উমেদার সোবহানের টাকা গাছে ধরে !

উমেদার সোবহানের টাকা গাছে ধরে !

এস ইসলাম: রবিবার, ০২ জুন, ২০২৪, আপডেট ১৪:০০

কথায় আছে, টাকা কি গাছে ধরে? হ্যাঁ, টাকা এখন গাছেই ধরছে। তবে সবার টাকা গাছে ধরে না। কিন্তু উমেদার সোবহানের টাকা গাছেই ধরছে অনেক বছর যাবৎ। সেই টাকা দিয়ে তিনি শত শত কোটি টাকার সম্পদ করেছেন। খোদ রাজধানীতে রয়েছে ৫/৬টি বাড়ি। বেশ কয়েকটি প্লট ও ফ্ল্যাট। বেশ কয়েটি মাইক্রোবাস এবং মিনিবাস রয়েছে ১০টি।

দৈনিক ৬০ টাকা বেতনের হাজিরায় চাকরি করলেও মানুষের সর্বনাশ করে এই টাকার মালিক হয়েছেন তিনি। বলছিলাম রাজধানীর তেজগাঁওয়ের রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের উমেদার আব্দুস সোবহানের কথা।

জানা গেছে, মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের অঘোষিত কিং উমেদার সোবহান। তার কথা ছাড়া এই অফিসের একটা কাগজও নড়ে না। স্বয়ং সাব-রেজিস্ট্রারও সোবহান চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েন।

এই চক্রের অপকর্ম: অপকর্মের চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন উমেদার সোবহান। তার সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন তার ভাগ্নে আয়নাল হোসেন। এই চক্রের অন্যতম কাজ হলো দলিল আটকে ঘুষ আদায় করা। প্রতিটি দলিল থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ আদায় করেন তারা।

এছাড়া ভলিউম ছেঁড়া, দলিলের পাতা বদল, দাগ নং পরিবর্তন, নাম-ঠিকানা পরিবর্তন তাদের অন্যতম কাজ। এখান থেকে যে টাকা আদায় হয়; তার সিংহভাগ যায় সোবহানের পকেটে। আর এভাবেই এক সময়ের বাদাম বিক্রেতা সোবহান এখন শত শত কোটি টাকার মালিক।

তিনি সিংহভাগ সম্পদ করেছেন তার স্বজনরা বিশেষ করে স্ত্রী ও শশুর পক্ষের লোকজনের নামে। আয়নাল এই অফিসের কর্মী না। তার নিয়োগপত্র নেই। তবে তিনি মামার দাপটে সবাইকে দৌড়ের ওপর রাখেন। তার কাছে থাকে এই অফিসের চাবি। তিনি লোকজন নিয়ে রাতে অফিসে ঢুকে কাগজপত্র টেম্পারিং করেন।

দলিলের পাতা পরিবর্তন, দাগ নং পরিবর্তন, খতিয়ান পরিবর্তন এবং দাতা ও জমির পরিমাণ পরিবর্তন করে থাকেন তিনি। মূলত কোটি কোটি টাকা আসে এখান থেকেই। এ সংক্রান্ত ভিডিও ফুটেজ এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।

সোবহানের যত সম্পদ ও আয়কর বিবরণী: দুর্নীতি দমন কমিশনে উমেদার সোবহানের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তিনি (সোবহান) এক সময় বাদাম বিক্রি করতেন। উমেদারের চাকরি করে তিনি শত শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। রাজধানীর আদাবরে ঢাকা হাউজিংয়ে ১৩/৩- এ ৩ কাঠার জমির উপর তার ৬ তলা বাড়ি রয়েছে।

আদাবরের বায়তুল আমান হাউজিং ১১ নং রোডের ৬১৭ নং হোল্ডিংয়ে তিনটি ফ্ল্যাট রয়েছে তার। কাটাসুর বেড়িবাধের সাথে ৫ কাঠা জমির উপর তার একটি টিনসেড বাড়ি রয়েছে। বছিলা সিটিতে রয়েছে ১৫ কাঠার প্লট। এর দাতা আনোয়ার হোসেন।

রামচন্দ্রপুর মৌজায় রয়েছে ২০ কাঠার প্লট আছে তার। আদাবরে ৫ কাঠার টিনসেড বাড়ি রয়েছে তার। এর দাতা আবুল কাশেম। এর দলিল নং ৩০৬০। এটি ২০১৭ সালের মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে দলিল করা হয়। কাটাসুর মৌজায় ১৮ কাঠার প্লট রয়েছে তার; এর দলিল নং ৯৬৫৪। এটি ২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর রেজিস্ট্রেশন করা হয়। তার মিনিবাস রয়েছে ১০টি।

এছাড়া তিনটি মাইক্রোবাসের হদিস মিলেছে। উমেদার সোবহান রাজকীয় জীবনযাপন করে থাকেন। তিনি নিজের গাড়িতে অফিসে আসেন। স্ত্রী-সন্তানরাও একেকজন একেকটা গাড়ি ব্যবহার করেন। তারা শপিং করেন সিঙ্গাপুরে। তাদের চিকিৎসাও হয় সেখানে।

উমেদার সোবহানের দুর্নীতির প্রমাণ মেলে তার আয়কর বিবরণীতে। ২০২১-২২ অর্থ বছরে তিনি ৭৯ লাখ ৯৩ হাজার ৪০৮ টাকার সম্পদের মালিক দাবি করেছেন। এর মধ্যে তিনি দুইটি গাড়ি; আদাবরে ৫ শতাংশ জমিতে ৩৫টি টিনসেড ঘর; বাড্ডার সাতারকুলে ২ কাঠার জমির ৫০ শতাংশ অর্থাৎ ১ কাঠা জমির প্লট এবং ওই এলাকায় আরেকটি প্লটে ৬ শতাংশ জমি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

ক্ষুব্ধ সহকর্মী: উমেদার সোবহানের কয়েকজন সহকর্মী বলেন, সোবহানের কুকর্মের দায়ে তারাও লজ্জিত। তিনি শত শত কোটি টাকার মালিক। তিনি (সোবহান) সম্পদ নিয়ে গর্ব করে বলেন- চৌদ্দ পুরুষ খেলেও আমার সম্পদ শেষ হবে না।

তার এই দুর্নীতির কথা মাঝেমধ্যে পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়। তখন তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে থাকেন। এ কারণে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ২৫ বছরের বেশি তিনি মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে কর্মরত আছেন। তার বদলি হয় না অদৃশ্য কারণে। অথচ অনেক উমেদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তাকে বদলি করা হয়। তাকে বদলি না করার কারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তার সহকর্মীরা।

দুদকের পদক্ষেপ: এরই মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সোবহানের দুর্নীতির অভিযোগ আমলে নিয়েছে। বুধবার (২৯ মে) একজন সহকারী পরিচালক তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। ওই কর্মকর্তার সাথে এ বিষয়ে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি এখনই এ বিষয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে জনসংযোগ বিভাগে যোগাযোগ করতে বলেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে সোবহানকে বেশ কয়েকবার মোবাইল ফোনে কল করা হয়। তবে তিনি কল রিসিভ করেননি। মেসেজ পাঠালেও উত্তর দেননি।

ইউডি/এআর

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading