একদিনে ১৮ জনের মৃত্যু: সড়কে প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা, এত প্রাণহানির দায় নেবে কে?

একদিনে ১৮ জনের মৃত্যু: সড়কে প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা, এত প্রাণহানির দায় নেবে কে?

উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১২:৪৫

সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। শুক্রবার একদিনেই ১৮ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে সাদিত কবির’র প্রতিবেদন

আর কত প্রাণ সড়কে ঝরবে: সড়কে প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা। কোনো ভাবেই যেন প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। অসাবধানতা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগেই এসব দুর্ঘটনা ঘটছে বলে বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে। শুক্রবার (১৬ ফেব্রæয়ারি) দেশে পৃথক পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ময়মনসিংহে বাস ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে নারী-শিশুসহ সাতজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা সবাই অটোরিকশার যাত্রী ছিলেন। এদিন বেলা ১১টার দিকে সদর উপজেলার শেরপুর ময়মনসিংহ মহাসড়কের আলালপুর এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে গণমাধ্যমকে জানান ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আনোয়ার হোসেন। নিহতের মধ্যে একই পরিবারের তিনজন রয়েছে। তারা হলেন, ফুলপুর উপজেলার রামভদ্রপুরের আশাবট গ্রামের বাবলু আহমেদ (৪৫) তার স্ত্রী শিলা আক্তার (৩৫), তাদের ছেলে মো. সাদমান (৭)। তারা আত্মীয়ের জানাজায় যাচ্ছিলেন বলে জানা গেছে। নিহত অন্যদের মধ্যে অটোরিকশাটির চালক আলামিন হোসেনের (২৫) বাড়ি ফুলপুর উপজেলার দিও গ্রামে। এদিকে, সিলেটের গোয়াইনঘাটে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ট্রাক্টরের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুজন নিহত হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে গোয়াইনঘাটের সারী-গোয়াইনঘাট সড়কের গোয়াইন ব্রিজসংলগ্ন পূর্ণানগর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তিরা হলেন গোয়াইনঘাট উপজেলার কর্নি গ্রামের ইসমাইল আলীর ছেলে নজরুল ইসলাম (৫০) ও লেঙ্গুড়া গ্রামের আরফান মিয়ার ছেলে জসির উদ্দিন (৬৫)। দুর্ঘটনায় অটোরিকশা, ট্রাক্টরের চালকসহ সাতজন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, ফরিদপুরের নগরকান্দায় একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে রবিউল ইসলাম (২৫) নামের এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে নগরকান্দা উপজেলার ডাঙ্গী ইউনিয়নের মাশাউজান নামের স্থানে ফরিদপুর-বরিশাল মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এদিকে, রাজধানীর বাড্ডার আফতাবনগরে ফুটপাতে ট্রাকের ধাক্কায় মোহাম্মদ শাহজাহান (৫০) এক নির্মাণ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এছাড়া, জামালপুর সদরের শাহবাজপুরে মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে দুই বন্ধুর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে শাহবাজপুর ইউনিয়নের শাহবাজপুর কাচারিপাড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত দু’জন হলো – শাহবাজপুর কাচারিপাড়া এলাকার সোহেল রানার ছেলে মো. কাঁকন মিয়া এবং পিঙ্গল হাটি গ্রামের মো. সুমন মিয়ার ছেলে সিনহাত। নিহত কাকন ও সিনহাত দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। এদিন, মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার মহাসহস্র এলাকায় দু’টি সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে চালকসহ ২ জন নিহত হয়েছেন। এসময় গুরুতর আহত হয়েছেন আরও ৩ জন। শুক্রবার বিকেলে রাজনগরের মহাসহস্র নামক স্থানে ঘটনাটি ঘটে। নিহতরা হলেন- সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক রাজু মিয়া (২১) ও যাত্রী নাঈম মিয়া (২৯)। তাদের বাড়ি রাজনগর উপজেলায়। শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে উপজেলার নাটোর-বগুড়া মহাসড়কের বীরগ্রাম নামক স্থানে এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- নাটোর সদর উপজেলার আল আমিন (৩৯), কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কুদ্দুস মিয়া (৩৭) ও উলিপুর উপজেলার নূর ইসলাম (২২)। এদের মধ্যে আল আমিন ও কুদ্দুস দুই ট্রাকের চালক। আর নুর ইসলাম সহকারী।

প্রায় ৮ হাজার জনের মৃত্যু এক বছরে: বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল জানায় গত বছর (২০২৩ সাল) দেশে ৬ হাজার ২৬১টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এসকল দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯০২ জনের মৃত্যু হয়েছে, এসময় আহত হয়েছেন ১০ হাজার ৩৭২ জন। দুর্ঘটনার কারণ ও প্রতিরোধে ১১টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে, বিআরটিএ বলছে, ২০২৩ সালে পাঁচ হাজার ৪৯৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ হাজার ২৪ জন নিহত হয়েছে । বিআরটিএ চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার এ তথ্য জানান। যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, ২০২৩ সালে সড়ক, রেল ও নৌপথ মিলিয়ে মোট ৬ হাজার ৯২৯ দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৮ হাজার ৫০৫ জন, আহত হয়েছেন ১০ হাজার ৯৯৯ জন।এর মধ্যে ২ হাজার ৩১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ১৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা সড়কে মোট মৃত্যুর ২৭ দশমিক ২৩ শতাংশ। গত বছর রেলপথে ৫২০টি দুর্ঘটনায় ৫১২ জন নিহত হয়েছেন জানিয়ে সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, নৌপথে ১৪৮ দুর্ঘটনায় ৯১ জন নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন ১০৯ জন। এছাড়া গত বছর যত মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে, তা মোট দুর্ঘটনার ৩২ দশমিক ৪৩ শতাংশ। তিনি আরও বলেন, গত ৯ বছরে নিবন্ধিত যানবাহনের পাশাপাশি ছোট যানবাহন বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকের সংখ্যা চার থেকে পাঁচগুণ বেড়েছে। ইজিবাইক, মোটরসাইকেল ও থ্রি-হুইলার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে অবাধে চলাচলের কারণে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বাড়ছে। সড়ক দুর্ঘটনার শিকার পরিবহনগুলো হলো, ১৬ দশমিক ১৫ শতাংশ বাস, ২৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ ট্রাক-পিকাপ-কভার্ডভ্যান ও লরি, ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ কার-জিপ-মাইক্রোবাস, ৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ অটোরিকশা, ২৬ দশমিক ২ শতাংশ মোটরসাইকেল, ১৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক, ৭ দশমিক ১৯ শতাংশ নছিমন-করিমন-মাহিন্দ্রা-ট্রাক্টর ও লেগুনা সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। দুর্ঘটনার ধরণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত বছর মোট দুর্ঘটনার ৩৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ২৮ দশমিক ৪১ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ ফিডার রোডে সংঘটিত হয়েছে। এছাড়া মোট দুর্ঘটনার ৬ দশমিক ৩২ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে, ১ দশমিক ১১ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে, শূন্য দশমিক ৬৮ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে সংঘটিত হয়েছে। ঢাকা বিভাগে ১ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৭১২ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১ হাজার ২৩৩ সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ২০৫ জন, খুলনা বিভাগে ৭৬৫ সড়ক দুর্ঘটনায় ৭৬৪ জন, বরিশাল বিভাগে ৩৮১ সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৭৯ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৪১৮ সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৬৪ জন, সিলেট বিভাগে ৩৭১ সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০৩ জন, রংপুর বিভাগে ৫৬৯ সড়ক দুর্ঘটনায় ৬২৬ জন ও রাজশাহী বিভাগে ৭৮৮ সড়ক দুর্ঘটনায় ৭৯৩ জনের প্রাণ গেছে।

নুর মোহাম্মদ মজুমদার

প্রতিরোধে সরকারের যত পদক্ষেপ: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা দুই বছর ধরেই সড়কে আইন মেনে চলার বিষয়টির দিকে বেশি জোর দিয়েছি। কিছু সুফলও পাচ্ছি। আইনটা তো সবার মানতে হবে। এক পক্ষকে মানলে চলবে না। সেটা নিয়ে সচেতনতার অভাব আছে। সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা চালু করেছে সরকার। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে স্বয়ংক্রিয় মোটরযান ফিটনেস সেন্টার চালু করা হয়েছে। ই-ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রবর্তনের মাধ্যমে বিআরটিএ’র প্রায় সকল সেবা ডিজিটালাইজড করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে ৬ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ‘বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রজেক্ট’ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সরকার ২০১৮ সালে সড়ক পরিবহন আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তার বিধান যুক্ত করে। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য বিধিমালার প্রজ্ঞাপন জারি হয় গত বছরের ৩ জানুয়ারি। এ পর্যন্ত এক বছরের বেশি সময়ে ১৯৪ জনকে মোট ৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। মূলত গত ১৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমবার একসঙ্গে ১৬২ জনকে প্রায় সাত কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে এই কার্যক্রম শুরু করেন। এরপর গত প্রায় তিন মাসে আরও ৩২ জনকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সালের ৫ জুন মন্ত্রিসভার বৈঠকে ২২ অক্টোবরকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া ও অনুমোদন করা হয়।

প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ: সড়কে দুর্ঘটনা কমাতে প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ। পাশাপাশি মেট্রোরেল ও নতুন উড়ালসড়কগুলো স্বল্প খরচে সাধারণ মানুষের ব্যবহার উপযোগী করার কথাও ভাবতে হবে সরকারকে, বলছেন বিশেষজ্ঞগণ। তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, সড়ক নিরাপত্তা জোট শ্রোতার সভাপতি, অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমাতে সড়কে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। সড়ক দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ডাটাব্যাংক তৈরির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা তহবিলের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকতে হবে। ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকার মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত কিন্তু একক দায়িত্বপ্রাপ্ত নন। তাই সরকারি-বেসরকারি সবাইকে সাথে নিয়ে কাজ করা গেলে এর কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যেত।তিনি বলেন, আমাদের সড়কের অবকাঠামোগত বিস্তার ঘটছে, গাড়ি বাড়ছে, কিন্তু সড়ক নিরাপত্তা ইস্যুটি বরাবরই উপেক্ষিত থাকছে। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশের ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান সিদ্দিকী বলেন, আমরা দেখছি, সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে থেকে বারবার ব্যবসায়ী মনোভাব দেখা যায়। জনগণ ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি লুটের মাধ্যমে একধরনের বৈষম্য তৈরি করা হয়। ফলে মানুষের সব সুবিধা নেওয়া সম্ভব হয় না। যা আমরা দেখতে পারছি মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেস ব্যবহারে। গণপরিবহনবিশেষজ্ঞ সৈয়দ জাহাঙ্গীর বলেন, সবাই মিলে সমাধান চেষ্টা করলে এবং আমাদের সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে আমি মনে করি, ৮০ থেকে ৭০ শতাংশ দুর্ঘটনা কমে যাবে।

তিনজনের বেশি শিশুর প্রাণ যাচ্ছে প্রতিদিন!: সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, গত বছর তথা ২০২৩ সালে দেশে ১ হাজার ১২৮ শিশু প্রাণ হারিয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায়; অর্থাৎ প্রতিদিন তিনজনের বেশি শিশুর প্রাণ যাচ্ছে সড়কে। বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স, অটোরিকশা কিংবা স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন নছিমন বা ভটভটির ধাক্কায় বা চাপায় এসব শিশু নিহত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৪০ শতাংশের বেশি শিশু মারা গেছে যাত্রী বা পণ্যবাহী বাস, ট্রাক ও প্রাইভেট কারের ধাক্কায়। এরপর আঞ্চলিক বা গ্রামীণ সড়কের যানবাহন, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের ধাক্কায় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। প্রায় ১৬ শতাংশ শিশুর প্রাণ গেছে বেপরোয়া মোটরসাইকেলের ধাক্কায়। স্থানীয়ভাবে তৈরি নছিমন, ভটভটি বা মাহিন্দ্র কেড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ শিশুর প্রাণ। দুর্ঘটনায় শিশু নিহত হওয়া সড়কের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ৩৭ শতাংশ শিশুর মৃত্যু হয়েছে আঞ্চলিক সড়কে। এরপরই আছে মহাসড়ক, গ্রামীণ সড়ক ও শহরের সড়ক। রোড সেফটির বিশ্লেষণে দেখা যায়, গ্রামীণ সড়কে আগের বছরের (২০২২) চেয়ে গত বছরে শিশুমৃত্যু কমেছে। কিন্তু বেড়েছে আঞ্চলিক সড়কে। যেসব দুর্ঘটনার কবলে পড়ে শিশুদের মৃত্যু হয়, এর এক-তৃতীয়াংশের বেশি ঘটে দুপুরের দিকে। তবে সকাল ও বিকেলের দিকেও অনেক দুর্ঘটনা ঘটে।

বিআরটিএ’র নতুন উদ্যোগ: সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ ও আইন প্রণয়ন করলেও এর প্রভাব সামান্যই। উদ্ভ‚ত পরিস্থিতিতে সড়কে এই অরাজকতা রুখতে বিশেষ এক সফটওয়্যার চালু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)। এই পদ্ধতির মাধ্যমে যেকোনো ধরনের অপরাধে শাস্তির আওতায় আসবেন চালক। সেই সঙ্গে নির্দিষ্ট সংখ্যক অপরাধ সংঘটিত হলে বাতিল হতে পারে লাইসেন্সও। কারো লাইসেন্স একবার বাতিল হলে, তিনি আর কখনো লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবেন না। ফলে, লাইসেন্স বাতিলের ভয়ের সড়কে সড়কের শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং দুর্ঘটনা কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)-এর তথ্য মতে, প্রতি ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিপরীতে ১২ পয়েন্ট বরাদ্দ থাকবে। সড়ক পরিবহন আইন-বিধির অধীনে অপরাধের ধরন ভেদে কাটা পড়বে দোষসূচক পয়েন্ট। ৮ পয়েন্ট কাটা গেলে পয়েন্ট ফেরতের জন্য অপেক্ষা করতে হবে ২ বছর। অপরাধের সংখ্যা বেড়ে ১২ পয়েন্ট কাটা পড়লেই স্থগিত বা বাতিল হয়ে যাবে ড্রাইভিং লাইসেন্সও। কোনো চালকের লাইসেন্স বাতিল হলে ওই চালক আর কখনো আবেদন করতে পারবেন না। কোনো চালক ৬ মাসের মধ্যে যদি কোনো নিয়ম লঙ্ঘন না করেন, তাহলে চালকের আপিলের পর ২ পয়েন্ট ফেরত পেতে পারেন। পরে আবার পরবর্তী ৬ মাস কোনো নিয়ম লঙ্ঘন না করলে আরও ২ পয়েন্ট ফেরত পাবেন চালক। বিভিন্ন অপরাধে পয়েন্ট কাটা গেলেও সড়ক পরিবহন আইন-বিধির অধীনে নিয়মের ব্যত্যয় না করলে সুযোগ থাকবে পয়েন্ট ফেরত পাওয়ার। বিআরটিএ’র তথ্যমতে, সফটওয়্যারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়ন করা হবে এই পদ্ধতি। এই প্রক্রিয়া শুরুর জন্য বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। যত দ্রæত সম্ভব, এই পদ্ধতি চালুর জন্য কাজ চলছে বলেও জানা গেছে। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি’র (বিআরটিএ) রোড সেফটি শাখার পরিচালক শেখ মোহাম্মদ-ই-রব্বানী গণমাধ্যমকে জানান, সিস্টেমের কাজ চলছে। কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত চালু করা সম্ভব নয়। বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের পয়েন্ট কাটা বিষয়ে বলেন, যে-সব অপরাধে পয়েন্ট কাটা পড়বে, সেগুলো হচ্ছে- ইচ্ছাকৃতভাবে পথ আটকে বা অন্য কোনোভাবে অন্য মোটরযানের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করলে কাটা যাবে ২ পয়েন্ট। নির্ধারিত শব্দমাত্রার অতিরিক্ত উচ্চমাত্রার কোনোরূপ শব্দ সৃষ্টি বা হর্ন বাজানো বা কোনো যন্ত্র, যন্ত্রাংশ বা হর্ন মোটরযানে স্থাপন করলে কাটা যাবে ১ পয়েন্ট। অতিরিক্ত ওজন বহন করে মোটরযান চালানোয় কাটা যাবে ২ পয়েন্ট। পরিবেশ দূষণকারী ও ঝুঁকিপূর্ণ মোটরযান চালানোয় কাটা যাবে ১ পয়েন্ট। ট্রাফিক সাইন ও সংকেতের বিধান লঙ্ঘন করলে কাটা যাবে ১ পয়েন্ট। মোটরযানের গতিসীমা নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে কাটা যাবে ১ পয়েন্ট। মোটরযানের বাণিজ্যিক ব্যবহার সংক্রান্ত ধারা ৩১-এর বিধান লঙ্ঘন করলে কাটা যাবে ১ পয়েন্ট।

এত দুর্ঘটনার পেছনে মূল কারণ কী: বিশ্লেষকগণ বলছেন, বেপরোয়া গতি, বিপদজনক ওভারটেকিং, রাস্তাঘাটের নির্মাণ ত্রæটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধে চলাচল, যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, চালকের অদক্ষতা, যানবাহন চালক ও মালিকের বেপরোয়া মনোভাব, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেড ফোন ব্যবহার, মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো, রেলক্রসিং ও মহাসড়কে হঠাৎ ফিডার রোড থেকে যানবাহন উঠে আসা, রাস্তায় ফুটপাত না থাকা বা ফুটপাত বেদখলে থাকা, ট্রাফিক আইনের দুর্বল প্রয়োগ, ট্রাফিক আইন অমান্য করা, ছোট যানবাহনের ব্যাপক বৃদ্ধি, সড়কে চাঁদাবাজি, রাস্তার উপর হাট-বাজার, ত্রæটিপূর্ণ যানবাহন চালানো, চালকের নিয়োগ ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪। প্রথম পৃষ্ঠা

দুর্ঘটনার প্রতিরোধে একাধিক সুপারিশ: বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি দুর্ঘটনার প্রতিরোধে একাধিক সুপারিশ রেখেছেন। প্রথমত, সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার প্রকল্পে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি অর্ন্তভুক্ত করা। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দ্রæত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা। সড়ক নিরাপত্তায় বাজেট বাড়ানো, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে সড়ক নিরাপত্তা ইউনিট শক্তিশালী করা। দেশের সড়ক-মহাসড়কে রোড সাইন, ট্রাফিক চিহ্ন স্থাপন করা। জেব্রা ক্রসিং ও আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা। চালকদের পেশাদার ট্রেনিং ও নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা। অনিয়ম-দুর্নীতি ও চাদাঁবাজি বন্ধ করা; গাড়ির নিবন্ধন, ফিটনেস ও চালকদের লাইসেন্স প্রদানের পদ্ধতি আধুনিকায়ন করা। সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক সহায়তা তহবিলে আবেদনের সময়সীমা ৬ মাস নির্ধারণ করা। দেশব্যাপী পর্যাপ্ত মানসম্মত নতুন বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেয়া। ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণের জন্য ট্রাফিক ট্রেনিং একাডেমি গড়ে তোলা ।মহাসড়কের রোড ডিভাইডার পর্যাপ্ত উঁচু করা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুসরণ করে পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই সড়ক দুর্ঘটনা কমে এসেছে। ২০১০ সালের তুলনায় মৃত্যুর হার কমেছে অন্তত ১০৮টি দেশে। প্রতিবেশি দেশ শ্রীলঙ্কা, বেলারুশ, ব্রæনাই দারুসসালাম, ডেনমার্ক, জাপান, লিথুয়ানিয়া, নরওয়ে, রাশিয়া, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভেনিজুয়েলার মত ১০টি দেশে মৃত্যুর হার অর্ধেকের বেশি কমিয়ে এনেছে। ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সরকারকে সড়ক নিরাপত্তায় বড় ধরনের অর্থ সহায়তা দিচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনার ডাটাবেজ সিস্টেম আধুনিকায়নের প্রকল্পও এতে সংযুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি মনে করে, বিআরটিএ প্রাথমিক উৎস থেকে সড়ক দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ডাটা সংগ্রহ করলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টের সমপরিমাণ হতাহত ও দুর্ঘটনার তথ্য উঠে আসবে। কিন্তু বিআরটিএ সেকেন্ডারি সোর্স ব্যবহারের কারণে সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র তুলে আনতে পারছে না। ফলে দেশের মানুষের জীবন বাঁচাতে সরকার সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারছে না। এসডিজির লক্ষ্য অর্জনে সরকারি উদ্যোগে বিআরটিএ মাধ্যমে প্রাথমিক উৎস থেকে সড়ক দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ডাটা ব্যাংক চালুর দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে ছোট যানবাহন বন্ধ করে নিরাপদ সাশ্রয়ী ও স্মার্ট গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা জানান তারা।

ইউডি/এজেএস

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading