দেশে ৩০৮টি নদী নাব্য হারিয়েছে: নদীমাতৃক দেশে কেন এই সংকট
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১৫:৩০
নাব্যতার সংকটের ফলে নদীমাতৃক দেশ-বাংলাদেশ তার স্বাভাবিক রূপ হারিয়ে ফেলছে। এ অবস্থায় নৌরুটে সমস্যাসহ জীববৈচিত্র্যও হুমকিতে পড়েছে। এ নিয়ে মো. শহীদ রানা’র প্রতিবেদন
অস্তিত্ব সংকটে নদ-নদী: ব্রিটিশ ও পাকিস্তান শাসনের অবসান ঘটার মাধ্যমে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরও বাংলাদেশের মানুষের যোগাযোগের বৃহৎ মাধ্যম ছিল নৌপথ। ২০০৩-০৪ সালের দিকেও নদী খালগুলোর গভীরতা ছিল ছোট বড় নৌকা, ট্রলার চলাচলের জন্য যথেষ্ট, নদীগুলোও স্বরূপ ধরে রেখেছিল। কিন্তু সড়ক পথের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটতে থাকায় মানুষ সড়ক পথে যাতায়াত শুরু করায় এবং নৌ পথে চলাচল স্বাভাবিক রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় ধীরে ধীরে নৌপথ তার প্রাণ হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। সারা দেশে ৩০৮টি নদী নাব্যতা হারিয়েছে বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। গত মঙ্গলবার সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকারি দলের সদস্য এম. আব্দুল লতিফের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। খালিদ মাহমুদ চৌধুরী জানান, নাব্যতাহীন নদীগুলোর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৮৫, রংপুর বিভাগে ৭১, রাজশাহী বিভাগে ১৮, বরিশাল বিভাগ শূন্য, চট্টগ্রাম বিভাগে ১১, সিলেট বিভাগে ১০, ময়মনসিংহ বিভাগে ২৬ এবং খুলনা বিভাগে ৮৭টি নদী রয়েছে। তিনি বলেন, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের নদ-নদী, সংজ্ঞা ও সংখ্যা’ শীর্ষক বইয়ের তথ্যমতে বাংলাদেশে বর্তমানে মোট নদীর সংখ্যা ১০০৮টি। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসক ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড হতে আরো নদীর সংখ্যা পাওয়া গেছে। বর্তমানে জেলা প্রশাসন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশে ৯৩১টি নদী প্রবহমান রয়েছে। বাংলাদেশের এখনও বহু অঞ্চল থেকে রাজধানী ঢাকায় যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম নৌপথ। এছাড়া বহু অঞ্চলে নৌপথে যাতায়াত করা যায় সারা বছর। কিন্তু সড়ক পথে যাতায়াত বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং সরকার কর্তৃক সড়ক পথের যোগাযোগকে প্রাধান্য দেয়ার বিপরীতে নৌপথ নিয়ে গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করায় দিন দিন নদীগুলো নাব্যতা হারাচ্ছে। এছাড়া দেশব্যাপী ছোট ছোট নদী ও খালগুলোর দুই পাশে অবৈধ দখলদারদের কারণে নদী-খালের আয়তন ও গভীরতা কমছে। ফলে বর্ষাকালেও ঠিকমতো পানি হয় না গ্রামের খালগুলোতে। ফলে নদীমাতৃক ও কৃষিপ্রধান দেশটিতে বর্ষা মৌসুমে পাট ও ধান উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটছে। বর্ষাকালে নদ-নদীগুলোতে পর্যাপ্ত পানি থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে দেশব্যাপী নাব্যতা সংকটের খবর পাওয়া যায় অহরহ। এই নাব্যতা সংকটের মূলেই খনন কার্যক্রম না করা। তথ্য মতে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ৮৮টি নৌপথে নাব্যতা সংকট দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে ৫৭টি নৌ পথে ঝুঁকি নিয়ে দোতলা লঞ্চসহ বিভিন্ন নৌযান চলাচল করছে। বাকি ২৭টি নৌ পথ চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। শুধু দক্ষিণাঞ্চলেই নয়, দেশব্যাপী যত নদী ও খাল আছে, সবগুলোর একই চিত্র। নাব্যতার সংকটের ফলে নদীমাতৃক দেশ তার স্বাভাবিক রূপ হারিয়ে ফেলছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী গত ৪০ বছরে ১৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ হারিয়ে গেছে। দূষণ-দখল ছাড়াও নিয়মিত নদী খনন না করাকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পরিস্থিতি পরিবর্তনে সরকারের উদ্যোগ: নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী মন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার রাজধানীসহ দেশের নৌযোগাযোগ ব্যবস্থায় আধুনিকায়নের লক্ষ্যে নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৫ বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় মোট ৩৫টি এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে পাঁচটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক রাখতে নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি করার জন্য ৪৯১টি নদী খননের জন্য একটি প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে বিআইডব্লিউটিএ ১৭৮টি নদী এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড ৩১৩টি নদী খনন করবে। এরই মধ্যে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃক নৌপথ খননের মাধ্যমে ৩ হাজার ৭৩৩ কিলোমিটার নৌপথ নাব্য করা হয়েছে। এছাড়া বিআইডিব্লউটিএ কর্তৃক চলতি অর্থবছরে (২০২৩-২০২৪) ১৪টি উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ চলমান রয়েছে। আশার কথা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল, হাওরাঞ্চল ও পার্বত্য এলাকাকে প্রাধান্য দিয়ে ১৭৮টি নদ-নদী খনন করে প্রবহমান করার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর মাধ্যমে ২০২৫ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করার ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার কথা রয়েছে। আশার মাঝেও হতাশার ব্যাপার হলো ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশের নদ-নদীতে নাব্যতা বজায় রেখে নৌপথের যোগাযোগ স্বাভাবিক রাখতে নৌপথ নিয়ে সরকারের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নাব্যতা সংকটের নেপথ্যের কারণ: নাব্যতা সংকটের এর প্রধান কারণগুলো জানা যায়- প্রথমত, কিছু প্রাকৃতিক কারণে নদ-নদীর নাব্য হারাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের অপরিণামদর্শী আচরণও নদীকে সঙ্কুচিত করছে দিন দিন। যেমন- সমাজের একশ্রেণির প্রভাবশালী মহল প্রতিনিয়ত নদীর পাড় দখল করছে। নদীর মাটিসহ প্রাকৃতিক সম্পদ যথেচ্ছাচারভাবে ব্যবহার করছে। একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে মাছের ঘের, বাঁশ ও স’মিলের বড় বড় কাঠের ফাইল নদীতে ফেলে নদীর আশপাশ দখল করে রেখেছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তথ্য অনুযায়ী, গত ৪০ বছরে ১৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ হারিয়ে গেছে। দূষণ-দখল ছাড়াও নিয়মিত নদী খনন না করাকে এ জন্য দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই দায়সারা গোছের কাজ না করে সমন্বিত ও পরিকল্পিত উপায়ে খনন তথা বৃহৎ বা গভীর খনন করতে হবে। নদ-নদী রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তর, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বিআইডব্লিউটিএ, ডিসিসিসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থা গত ১০ বছরে প্রায় ৪০ দফা অভিযান চালিয়েছে। উচ্ছেদ করা হয়েছে সাড়ে আট হাজারেরও বেশি অবৈধ স্থাপনা। মামলা, গ্রেপ্তার, জরিমানাসহ নানা রকম শাস্তিও দেয়া হয়েছে দখলদারদের। এরপরও কি দখলদারদের দৌরাত্ম্য কমেছে? ড্রেজিং ও নদীশাসনের মাধ্যমে নদীগুলোর নাব্য রক্ষা করার কার্যকর উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা না গেলে জীববৈচিত্র্যসহ মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর এর স্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব আরো ভয়াবহ হতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন বড় হুমকি: দেশের সমুদ্র উপকূলের চ্যানেলগুলোয় প্রতি বছর নদীবাহিত পলি জমা হচ্ছে শতকোটি ঘনমিটারেরও বেশি। নাব্যতা হারাচ্ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তিন সমুদ্রবন্দরের জাহাজ চলাচলে ব্যবহূত চ্যানেলগুলো। সমস্যা আরো বাড়িয়ে তুলেছে জলবায়ু পরিবর্তন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় বেড়েছে বন্দরসংলগ্ন এলাকাসহ গোটা উপকূলীয় অঞ্চলের ভূমিক্ষয়। পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর হিসেবে মোংলা, পায়রা ও চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যকারিতা হুমকির মুখে পড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমনকি ২০৩০ সালের মধ্যে কোনো কোনোটি সমুদ্রবন্দর হিসেবে উপযোগিতা হারিয়ে ফেলতে পারে বলেও মনে করছেন কেউ কেউ। দেশের আমদানি-রফতানি কার্যক্রম এখন মূলত চট্টগ্রাম বন্দরে কেন্দ্রীভূত। বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, ২০১০-১১ অর্থবছরেও এখান দিয়ে আমদানি-রফতানি পণ্য হ্যান্ডলিং হয়েছিল সাড়ে চার কোটি টনের কিছু কম। এক দশকে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ২০২০-২১ অর্থবছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ কোটি ৩৭ লাখ টনের বেশিতে। গত অর্থবছরে (২০২১-২২) তা আরো বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ কোটি ৮২ লাখ টনে। সামনের দিনগুলোয় তা আরো বাড়বে বলে বিভিন্ন পূর্বাভাস-প্রাক্কলনে উঠে এসেছে। যদিও ঠিক এমন মুহূর্তেই বন্দরসহ গোটা চট্টগ্রাম অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত হুমকির বিষয়টিকে বারবার পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। বন্দরটি গড়ে উঠেছে কর্ণফুলী নদীর মোহনায়। বর্তমানে নদীটির প্রশস্ততা ও গভীরতা দুটোই কমেছে। নিয়মিত ড্রেজিং না করালে এখানে জেটিমুখে পলি জমে বন্দরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। অতীতে এমন ঘটনা ঘটতেও দেখা গেছে। সামনের দিনগুলোয় সমস্যাটি আরো প্রকট হয়ে দেখা দেবে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
অধিকাংশ নৌপথ নাব্য হারিয়ে ফেলেছে: পলি পড়ে দেশের অধিকাংশ নৌপথ নাব্য হারিয়ে ফেলেছে। এ কারণে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন ৪১টি নৌপথের মধ্যে এখন ১৫টিই পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে। নদীর গভীরতা বা নাব্য ধরে রাখতে কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয় খননে। কিন্তু অভিযোগ আছে, এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। পলি অপসারণে অনিয়মের কারণে মরে যাচ্ছে নদীপথ, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে নৌ-চলাচল। অনেক নৌপথ এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। নদী নিয়ে যারা গবেষণা করেন তারা শুধু নন, নৌযান মালিকসহ নৌ খাত নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর নেতা ও বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন এসব কথা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের দেশের ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থা ও অধিক জনসংখ্যার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে ভূমির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সে ক্ষেত্রে প্রকৃতিপ্রদত্ত নদনদীগুলোর সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে নৌপরিবহন ব্যবস্থাকে আরো সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন; যাতে সাধারণ মানুষ নৌপথের ওপর অধিক নির্ভরশীল হয় এবং সড়কের ওপর নির্ভরশীলতা কমে আসে। এর ফলে ভূমির অপচয় কম হবে। তারা বলছেন, এ ভূখণ্ডের মানুষের সভ্যতা গড়ে উঠেছে নদী ও নৌপরিবহন ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে। বৃহত্তর খুলনা ও বরিশালসহ দেশের উপকূলীয় জনপদের মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌ যোগাযোগব্যবস্থা। কিন্তু নদীগুলো মরে যাওয়ায় নৌপথ বিলুপ্ত হচ্ছে, আমাদের প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলের নৌপথের সংখ্যা ৪১। তবে ঢাকা নদীবন্দরের সদরঘাট টার্মিনাল থেকে যাত্রীবাহী নৌযান (লঞ্চ) চলাচল করে ২৬টি নৌপথে। যাত্রীস্বল্পতার কারণে বাকি নৌপথগুলোতে লঞ্চ চলাচল করে না। তবে লঞ্চমালিক নেতারা বলছেন, প্রয়োজনীয় ড্রেজিংয়ের অভাবে তীব্র নাব্যসংকটের কারণে ১৫টি নৌপথ কার্যত পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। ২৬টি নৌপথ সচল থাকলেও নিয়মিত লঞ্চ চলে মাত্র ২০টিতে। বাকি ৬ নৌপথে অনিয়মিতভাবে লঞ্চ চলাচল করে। অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, নদী খনন ও নৌপথ ড্রেজিংয়ে কোনো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নেই। এ কারণে জনগুরুত্বপূর্ণ এ কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতি হচ্ছে। নৌপথগুলো পরিত্যক্ত হওয়ার পেছনে যাত্রী স্বল্পতার কথা বলা হলেও লঞ্চমালিক নেতারা বলছেন, নৌপথে তীব্র নাব্যসংকট সৃষ্টি হওয়ায় তারা লঞ্চ চলতে পারছেন না। তাদেরও অভিন্ন অভিযোগ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাবে নৌপথগুলো সঠিকভাবে খনন হচ্ছে না।

লঞ্চমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থা বলছে, আমরা নৌ খাতের বড় স্টেকহোল্ডার। কিন্তু নদী ড্রেজিংয়ে আমাদের যুক্ত করা হয় না। কোন রুটের কোথায় নাব্যসংকট বেশি ও কম, সে বিষয়ে আমাদের মতামত নেওয়া হয় না। বিশ্লেষকরা বলছেন, কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচ হলেও আশানুরূপ সাফল্য চোখে পড়ছে না। এর পেছনে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির ঘাটতি, অস্বচ্ছতা, অনিয়ম ও দুর্নীতি দায়ী।
হুমকিতে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য: ভোলা, খড়মা ও আড়ুয়ারবেড় নদীর নাব্য সংকটে হুমকির মুখে পড়েছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য। শুধু বনের জীববৈচিত্র্যই নয় বরং পলি পড়ে নদী ভরাটের বিরূপ প্রভাব পড়ছে কৃষিতেও। কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া, সেচের পানির অপর্যাপ্ততা, জেলেদের জীবিকা হারানোসহ নানা সংকট তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত নদী খনন করে নাব্য সংকট সমাধানের দাবি স্থানীয়দের। বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার লোকালয় ও পূর্ব সুন্দরবনের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে একসময়ের খরস্রোতা ভোলা নদী। এই নদীতে জেলেরা ইলিশ আহরণ করতেন। বন বিভাগের লঞ্চ, স্টিমার ও নৌকা চলাচল করে মোংলা বন্দরে যেত, কিন্তু বছরের পর বছর পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় এই নদী যেন খালে পরিণত হয়েছে। ফলে এসব অঞ্চলের কৃষিজমিতে তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা, বাড়ছে লবণাক্ততা, ফসল চাষের জন্য কৃষক পাচ্ছেন না পর্যাপ্ত সেচের পানি, জেলেরা হয়ে পড়ছেন কর্মহীন। এতে করে নদীর ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকা নির্বাহ করা দিনের পর দিন আরো কঠিন হয়ে উঠছে।

নদী দখলদারদের রুখবে কে?
রাষ্ট্রীয়ভাবে নদ-নদী রক্ষার জন্য ‘জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন আইন ২০১৩’ পাশ করা হয়। এ আইন অনুযায়ী ২০১৪ সালে ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন’ গঠিত হয়। এ আইনের ১২নং ধারায় কমিশনের দায়িত্ব ও কার্যাবলী বিবৃত হয়েছে। নদীর সাথে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের কার্যাবলীর মধ্যে সমন্বয় সাধনের লক্ষ্যেঃ অবৈধ দখলমুক্ত এবং পূণর্দখল রোধ করার বিষয়ে; নদী ও নদীর তীরে স্থাপিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ সংক্রান্ত; নদীর পানি দূষণমুক্ত রাখা; বিলুপ্ত বা মৃতপ্রায় নদীখনন; পরিবেশগত ভারসাম্য ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ; খাল জলাশয় ও সমুদ্র উপকূল দখল ও দূষণমুক্ত রাখার বিষয়ে সরকারকে সুপারিশ করা। ২০১৩ সালে দ্রুত আইনটি তৈরির কারণে কমিশনকে নদীর ‘আইনি অভিভাবক’ ঘোষণা করা হলেও কেবলমাত্র সরকারের পরামর্শ ও সুপারিশ করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। নদী রক্ষায় প্রয়োগিক ক্ষমতা প্রদান করা হয়নি। হাইকোর্টের নির্দেশ বাস্তবায়ন ও নদী রক্ষার লক্ষ্যে ২০১৩ সালে সংশোধনী জারি করার কথা থাকলেও আইন কমিশন ঠুনকো যুক্তি দেখিয়ে প্রয়োগিক ক্ষমতাটি নাকজ করে দেন। ফলে শক্তিশালী হয়ে উঠে দখলদারিত্ব। চরাঞ্চলে জেগে উঠা জমি দখল করে নেয় প্রভাবশালীরা। নদীখননের নামে কেটে নেয়া হয় কৃষকের আবদি জমি, নদীর বালু ফেলে ধ্বংস করা হয় জমি। রংপুর অঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে নাব্যহীনতা ও পানিশুন্যতা ব্যাপকভাবে দুর্বিসহ অবস্থার সৃষ্টি করে চলছে। ভূমি, পানিসম্পদ ও নৌ পরিবহন এ তিন মন্ত্রনালয়ের ১৬টি সংস্থা ও দুটি ট্রাষ্টি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নদী ব্যবস্থাপনার প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে ও দায়িত্বহীনতার কারণে জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন তার অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারছে না যা কমিশনের বার্ষিক রিপোর্ট প্রকাশ পেয়েছে। প্রকল্পের সমীক্ষায় নদী দখলকারী প্রায় ৩৮ হাজার ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করেছে জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন। দখলদারদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে ওই প্রকল্পের চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি বাতিল করা হয়। ফলে দখলদারদের দৌরাত্ম আরো বাড়তে থাকে। ২০১৯ সালে জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদনে সারাদেশে দখলদারের সংখ্যা পাওয়া যায় ৫৭ হাজার ৩৯০ জন। একই বছর দখলদারের সংখ্যা হয় আরো ৫ হাজার বেড়ে মোট দখলদারের সংখ্যা দাড়ায় ৬৩ হাজার ২৪৯। নদ-নদীর তীরে অবৈধভাবে শিল্প-কারখানা, ইটের ভাটা, বিভিন্ন হাউজিং কোম্পানী বা অবৈধ স্থাপনা নির্মান করে, নদী বা খালের জায়গা ভরাট বা দখল করে অবিরাম দখলীপানা চলছে। নদীতে অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা, কালভার্ট, ব্রীজ, পোল্ডার, স্লুইস গেইট ও বাঁধ নির্মানের ফলে অনেক ক্ষেত্রেই খালবিল ও নদ-নদীর গতিপথ বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে। নদী রক্ষা ও নদীর জীবন্ত সত্ত্বা ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে ‘জাতীয় নদীরক্ষা আইন ২০১৩’ সংশোধন করে নদী ব্যবস্থাপনার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহে প্রকৃত দেশপ্রেমিকদের নিয়ে সক্ষমতা অর্জন ও সমন্বয়ের মাধ্যমে জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপ দেয়া প্রয়োজন।
ইউডি/কেএস

