জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব: উপকূলীয় জীবন-জীবিকা ও কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতির সম্ভাবনা

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব: উপকূলীয় জীবন-জীবিকা ও কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতির সম্ভাবনা

উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১২:০০

জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, বরফ গলছে এবং শরণার্থী বাড়ছে। বাংলাদেশে এই ঝুঁকির পরিমাণ অনেক। এ নিয়ে আব্দুল্লাহ সিফাত’র প্রতিবেদন

ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি প্রভাব কতটা: বাংলাদেশে গত দুই দশক ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সুস্পষ্ট। ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ সব সময়ই দুর্যোগপ্রবণ দেশ, এর পাশাপাশি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন দুর্যোগের তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে তীব্র তাপ দাহ, সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, উপক‚লীয় এলাকায় লবণাক্ততা, নদী ভাঙন কিংবা বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। যার প্রভাব পড়ছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনে। দক্ষিণে সমুদ্র উপক‚লবর্তী অঞ্চলে বসবাসরত মানুষ থেকে ধরে উত্তরে, এমনকি রাজধানী ঢাকাবাসীও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে দেশের উপক‚লের মানুষের ঘরবাড়ি ও জীবিকা বিপন্ন হওয়ার শঙ্কা বাড়ছে। এ কারণে আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় নয় লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইসিসিসিএডি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদন বলছে, এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে কারণ সমুদ্রের পানি বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের উপক‚লীয় এলাকার ১২ থেকে ১৮ শতাংশ ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে এবং আরও বেশি মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ গ্রহণের জরুরি প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ বারবার তাপপ্রবাহ ও ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের মতো চরম জলবায়ু বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে।

এদিকে, অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাওয়া জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাবে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের প্রতি সাতজনে একজন বাস্তুচ্যুত হতে পারে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে অনেক নি¤œাঞ্চল। এজন্য প্যারিসচুক্তি বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। জাতিসংঘের ডেপুটি সেক্রেটারি আমিনা জে. মোহাম্মদ জানান, জলবায়ু এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) পদক্ষেপ একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। দুর্ভাগ্যের বিষয়, জলবায়ুসহ বেশ কিছু এসডিজি সূচক ভুল দিক নির্দেশ করছে। মানুষের ক্ষয়ক্ষতি দ্রুতগতিতে বাড়ছে। এখন পর্যন্ত হিসাব করে দেখা গেছে, ২০৫০ সালে বাংলাদেশের প্রতি সাতজনে একজন ব্যক্তি জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়বে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে অনেক নি¤œভ‚মির অঞ্চলও মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হবে।

আইসিসিসিএডি’র প্রতিবেদনটি বলছে, দেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বন্যা, পানির উৎস হ্রাস, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো প্রত্যক্ষ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসেবে এসব কারণে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। সম্ভবত জনসংখ্যার সাত ভাগের এক ভাগ বাস্তুচ্যুতির সম্মুখীন হতে পারে। বাতাসে কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি পাওয়ায় পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ছে, বাড়ছে বরফ আচ্ছাদিত অঞ্চলের বরফ গলার পরিমাণ। এতে বাড়ছে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা, বাড়ছে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও। পরিণামে বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বেই স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে পরিবেশে, প্রকৃতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ মোটেও দায়ী নয়। বরং তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ।

জান-মালের ক্ষতি বেড়েছে অনেক: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে বৃদ্ধি পেয়েছে বজ্রপাতের মতো দুর্যোগ। আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা। বিশেষ করে গত এক দশক ধরে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে। সার্ক আবহাওয়া গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতে মৃত্যু হয় বাংলাদেশে। এ ছাড়াও আমেরিকান গবেষকদের মতে পৃথিবীতে বজ্রপাতে যে পরিমাণ মানুষ প্রাণ হারান তার এক-চতুর্থাংশ প্রাণহানি ঘটে বাংলাদেশে। বৈশ্বিক জলবায়ু সূচক-২০২১ এর প্রতিবেদনে বলা হয় গত ২০ বছরে বাংলাদেশে ১৮৫টি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বড় দুর্যোগ আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ¡াস, পাহাড়ধসের মতো দুর্যোগ রয়েছে। এতে ১১ হাজার ৪৫০ জন মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। আর অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে ৩৭২ কোটি ডলার। বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের (আইডবিøউএফএম) পরিচালক এবং প্রতিবেদনের প্রধান লেখক অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, একবিংশ শতাব্দীতে দক্ষিণ এশিয়ার চারপাশে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে, বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চলে বন্যা বাড়বে। এটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য ধ্বংস করবে, আরও বেশি লোককে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য করবে।

আইসিসিসিএডি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের অভিযোজন নীতি এবং স্থানীয় উদ্যোগ অনেক জীবন বাঁচিয়েছে এবং এখন পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে খারাপ প্রভাবগুলি এড়াতে পেরেছে। বর্তমানে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বাংলাদেশের আনুমানিক বার্ষিক গড় ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটি ডলার, যা জিডিপির ০ দশমিক ৭ শতাংশ। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সৃষ্টি সামুদ্রিক জলোচ্ছ¡াসের কারণে উপক‚লীয় এলাকা প্লাবিত হওয়ায় মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ফসলি জমি। ২০০৭ সালের প্রলয়ংকরী সিডরের পর দীর্ঘদিন উপক‚লীয় মানুষ লবণাক্ত সমস্যার কারণে তাদের ফসলি জমিতে ফসল বুনতে পারেনি। এক জরিপে দেখা যায় পটুয়াখালীতে লবণাক্ততার পরিমাণ ২ পিপিটি থেকে বেড়ে ৭ পিপিটিতে পৌঁছেছে। এ ছাড়াও প্রয়োজনের সময়ে বৃষ্টি না হওয়া কিংবা অপ্রয়োজনে অতিরিক্ত বৃষ্টিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে বিগত কয়েক বছর ধরে। যার কারণে কৃষির উপর বিরূপ প্রভাব তৈরি হচ্ছে। ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা জার্মান ওয়াচে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি দেশের মধ্যে প্রথম সারিতে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা ম্যাপলক্র্যাফটের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনজনতি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যারা দায়ী তারা এ জন্য ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে না। বাংলাদেশ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মূলত বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে। এতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্রমাগত। অন্যদিকে এন্টার্টিকাসহ হিমালয়ের বরফ গলা জলের প্রবাহে সৃষ্টি হচ্ছে ব্যাপক বন্যাসহ নদ-নদীর দিক পরিবর্তন। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে নদ-নদীর ভাঙন। পাশাপাশি সমুদ্রের পানিতে বাড়ছে লবণাক্ততাও। এতে দেশের সমুদ্র উপক‚লের মানুষ বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাবে লবণাক্ত পানি পানে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। নারীরা সন্তান ধারণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। এ ছাড়া তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে দেশের বরেন্দ্র অঞ্চলে গ্রীষ্ম মৌসুমে মরুকরণের সৃষ্টি হচ্ছে। এ বিষয়ে বিশ্বখ্যাত মরুভ‚মি গবেষকরা বাংলাদেশকে সতর্কও করে আসছেন বারবার। দেশের এ সমস্যাগুলোকে বাংলাদেশ ‘ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্ল্যান’ দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

সাবের হোসেন চৌধুরী

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করছে সরকার: পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন অস্তিত্বের সংকট সৃষ্টি করে। এ সমস্যা আমরা যে হারে তৈরি করছি সে হারে তার সমাধানের পথ বের করতে পারছি না। কার্যকর সমাধান ছাড়া এ সংকট মোকাবেলায় অবদান রাখতে পারব না। তিনি বলেছেন, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবকে খাটো করে দেখার উপায় নেই। আমাদের অস্তিত্ব সংকটের মুখে। এর কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, বরফ গলছে এবং শরণার্থী বাড়ছে। সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, পানি টেকসই উন্নয়নের অন্যতম উপাদান। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে আমাদের অবশ্যই বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এটি ব্যবহার করতে হবে।

তিনি বলেন, তার মন্ত্রণালয়ের নেয়া ১০০ দিনের পরিকল্পনায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় একটি বিস্তৃত কর্মসূচি রয়েছে। সামগ্রিক সমাধান খুঁজে বের করার জন্য সরকার, বিজ্ঞানী, এনজিও এবং বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করে একটি মাল্টি-স্টেকহোল্ডার প্ল্যাটফর্ম গঠন করা এখন সময়ের দাবি। মন্ত্রী বলেন, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করে এমন প্রকল্পগুলো পাইলটিং করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা শুধু ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে নয়, সমাধান খোঁজার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে চাই। আশা করি এ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ফলাফল আমাদের নতুন দিক নির্দেশনা দেবে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের জন্য আমরা যে সংস্থাগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছি তাদের মধ্যে একশনএইড বাংলাদেশ অন্যতম। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নেয়া উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে- অর্থবহ ও কার্যকর সহযোগিতার মাধ্যমে পরিবেশ ও জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ক্লাইমেট ডেভলপমেন্ট পার্টনারশিপ চূড়ান্তকরণের কার্যক্রম গ্রহণ। ইউএনএফসিসিসি’র উদ্যোগে এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক আগামী এপ্রিলে ঢাকায় অনুষ্ঠেয় ন্যাশনাল এডাপ্টেশন প্ল্যান এক্সপো আয়োজনের লক্ষ্যে যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ। মুজিব ক্লাইমেট প্রোসপারিটি প্ল্যান ২০২২-২০৪১ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে কর্মকৌশল প্রণয়ন। জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের আওতায় প্রস্তাবিত প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাইয়ের নিমিত্ত গাইডলাইন প্রণয়। আন্তর্জাতিক লস অ্যান্ড ড্যামেজ থেকে অর্থায়ন প্রাপ্তির লক্ষ্যে উদ্যোগ গ্রহণ।

জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগজনিত ক্ষয়ক্ষতি প্রশমনকে প্রাধান্য দিয়ে সরকার ১০০ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ এবং অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির কারণে বিশ্বে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট দুর্যোগও বাড়ছে। দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা ও দৈনন্দিন আবহাওয়া বার্তা জানতে মোবাইলে ‘১০৯০’ নম্বরে টোল ফ্রি সার্ভিস চালু করা হয়েছে। সরকার কৃষি-আবহাওয়া পূর্বাভাস ও পরামর্শ সেবার মান উন্নয়নে সাতটি নতুন কৃষি- আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার স্থাপনসহ কৃষি- আবহাওয়া বিষয়ক গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার বলেছেন, জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বর্তমান সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

গত ১৪ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপক প্রভাব এবং ঘূর্ণিঝড়, বজ্রপাত, জলোচ্ছ¡াস, অতিবৃষ্টি, খরাসহ অন্যান্য চরম আবহাওয়ায় আগাম সতর্কতা এবং আগাম পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আজ বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে রোল মডেল উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বিজ্ঞান ভিত্তিক আবহাওয়া ও জলবায়ুর উন্নততর পূর্বাভাস প্রদানের মাধ্যমে ‘রূপকল্প-২০৪১’ বাস্তবায়নে ‘বাংলাদেশ আঞ্চলিক আবহাওয়া ও জলবায়ু সেবা প্রকল্প (কম্পোনেন্ট-এ)’ চলমান রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আবহাওয়া পরিষেবার মান বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ যা-ই আসুক না কেন তা মোকাবিলার জন্য তিনি সবাইকে সদা প্রস্তুত থাকার আহŸান জানান।

কৃষিতে পড়ছে বিরূপ প্রভাব: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের কৃষিতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এর ফলে কৃষিকে নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে এতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে কৃষি, চাষাবাদ ও উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে দেশের ধান উৎপাদন ৬ থেকে ৯ শতাংশ কমে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান লবণাক্ত পানি মাছচাষ ব্যাহত করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা দরিদ্র উপক‚লীয় মানুষের জীবিকায় প্রভাব ফেলবে। তাদের জন্য মাছ আমিষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসও। লবণাক্ত পানি ভ‚গর্ভস্থ পানি এবং ভ‚-পৃষ্ঠের পানির উৎসেও ঢুকতে পারে, যা পানীয় জলের সরবরাহ এবং মানব স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করবে। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খরা এবং তাপমাত্রার ক্রমবৃদ্ধির কারণে বহু প্রজাতির ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। আবার আগাছা, পরগাছা, রোগ-বালাই ও পোকা-মাকড়ের আক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের অঞ্চল ভেদে মাটির গুণাগুণ এবং উপাদানেও তারতম্য ঘটছে। ফলে ফসলের প্রত্যাশিত উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ইরি-বোরো উৎপাদনে প্রচুর সেচের পানির প্রয়োজন হচ্ছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জমিগুলোয় লবণাক্ততার কারণে সেচে, চাষে বিপত্তি ঘটছে। আবার লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে চিংড়িচাষেও ধস নেমেছে। ২০১৫ সালে এক হিসাবে দেখা গিয়েছিল, খাদ্য ব্যবস্থা বিশ্বে প্রায় এক তৃতীয়াংশ উষ্ণায়নের জন্য দায়ী। খাদ্য ও কৃষি থেকে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ হয় ১৮শ’ কোটি টন। বিশ্বের খাদ্য উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশই জলবায়ু সংকটে ঝুঁকির মুখে আছে বলে গবেষণায় দেখা গেলেও একইসময়ে খাদ্য ও কৃষি ব্যবস্থাও জলবায়ু পরিবর্তনে গুরুতর প্রভাব ফেলছে।

