পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর ইচ্ছা পূরণের নির্বাচন: প্রধানমন্ত্রীর মুকুট নওয়াজের মাথায়?

পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর ইচ্ছা পূরণের নির্বাচন: প্রধানমন্ত্রীর মুকুট নওয়াজের মাথায়?

উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১৫:০০

পাকিস্তানের পার্লামেন্ট নির্বাচন ঘিরে রাজনীতিতে চলছে মেরুকরণ, বিভক্তি ও অস্বস্তি। এ নির্বাচনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পিটিআই’কে (তেহরিক-ই-ইনসাফ) বঞ্চিত করার অভিযোগ ওঠেছে। মো. শহীদ রানা’র প্রতিবেদন

নির্বাচন নিয়ে যত নাটক: পাকিস্তানের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বৃহস্পতিবার (০৮ ফেব্রুয়ারি)। এ নির্বাচন নিয়ে দেশটির রাজনীতিতে চরম বিভক্তি দেখা দিয়েছে। বাবার হাতে ছেলে খুন হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। মানুষ এ বিষয়ে কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) শীর্ষ নেতারা এ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না। অনেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ভোটের আগে দলটির চেয়ারম্যান ইমরান খানকে তিনটি মামলায় সাজা দিয়েছেন আদালত। এ কারণে দলটিকে নির্বাচনে সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ ওঠেছে। অন্যদিকে দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। শুধু তা-ই নয়; তার দণ্ড মওকুফ করা হয়েছে। আর এ সবের পেছনে দেশটির সেনাবাহিনী কলকাঠি নাড়ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ইমরান খান নিজেও এ অভিযোগ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সেনাবাহিনী কলকাঠি নাড়ছে। পরে ইমপিচমেন্টের মুখে পদত্যাগ করেন তিনি। একটি প্রতিবেদন বলছে, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ। এ কারণে জেনারেল ক্ষমতা নিচ্ছেন না; কিন্তু পেছন থেকে দেশ পরিচালনা করছেন। এদিকে বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে কে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রীর মসনদে বসবেন, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে বিভিন্ন জরিপ বলছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ এবার প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন।

‘স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার কারও নেই’
লাহোরের বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষার্থী আমেনা বলেন, পাকিস্তানের রাজনীতির বিষয়ে কারোরই স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার নেই। ভোটাররা জানান, পাকিস্তানের মানুষ এতটাই বিভক্ত যে তারা নির্বাচনের বিষয়ে কথা বলতে অস্বস্তি অনুভব করছেন। রাজনীতি এখন এতটাই মেরুকরণ হয়ে গেছে যে এ নিয়ে মতানৈক্যের ঘটনায় নিজের সন্তান আতা উর রেহমানকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার বাবার বিরুদ্ধে। আতার ভাই আরিফ বলেন, আমাদের পুরো পরিবার শোকাহত। তিনি বলেন, তার ভাই কাতারের চাকরি করতেন। ছুটিতে এসে পেশোয়ারে বাবার সাথে থাকছিলেন। আতা বাড়ির ছাদে পিটিআইয়ের পতাকা টাঙাতে চাইলে তার বাবার সাথে তর্ক শুরু হয়। যদিও আমার বাবা কোনো রাজনৈতিক দল সমর্থন করেন না, তিনি এটি পছন্দও করেন না। উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডার পর তার বাবা আতাকে গুলি করে পালিয়ে যান। পরে পুলিশ আতার মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। যদিও এটি একটি বিরল ঘটনা। তবে অনেক লোকজন বলেছে যে নির্বাচনের সময় তারা পরিবারের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে।

ইমরান খানের অন্ধ সমর্থক নিদা জিশান বলেন, আমার বোন এবং আমি বাবার সাথে তিন মাস কথা বলিনি। ইমরান খানেকে জেতানোর জন্য নিদা এবং তার বোন ২০১৮ সালের নির্বাচনে পিটিআইকে ভোট দিয়েছিলো। কিন্তু এটি তাদের পরিবারে বিভক্তি সৃষ্টি করে। আমার বাবা খানের নির্বাচনি ইশতেহারের সাথে একমত নয় এবং তার মতে খান ভালো রাজনীতিবিদ নন। অন্য যেসব তরুণের সাথে আমি কথা বলেছি, তাদের মতো নিজের মত প্রকাশে ভীত ছিল না নিদা। আমি আমার বাবার সাথে দ্বিমত করে বলতাম যে, আমি খানকে এবং তার ব্যক্তিত্বকে ভালোবাসি। আমি তার নির্বাচনী ইশতেহার পছন্দ করেছিলাম। ২০২৪ এর নির্বাচনেও এর ব্যতিক্রম হবে না বলে জানিয়ে নিদা বলেন, কেউ যদি তার সাথে দ্বিমত করে সে তাদের সাথে দেখা করা বন্ধ করে দেবে, নয়তো সে আলাপ ঝগড়া পর্যন্ত গড়াবে। তার সঙ্গে একমত না হলেও ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা তার মতামতকে শ্রদ্ধা করে বলে জানান তিনি। আমার বন্ধুর স্বামী অন্য দল থেকে এবারর নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। সে খুব ভালো করেই জানে আমি তাকে ভোট দেবো না, আর তাই সে আমার কাছে সমর্থন চায়নি।

পিটিআই’র ভাগ্যে কী আছে? পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরানের খানের রাজনৈতিক দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) নিষিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। ১৯৯৬ সালে নিজের হাতে দলটি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তিনি। দেশটির বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বলছে, বেশ আগে পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশনে (ইসিপি) একটি অভিযোগ এসেছিল। সেখানে বলা হয়েছে, ২০০৩ সালে ‘নিষিদ্ধ উৎস’ থেকে তহবিল সংগ্রহ করেছিল পিটিআই। দীর্ঘদিন অভিযোগটি নিয়ে নির্বাচন কোনো তৎপরতা দৃশ্যমান হয়নি। তবে সম্প্রতি এ ইস্যুতে ইসিপি তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা গেছে। পাকিস্তানের সংবিধান অনুসারে, যদি কোনো রাজনৈতিক দল বিদেশি কোনো উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে এবং যদি তা প্রমাণিত হয়, তাহলে সেই রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা যাবে। পিটিআইয়ের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ রয়েছে এবং সেটিরই তদন্ত শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। এদিকে রাষ্ট্রের গোপন নথি ফাঁস, তোশাখানা দুর্নীতি ও অবৈধ বিয়ের মামলায় ইমরান ও তার দলের জেষ্ঠ্য নেতা মাহমুদ কোরেশী দোষী সাব্যস্ত হন। এ কারণে তারা রাজনীতিতে নিষিদ্ধ। ফলে সার্বিক ভাবে এক চরম অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে পিটিআই। ২০২২ সালের ২৭ মার্চ এক জনসভায় ইমরান খান একটি চিঠি প্রদর্শন করে বলেছিলেন, তার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটাতে আমেরিকা চাপ দিচ্ছে এবং এই ইস্যুতে আমেরিকার সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর যে তারবার্তা আদানপ্রদান চলছে, তার প্রমাণ এই চিঠিতে রয়েছে। তারপরই তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের গোপন তথ্য ফাঁস (সাইফার) মামলা দায়ের করা হয়। তারপর ২০২৩ সালের ৯ মে ইসলামাবাদ হাইকোর্ট চত্বরে ইমরান খান গ্রেপ্তার হওয়ার পর ক্ষোভে ফেটে পড়েন পিটিআই কর্মী-সমর্থকরা এবং পাকিস্তানের ইতিহাসে সেবার প্রথমবারের মতো সামরিক বাহিনীর স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দলের সমর্থকদের উসকানি দেওয়ার অভিযোগে ইমরান খান ও তার দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা চলছে পাকিস্তানের একাধিক আদালতে।


‘পিটিআই নিষিদ্ধ হচ্ছে’ এই সংবাদটি অবশ্য পাকিস্তানের অপর দুই বড় রাজনৈতিক দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএলএন) এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)সহ অন্যান্য অনেক রাজনৈতিক দলের জন্য সুখবর। কারণ এই মুহূর্তে পিটিআই পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল এবং ইমরান খান এখনও দেশটির সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা। বস্তুত, এখন পর্যন্ত পিটিআই এবং ইমরানের যে জনপ্রিয়তা- পিএমএলএন এবং পিপিপি তার ধারে কাছেও নেই। পাকিস্তানের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটের সদস্য এবং পিএমএলএন নেতা শেহবাজ শরিফের নেতৃত্বাধীন সাবেক সরকারের আইন ও বিচার বিষয়ক মন্ত্রী আজম নাজির তারার অবশ্য মনে করেন, নিষিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকলেও শিগগিরই পিটিআইকে এমন বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে না। এই মুহূর্তে পাকিস্তানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো টালমাটাল অর্থনীতিকে স্থিতিশীল অবস্থায় আনা। লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যাপক সংকটে রয়েছেন সাধারণ জনগণ। এই সংকটের সুরাহা হওয়া এখন সবচেয়ে জরুরি।

অনেকটা খালি মাঠে গোল দিচ্ছেন নওয়াজ: পাকিস্তানের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ গত বছর স্বেচ্ছা নির্বাসন শেষে দেশে ফিরেছেন। তিনিই আগামী নির্বাচনে জয়ী হতে যাচ্ছেন। তিনিই প্রধানমন্ত্রী হবেন বলে বিবিসি’র জরিপে বলা হয়। এর আগে গ্যালাপের জরিপ ও ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, নওয়াজ শরীফই আবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। শেষবার যখন নওয়াজ শরীফ দেশটির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন তিনি দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হন। এর আগে তাকে ক্ষমতা থেকে হটানো হয়। এতোকিছুর পরেও নওয়াজ শরীফ আবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। আমেরিকাভিত্তিক উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, শুধু জনপ্রিয়তার কারণে নওয়াজ শরীফ পাকিস্তানের পরবর্তী নির্বাচনের শীর্ষ প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হননি। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে তিনি পর্দার আড়ালে সঠিক কার্ডটি খেলেছেন। বর্তমানে নওয়াজ শরীফের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান জেলে রয়েছেন। গত কয়েকদিন ধরেই তার বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডের রায় হলো। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ১৯৯৯ সালে নওয়াজ শরীফকে যখন হটানো হয়, এরপর ২০১৩ সালের সংসদ নির্বাচনে ভালোভাবেই ফিরে আসেন নওয়াজ শরীফ। তিনি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় বসেন। তবে দুর্নীতির দায়ে ২০১৭ সালের জুলাইতে নওয়াজ শরীফকে অযোগ্য ঘোষণা করেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। এর কয়েকদিন পরেই পদত্যাগ করেন তিনি। ২০১৮ সালের জুলাইতে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হন নওয়াজ শরীফ। তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে এর দুইমাসের মধ্যে দেশটির আদালত এই সাজা বাতিল করে এবং চূড়ান্ত সাজা স্থগিত রাখে। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে নওয়াজ শরীফের দুর্নীতির দায়ে জেল হয়। এবার তার সাত বছরের সাজা দেওয়া হয়। এরপর ব্রিটেনে চিকিতসার কথা বলে জামিনের জন্য লড়েন নওয়াজ শরীফ। ২০১৯ সালেই তিনি জামিন পান এবং লন্ডনে যান। সেখানেই তিনি গত চার বছর ধরে এক বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকেন এবং গত অক্টোবরে পাকিস্তানে ফিরেন। এতকিছুর পরেও গত ৩৫ বছর ধরে নওয়াজ শরীফ পাকিস্তানের রাজনীতে শীর্ষ পর্যায়ের নেতা হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। তবে নওয়াজ শরীফের এতকিছুর নেপথ্যে তার দেশটির শক্তিশালী সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কের উত্থান পতন প্রধান কারণ বলে ধারণা পর্যবেক্ষকদের। সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগসাজশের ফলেই নওয়াজ শরীফের দেশে ফেরা ও আবার প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বলে মতামত বিশ্লেষকদের।

টক অব দ্য পাকিস্তান ইমরানের ‘বুশরা বিবি’ : রাজনীতির মাঠে নেই ইমরান খানের স্ত্রী বুশরা বিবি। কিন্তু রাজনীতির আগুন আঁচ লেগেছে তার শরীরেও। ‘ইদ্দত’ পালন না করায় তার সাজা হয়েছে সাত বছর। এখন তিনি রয়েছেন কারাগারে। আর এ কারণে বিষয়টি টক অব দ্য পাকিস্তানে পরিণত হয়েছে।
বিবাহ বিচ্ছেদের পর শরিয়া আইন মেনে ইদ্দতকাল (বিয়ের পর নির্দিষ্ট সময় পার করা) পালন করা হয়নি অভিযোগে করা একটি মামলায় সর্বশেষ শনিবার ইমরান ও তার স্ত্রী বুশরা বিবিকে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে দেশটির একটি আদালত। গত বছর নভেম্বরে বুশরার সাবেক স্বামী খাওয়ার ফরীদ মানেকার করা এই মামলায় আদিয়ালা জেলা কারাগারে একট অস্থায়ী আদালত বসিয়ে এই রায় দেন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি কুদরতুল্লাহ। ইমরান-বুশরা দম্পতির উভয়কে পাঁচ লাখ রুপি করে জরিমানাও করেছে আদালত। এ সপ্তাহেই আরো দুটো মামলা সাজা পেয়েছেন ইমরান খান। তার একটি হলো তোষাখানা মামলা, যে মামলায় ইমরান ও তার স্ত্রীকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। তার আগে রাষ্ট্রীয় গোপন নথি ফাঁসের অভিযোগে ইরমান ও তার দল পিটিআই এর জ্যেষ্ঠ নেতা শাহ মেহমুদ কোরেশির ১০ বছর করে কারাদণ্ড হয়। শনিবার যে মামলায় ইমরান ও তার স্ত্রীর সাজা হলো সেই মামলার অভিযোগে বুশরা বিবির আগে স্বামী বলেছিলেন, তার সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর ইসলামিক শরিয়া অনুযায়ী নির্ধারিত ইদ্দতকাল পার না হওয়ার আগেই ইমরান ও বুশরা বিয়ে করেন; যা স্পষ্টতই ওই আইনের লঙ্ঘন এবং আইন না মানায় তাদের বিবাহ অবৈধ। শনিবারের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবেন ইমরান-বুশরা। তারা এরইমধ্যে আপিলের প্রস্তুতি শুরু করেছেন বলে পিটিআই নেতাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে পাকিস্তানের ইংরেজি ভাষার দৈনিক ডন।

নেপথ্যে খেলছেন যিনি: পাকিস্তানের সেনাবাহিনী পেছন থেকে দেশটির শাসনক্ষমতার কলকাঠি নাড়ছে। কয়েক মাস আগে দেশটিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আনোয়ার উল হক কাকারকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তার এ নিয়োগ সেনাবাহিনীর উদ্ধর্তন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনেই হয়েছে। ১২ আগস্ট এশিয়ান লাইটের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা এখন দুর্বল। কোন অরাজনৈতিক ব্যক্তি বা সেনাপ্রধানের পক্ষে এ অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। বিশ্বব্যাংকের মতে, এ বছর দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ০.৫ শতাংশেরও কম। তাই দেশটির জেনারেল হেডকোয়ার্টার (জিএইচকিউ) সরাসরি দেশটির শাসন ক্ষমতায় আসতে চায় না। বরং তারা স্পেশাল ইনভেস্টমেন্ট ফেসিলেশন কাউন্সিল (এসআইএফসি) এর একজন সদস্য হিসেবে পেছন থেকে দেশকে চালাতে চায়। এছাড়া সম্প্রতি জঙ্গী গোষ্ঠী তেহরিক-ই-তালেবান-ই-পাকিস্তানের (টিটিপি) সক্রিয় সদস্যরা পাকিস্তানির উপজাতীয় অঞ্চলে অবস্থান করছে। টিটিপি এর সদস্যরা পাকিস্তানে শরিয়াভিত্তিক শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে চায়। একারণে দেশটি নিরাপত্তা ঝুঁকিতেও রয়েছে। পাকিস্তানের সেনা প্রধান জেনারেল ওয়াসীম মুনিরের সামনে ইমরান খান ও টিটিপি একই সমস্যার দুটো দিক। ইমরান খানকে আটক এবং তাকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার পর তার জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা পাকিস্তানি সেনবাহিনীর জন্য একটি সমস্যা। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের ছোট ভাই শাহবাজ শরীফ দক্ষ রাজনীতিবিদ। তিনি নওয়াজের অনুপস্থিতিতেও পাঞ্জাব প্রদেশে প্রভাব ধরে রেখেছেন। পাকিস্তানের অধিকাংশ সেনাসদস্য এ প্রদেশের। এ প্রদেশকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেরুদন্ডও বিবেচনা করা হয়। ইমরান খানের অনুপস্থিতে নওয়াজ শরীফ অবশ্যই নির্বাচনের মাঠে সুবিধা পাবেন। এছাড়া পিটিআই এখন বিভক্ত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান আটক এবং নির্বাচনে তাকে অযোগ্য ঘোষণার পর এখনো তার সমর্থকরা সফল আন্দোলন করে তাকে মুক্ত করতে পারেনি। তবে পিটিআই থেকে যারা বের হয়ে গেছে তারা পিটিআইয়ের শুরু থেকে ছিল না। পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যরা এটিতে এখনো আছে। যদি তারা দেশটির সেনা বাহিনীর সমর্থন পান তবে আবারও পিটিআই শাসক্ষমতায় আসতে পারে। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্ক খারাপ করে ভুল করেছিল। তার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল ইন্টার সার্ভিস ইন্টেলিজেন্স প্রধানকে অপসারণ করা। সহজভাবে বলতে গেলে আগামী কয়েকমাস পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হবে। এটা নওয়াজ এবং জার্দারির জন্য খারাপ সংবাদও হতে পারে। তবে দেশটিতে গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন ঘটতে পারে কেননা পাকিস্তানের জিএইচকিউ শুরা হোয়াইট হাউজ এবং পেন্টাগনের সদিচ্ছা বজায় রাখতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে।

