গুজব প্রতিরোধ ও সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রণে কঠোর হচ্ছে সরকার
উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ০১ এপ্রিল, ২০২৪, আপডেট ১৩:৩০
গুজব প্রতিরোধ ও সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রণে কঠোর হচ্ছে সরকার। এ ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে দেওয়া হচ্ছে নয়া বার্তা। এ নিয়ে আরেফিন বাঁধন’র প্রতিবেদন
ভার্চুয়াল দুনিয়ায় খেই হারানো: ডিজিটাল বাংলাদেশের যুগে সবার হাতে হাতে মোবাইল। ঘরে ঘরে ইন্টারনেট। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে সহজেই দুনিয়ার সাথে যোগাযোগ রাখছে মানুষ। চারপাশে, কী ঘটছে, কী শুনছে সেগুলো ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবসহ অন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে পেয়ে যাচ্ছে সবাই। বাংলাদেশে যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে তাদের মধ্যে ৮৪ শতাংশ মানুষের রয়েছে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট। দেশে বর্তমানে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছয় কোটি ছাড়িয়েছে। আর ইউটিউবের দর্শকের সংখ্যা ৩ কোটিরও বেশি। এই সুযোগ কেউ ভালো কাজে ব্যবহার করে অর্থ উপার্জন করছেন। আবার কেউ কেউ এর ফায়দাও লুটছে। বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠেছে ‘হ্যাকার চক্র’।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতিনির্ভরশীলতায় লাইক কমেন্ট শেয়ারে বন্দি হয়ে গেছে মানুষের জীবন। যাপিত জীবনের সিংহভাগ সময় জুড়েই থাকছে সবুজ আর নীল আলোর হাতছানি। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, টুইটার, ইমো আর টিকটকের মতো অ্যাপে সীমাহীন আসক্তির পরিধিতে অবধারিতভাবেই ঢুকে যাচ্ছে যেন আট থেকে আশি বয়সের সবাই। ভার্চুয়াল দুনিয়ার দুর্নিবার আকর্ষণে খেই হারাচ্ছে গোটা দুনিয়া। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে বিশেষ করে ফেসবুক-ইউটিউবে বিভিন্ন সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, ধর্মীয় ইস্যু, রাজনীতি, অর্থনীতি, সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, আমলা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বাহিনীর সদস্য, মৃত্যুসহ বিভিন্ন বিষয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব গুজবের কোনোটি দেশের ভেতর থেকে, আবার কোনোটি দেশের বাইরে থেকে ছড়ানো হয়। মূলত দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে এমন গুজব। এই ধরণের গুজব প্রতিরোধে সরকার নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা সত্বেও কেনো ভাবেই যেন তা থামছে না। তাই এবার সরকার আরও কঠোর হচ্ছে। ফেসবুক ইউটিউব যদি সরকারের অভিযোগ আমলে না নেয় তবে দেশে এই সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বন্ধ করে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এই ধরণের গুজব ঠেকাতে পুলিশের কয়েকটি বিশেষায়িত ইউনিটে সাইবার ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। একেকটি ল্যাব স্থাপনে খরচ হয়েছে ৮ কোটি থেকে ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত। কেনা হয়েছে ডিজিটাল সরঞ্জাম। আরও সরঞ্জাম কেনা হচ্ছে। এ ছাড়া গুজব ছড়ানোর ঘটনায় গত প্রায় তিন বছরে শুধু রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন থানায় অন্তত ৯৮টি মামলা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে রমনা মডেল থানায়।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তানভীর হাসান জোহা গুজব প্রতিরোধে তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, সমাজে অবাধ তথ্যপ্রবাহ থাকলে সে বিষয় নিয়ে গুজব হবে না। এ ছাড়া গুজব রটনাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করলে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর সঙ্গে চুক্তি করলে গুজব কমবে। গোয়েন্দা বিভাগের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ বলছে, যারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায় তারাই মূলত এমন কাজগুলো করে থাকে। তাই এসব খবর বিশ্বাস না করতে পরামর্শ দিয়েছে সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ। তারা পরামর্শ দিয়ে বলেছে- যেকোনো খবর শুনেই প্রতিক্রিয়া না দেখাতে, আগে যাচাই করতে বলেছেন ঘটনা সত্য কিনা।

আ ক ম মোজাম্মেল হক
সরকারের পক্ষ থেকে যা বলা হচ্ছে: সরকারের অভিযোগ আমলে না নিলে ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো প্রয়োজনে বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। রবিবার (৩১ মার্চ) সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। সভা শেষে কমিটির সভাপতি সাংবাদিকদের সভার সিদ্ধান্ত জানান। তিনি বলেন, গুজব প্রতিরোধ ও সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রণে ওদের (ফেসবুক, ইউটিউব, গুগল) হেড অফিস এখানে না থাকার কারণে বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের সুপারিশ-কথা তারা শোনেও না। তারা যে শুনছে না সেটা আমরা পাবলিকলি প্রচার করব। প্রয়োজন হলে এগুলো কিছু সময়ের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাকে আগে প্রোপার নোটিফাই করব- আমাদের অভিযোগ যথাযথভাবে আমলে না নিয়ে তারা (সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম) এসব ক্রাইম, গুজব অব্যাহত রাখছে এবং তাদের পক্ষ থেকে (প্রতিরোধে) কোনো উদ্যোগ নেই। প্রথমে তাদের বারবার বলা হবে, দরকার হলে আমরা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন আকারেও বলবো। যেন এ কথা বিশ্ববাসীর কাছে মনে না হয়, এখানে কোনো মৌলিক অধিকার ব্যাহত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় আইনের যে বিধানগুলো রয়েছে, কোনো অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া। তারা আমাদের অভিযোগগুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তাদের এই উদাসীনতা পাবলিক নোটিশের মাধ্যমে জনগণকে অবহিত করা, যদি কখনো এগুলো বন্ধ হয় দায়টা যেন সরকারের ওপর না আসে, তাদের (সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো) ওপরেই যেন বর্তায়। তাদের আমরা কী অভিযোগ দিলাম সেগুলো যেন মানুষ জানে। আমরা অভিযোগ করে প্রতিকার পাচ্ছি না।
তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমেই রোধ করা সম্ভব: তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে যে অপপ্রচার চালানো হয় তা তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমেই রোধ করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও স¤প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত। দ্বাদশ জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা জানান তিনি। তিনি উল্লেখ করেন, বিদেশে বসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর অপতথ্য প্রচার করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সরাসরি কোনো এখতিয়ার তথ্য ও স¤প্রচার মন্ত্রণালয়ের না থাকলেও মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরে বসে দেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার বা অন্তর্ঘাতমূলক কোনো কর্মকাÐ পরিচালনা করলে তা দেশের প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। গুজব প্রতিরোধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ অন্যান্য অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত যেকোনো তথ্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তার মাধ্যমে গুজব বলে নিশ্চিত হলে প্রকৃত তথ্যসহ তাৎক্ষণিক তথ্যবিবরণী জারি করে তা সব মিডিয়ায় প্রচারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশে ও বিদেশে বসে দেশবিরোধী অসত্য তথ্য, বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার ও গুজবরোধে বাংলাদেশ টেলিভিশনে নিয়মিতভাবে টিভিসি, স্পট ও ফিলার প্রচার করে থাকে।
পেশায় পরিণত হচ্ছে গুজব ছড়ানো: সমাজের আনাচা-কানাচে গুজবের চর্চা দেখা যেত। তবে ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো আসার পর মনে হচ্ছে, এর ভয়াবহতার মাত্রা ছাড়িয়েছে। গুজবের কারণে আগুন দিয়ে ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে হয়েছে বিভিন্ন সময়, ভাঙচুর করা হয়েছে। তাÐব চলে বিভিন্ন জায়গায়। ছেলেধরা বলে প্রচার করে কেমন করে একজন মাকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে একদল উন্মাদ লোক। ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার নামে বানানো স্ট্যাটাস দিয়ে বিভিন্ন সময় অনেকেই নাজেহাল হয়েছেন। কোটা আন্দোলন বা নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনেও চালানো হয়েছিল এই গুজবের ট্রাম্প কার্ড। সেসব গুজবে অংশ নিয়েছে সমাজের উচ্চশিক্ষিত মানুষজনও। এক গবেষণা বলছে, গুজব ছড়ানোকেই একদল মানুষ পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। এর জন্য অবশ্য তারা উভয়মুখী অর্থ পেয়ে থাকে বলে জানানো হয়। একটি গ্রæপ এটিকে সাময়িক পেশার মতো করে দেশে-দেশে নির্বাচনী কাজ করে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৩০টি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের একটি কনসোর্টিয়াম অনুসন্ধান চালিয়ে এই কাজ সম্পর্কে অবহিত হয়। তিনজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক গ্রাহক সেজে এসবের বিস্তারিত তথ্য উঠে আসে। তাদের মূল কাজ হলো হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিষোদগার, গুজব, অপবাদ ছড়ানো এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে নিজেদের প্রার্থীর পক্ষে জনমত গড়তে কাজ করে। এখন পর্যন্ত এই গ্রæপ বিভিন্ন দেশের প্রায় ৩০টির বেশি নির্বাচনে প্রভাব রেখেছে বলে দাবি করা হয়। এই টিম অত্যাধুনিক সফটওয়্যার প্যাকেজ অ্যাডভান্সড ইমপ্যাক্ট মিডিয়া সলিউশনস ব্যবহার করে ফেসবুক, টুইটার, লিংকডইন, টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, জি-মেইল, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবে হাজার হাজার ভুয়া অ্যাকাউন্ট রাখে। এমনকি অনলাইনে পণ্য কেনাবেচার বৈশ্বিক প্ল্যাটফরম অ্যামাজনেও তাদের অ্যাকাউন্ট আছে। এভাবেই জি-মেইল, টেলিগ্রামসহ অনলাইন যোগাযোগের বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে তথ্য হাতিয়ে নেয়। পরিকল্পিতভাবে বিশ্বাসযোগ্য সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের ব্যবস্থা করে। পরে সেগুলো অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে।
কৌশলের মধ্যে প্রতিপক্ষের প্রচারণা ব্যাহত করা বা অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাÐ সংঘটিত করার বিষয়ও যুক্ত। অনেক রাজনীতিবিদের বø্যাকমেইল করে পারিবারিকভাবে তাদেরকে বিপর্যস্ত করার বিস্তর উদাহরণ আছে তাদেও কাছে। অর্থাৎ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করাই লক্ষ্য হয়ে উঠে। আধুনিক প্রযুক্তি যেমন নতুনতর গুজব ছড়াতে সহযোগিতা করছে। মুহূর্তেও দ্রæত ছড়িয়ে যায় গুজব। অনেকেই মিথ্যা বানাচ্ছে ও ইচ্ছাকৃত মিথ্যা ছড়াচ্ছে। ইচ্ছাকৃত এসব অসত্য, ভ্রান্ত বিষয়, গল্প এখন লোকমুখে না ছড়িয়ে সোশ্যাল মিডিয়া, এমনকি গণমাধ্যমকেও ব্যবহার করা হচ্ছে। তার চেয়েও দুঃখজনক ব্যাপার হলো, একশ্রেণির তথাকথিত শিক্ষিত মানুষ এসব ব্যবহার করছে, অপরকে বিশ্বাস করাতে ছড়াচ্ছে নানাভাবে। একটা শ্রেণি আবার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকেও এসব ভ্রান্ত অসত্য তথ্য, গল্প বা ফেক ভিডিও ছড়াতে ব্যবহার করছে।

জুনাইদ আহমেদ পলক
চার কৌশলগত বিষয়ে কাজ করার পরামর্শ: সাইবার নিরাপত্তা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব প্রতিরোধে জেলা প্রশাসকদের সচেতনভাবে কাজ করার আহŸান জানিয়ে চারটি কৌশলগত বিষয় নিয়ে কাজ করতে পরামর্শ দিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। একইসঙ্গে পুলিশ প্রশাসন যাতে একাডেমিয়া, মিডিয়া এবং প্রাইভেট সেক্টরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার পরামর্শও দেন তিনি। সম্প্রতি জেলা প্রশাসক সম্মেলনে সাংবাদিকদের তিনি এ তথ্য জানান।
জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, আমরা মনে করি, সরকার এবং জনগণের মধ্যে মাঠ পর্যায়ে সেতুবন্ধনের ভ‚মিকা পালন করেন জেলা প্রশাসকরা। একদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা, অন্যদিকে উন্নয়ন কার্যক্রম তদারকি করা। তিনি বলেন, ডিসিরা বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব প্রতিরোধ করা, যখন পরীক্ষা হয়, তখন প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া না হওয়া অথবা ছাত্র-ছাত্রীদের বিরুদ্ধে যখন সাইবার বুলিং ও সাইবার ক্রাইম হয় সেই বিষয়ে তাদের (ডিসি) উদ্যোগ কী হতে পারে, সেই বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। তারা কী ধরনের সহযোগিতা পেতে পারেন সেই বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। সাইবার নিরাপত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব প্রতিরোধ করার জন্য আমরা তাদের চারটি কৌশলগত বিষয়ে সচেতনভাবে কাজ করার আহŸান জানিয়েছি।
যেন নতুন ধরনের সন্ত্রাসবাদ: সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, গুজবকে নতুন ধরনের সন্ত্রাসবাদ বললে ভুল হবে না। গুজবের বিরুদ্ধে আইনকে আরও কার্যকর করতে হবে। তবে আইনের অপব্যবহার যাতে না হয় সেদিকেও নজর রাখতে হবে। সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে হবে কোনও কিছু বিশ্বাস করা বা প্রচারের আগে। গুজব মিথ্যাচারের রাজনীতি দলকে পিছনে ঠেলে দেয়, এসব সঙ্গে নিয়ে রাজনীতি করলে রাষ্ট্র মেরামতের চটকদার ফর্মুলা বেশি দূর গড়াতে পারবে না।গুজব ছড়ানো হয় মানুষকে ভুল বোঝাতে বা জনমতে ভীতি তৈরি করতে। কিছু অনিশ্চয়তাকে পুঁজি করে গুজবের ট্যাবলেট খাওয়ানো হয়। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, গুজব হলো প্রচারণা, একটি উপসেট। আমাদের দেশে কয়েকটি বিরোধীদল এই উপসেটকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। রাজনৈতিক গুজবগুলোর উৎস কোথায় বা কী করে এসব তৈরি করে ছড়ানো হচ্ছে তা কমবেশি আমরা সবাই জানি-বুঝি ও অনুমান করতে পারি। নিয়মিত এসব মিথ্যাগল্প ও গুজব নিয়ে পড়ে থাকে বেশ কিছু রাজনৈতিক কর্মী, যেন এসবই তাদের কাজকর্ম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনসাধারণকে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য এবং গুজবের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ে সাহায্য করতে মিডিয়া লিটারেসি শিক্ষাদানে স্কুল-কলেজ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলো এমন প্রোগ্রাম গ্রহণ করতে পারে, যা তাদের সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতা এবং ফ্যাক্ট চেকিংয়ের কৌশল শেখাবে। দেশপ্রেম, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার আলোকে সোশ্যাল মিডিয়ার দায়িত্বশীল ব্যবহার এই প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে মিথ্যা তথ্যের বিস্তাররোধে সহায়তা করতে পারে। অন্যদের সাথে শেয়ার করার পূর্বে বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে ও ফ্যাক্ট চেকিংয়ের মাধ্যমে সর্বদা তার বিশ্বাসযোগ্য সূত্র যাচাই করে দায়িত্বশীল শেয়ার করতে হবে। পাশাপাশি তার পেছনে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর স্বার্থ আছে কি না তা যাচাই করতে হবে। অযাচাইকৃত বা চাঞ্চল্যকর বিষয়বস্তু অনলাইন প্ল্যাটফর্মসহ বিভিন্ন মাধ্যমে শেয়ারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ০১ এপ্রিল ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা
দেশে ফেসবুক ব্যবহারকারী এক বছরে বেড়েছে পৌনে ২ কোটি: দেশে গত এক বছরে প্রায় পৌনে দুই কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারী বেড়েছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ৬৫ লাখ ৪৮ হাজার ৩০০ জন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৩৯ লাখ ৫৫ হাজার ১০০ জনে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে এক কোটি ৭৪ লাখ ৬ হাজার ৮০০ জন। একই সঙ্গে ব্যবহারকারী বেড়েছে মেসেঞ্জার, ইনস্টাগ্রাম এবং লিংকডইনের মতো পেশাজীবীদের যোগাযোগমাধ্যমেও। তবে ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামসহ সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের উপস্থিতি বেশি। এমনকি লিংকডইনেও তরুণ-যুবকদের অংশগ্রহণ বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপনার প্ল্যাটফর্ম নেপোলিয়নক্যাটের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। পোল্যান্ডভিত্তিক এ প্রতিষ্ঠানটি প্রতিমাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করে থাকে। নেপোলিয়নক্যাটের তথ্য বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশে ফেসবকু ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৬ কোটি ৩৯ লাখ ৫৫ হাজার ১০০ জন। যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৬ শতাংশেরও বেশি। এরমধ্যে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী ব্যবহারকারী ৩ কোটি ১৪ লাখেরও বেশি। তাদের মধ্যে পুরুষ ২৯ দশমিক ১ শতাংশ এবং নারী ২০ শতাংশ। আর ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ২১ দশমিক ৯ শতাংশ পুরুষ এবং ৯ দশমিক ৫ শতাংশ নারী।
এদিকে, ফেসবুক বেশি ব্যবহার করছেন পুরুষরা। শতাংশের হিসাবে প্রতি ১০০ জন ব্যবহারকারীর মধ্যে ৬৫ জনই পুরুষ। বাকি ৩৫ জন নারী। তবে গত বছরের চেয়ে এবার নারীদের ফেসবুক ব্যবহারের হার বেড়েছে। গত বছর প্রতি ১০০ জন ব্যবহারকারীর মধ্যে ৩২ জন ছিলেন নারী। আর বাকি ৬৮ জনই ছিলেন পুরুষ। সেই হিসাবে পুরুষ ফেসবুক ব্যবহারকারীর হার কিছুটা কমেছে। গত এক বছরে দেশে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী বেড়েছে ২১ লাখ ৯ হাজার ৩০০ জন। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে ৪৭ লাখ চার হাজার ১০০ জন ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী ছিলেন। বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৬৮ লাখ ১৩ হাজার ৪০০। ইনস্টাগ্রামেও নারীদের চেয়ে পুরুষ ব্যবহারকারী বেশি। বর্তমানে দেশে প্রতি ১০০ জন ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীর মধ্যে ৬৬ জনই পুরুষ। বাকি ৩১ জন নারী। বয়সভিত্তিক হিসাবে বাংলাদেশের ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীদের প্রায় ৫৯ শতাংশই ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণ, যা সংখ্যার হিসাবে ৪০ লাখের বেশি। ইনস্টাগ্রামের বাকি ৪১ শতাংশ বাংলাদেশি ব্যবহারকারীর মধ্যে ৩০ শতাংশ ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী। অর্থাৎ, তরুণ-যুবকদের দখলে ৮৯ শতাংশ ইনস্টাগ্রাম আইডি। বর্তমানে ফেসবুকের মেসেঞ্জার ব্যবহারকারী ৫ কোটি ৭২ লাখ ৬৫ হাজার ৮০০ জন। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ৪১ লাখ ৬৬ হাজার ৯০০ জন। হিসাব অনুযায়ী মেসেঞ্জার ব্যবহারকারী বেড়েছে এক কোটি ৩০ লাখ ৯৮ হাজার ৯০০ জন। মেসেঞ্জার ব্যবহারেও এগিয়ে পুরুষরা। দেশে মেসেঞ্জার ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৬৬ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৪ শতাংশ নারী। ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের মতো মেসেঞ্জারও বেশি ব্যবহার করছেন ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীরা। মোট ব্যবহারকারীর ৮০ শতাংশই তরুণ-যুবক। পেশাজীবীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম লিংকডইনের ব্যবহারও বেড়েছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে লিংকডইন ব্যবহার করতেন ১৮ লাখ ৫ হাজার মানুষ। বর্তমানে অর্থাৎ, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তা বেড়ে হয়েছে ৮০ লাখ ১৮ হাজার, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
ইউডি/এজেএস