কৃষি খাত বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি। কৃষি খাত এককভাবে প্রায় ৪১ শতাংশ লোককে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ১% থেকে ২ শতাংশের মধ্যে বার্ষিক জিডিপি ক্ষতির কারণ হবে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনশীলতা দক্ষিণ এশিয়া এবং তার বাইরের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম। এডিবির মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ইতোমধ্যে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাব ফেলছে। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, নদীর পানি বেড়ে যাওয়া, গলিত হিমবাহ এবং অন্যান্য চরম আবহাওয়ার ঘটনা আঞ্চলিক খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে। জলবায়ু পরিবর্তন এই অঞ্চলের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে, যা সহজেই উন্নয়নকে দুর্বল করে দিতে পারে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার দিকে অগ্রগতি ব্যাহত করতে পারে। তাই সবশেষ কপ২৮ জলবায়ু সম্মেলনে ১৩৪ টি দেশের নেতারা প্রথম জলবায়ুর ওপর খাদ্য ও কৃষির প্রভাবকে গুরুত্ব দিয়ে ঘোষণাপত্র সই করেছেন। আমেরিকা, চীন এবং ব্রাজিলসহ অন্য যেসব দেশ বিশ্বে খাবারের ৭০ শতাংশ উৎপাদন করে, তারা প্রত্যেকেই জলবায়ু পরিবর্তন রোধের লড়াইয়ে নিজেদের জাতীয় পরিকল্পনায় খাদ্য ও কৃষি ব্যবস্থাকে বিবেচনায় নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, প্রথম পৃষ্ঠা

কপ-২৮ সম্মেলন কী পেল বাংলাদেশ: জাতিসংঘের সর্ববৃহৎ আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলন (কপ-২৮) শেষ হয়েছে গত বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরে। এ শীর্ষ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে সারা বিশ্বের মানুষ অধীর অপেক্ষায় ছিলো জলবায়ুর অভিঘাত থেকে পরিত্রাণ পেতে কী বার্তা আসে সেখান থেকে। সম্মেলনে ‘জলবায়ু বিপর্যয় তহবিল’ গঠন করে প্রতিনিধিরা। দরিদ্র দেশগুলোর জন্য জলবায়ু বিপর্যয় তহবিল গঠন করাকে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসাবে দেখছেন তারা। কপ-২৮ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ নিজের অবস্থান ঘোষণা করে। বলা হয়েছে, শিল্পোন্নত দেশগুলো যাতে জলবায়ুর ক্ষয়ক্ষতি তহবিলে অন্য কোনো খাত থেকে অর্থ এনে না দেয়। অর্থাৎ জিসিএফ ও অভিযোজন তহবিলে অর্থ বরাদ্দ কমিয়ে নতুন তহবিলে বরাদ্দ না দেয়, এ ব্যাপারে বিশ্ববাসীকে সাবধান করে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী, বিশ্বের তাপমাত্রা এ শতাব্দীর মধ্যে যাতে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি না বাড়ে, সেই লক্ষ্যে শিল্পোন্নত দেশগুলোতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর আহŸান জানানো হয়। এদিকে জিএসটিতে বলা হয়েছে, বিশ্বের তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে, তাতে কার্বন নিঃসরণ না কমালে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বের তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাবে। ফলে এ শতাব্দীর মধ্যে যাতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি না পায়, এ জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ২০৩৫ সালের মধ্যে তিনগুণ বাড়াতে হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের জলবায়ু বিষয়ক দূত ও বর্তমান পরিবেশমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, লস অ্যান্ড ড্যামেজের প্রাথমিকভাবে যে তহবিল এসেছে, তা আমার কাছে সামান্য মনে হয়নি। কেবল তো শুরু হলো তহবিল আসা। আমার ধারণা এটা সামনে আরও অনেক বাড়বে। তবে ক্ষয়ক্ষতির তহবিলের চেয়ে বাংলাদেশের জন্য অভিযোজন তহবিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, অভিযোজন হলো জীবন-মরণের ব্যাপার। আমরা জীবন ও জীবিকা এবং অভিযোজনে কোনো আপস করতে পারি না। সাবের হোসেন আরও বলেন, তহবিল থেকে অর্থ সংগ্রহ করার বিষয়টি আমাদের কাছে মুখ্য। এ ক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতা কতটুকু সেটা ভাবতে হবে। শুধু তাই নয়, এ অর্থ সংগ্রহের পর আমি যাদের উদ্দেশ্যে আনছি, তাদের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেসব বিষয় নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। এমনকি স্বচ্ছতার মাধ্যমে সঠিক উদ্দেশ্যে অগ্রসর হতে হবে। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যারা প্রকৃতপক্ষে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে তাদের কাছে অর্থটা সঠিকভাবে পৌঁছানো। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নি¤œ ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো গত ৩০ বছরে মোট ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের মূলধন এবং জিডিপির সম্মিলিত ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, যা উন্নয়নশীল বিশ্বের মোট ২০২৩ জিডিপির প্রায় অর্ধেক। এখনো যেহেতু এ সময়সীমা বাকি আছে, তাই এটি এবারের আলোচনায় মুখ্য সূচিতে নাও থাকতে পারে। তবে সুশীলসমাজ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো এ তহবিল প্রতিষ্ঠার অগ্রগতি যে আশাব্যঞ্জক নয় এবং এটি জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন, তা নিয়ে জোর চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে অনেকেই মনে করেন।

ইউডি/এজেএস

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading