তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: আমেরিকাপন্থীর জয়, চীনের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ল
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১৪:৪০
শনিবার অনুষ্ঠিত হওয়া তাইওয়ানের নির্বাচন ও চীন-আমেরিকা উত্তেজনার উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে বিনয় দাস’র বিশ্লেষণ
নির্বাচন উত্তেজনা উসকানি: এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে আমেরিকা-চীনের উত্তেজনা ছিলো তাইওয়ানের থেকেও বেশি। শনিবার (১৩ জানুয়ারি) বহুল প্রতিক্ষিত সেই নির্বাচনে চীনের আশায় গুঁড়েবালি দিয়েছেন তাইওয়ানের স্বাধীনতার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে কাজ করে আসা ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাটিক প্রগ্রেসিভ পার্টির (ডিপিপি) প্রার্থী আমেরিকা ঘেঁষা বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে। তিনি সেখানে উইলিয়াম লাই নামেও পরিচিত। যাকে চীন আগেই ট্রাবলমেকার বা সমস্যা সৃষ্টিকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ নির্বাচন ঘিরে তাইওয়ানের পাশাপাশি আমেরিকা ও চীনেও বিরাজ করেছে উত্তেজনা। নির্বাচনের আগে তাইওয়ানে যুদ্ধবিমান, নৌজাহাজসহ চীনা বেলুনও মোতায়েন করেছে বেইজিং। কিন্তু এতসব বাধা সত্ত্বেও মাঠে নামে তাইওয়ান। চীনের সাথে দীর্ঘদিনের বিরোধ তাইওয়ানের। চীন তাইওয়ানকে মনে করে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এক প্রদেশ হিসেবে, বর্তমানে যার পুনঃএকত্রীকরণ চীনা জাতীয়তাবাদের অংশ। আমেরিকা চীনকে একক রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করে, যেটি বেইজিং থেকে পরিচালনা করা হচ্ছে। আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে তাইওয়ানকে স্বীকৃতি না দিলেও, গত শতাব্দী থেকেই জাতীয় স্বার্থ আর অর্থনৈতিক প্রয়োজনের নিরিখে আমেরিকা তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে। তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে আমেরিকা-চীনের উত্তেজনা অনেকগুলো কারণই রয়েছে। এই উত্তেজনায় চীনের যেমন জাতীয় স্বার্থ আছে, একইভাবে জাতীয় স্বার্থ জড়িয়ে আছে আমেরিকারও। সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে চীন এখন কী করবে এবং তাদের প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকা কীভাবে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাবে সেগুলো এখন দেখার বিষয়। স্বৈরাচারী শাসন এবং সামরিক আইনের বিরুদ্ধে কয়েক দশকের সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে ১৯৯৬ সালে তাইওয়ানে প্রথম সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এটিকে চীনের বিরুদ্ধে তাইওয়ানের একটি গণতান্ত্রিক সাফল্য হিসেবে দেখা হয়। এবার দেশটির ৮ম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।
সেই ‘ট্রাবলমেকার’র বড় ব্যবধানে জয়: শনিবার নির্বাচনের শুরুতে ক্ষমতাসীন দল ডেমোক্র্যাটিক প্রোগ্রেসিভ পার্টি (ডিপিপি) ও বিরোধী দল কেমটির মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাসও দেখা দিয়েছিল। তবে নির্বাচন শেষে একের পর এক কেন্দ্রের ফল ঘোষণা হতে থাকলে ফিকে হয়ে আসতে থাকে চীনের আশা। এই নির্বাচনে চীনের আশায় গুঁড়েবালি দিয়েছেন ডিপিপি প্রার্থী লাই চিং-তে জয়ী হয়েছেন। শনিবার দেশটিতে আট ঘণ্টার ভোট গ্রহণ শেষে ফলাফল ঘোষণা করা হয়। সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে চীনের ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে তাইওয়ানের এ নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন ডিপিপির ভাইস প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে। স্থানীয় প্রচারমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ১ কোটি ৯৫ লাখের বেশি ভোটার রয়েছেন তাইওয়ানে। এর মধ্যে ৫০ লাখের বেশি ভোট পেয়েছেন লাই। চীনের নানা চেষ্টায় গুঁড়েবালি দিয়ে তৃতীয়বারের মতো বড় ব্যবধানেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন লাই। এটি একটি ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে তাইওয়ানের ইতিহাসে স্থান নিতে যাচ্ছে বলে অভিমত দিয়েছেন অনেক বিশ্লেষক। এদিকে উইলিয়াম লাইয়ের প্রধান বিরোধী প্রতিদ্বন্দ্বী দল কুমিংতাংয়ের প্রার্থী হো ইই-ইহ নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে উইলিয়াম লাইয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন তাইওয়ানের সবচেয়ে বড় বিরোধী দল কুয়োমিনতাং (কেএমটি) পার্টির হো ইয়ু ইহ এবং তাইওয়ান পিপলস পার্টির (টিপিপি) নেতা রাজধানী তাইপের সাবেক মেয়র কো ওয়েন-জে। তিনি ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত তাইওয়ান্স পিপলস (টিপিপি) পার্টির হয়ে নির্বাচন করেছেন। তাইওয়ানের সংবিধান অনুসারে, কোনো নাগরিক সেখানে টানা দুই বারের বেশি প্রেসিডেন্ট পদে থাকতে পারেন না। তাই এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি ভূখণ্ডটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট সাই ইং ওয়েন। তাইওয়ানে প্রতি চার বছর পর পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। সংবিধান অনুযায়ী, দুই মেয়াদের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারে না কেউ।
নয়া প্রেসিডেন্টের বার্তা তাইওয়ানকে রক্ষা করবো: নির্বাচনে জয়ের পর প্রতিক্রিয়ায় লাই বলেন, চীনের ক্রমাগত হুমকি এবং ভীতি থেকে তাইওয়ানকে রক্ষা করতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি তাইওয়ান প্রণালিতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখবেন। তিনি আরও বলেন, আমাদের গণতন্ত্রে একটি নতুন অধ্যায় লেখার জন্য আমি তাইওয়ানের জনগণকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। আমরা বিশ্বকে দেখিয়েছি যে আমরা গণতন্ত্রকে কতটা লালন করি। এটি আমাদের অটল অঙ্গীকার। ভোটের আগে লাইকে বারবার ‘বিপজ্জনক বিচ্ছিন্নতাবাদী’ বলে উল্লেখ করেছে বেইজিং। সেই সঙ্গে তার দেওয়া আলোচনার প্রস্তাব বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে চীনা প্রশাসন। এরপরও তাইওয়ান প্রণালিতে শান্তি বজায় রাখা ও প্রতিরক্ষা জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন লাই। লাইকে নির্বাচিত না করতে ভোটের আগেই তাইওয়ানিজ ভোটারদের হুঁশিয়ারি দিয়েছিল চীন। এই নির্বাচনকে ‘যুদ্ধ ও শান্তি’র মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়া হিসেবে উল্লেখ করেছিল বেইজিং। কিন্তু ফলাফলে দেখা গেছে, তাইওয়ানের ভোটাররা চীনের সেই হুঁশিয়ারিকে পাত্তা দেননি। দ্বীপটির বর্তমান ভাইস-প্রেসিডেন্ট লাইকেই ভোট দিয়েছেন তারা।
কে এই উইলিয়াম লাই: তাইওয়ানের ৬৪ বছর বয়সী অজ্ঞিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতা লাই চিং তে হিসেবেও পরিচিত। ২০২০ সালে তাইওয়ানের ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে তিনি একজন আইনপ্রণেতা ছিলেন। এ ছাড়া ২০১৭ ও ২০১৯ সালে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট সাই ইং ওয়েনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে দুই মেয়াদে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর তাইনানের জনপ্রিয় মেয়র ছিলেন তিনি। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে তিনি পূর্বসূরি সাইয়ের পথই কঠোরভাবে অনুসরণ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সাইয়ের নীতি হলো চীন থেকে বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড হিসেবে তাইওয়ানকে স্বাধীন একটি দেশ। তাই সাইয়ের নীতি কী হবে, তা আর বলার দরকার নেই। লাই রাজনীতিতে আসার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন চীনের কাছ থেকেই। তিনি তাইওয়ানের উত্তরাঞ্চলের একটি দরিদ্র গ্রাম থেকে উঠে এসেছেন। সেই গ্রামে ছিল কয়লাখনি। তার বাবা ছিলেন কয়লাশ্রমিক। তিনি যখন ছোট, তখনই তার বাবা মারা যান। এরপর তার মা একাই ছয় সন্তানকে বড় করেন। লাইয়ের মুখপাত্রের ভাষ্য, শৈশবে দেখা লাইয়ের দুঃখকষ্টই তাকে সুবিধাবঞ্চিত ও সংখ্যালঘুদের প্রতি সমব্যথী হতে শিখিয়েছেন। তিনি তাইওয়ানের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিসিন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। পরে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনস্বাস্থ্যের ওপর স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন।
বেইজিং-ওয়াশিংটনটানাপোড়েন কেন: কয়েক মাস ধরেই তাইওয়ানের এই নির্বাচন ঘিরে চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। নির্বাচন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে আসছে চীন ও আমেরিকা। যেহেতু উইলিয়াম লাই প্রেসিডেন্ট হয়েছেন সেহেতু বেইজিং-ওয়াশিংটন সম্পর্ক যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়াবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকগণ। কারণ চীনের সঙ্গে দ্বীপটির ভবিষ্যত কী দাঁড়াবে তা এখন স্পষ্টতই পরিষ্কার। গত সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে তাইওয়ানকে নিজেদের বলে দাবি করে আসছে চীন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সম্প্রতি জানিয়েছেন, তাইওয়ানকে চীনের অন্তর্ভুক্তকরণ কেউ ঠেকাতে পারবে না।
তাইওয়ান ইস্যুতে কখনো কোনো আপস করবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে চীন। তাছাড়া স্ব-সাশিত দ্বীপটিকে আবারও নিজের অংশ বলে দাবি করেছে বেইজিং। সম্প্রতি মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সামরিক আলোচনা শেষে এক বিবৃতিতে এসব বিষয় তুলে ধরেন চীনা কর্মকর্তারা। আমেরিকা সরাসরি না হলেও, অনানুষ্ঠানিকভাবে তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। আবার তারা এক চীন নীতিরও সমর্থক বলে দাবি করে। অথচ এ নীতি অনুযায়ী, তাইওয়ান চীনের অংশ। তবে ওয়াশিংটন কখনোই তাইওয়ানকে বেইজিংয়ের অংশ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। ভোটের দিন শনিবার সকালে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, আবারও চীনা বেলুনকে সংবেদনশীল তাইওয়ান প্রণালী অতিক্রম করতে দেখেছে তারা। এসব বেলুনের একটি তাইওয়ানের উপর দিয়ে উড়ে গেছে। মন্ত্রণালয়টি গত মাসে প্রণালীতে বেলুন উড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাকে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এবং বিমান চলাচলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে নিন্দা করেছিল।
দ্বন্দ্ব চরমে গেল যেভাবে: ২০২২ সালের আগস্টে চীনের আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে তাইওয়ান সফরে গিয়েছিলেন আমেরিকার তৎকালীন স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি। চীন এ ঘটনাটিকে খুবই বিপজ্জনক হিসেবে নেয়। গত ২ যুগে ন্যান্সির ছাড়া কোনো শীর্ষ পর্যায়ের মার্কিন রাজনীতিবিদ সেখানে যাননি। তাইওয়ানে ন্যান্সি পেলোসির সফরের পর কঠোর হয়েছে চীন। দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এমনকি কঠোর শক্তি প্রয়োগের কথাও বলছেন। বিপরীতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, তাইওয়ান আক্রান্ত হলে পাশে থাকবে। চাপে রাখার কৌশল হিসেবে গত বছরের আগস্টের পর থেকে তাইওয়ানের উপকূলে বেশ কয়েকবার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে চীন, চালিয়েছে সামরিক মহড়াও। মহড়ার সময় তাইওয়ানের চারপাশ দিয়ে উড়েছে ৯১টি সামরিক উড়োজাহাজ। বর্তমানে চীন সামরিক শক্তিতে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দেশ। যদি তারা তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ করতে যুদ্ধের পথ বেছে নেয়, তাহলে সম্ভাবনা আছে আমেরিকারও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার। অনেক সামরিক বিশ্লেষক মনে করে যে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় এই ২ দেশ এখনই কোনো যুদ্ধে জড়াবে না। সামরিক শক্তির হিসাবে চীনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে তাইওয়ান। তবে সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে প্রতিরক্ষাখাতে তারা ব্যয় বাড়িয়ে চলেছে। এ খাতে এ বছর রেকর্ড ১৯ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে তাইওয়ান। যদিও চীনের ব্যয় এর ১২ গুণ বেশি। তাইওয়ানকে চাপে রাখতে নানান কৌশল নিয়েছে চীন। ২০২০ সালে তাইওয়ানের ১০ সরকারি সংস্থার তথ্য ও ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে অন্তত ৬০০ ইমেইল অ্যাকাউন্ট হ্যাক করার অভিযোগ আছে চীনের বিরুদ্ধে।

চীন কেন তাইওয়ানকে চায় স্বার্থের মূলে কি: চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের একত্রীকরণ অনিবার্য বলে বলে আসছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তিনি বলেন, মাতৃভূমির সঙ্গে তাইওয়ানকে পুনরায় এক করার প্রক্রিয়া শেষ করাটা চীনের সার্বিক উন্নয়নের অনিবার্য শর্ত। এটি ন্যায়নিষ্ঠ প্রক্রিয়া, যা জনগণ চায়। চীন ও তাইওয়ান অবশ্যই আবার এক হবে। শি জিনপিংয়ের ভাষ্য, আমাদের অবশ্যই আন্তপ্রণালি সম্পর্ককে শান্তিপূর্ণ করার জন্য কাজ করতে হবে। যে কোনোভাবেই হোক, চীন থেকে তাইওয়ানকে বিচ্ছিন্ন করতে চাওয়া যে কাউকে প্রতিরোধ করতে হবে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে থাকে। যদিও এ অঞ্চলে কখনো তাদের নিয়ন্ত্রণ ছিল না। কিন্তু চীনা কর্মকর্তারা বারবারই তাইওয়ানকে চীনের সঙ্গে যুক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করে আসছেন। এমনকি, প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করতেও চান তারা। তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের বড় স্বার্থের জায়গা সেমিকন্ডাক্টর বা ‘চিপ’। কম্পিউটার, মোবাইল, যানবাহন-কোথায় ব্যবহার হয় না এই চিপ। ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৬০ ভাগ চিপ শুধুমাত্র তাইওয়ানেই তৈরি হয়। তাই চীন একে দখলে রাখতে পারলে এর ব্যবসা একচেটিয়াভাবে নিজেদের দখলে রাখতে পারবে৷তবে তাইওয়ানেরও আছে নিজস্ব পরিকল্পনা। চীনের পরিচয়ে নয়, বরং সেমিকন্ডাক্টরের ব্যবসায় বিশ্বে নিজ পরিচয়ে পরিচিত হতে চায় তারা। এমনকি, তাইওয়ানে পর্যটনে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে চীন। সেখানে পর্যটকের সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে। চীনের চাপে তাইওয়ানের সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তিও করতে পারছে না অনেক দেশ। সিঙ্গাপুর ও নিউজিল্যান্ড ছাড়া খুব বেশি উন্নত দেশের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নেই।

আমেরিকার মাথা ঘামানোর নেপথ্যে: আমেরিকা ১৯৭৯ থেকে ‘এক চীন’ নীতি মেনে চললেও, সম্পর্ক এগিয়ে নেয় তাইওয়ানের সঙ্গেও। তাদের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও অস্ত্রের অন্যতম বড় বাজার তাইওয়ান। এটি মোটেও সহজভাবে নেয়নি বেইজিং। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের করা তাইওয়ান অ্যাক্ট অনুসারে, আমেরিকা তাইওয়ানকে চীনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। একইসঙ্গে অস্ত্র বিক্রি, সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগও রেখে চলছে। তাইওয়ানকে ঘিরে আমেরিকার চলছে ‘কৌশলগত দ্বিচারিতা’। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে তাইওয়ানের কাছে ১৮ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করে আমেরিকা। তাইওয়ানে মার্কিন দূতাবাসের জন্য খরচ করা হয় ২৫০ মিলিয়ন ডলার। ১৯৭৯ সালের পর তাইওয়ানের এত ঘনিষ্ঠ আর কখনো হয়নি আমেরিকা। সেই সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে আগ্রহী বাইডেন। গত বছরের জুলাইতে তাইওয়ানকে ৩৪৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সামরিক সহায়তা দেয় আমেরিকা। তাইওয়ানকে দেওয়া সামরিক সহায়তা প্যাকেজের মধ্যে প্রতিরক্ষা নিবন্ধ, সামরিক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সহায়তার আওতায় দেওয়া হবে বহনযোগ্য বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গোয়েন্দা ও নজরদারি ক্ষমতা, আগ্নেয়াস্ত্র এবং ক্ষেপণাস্ত্র। তাইওয়ানের কাছে দ্রুত অস্ত্র পাঠাতে পেন্টাগন এবং হোয়াইট হাউসকে চাপে রাখে মার্কিন আইনপ্রণেতারা। এমনিতে তাইওয়ান ইস্যুসহ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বাণিজ্য বিরোধ নিয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে মনোমালিন্য আছে। ‘সার্বভৌম দেশগুলোর’ জন্য সংরক্ষিত একটি কর্মসূচির অধীনে গত বছর বিশেষ একটি প্যাকেজে প্রথমবারের মতো তাইওয়ানকে সামরিক সরঞ্জাম হস্তান্তরের অনুমোদন দেয় আমেরিকা। গত বছর পাস করা তাইওয়ান এনহ্যান্সড রেজিলিয়েন্স অ্যাক্টের অধীনে, ২০২৩ থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত দ্বীপটিতে সামরিক অনুদান বার্ষিক ২০০ কোটি ডলার পর্যন্ত অনুমোদিত। এটি মার্কিন ফরেন মিলিটারি ফাইন্যান্সের (এফএমএফ) আওতাভুক্ত প্রোগ্রাম। আমেরিকার করদাতাদের অর্থ থেকে এ প্যাকেজের আট কোটি ডলার খরচ হবে। তাইওয়ানের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শক্তিশালী করতে এ সামরিক সহায়তা দিচ্ছে এফএমএফ। তাইওয়ানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করতে আমেরিকা আগ্রহী বলে জানায় দেশটি। তাদের ভাষ্য, তাইওয়ানে শান্তি প্রতিষ্ঠা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অ্যাপল ও অন্যান্য মার্কিন কোম্পানির প্রধান চিপ সরবরাহকারী তাইওয়ানের পাশে আমেরিকার দাঁড়াতে চাওয়ার পেছনে এটিও ভূমিকা রেখেছে। এ ছাড়া, তাইওয়ানের সহায়তা নিয়ে নিজেদের দেশেও চিপের বাজার গড়ে তুলতে চায় আমেরিকা।
তাইওয়ানিজ না চীনা কোন পক্ষে জনগণ: নির্বাচনের আগে থেকেই উইলিয়াম লাইয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপপ্রচার চালাচ্ছিল চীন। এরপরেও বড় এই জয় ইঙ্গিত দিচ্ছে-চীনের চাপকে পাত্তা দেননি তাইওয়ানের সাধারণ ভোটাররা। তারা চীন বিরোধী উইলিয়াম লাইকেই ক্ষমতায় আনার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর ছিলেন। নতুন প্রেসিডেন্ট ছাড়াও তাইওয়ানের সাধারণ মানুষ শনিবার এমপি নির্বাচনেও ভোট দিয়েছেন। লাই নির্বাচনের আগে জানিয়েছিলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট হলে তাইওয়ান প্রণালীর স্থিতিশীলতা এবং এটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বৃদ্ধি নিয়ে কাজ করবেন। তাইওয়ানের নাগরিকদের মধ্যে অন্তত ৬১ ভাগই নিজেদেরকে ‘তাইওয়ানিজ’ পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। নিজেদের ‘চীনা’ মনে করেন ৩ শতাংশ মানুষ। ১৯৯৪ সালে এই হার ছিল প্রায় ২৬ শতাংশ। এ ছাড়া, সেখানকার ৩৩ শতাংশ বাসিন্দা নিজেদের চীনা ও তাইওয়ানিজ উভয়টিই মনে করেন। চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের চলমান উত্তেজনার মধ্যেও, নানান গবেষণা বলছে তাইওয়ানের জনগণ মনে করে অর্থনৈতিক উন্নয়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। ২০২৩ সালে ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি কাউন্সিলের কর্মকর্তাদের পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায় ৩৪ দশমিক ২ শতাংশ লোক চায় তাদের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট অর্থনীতিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিক। তরুণ জনগোষ্ঠী ও শ্রমিকদের মধ্যে সবকিছুর উচ্চ মূল্য ও বাড়ির মূল্য দিনদিন বেড়ে যাওয়া নিয়ে ব্যাপক হতাশ।

দ্বীপরাষ্ট্রটির ইতিহাস কী জানাচ্ছে: চীন মনে করে তাইওয়ান তাদেরই অংশ। তবে তাইওয়ান বিশ্বাসী নিজেদের স্বাধীনতায়। তাদের নিজস্ব সংবিধান আছে। তারা চীনের অংশ হতে চায় না। রক্ষা করতে চায় নিজেদের সার্বভৌমত্ব। ‘এক চীন’ নীতি বাস্তবায়ন করতে তাইওয়ানকে যেকোনো মূল্যে করায়ত্ত করতে চায় বেইজিং। এই দ্বন্দ্ব অবশ্য নতুন নয়। দক্ষিণপূর্ব চীনের উপকূল থেকে ১০০ মাইল দূরের দ্বীপ তাইওয়ান। ১৭ শতকে কিং রাজবংশের শাসনামলে দ্বীপটি প্রথমবারের মতো চীনের নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। ১৮৯৫ সালে জাপানের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে দ্বীপটি তাদের হাতে তুলে দেয় চীন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আবারো চীনের দখলে আসে তাইওয়ান। ১৯৪৯ সালে চিয়াং কাই-শেক নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জিতে যান মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বাধীন সমাজতন্ত্রীরা। কাই-শেকের দল পরিচিত ছিল কুওমিনতাং নামে। তারা চলে যায় তাইওয়ানে। ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত নিজেদের চীনের বৈধ শাসক দাবি করে তাইওয়ান থেকে সরকার পরিচালনা করেন তারা। এমনকি, তারা জাতিসংঘের স্বীকৃতিও পান। ১৯৭১ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে তারাই এগিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে মাও সে তুংয়ের সরকার জাতিসংঘের স্বীকৃতি পায়। চীন নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হয়, পায় ভেটো ক্ষমতা। এই ঘটনাটি চীন ও তাইওয়ান ব্যবহার করছে একে অপরের বিরুদ্ধে। তাইওয়ান বলছে, তারা মাওয়ের সময় কিংবা তারও আগে ১৯১১ এর বিপ্লবের পর চীনের অংশ ছিল না। অপরদিকে, কাই-শেকের সরকারের কথা তুলে চীন বলছে, তাইওয়ান তাদেরই অংশ। ১৯৭৯ সালে আমেরিকা মাওয়ের উত্তরসূরিদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন ও কুওমিনতাংয়ের প্রতি সমর্থন তুলে নেয়। আন্তর্জাতিক পরিসরে একা হতে থাকে তাইওয়ান। বর্তমানে ভাটিক্যানসহ মাত্র ১৪ দেশ তাইওয়ানের সার্বভৌম মানে।
ইউডি/সুপ্ত/কেএস

