ই বলে দেবে। এরপরই তার দলের কয়েকজন প্রার্থী নানা কারণ দেখিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। এর মধ্য দিয়ে সরকারের ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি করা হচ্ছে বলেও অনেকে মনে করেন। কেননা, এ নির্বাচনে ২৯টি দল অংশ নিলেও আওয়ামী লীগের পরে সব চেয়ে বড় দল জাতীয় পার্টি। দলটি সরে দাঁড়ালে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে। ফলে সরকার স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সরিয়ে দিয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের বিজয়ের পথ সুগম করতে পারে- এমন কথাও বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সুতরাং প্রার্থীদের সরে দাঁড়ানোর ঘটনা কেন্দ্রের একটা কৌশলও হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে কেউ মুখ খুলছেন না। দলটির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেছেন, তারা লড়াই করেই বিজয় ছিনিয়ে আনবেন। শুধু তাই নয়; জাতীয় পার্টি সরকার গঠন করবে। আর প্রধান বিরোধী দল হবে আওয়ামী লীগ।

জিএম কাদের
জি এম কাদের যা বললেন: নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়ে চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, এটা দলের নয়, তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে নানা অসন্তোষের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নির্বাচন না আসা পর্যন্ত সঠিক করে বলা যাচ্ছে না। নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত থাকবো কিনা সেটা সময়ই বলে দেবে। সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। অনেক সময় অনেক প্রার্থী নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত থাকেন না, কেউ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে প্রকাশ করেন, আবার কেউ ঘোষণা করেন না। কেউ এমনিতেই বসে যান। তিনি আরও বলেন, পার্টির প্রার্থীদের মধ্যে আমার একটা নির্দেশ আছে, যারা নির্বাচন করতে চান, করতে পারেন। নির্বাচন করতে না চাইলে সেটিও সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা রয়েছে।

মুজিবুল হক চুন্নু
অনেক প্রার্থী হতাশায় সরে দাঁড়াচ্ছেন বললেন চুন্নু: জাতীয় পার্টির মহাসচিব ও কিশোরগঞ্জ-৩ আসনে দলটির প্রার্থী মুজিবুল হক চুন্নু বলেছেন, আওয়ামী লীগ ও তাদের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সারা দেশে বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করছে। আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে জাতীয় পার্টির কিছু কিছু প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। মঙ্গলবার (০২ জানুয়ারি) সকালে কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার কাজলা গ্রামে নিজের বাড়িতে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। চুন্নু বলেন, সারা দেশে আমরা জাতীয় পার্টির অনেক প্রার্থী দিয়েছি। তাদের সকলের অবস্থা সমান না। অনেকেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না। তারা বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করছেন। তিনি আরও বলেন, আমরা কেন্দ্র থেকে জাপা প্রার্থীদের কোনো আর্থিক সাপোর্ট দিতে পারছি না। এজন্যই হয়তো তাদের অনেকটা হতাশা আছে এবং হতাশা থেকেই অনেকেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। আমরা সার্বিক অবস্থা এখনো পর্যবেক্ষণ করছি। চুন্নু বলেন, আমি নির্বাচন নিয়ে এলাকায় ব্যস্ত আছি। দলের চেয়ারম্যান নিজের এলাকায়। তাই বিষয়টি সমন্বয় করতে পারছি না। তবে নির্বাচনে এখনও সার্বিক পরিবেশ সঠিক আছে বলে মন্তব্য করেন জাপা মহাসচিব।
সবার অভিযোগকেন্দ্রের দিকে: কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছ থেকে সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ তুলে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন জাতীয় পার্টির অন্তত ৯ জন প্রার্থী। সূত্র বলছে, নির্বাচনের শুরুতে প্রার্থীদের দল থেকে আর্থিক সাপোর্ট দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। এজন্য তারা মাঠে নেমেছিলেন। শুরুতে নিজেদের টাকা খরচ করে অনেক প্রার্থী নিজ নিজ এলাকায় পোস্টার ও নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন। কিন্তু প্রার্থীরা এখন দলের প্রতিশ্রæত আর্থিক সাপোর্ট পাচ্ছেন না। ফলে অনেকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। আবার অনেকে মান-সম্মান ও চাপের কারণে নির্বাচন থেকে সরে না দাঁড়ালেও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। এ ছাড়া, এখন পর্যন্ত কেন্দ্র থেকেও প্রার্থীদের নির্বাচনের মাঠে রাখার কোনো পরিকল্পনা নেই। কেন্দ্রের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না করেই প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। বর্তমানে দলটির কতজন প্রার্থী মাঠে আছে, তার সঠিক হিসাবও কেন্দ্রের কাছে নেই! জাতীয় পার্টির কত প্রার্থী নির্বাচনে আছে জানতে চাইলে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব জহিরুল ইসলাম জহির বলেন, ২৫৭ আসনে জাপার প্রার্থী ছিল। কয়েকজন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। এখন মনে হয় ২৪৭-৪৮ জনের মতো প্রার্থী মাঠে আছেন। প্রার্থীরা দলের কাছে কী ধরনের সহায়তা চাচ্ছেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রার্থীরা কেন্দ্রের কাছে কিছু আর্থিক সহায়তা চাচ্ছেন। সব দল তো দেয়, আমাদের দলের প্রার্থীরাও ধারণা করেছেন এখানে থেকে কিছু আর্থিক সুবিধা পাবেন। প্রথমদিকে দল থেকেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন সেটা আর বাস্তবায়ন করতে পারছে না। দল ভেবেছিল কোথাও না কোথাও থেকে টাকা পাবে বা ম্যানেজ করতে পারবে। কিন্তু সেটা শেষ পর্যন্ত হয়নি। যার ফলে কেন্দ্র প্রার্থীদের সাপোর্ট দিতে পারছে না। এতে সারা দেশের প্রার্থীরা ক্ষুব্ধ। তারা বলছেন- আমাদের নির্বাচনে নামাল, এখন সহযোগিতা করছে না। নিজেদের টাকা-পয়সা খরচ করেছি। কেন্দ্র থেকে কিছু সহযোগিতা পেয়ে নির্বাচনের বাকি খরচ করব আশা ছিল; এখন সেটাও পাচ্ছি না।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ, ০৩ জানুয়ারি ২০২৪, প্রথম পৃষ্ঠা
সরে গেলেন যারা: গাজীপুর-১ ও গাজীপুর-৫ আসনের প্রার্থী নিয়াজ উদ্দিন; বরিশাল-২ ও বরিশাল-৫ আসনের ইকবাল হোসেন তাপস; বরগুনা-১ আসনের খলিলুর রহমান; চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সোহরাব হোসেন; সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের (রায়গঞ্জ-তাড়াশ) জাকির হোসেন; নাটোর-৪ আসনের আলাউদ্দিন মৃধা; গাজীপুর-৪ আসনের বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুদ্দিন খান; দিনাজপুর-২ (বিরল-বোচাগঞ্জ) আসনে মাহবুব আলম এবং সুনামগঞ্জ-১ আসনে আব্দুল মান্নান তালুকদার।
নির্বাচন থেকে সরে গেলেন জাতীয় পার্টি (জাপা) মনোনীত প্রার্থী মাহবুব আলম।
‘তারা আওয়ামী লীগ সমর্থিত, আমরা কী’:নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে হবিগঞ্জ-২ আসনের (বানিয়াচং আজমিরীগঞ্জ) জাতীয় পার্টির প্রার্থী শংকর পাল বলেন, এই নির্বাচনে থাকা না থাকা একই কথা। তারা (কেন্দ্র) ২৬ আসন নিয়ে খুশি। তারা লিখছে আওয়ামী লীগ সমর্থিত। তাহলে আমি কী সমর্থিত লিখবো। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশের অভাব রয়েছে। আছে ক্ষমতাসীনদের পেশিশক্তির প্রভাব। আমি আমার কর্মী-সমর্থকদের কথা চিন্তা করে নির্বাচন থেকে সরে আসছি। সূত্র জানায়, গত মে মাসে অনুষ্ঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বদ্বীতা করে জামানত হারান জাপার প্রার্থী এম এম নিয়াজ উদ্দিন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধারণা ছিল গাজীপুরের একটি আসন জাতীয় পার্টিকে ছাড় দেবে আওয়ামী লীগ। আসন সমঝোতা না হওয়ায় এবং দলীয় ভিত্তি মজবুত না থাকায় নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জাপা প্রার্থী নিয়াজ উদ্দিন। একই দিনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রহসনের নির্বাচন আখ্যা দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান বরিশাল-২ ও ৫ আসনের দলীয় প্রার্থী জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা প্রকৌশলী ইকবাল হোসেন তাপস এবং বরগুনা-১ আসনের প্রার্থী খলিলুর রহমান। সংবাদ সম্মেলনে ইকবাল হোসেন তাপস বলেন, নির্বাচন কমিশনের আচরণে মনে হচ্ছে তারা সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। সরকার কিছু রাজনৈতিক দলকে ঘুষ বরাদ্দ দিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চাচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে আমার কাছে মনে হচ্ছে ৭ই জানুয়ারি প্রহসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
ইউডি/সিরাজ/এজেএস

