দেশে ক্যানসার চিকিৎসাব্যবস্থা: যন্ত্রপাতি ঘাটতিসহ নানা সংকট, বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে কতখানি
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ১৯ মে, ২০২৪, আপডেট ১৪:০০
দেশে দৈনিক গড়ে ৪৫৮ জন নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। যে হারে রোগী বাড়ছে, সেদিক বিবেচনায় চিকিৎসা ব্যবস্থা চাহিদার তুলনায় খুবই অগ্রতুল। এ নিয়ে আরেফিন বাঁধন’র প্রতিবেদন
উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা: বাংলাদেশে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে দৈনিক গড়ে ৪৫৮ জন নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। আর দৈনিক গড়ে মারা যাচ্ছে ৩১৯ জন। কমপক্ষে ৩২ ধরনের ক্যানসারে দেশের মানুষ আক্রান্ত হন বলে তথ্য দিচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বাংলাদেশে খাদ্যনালির (গলবিল থেকে খাদ্যনালি পর্যন্ত) ক্যানসার সবচেয়ে বেশি। দেশে প্রধান পাঁচটি ক্যানসারের মধ্যে আছে-খাদ্যনালি, ঠোঁট ও মুখ, ফুসফুস, স্তন ও জরায়ু ক্যানসার। পুরুষের ক্ষেত্রে খাদ্যনালির ক্যানসার বেশি, আর নারীর ক্ষেত্রে স্তন ক্যানসার বেশি। তবে মৃত্যু বেশি হচ্ছে খাদ্যনালির ক্যানসারে। বিশ্লেষকরা বলছেন রোগের প্রকোপের তুলনায় দেশে চিকিৎসাব্যবস্থা অপ্রতুল। চিকিৎসায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেকে চিকিৎসা নেওয়া থেকে বিরত থাকেন। অনেকে ব্যয় বহন করতে পারেন না। অনেক অর্থ ব্যয় করে ঢাকায় এসেও চিকিৎসা না নিয়ে বাড়ি ফেরত যান। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় অনেক বেশি। তাই অনেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে আগ্রহী নন। আবার দেশের চিকিৎসায় আস্থা না থাকায় বিত্তশালীরা বিদেশে চিকিৎসা নেন। তাই আক্রান্তের একটি বড় অংশ চিকিৎসার বাইরে থেকে যায়। আবার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, চিকিৎসার আওতায় আসেন একেবারে শেষ পর্যায়ে। সে সময় চিকিৎসা হয়ে পড়ে জটিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ চিকিৎসা ব্যয় নাগরিকদের নিজ পকেট থেকে দিতে হয়। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছে দরিদ্র পরিবারগুলো। তাদের আয়ের বড় একটি অংশ এই স্বাস্থ্যসেবায় চলে যায়। এই সেবা নিতে সামর্থ্য না থাকায় স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে এবং দরিদ্র মানুষের উপার্জনক্ষমতা কমে যায়। গরিব ও স্বল্প আয়ের রোগীদের একমাত্র ভরসা সরকারি হাসপাতাল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
ক্যান্সার চিকিৎসার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ রেডিওথেরাপির যন্ত্র নষ্ট অনেক হাসপাতালে। কোনো কোনো হাসপাতালে পুরোনো যন্ত্র দিয়ে কোনোমতে চলছে চিকিৎসা। কোনো হাসপাতালে একটিমাত্র যন্ত্র দিয়ে অসংখ্য রোগীকে থেরাপি দিতে হচ্ছে। এতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত একজন রোগীর চিকিৎসায় গড়ে পাঁচ লাখ ৪৭ হাজার ৮৪০ টাকা পকেট থেকে খরচ করতে হয়। এই খরচ জনপ্রতি সর্বনি¤œ ৮১ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খরচ হয় ওষুধপত্র কিনতে। ক্যান্সারের প্রাথমিক স্তরে গড়ে চিকিৎসা খরচ তিন লাখ ৩১ হাজার ২৪৩ টাকা। দ্বিতীয় স্তরে গড় খরচ ছয় লাখ ৯৯ হাজার ৮৬৫ টাকা।
সঠিক তথ্য জানা যাবে কোথায়: বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির তথ্যমতে, দেশে জাতীয় পর্যায়ে কোনো ক্যানসার রেজিস্ট্রি নেই। বছরে সারা দেশে কতজন ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন বা মারা গেছেন এমন হিসাব সরকারের কাছে নেই। বাংলাদেশে রোগভিত্তিক কোনো জাতীয় জরিপ নেই। ক্যানসারে কত মানুষ আক্রান্ত হন, কত মানুষ মারা যান, কোন ক্যানসারের প্রকোপ বেশি-এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া অনুমিত পরিসংখ্যানই ব্যবহার করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ৬৭ হাজার ২৫৬ জন ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি। বছরে ক্যানসারে মারা যাচ্ছেন ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৯৮ জন। মৃত্যুও দেখা যায় পুরুষের বেশি। মৃত রোগীদের হিসাব বাদ দিয়ে দেশে এখন ক্যানসার রোগীর সংখ্যা ৩ লাখ ৪৬ হাজারের কিছু বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধীন ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (আইএআরসি) তাদের সর্বশেষ হিসাবে জানিয়েছে, ২০২০ সালে শনাক্ত হয়েছিল ১ লাখ ৫৬ হাজার ৭৭৫ জন। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার ক্যান্সার রোগীর। দেশে ক্যান্সার রোগীদের নিবন্ধন না থাকলেও বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সময় বলেছেন, দেশে ১৫ থেকে ২০ লাখ ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী রয়েছে। প্রতিবছর এই তালিকায় দুই লাখ রোগী যোগ হয়। স¤প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (এনসিডিসি) ও বিএসএমএমইউয়ের পাবলিক হেলথ ডিপার্টমেন্ট যৌথভাবে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের রেজিস্ট্রির পাইলটিং প্রজেক্ট পরিচালনা করছে। এরই মধ্যে কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার প্রায় লক্ষাধিক মানুষের ওপর জরিপ চালানো হয়েছে। এ বছরের জুন-জুলাইয়ের দিকে জরিপে পাওয়া তথ্য প্রকাশ করা হবে।
এনসিডিসির লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন গণমাধ্যমকে জানান, এই লাখখানেক মানুষের ওপর চালানো জরিপে প্রায় ১১১ জন ক্যানসার আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে কোনো রেজিস্ট্রি বা সঠিক তথ্য নেই। শুধু জাতীয় ক্যানসার হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হাসপাতালে আসা রোগীদের রেজিস্ট্রার আছে। কিন্তু তা সারাদেশের চিত্র দেখায় না। তিনি বলেন, হাসপাতালের চিত্র দিয়ে চিকিৎসা বিষয়ে ধারণা নেওয়া যায়। কিন্তু দেশে ক্যানসারের সঠিক চিত্র দেখতে হলে জনসংখ্যার ভিত্তিতে দেখতে হবে। দেশে এ ধরনের তথ্য না থাকায় স¤প্রতি হোসেনপুরে একটি জরিপ চালানো হয়েছে। ওই এলাকায় মোট জনসংখ্যা আড়াই লাখের মতো, যেখানে লাখখানেক মানুষের ওপর জরিপ চালানো হয়েছে।
সরকারের যত পদক্ষেপ, আরও যা দরকার: বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. গোলাম মহিউদ্দীন ফারুক গণমাধ্যমকে বলেন, ডা. গোলাম মহিউদ্দীন ফারুক জানান, বাংলাদেশ সরকার ক্যানসার চিকিৎসায় উন্নতি করার ব্যবস্থা নিচ্ছে। আটটি বিভাগে আলাদা করে ক্যানসারের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান করে দেওয়া হচ্ছে। সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর মান ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেলে রাজধানীমুখী রোগীদের সংখ্যা কমবে। বর্তমানে যারা জেলা বা বিভাগীয় শহরে চিকিৎসা পাচ্ছেন না, তারাও চিকিৎসার আওতায় আসবেন। তাদের অর্থ সাশ্রয় হবে। তিনি বলেন, ক্যানসারের বেশকিছু ওষুধ ফ্রান্স, ইতালিসহ বিভিন্ন দেশ থেকে নিয়ে আসা হয়। সরকারকে এসব ওষুধের ওপর ভর্তুকির ব্যবস্থা রাখার অনুরোধ করছি। আগে চাহিদা অনুযায়ী বিএসএমএমইউতে কিছু ওষুধ রোগীদের ফ্রি দেওয়া হতো। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর একটি তহবিল আছে, সেখান থেকে কিছু রোগীকে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। সমাজকল্যাণ অফিস থেকে এলে সে ক্ষেত্রে কিছু পায়। তবে, এসব অপ্রতুল। আমরা অন্যান্য দেশ, যেমন-ইন্ডিয়ার মতো কাঁচামাল এবং ওষুধ নিজেরা উৎপাদন করলে খরচ অনেক কমে যাবে। আরেকটি কাজ সরকারিভাবে আপাতত করা যায়, সেটি হচ্ছে, ক্যানসারের এসব ওষুধ সরকার কিনে কম দামে রোগীদের সরাসরি সরবরাহ করা। এটা করা গেলে, যেটি আমাদের দেশে ১০ হাজার টাকায় এখন পাওয়া যাচ্ছে, তা ১ বা ২ হাজার টাকায়ই পাওয়া যাবে।

অধ্যাপক ডা. ফারুক বলেন, ক্যানসারের চিকিৎসা যেমন ব্যয়বহুল, তেমনই এর চিকিৎসা দীর্ঘদিন করতে হয়। প্রতি বছর বাংলাদেশে ২ লাখের মতো নতুন রোগী ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। এদের মধ্যে ৫০ হাজার রোগীকে সুস্থ করা সম্ভব হচ্ছে। সবাইকে ভালোভাবে চিকিৎসা না দিতে পারাটাও এক রকমের বৈষম্য। গরিব রোগীদের যথাযথ চিকিৎসার আওতায় না আনতে পারাটাও বৈষম্য। সরকারি হাসপাতালগুলোতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় রোগীদের ওষুধ সরবরাহ ও চিকিৎসা দেওয়ার আহŸান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ক্যানসার রোগীদের সহযোগিতায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এছাড়া, সরকারের কাছে আবেদন, সমাজকল্যাণ ফান্ড থেকে যে ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হতো, তা ১ লাখ টকায় উন্নীত করা হোক। এতে ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসায় কিছুটা সুবিধা বাড়বে। অনেক রোগীকে বিভিন্ন জেলা থেকে রাজধানীতে যাতায়াত করতে হয়। তাদের একটি ক্যানসার কার্ড করে দিয়ে ৫০ শতাংশ যাতায়াত ভাড়া করে দেওয়া গেলে তারা এসে চিকিৎসা নিতে পারবেন।
চিকিৎসা পরিস্থিতি কোথায় কেমন: দেশের আট বিভাগে ক্যানসারসহ বিশেষ চিকিৎসার জন্য আটটি হাসপাতাল করা হচ্ছে। সেখানে কার্ডিওলজি, নেফ্রোলজি ও ক্যানসার- এ তিনটি রোগের চিকিৎসা হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, দেশে সরকারিভাবে ২২টি সেন্টারের পাশাপাশি বেসরকারিভাবে আরও ১০টি সেন্টার ক্যান্সারের চিকিৎসা দিচ্ছে। নতুন করে হতে যাওয়া ৮টি মেডিকেল কলেজেও ক্যান্সার ইউনিট থাকছে। তবে নতুন সেন্টার যুক্ত হলেও যে হারে রোগী বাড়ছে, তা চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল। জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে চিকিৎসা-সক্ষমতা না থাকাই ক্যান্সার রোগীদের এমন দুর্ভোগের মূল কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ব্যয়বহুল এ রোগের চিকিৎসায় দেশে সরকারিভাবে ২২টি চিকিৎসাকেন্দ্র থাকলেও অধিকাংশেরই অনেক যন্ত্রপাতি বিকল হয়ে আছে। এ ছাড়া চিকিৎসক-নার্সের পর্যাপ্ত পদ না থাকা, যেসব পদ আছে সেগুলোতেও লোকবলের ঘাটতিসহ নানা সংকট ও জটিলতা রয়েছে। এতে প্রতিবছর দেশে এক লাখের বেশি মানুষ ক্যান্সার আক্রান্ত হলেও চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন তাদের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে সরকারিভাবে যত ক্যান্সার রোগী চিকিৎসা নেন, তাদের অধিকাংশই ৫০০ শয্যার মহাখালীর ক্যান্সার হাসপাতালে যান। তবে প্রতিষ্ঠানটির দুই-তৃতীয়াংশ যন্ত্রপাতিই দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। স¤প্রতি দুটি রেডিওথেরাপি যন্ত্র কেনা হয়েছে।
এরপরও থেরাপি নিতে গিয়ে এক মাস থেকে তিন মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে রোগীদের। একসময়ে প্রতিদিন গড়ে হাজারের বেশি থেরাপি দেওয়া যেত এই হাসপাতালে। এখন তা ১৫০ থেকে ২০০ জনে নেমে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটিতে চারটি লিনিয়ার এক্সিলারেটর ও দুটি কোবাল্টসহ রেডিও থেরাপির জন্য ছয়টি যন্ত্র ছিল। বর্তমানে একটি লিনিয়ার ছাড়া বাকি পাঁচ যন্ত্রের কোনোটি পুরোপুরি অকেজো, কোনোটি আবার নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। সচল একমাত্র লিনিয়ারটিও স¤প্রতি নষ্ট হয়ে গেলে নানা সমালোচনার মুখে দুটি কেনা হয়েছে। আরও দুটি শিগগির পাওয়া যাবে বলে আশা কর্তৃপক্ষের। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্চ অ্যান্ড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. এম নিজামুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, হাসপাতালে রোগীর চাপ অনেক বেশি। এখানে দৈনিক ৫০০ জনের কেমোথেরাপি দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। বিপরীতে চাহিদা তিন হাজারের বেশি। এ ক্ষেত্রে রোগীদের অপেক্ষা করার প্রয়োজন হয়। একজন রোগী হাসপাতালে এলেই পরীক্ষানিরীক্ষা করতে হয়। তবে সব পরীক্ষানিরীক্ষার ব্যবস্থা আমাদের এখানে নেই।
তামাক ব্যবহার, অ্যালকোহল সেবন, স্থূলতা ও বার্ধক্যজনিত কারণে উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে ২০৫০ সালের মধ্যে নতুন করে ৪.৮ মিলিয়ন মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারে। এই সময়ে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হবে কম আয়ের দেশে। দরিদ্র দেশগুলোতে ক্যানসারে মৃত্যুর হার বেড়ে দ্বিগুণ হতে পারে বলে এক পূর্বাভাসে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যান্সারবিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইএআরসি)। সংস্থাটির পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৩৫ মিলিয়নে দাঁড়াতে পারে, যা ২০২২ সালের চেয়ে অন্তত ৭৭ শতাংশ বেশি।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ। ১৯ মে ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা
চিকিৎসক কম থাকলেও বেড়েছে আগ্রহ: দেশে ক্যানসার চিকিৎসায় চিকিৎসক সংকট রয়েছে। রেডিওথেরাপিস্ট, কেমোথেরাপিস্ট ও ক্যানসার স্পেশালিস্টের সংখ্যাও অনেক কম। আগে এ রোগের বিষয়ে চিকিৎসকদের আগ্রহ কম থাকলেও এখন অনেকটা বেড়েছে। তবে তাদের পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে স্পেশালিস্ট হয়ে আসতে সময় লাগবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ক্যান্সার রোগীর প্রায় ৮০ শতাংশের চিকিৎসার অংশ হিসেবে রেডিওথেরাপির প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে স্তন, জরায়ু, কোলোরেক্টাল (পায়ুপথ ও বৃহদন্ত্র) ও ফুসফুস ক্যান্সারের জন্য রেডিওথেরাপি অপরিহার্য। চিকিৎসকদের ভাষ্য, চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র হচ্ছে রেডিওথেরাপি মেশিন।
ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটোমিক এনার্জি এজেন্সি (আইএইএ) বলছে, প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যার বিপরীতে রেডিওথেরাপির যন্ত্রের প্রয়োজন শূন্য দশমিক ১৬টি। সে হিসাবে বাংলাদেশে রেডিওথেরাপি যন্ত্রের প্রয়োজন ১৭০টি। ২০৩০ সালে গিয়ে ২৪০টি যন্ত্রের প্রয়োজন পড়বে। বাংলাদেশে সোসাইটি অব রেডিয়েশন অনকোলজিস্টসের (বিএসআরও) তথ্যমতে, শুধু ক্যান্সার চিকিৎসার যন্ত্র নয়, দেশে চিকিৎসকের সংখ্যাও অপ্রতুল। দেশে অনকোলজিস্টের সংখ্যা ২৮০ জনের মতো। দরকার কম করে হলেও দেড় হাজার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী, প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য একটি মেশিন দরকার। সে হিসাবে ১৭ কোটি মানুষের জন্য ১৭০টি মেশিন থাকা দরকার। আর চিকিৎসাসেবা সহজ করতে প্রয়োজন ২০০টি মেশিন। তবে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে দেশে আছে মাত্র ২০টি মেশিন। এর অর্ধেকের বেশি আবার নষ্ট। ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের অভাবও আরেকটি বড় উদ্বেগের কারণ। দেশে মোট ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ তিন শর বেশি হবে না।
তাদের পক্ষে এত বেশি রোগীর চিকিৎসা করা সম্ভব নয়। ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওষুধের খরচ অনেক বেশি। তবে আগের চেয়ে কিছু কমেছে। আগে যেখানে ৩০ হাজার লাগত, সেখানে এখন ১০ হাজার লাগছে। তবে কাঁচামাল দেশে তৈরি করা গেলে আরো খরচ কমিয়ে আনা সম্ভব। রোগীর খরচ না কমানো গেলে চিকিৎসাসেবায় বৈষম্য হবে, এটা স্বাভাবিক।
চিকিৎসকরা বলছেন, বাংলাদেশেও তারা ক্যানসার রোগীদের পরীক্ষা ও শনাক্তকরণের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে চান। এজন্য প্রয়োজন সরকারের উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা। এছাড়া বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্যাকেজগুলোও ফলো করা যেতে পারে। তবে তারা চান দেশেই ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে ক্যানসার রোগীদের জন্য একটি আধুনিক মানের ল্যাব প্রস্তুত করতে। ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিকভাবে ক্যান্সার শনাক্ত করা এবং স্ক্রিনিং সিস্টেম ও চিকিৎসা প্রোটোকল অবশ্যই থাকতে হবে। সব ক্যান্সার প্রোগ্রামকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার উপযুক্ত সময় এখনই, যাতে চিকিৎসকদের কাছে সঠিক তথ্য থাকতে পারে। তারা বলছেন, দেশে ক্যান্সার রোগের ব্যাপকতা বাড়লেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা সেভাবে বাড়েনি।
ইউডি/এজেএস

