ক্যানসারের ঝুঁকিতে বাংলাদেশের কয়েক কোটি মানুষ

ক্যানসারের ঝুঁকিতে বাংলাদেশের কয়েক কোটি মানুষ

উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১৭:৫০

জলবায়ু পরির্তনের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদী ভাঙনের মতো দুর্যোগের কথা সবারই জানা। কিন্তু জলবায়ু সংকটের কারণে বাংলাদেশের আরেকটি ভয়ঙ্কর পরিণতির দিক উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়, এই গবেষণায় প্রাপ্ত আতঙ্ক জাগানো তথ্যাবলী তুলে ধরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।

এতে বলা হয়েছে, জলবায়ু সংকটের ফলে নলকূপের পানি দূষিত হয়ে পড়ায় ক্যানসারের ঝুঁকিতে পড়বে বাংলাদেশের কয়েক কোটি মানুষ। বিজ্ঞান জার্নাল পিএলওএস-ওয়ান এ প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে এ তথ্য উঠে এসেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, তাপমাত্রা বাড়ার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অপ্রত্যাশিত বন্যা ও তীব্র বৈরী আবহাওয়া দেখা দেওয়ায় দেশের সুপেয় পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে যাবে।

গবেষণাটির মুখ্য গবেষক, নরউইচ ইউনিভার্সিটির ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. সেথ ফ্রিসবি সম্প্রতি গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যের ওপর আয়োজিত প্রেজেন্টেশনে বলেন, সুপেয় পানিতে আর্সেনিক বিষের মাত্রা বাড়া গুরুতর সমস্যা। তিনি বলেন, একবার আমি একটা গ্রামে গিয়েছিলাম; ওই গ্রামে ৩০ বছরের বেশি বয়সের কোনো মানুষ নেই। এই গবেষণার ফলাফলে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য সংকটের তীব্রতা উঠে এসেছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। আর্সেনিক বিষের কারণে ইতিমধ্যে এদেশে লাখ লাখ মানুষ ত্বক, মূত্রাশয় ও ফুসফুসের ক্যানসারে ভুগছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে পানিতে আর্সেনিক দূষণের সূত্রপাত হয় ১৯৭০-এর দশকে। ওই সময় নদী-খাল, পুকুরের অর্থাৎ ভূ-উপরস্থ দূষিত পানির জন্য শিশুমৃত্যুর হারে শীর্ষ সারির দেশ ছিল বাংলাদেশ। এরপর গৃহস্থালি ব্যবহারে, ফসলের খেতে সেচ দিতে এবং মাছ চাষের জন্য গভীর নলকূপের পরিষ্কার পানি সরবরাহ করতে জাতিসংঘের সহায়তা সংস্থা এবং এনজিওগুলোর অর্থায়নে ব্যাপক কর্মসূচি চালানো হয়।

নতুন নলকূপগুলোর সুবাদে পানিবাহিত রোগের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব হয়। এর ফলে বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার অনেক কমে আসে। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকে জানা যায়, দেশের পাললিক শিলার স্তর থেকে তোলা পরিষ্কার পানিতে উচ্চমাত্রায় প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট আর্সেনিক থাকে। বাংলাদেশে নলকূপের পানিতে দীর্ঘস্থায়ী আর্সেনিক বিষক্রিয়ার প্রথম ঘটনার সন্ধান পাওয়া যায় ১৯৯৩ সালে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এঁকে একটি জনপদের ইতিহাসে বৃহত্তম গণ বিষক্রিয়ার ঘটনা বলে উল্লেখ করে। ফ্রিসবি বলেন, আর্সেনিক প্রাকৃতিকভাবেই উৎপন্ন হয়। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, ইরাবতী এবং মেকং নদীর অববাহিকায় প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন আর্সেনিক রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, মানুষ ভূমির ওপরের স্তরের (নদী-খাল, পুকুর) পানি পান করার সময় কোনো সমস্যা হতো না, কারণ ভূ-উপরস্থ পানি বায়ুমণ্ডলে থাকা অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসে। এর ফলে আর্সেনিক অদ্রবণীয় হয়ে পড়ে এবং পানি থেকে এটি সরে যায়। সে কারণেই হুট করে মানুষ এসব গভীর নলকূপের পানি ব্যবহার করতে শুরু করায় গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকটের উদ্ভব হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাত্রা অনুযায়ী পানিতে আর্সেনিকের সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা হচ্ছে ১০ পার্টস পার বিলিয়ন (পিপিবি)। ৪৯ শতাংশ এলাকার নলকূপের খাবার পানিতে আর্সেনিক সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি বলে জানান ফ্রিসবি। মাঠ পর্যায়ে কাজ করার সময় একটি নলকূপের পানি পরীক্ষা করে তাতে আর্সেনিকের মাত্রা পেয়েছেন ৪৮ পার্টস পার বিলিয়ন (পিপিবি)। ফ্রিসবি জানান, তার হিসাবে, বাংলাদেশের প্রায় ৭৮ মিলিয়ন বা ৭.৮ কোটি মানুষ আর্সেনিকের সংস্পর্শে এসেছে।

কমিয়ে হিসাব করলেও বাংলাদেশের প্রায় ৯ লাখ মানুষ ফুসফুস ও মূত্রাশয় ক্যানসারে মারা যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান তিনি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই সমস্যা আরও প্রকট আকার নিচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে বন্যার হার ব্যাপক বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা আরও বেড়ে যাবে।

ইডিডি/এআর

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading