মেটাভার্সে কিশোরীকে ‘গণধর্ষণ’: অপরাধের নতুন জগৎ
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ০৪ জানুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১৩:৪০
প্রযুক্তির দুনিয়ায় বাস্তবকে অনুভব করার অন্যতম পরিসর মেটাভার্স, ২০২১ সালে শুরু হওয়া সাড়াজাগানো এই ভার্চুয়াল রিয়েলিটি নিয়ে যে শঙ্কা প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা করেছিলেন তা দিনকে দিন যেন বাস্তবে পরিণত হওয়া শুরু করেছে। এই অবাস্তব দুনিয়াতেও বাড়ছে অপরাধ, যেখানে যুক্ত হয়েছে ধর্ষণের মতো গুরুতর ঘটনাও। এ নিয়ে আসাদ এফ রহমান’র প্রতিবেদন
ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে পৈশাচিক নির্যাতন: ২০২১ সাল থেকে মেটাভার্স শব্দটা প্রযুক্তি বিশ্বে পরিচিত হয়ে ওঠে। ধারণা করা হচ্ছে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় দ্রæতই জনপ্রিয়তা পাবে এবং ইন্টারনেটের বিকাশে নতুন মাত্রা আনবে মেটাভার্স। ২০২১ সালের অক্টোবরে ফেসবুকও তার নাম বদলে মেটা করে। ফেসবুকের এই নামবদলও মেটাভার্সের ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেটাভার্সেও যেন বাস্তব জীবনের নেতিবাচক প্রতিচ্ছবিগুলোও ফুটে উঠতে শুরু করেছে। মেটার অনলাইন জগত মেটাভার্সে গেম খেলার সময় ‘ভার্চুয়ালি গণধর্ষণের’ শিকার হয়েছে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরী। ব্রিটেনের ভুক্তভোগী কিশোরী পুলিশকে জানিয়েছে, ভিআর গেমে তার অবতারকে (নিজের ডিজিটাল চরিত্র) ধর্ষণ করেছে অজ্ঞাত একদল পুরুষ অবতার। আমেরিকার সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক পোস্ট এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ভার্চুয়ালি ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর ওই কিশোরী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। সংবাদমাধ্যমটি আরও জানিয়েছে, ভার্চুয়ালি যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার সময় কিশোরীটি ভার্চুয়াল রিয়েলেটির হেডসেট পরে ছিল। যদিও এ ঘটনায় সে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। তবে বাস্তবে একজন নারী ধর্ষিত হওয়ার পর যে মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যায়; সে একই অবস্থার মধ্যে দিয়ে গেছে। প্রসঙ্গত, মেটাভার্সে ভিআর হেডসেট পরে ভার্চুয়াল জগতে ঘুরে বেড়ানো, গেম খেলাসহ নানা কাজ করা যায়। গেম খেলার ক্ষেত্রে নিজের একটি ডিজিটাল চরিত্র (অবতার) থাকে। ভিআর গেমে এমন অনেক স্বতন্ত্র অবতার অংশ নেয়। এমনই এক গেমে একাধিক পুরুষ অবতারের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয় বলেও কিশোরী অভিযোগ তুলেছে। এর আগেও মেটাভার্সে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন এক মহিলা। ব্রিটিশ নাগরিক নিনা জেন পটেলের অভিযোগ, তিনি ‘মেটা’-র ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম ‘হরাইজন ওয়ার্ল্ড’-এ গণধর্ষণের শিকার। নেটমাধ্যমে এ বিষয়ে একটি পোস্টও করেন নিনা। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘হরাইজন ওয়ার্ল্ডে যোগ দেওয়ার এক মিনিটের মধ্যে আমাকে যৌন হেনস্থার শিকার হতে হয়। তিন-চার জন পুরুষ অবতার, যাদের গলার স্বরও পুরুষের ছিল, তাঁরা আমাকে ভার্চুয়ালি ধর্ষণ করেন এবং ছবি তুলে নেন।’ নিনা আরও লিখেছেন, ‘ঘটনার সময় ওই অবতারদের বøক ও রিপোর্ট করার চেষ্টাও করেও সফল হইনি।’ শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের ভার্চুয়াল রিয়ালিটি হেডসেটটি খুলে ফেলতে বাধ্য হন এবং সেটিকে বন্ধ করে দেন।
নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী: এ ঘটনায় পুলিশ তদন্তও শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, বিশ্বে এবারই প্রথমবার ভার্চুয়াল ধর্ষণের ব্যাপারে তদন্ত করা হয়েছে। পুলিশের এক কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেছেন, শিশুটি যে মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, সেটি বাস্তবে ধর্ষিত হওয়ার মতো। ভিক্টিমের ওপর আবেগজনিত ও মানসিক প্রভাব পড়েছে। যেটি যে কোনো ধরনের শারীরিক ক্ষয়ক্ষতির চেয়ে দীর্ঘ। তবে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য খুবই চ্যালেঞ্জিং। কারণ বর্তমান আইনে (আইনগত ব্যবস্থা নিতে) এ ধরনের কোনো কিছু নেই। ভার্চুয়াল গণধর্ষণের শিকার হওয়ার আগে ওই কিশোরী কী গেম খেলছিল সে বিষয়টি নিশ্চিত নয়। তবে সত্যিকারের ধর্ষণ মামলাগুলো নিয়েই প্রসিকিউটররা যে হিমশিম খাচ্ছেন, সেখানে ভার্চুয়াল ধর্ষণের ঘটনার তদন্ত নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস ক্লেভারলি পুলিশের এ তদন্তের বিষয়টির পক্ষে কথা বলেছেন।

মার্ক জাকারবার্গ
অভিযোগের বিষয়ে যা বলল মেটা: মেটার অনলাইন জগতে একাধিক যৌন অপরাধের অভিযোগ উঠেছে। ব্রিটেনে এ ঘটনার ব্যাপারে মেটার কাছে জানতে চাইলে সংস্থাটির এক মুখপাত্র বলেছেন, যে ঘটনার কথা বলছে সেগুলোর কোনো স্থান আমাদের প্ল্যাটফর্মে নেই। এ কারণে আমাদের স্বয়ংক্রিয় সুরক্ষা নামের একটি ব্যক্তিগত বাউন্ডারি আছে। যাদের আপনি চেনেন না এই বাউন্ডারি আপনাকে তাদের কাছ থেকে কয়েক ফুট দূরে রাখবে। এর আগে নিনার অভিযোগ তারা প্রতিটি অবতারের চারিদিকে অদৃশ্য একটি সুরক্ষা বলয় তৈরি করে দিয়েছে। এই বলয়ের ব্যাসার্ধ প্রায় চার ফুট। কেউ এই বলয় লঙ্ঘন করতে চাইলে মেটা সেই অবতারকে তৎক্ষণাৎ ‘ফ্রিজ’ করে দেবে। এই বলয়ের ব্যবহার যাতে খুব সহজ ভাবে করা যায় সেই ব্যবস্থাও করেছে সংস্থা। ত্রিমাত্রিক জগৎ যত বিস্তৃত হচ্ছে, বড় বড় সংস্থাগুলি তত চেষ্টা করে যাচ্ছে বাস্তব জগতের সমস্ত অনুভ‚তি এই জগতে তৈরি করতে। ইমার্জ নামে একটি সংস্থা ইতিমধ্যেই মেটাভার্সে এই প্রযুক্তি নিয়ে চলে এসেছে। যার মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা খালি হাতে স্পর্শের অনুভূতি পেতে পারবেন।
অপরাধের ধরনের পরিবর্তন, উদ্বেগ: প্রযুক্তির দুনিয়ায় বাস্তবকে অনুভব করার অন্যতম পরিসর মেটাভার্স। ঘরের বাইরে না গিয়েও বাইরের পৃথিবীর স্বাদ নেওয়া যায় এই প্রযুক্তির মাধ্যমে। তবে ভার্চুয়াল এই দুনিয়ায়, বাইরের পৃথিবীর ভালো বিষয়গুলোর সঙ্গে বিপজ্জনক বিষয়গুলোও জায়গা করে নিতে পারে বলে আশঙ্কা ইন্টারপোলের। ইন্টারপোল জানিয়েছে, মেটাভার্সের কারণে সংঘটিত হতে পারে নতুন ধরনের অপরাধ এবং সেই সঙ্গে আজকের অপরাধজগতেও অভিনব পরিবর্তন আসবে। ফলে সম্ভাব্য সেই সংকট নিয়ে ভাবছে ইন্টারপোলের সদস্য দেশগুলো। মেটাভার্সে সংঘটিত হতে পারে এমন অপরাধগুলো দমনে কীভাবে প্রস্তুতি নেওয়া যায় তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তারা। ইন্টারপোল জানায়, নিরন্তর পাল্টাতে থাকা এই প্রযুক্তির দুনিয়ায় নতুন নতুন অপরাধও যুক্ত হয়, পুরোনো অপরাধগুলো রূপ পাল্টায়। এরই ধারাবাহিকতায় মেটাভার্সে বদলে যেতে পারে ফিশিং ও স্ক্যামিংয়ের মতো জালিয়াতিগুলোর ধরন। পাশাপাশি শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে বাস্তব জগতের অপরাধ আরও সহজ হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করছে সংস্থাটি। তারা বলছেন, কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যদি কোথাও হামলা করার পরিকল্পনা করে, তবে তারা ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে সহজেই হামলার অনুশীলন করে নিতে পারবে। যেহেতু প্রযুক্তিটির ব্যবহার বহুমাত্রিক, তাই সন্দেহ না করে উপায় থাকছে না। ইন্টারপোলের টেকনোলজি ও ইনোভেশনের নির্বাহী পরিচালক মদন ওবেরয় বলেছেন, মেটাভার্সে সম্ভাব্য অপরাধগুলো দমনে কিভাবে প্রস্তুতি নেওয়া যায় তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইন্টারপোলের সদস্য দেশগুলো। তিনি বলেন, মেটাভার্সের মাধ্যমে কিছু নতুন ধরনের অপরাধ সংঘটিত হতে পারে, কিছু বিদ্যমান অপরাধ নতুন মাত্রা পেতে পারে। ওবেরয় বলেন, ফিশিং এবং স্ক্যামের ধরন বদলে যেতে পারে। শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ভার্চুয়াল রিয়েলিটে বাস্তব জগতে অপরাধকে আরও সহজ করে তুলতে পারে বলেও আশঙ্কা করেন তিনি।
বেশি ঘটছে দুর্ঘটনা, সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন: মেটাভার্সের দুনিয়ায় এখন প্রতিযোগিতা তুঙ্গে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু সংস্থা ব্যবসায় নেমেও পড়েছে। কিন্তু প্রযুক্তির এই চরম ব্যবহারের বিষয়ে সংশয় এখনও কাটেনি। আর সেইসব সংশয়কেই উস্কে দিচ্ছে সা¤প্রতিক বেশ কিছু ঘটনা। মার্কিন সংবাদ সংস্থা ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল সামনে এনেছে সেইসব তথ্য। দেখা গিয়েছে, মেটাভার্সের দুনিয়ায় অপরাধ শুরু হয়ে গিয়েছে ইতোমধ্যেই। ভার্চুয়াল রিয়েলিটির সদস্য বহু নারী অভিযোগ জানিয়েছেন, বিভিন্ন পুরুষ সদস্যের কাছে যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছেন তিনি। অথচ এই জগতে আইন নেই, পুলিশ নেই। মেটাভার্সের দুনিয়ায় মানুষ আদৌ কতটা সুরক্ষিত থাকবে, তাই নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে ইতিমধ্যে। এদিকে এই দুনিয়ায় বেশি ঘটছে দুর্ঘটনা। হাত-পা ভাঙার মতো ঘটনা তো ঘটছেই। এমনকি মরণাপন্ন অবস্থাতেও হাসপাতালে ছুটছেন অনেকে। স¤প্রতি জার্মানির এক ৩১ বছরের যুবক প্রায় মৃত অবস্থাতেই ছুটেছিলেন হাসপাতালে। ঘাড়ের কাছের হাড় ভয়ানকভাবে ভেঙে গিয়েছে, গলায় শ্বাসনালি ছিঁড়ে গিয়েছে, তখন হুঁশ ফিরেছিল তাঁর। ততক্ষণ পর্যন্ত এক ভার্চুয়াল রিয়েলিটি নির্ভর গেমের মধ্যে নিমগ্ন ছিলেন। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের পক্ষ থেকে আমেরিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলের ২০টি মারাত্মক দুর্ঘটনার কথা জানানো হয়েছে। এছাড়া ছোটোখাটো দুর্ঘটনা তো লেগেই রয়েছে। অনেকের মতে, এই সমস্ত দুর্গটনার জন্য দায়ী বর্তমান সময়ের অনুন্নত প্রযুক্তি। এখনও ভার্চুয়াল রিয়েলিটি বা কাল্পনিক বাস্তবতার জগতে যেতে গেলে চোখ ঢাকা ভারী যন্ত্র মাথায় পরতে হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই যন্ত্রের ওজন এবং আয়তন কমিয়ে আনা হচ্ছে। কিন্তু এই ব্যখ্যা মানতে রাজি নন অনেকেই। কারণ ভার্চুয়াল রিয়েলিটির অর্থই হল সেখানে পৌঁছে গেলে বাস্তব জগতের সমস্ত অনুভ‚তি হারিয়ে যাবে। প্রযুক্তি উন্নত হতে থাকলে এই বিচ্ছেদ আরও বেশি করে ঘটবে। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী আসলে এই বিচ্ছেদই। কাল্পনিক জগতকে বাস্তব মনে করে সেই অনুযায়ী হাঁটাচলা, দৌড়ানো বা অন্য সমস্ত কাজ করতে থাকেন এই জগতের সদস্যরা। অথচ তাঁর শরীরটা তো থেকে যায় বাস্তব জগতেই। সেখানে ধাক্কা খেতে হয়। এভাবেই রোজ কারোর না কারোর হাত-পা ভাঙছে। আরও বড়ো দুর্ঘটনা ঘটাও অসম্ভব নয়।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ, ০৪ জানুয়ারি ২০২৪, প্রথম পৃষ্ঠা
দ্রুত আইন সংশোধন চান প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা: প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একটা বড় অংশের আশঙ্কা, মেটাভার্স যৌন অপরাধীদের জন্য একটি মুক্তাঞ্চলে পরিণত হতে পারে এবং তা রুখতে সরকারকে দ্রুত আইন সংশোধন করতে হবে। কিন্তু মেটাভার্সে হয়রানির জন্য কোনও অবতারকে কোন আইনে দø দেওয়া হবে তা নির্ণয় করা কঠিন। কারণ, এখানে সরাসরি স্পর্শের কোনও ব্যাপার নেই এবং এই অবতারগুলি যে কেউ হতে পারে। কোনও প্রাপ্তবয়স্ক একটি বাচ্চা বা কোনও মহিলার অবতারও গ্রহণ করতে পারে। কোনও সংস্থার কাছে এখনও অবধি কোনও অবতারের পরিচয়ের সত্যতা নির্ণয়ের উপায়ও নেই। মেটাভার্স, যা কিনা একটি ডিজিটাল দুনিয়া সেখানেও অনেককে বাস্তব দুনিয়ার সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বাস্তব দুনিয়ার মতে এখানেও হেনস্থার শিকারিদের হেনস্থার প্রমাণ জোগাড় করতে হচ্ছে নিজেদের রক্ষা করার তাগিদে। বাস্তব সমাজে অনেক লড়াইয়ের পর এই ধরনের আলোচনা মূল স্রোতে জায়গা করে নিলেও, মেটাভার্সের মতো নতুন দুনিয়ার ক্ষেত্রে তা এখনও অনেক দেরি।
ইউডি/এজেএস