বিভাজনের রাজনীতিতে বিশ^াসী নন বিলাওয়াল: বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি ও তার বাবা আসিফ আলী জারদারির নেতৃত্বে মধ্য-বামপন্থী পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) ২০০৮ সালের পর প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় ফিরে আসার চেষ্টা করছে। দলটি প্রতিষ্ঠা করেন বিলাওয়ালের মাতামহ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। পরে তার মা ও পাকিস্তানের দুবারের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো এর নেতৃত্ব ছিলেন। ৩৫ বছর বয়সী বিলাওয়ালকে যোগ্য উত্তরসূরি হওয়ার জন্য অনেক কিছু করার আছে। বিলাওয়াল দ্বিতীয় দফায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ২০২২ সালে ইমরানের ক্ষমতাচ্যুতির পর তিনি ১১ দলীয় জোট পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টের (পিডিএম) শাসনামলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। ইন্ডিপেন্ডেন্ট উর্দুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো-জারদারি বলেছেন, ৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর পিএমএল-এন ক্ষমতায় এলে তার পক্ষে তাদের সঙ্গে হাত মেলানো কঠিন হবে। বিলাওয়াল বলেন, নওয়াজ ফের ক্ষমতায় এলে আমি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হবো না, সেই পুরোনো রাজনীতিতে অংশ নিতে পারব না। উনি যদি তা থেকে সরে এসে দেশে গণতন্ত্রের উপকারের পরিবেশ তৈরি করেন, তাহলে আমি তার পাশে দাঁড়াতে পারি। তিনি বলেন, পিপিপি ছাড়া প্রধান দুই রাজনৈতিক দলই ঘৃণা ও বিভাজনের রাজনীতিতে লিপ্ত এবং আমরা তাতে যোগ দিতে আগ্রহী নই। আগামী ৮ তারিখ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পিএমএল-এনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দলটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে চতুর্থবারের মতো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন নওয়াজ শরিফ।

নির্বাচন যে কারণে এতো গুরুত্বপূর্ণ: ভারতের সঙ্গে বৈরিতা, ইরান এবং তালেবান নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত অস্থিরতা, আমেরিকার সাথে অম্ল-মধুর সম্পর্ক এবং চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা পাকিস্তানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক খেলোয়াড় করে তুলেছে। আর তাই পরমাণু শক্তিধর এই দেশে যে-ই ক্ষমতায় আসুক না কেন তা গোটা বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ইরানের সাথে পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় এই নির্বাচন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কারণ দেশটির জনগণ স্থিতিশীলতা চাইছে। সামরিক ও স্বৈরশাসনের এক দীর্ঘ ইতিহাস আছে পাকিস্তানের, আর এই ভোটও অনুষ্ঠিত হচ্ছে সামরিক হস্তক্ষেপের অভিযোগের মধ্যেই। পিটিআই’র প্রার্থীদের অনেকের কারাগারে থাকা, পালিয়ে বেড়ানো অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ানোর মতো বিষয়গুলোর কারণে অনেকে বলছেন ইমরান খানের দলকে নির্বাচনে সমান সুযোগ দেয়া হয়নি। দলটির কাছে থেকে তাদের প্রতীক ক্রিকেট ব্যাটও ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে যেটি লাখ লাখ নিরক্ষর ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সহায়ক ছিল। পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নওয়াজ) (পিএমএল-এন) থেকে তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ বিপরীত ভূমিকায় আবার ফিরে এসেছেন। দুর্নীতির অভিযোগে কারাগারে থাকায় গত নির্বাচনে তিনি নিষিদ্ধ ছিলেন। কিন্তু স্বেচ্ছা নির্বাসন থেকে তিনি আবার ফিরে এসেছেন এবং তার দণ্ড মওকুফ করা হয়েছে। নির্বাচনের আরেকজন প্রার্থী পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলওয়াল ভুট্টো জারদারি। ৩৫ বছর বয়সী বিলওয়াল এই নির্বাচনে সর্বকনিষ্ঠ প্রতিদ্বন্দ্বী। তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজীর ভুট্টো; যাকে ২০০৭ সালে হত্যা করা হয়েছিলো। তার বাবা এবং নানাও সাবেক প্রেসিডেন্ট; তাই সমালোচকরা স্বজনপ্রীতির সুবিধাভোগী বলে প্রায়ই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন।

ইউডি/শহীদ রানা/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading