১৪ বছর আগের করা মন্তব্যের জন্য কারাগারে যাবেন অরুন্ধতী রায়?
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০২৪, আপডেট ১৬:৪৫
ইন্ডিয়ার অন্যতম বিখ্যাত লেখিকা অরুন্ধতী রায় ১৪ বছর আগে তার করা এক মন্তব্যের জন্য বিচারের মুখোমুখি হয়ে কারাগারে যেতে পারেন। মূল অভিযোগের এক যুগেরও বেশি সময় পার হওয়ার পর গত সপ্তাহে বুকার পুরস্কার জয়ী এই লেখিকাকে ইন্ডিয়ার কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় বিচারের অনুমতি দিয়েছেন দিল্লির গভর্নর। এই বেআইনী কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইনের (ইউএপিএ) অধীনে সহজে জামিন মেলে না, প্রায়ই বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত বছরের পর বছর কারাগারে থাকতে হয়।
অভিযোগ রয়েছে মোদী সরকার আন্দোলনকারী, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের সদস্যসহ সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতে এই আইনটি ব্যবহার করছে। ৬২ বছর বয়সী স্পষ্টভাষী লেখিকা ও অধিকার আন্দোলনকারী অরুন্ধতী রায় ইন্ডিয়ার চিরকালীন বিতর্কের কেন্দ্র কাশ্মীর নিয়ে মন্তব্যের জন্য কাঠগড়ায় দাঁড়াচ্ছেন।
“কাশ্মীর কখনোই ইন্ডিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল না। এটা ঐতিহাসিক সত্য। এমনকি ভারত সরকারও এটা মেনে নিয়েছে,” ২০১০ সালের অক্টোবরে দিল্লিতে কমিটি ফর দ্য রিলিজ অব পলিটিক্যাল প্রিজনার্স আয়োজিত দিনব্যাপী এক সম্মেলনে তিনি এমনটি বলেছিলেন। ওই সময় ইন্ডিয়া শাসিত কাশ্মীর অশান্ত হয়ে উঠেছিল। ওই বছরের প্রথম দিক থেকে কাশ্মীরের স্বাধীনতার পক্ষে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। কয়েকমাস ধরে চলা এ বিক্ষোভে বহু প্রতিবাদকারী নিহত হয়েছিল। স্থানীয়রা এটিকে ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে একটি ‘প্রচণ্ড বিদ্রোহ’ বলে বর্ণনা করেছিলেন, জানিয়েছে বিবিসি।
এর পরই দিল্লির ওই সম্মেলনে এ মন্তব্য করেছিলেন অরুন্ধতী। তার মন্তব্যে প্রত্যাশিতভাবে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। অনেক সমালোচক ভারতের প্রতি তার আনুগত্য নিয়ে প্রশ্নও তুলেছিলেন। কংগ্রেস পার্টির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার তাকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়েছিল। একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী বলেছিলেন, “ভারতে বাক স্বাধীনতা থাকলেও তা জনগণের দেশপ্রেমের অনুভূতিকে লঙ্ঘন করতে পারে না”।
দিল্লির অভিজাত এলাকায় অরুন্ধতী রায়ের বাড়ির বাইরে বিক্ষোভ হয়েছিল। তার ও কাশ্মীরের আইনের শিক্ষক শওকত হুসেইনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করে তাদেরসহ আরও দুইজনকে দেশদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।
সুশীল পণ্ডিত নামের এক নাগরিক অধিকারকর্মী এবং কাশ্মীরি পণ্ডিতদের সংগঠন ‘রুটস ইন কাশ্মীর’ দিল্লির হাকিম আদালতে এ মামলা দায়ের করেছিলেন। সেখানে অভিযোগ করা হয়, ওই বছর দিল্লিতে কমিটি ফর রিলিজ অব পলিটিক্যাল প্রিজনারস আয়োজিত ‘আজাদি: দ্য অনলি ওয়ে’ নামে এক সম্মেলনে কাশ্মীরকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করার দাবি তোলা হয়। সেখানে অরুন্ধতী রায় ও শেখ শওকত হোসেনসহ অন্য আসামিরা ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্য দেন।
২০১০ সালের নভেম্বরে দায়ের করা এ মামলায় ধর্ম, জাতি, জন্মস্থান, বাসস্থান, ভাষা ইত্যাদির ভিত্তিতে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্বেষ ছড়ানো, সম্প্রীতির জন্য ক্ষতিকর কাজ করা, জাতীয় ঐক্যের জন্য ক্ষতিকর বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
বিতর্কের পরেই লেখিকা তার বাক স্বাধীনতার অধিকারের পক্ষে কলম ধরেছিলেন। প্রতিক্রিয়ায় তিনি লিখেন, পত্রিকায় কেউ কেউ আমার বিরুদ্ধে ‘ঘৃণামূলক ভাষণ’ দেওয়ার জন্য, ভারত ভাঙতে চাই বলে অভিযোগ করেছে। কিন্তু আসলে আমি যা বলি তা ভালোবাসা ও গর্ব থেকে আসে। এটি মানুষকে হত্যা করে, ধর্ষণ করে, কারাবন্দি করে বা আঙুলের নখ উপড়ে ফেলে তাদের জোর করে তারা ভারতীয় এটি বলানোর চেষ্টার মতো কিছু থেকে আসে না। করুণা হয় সেই জাতির জন্য, যারা তাদের লেখকদের মনের কথা বলার জন্য চুপ করিয়ে দেয়।
ইন্ডিয়ার সরকারের কাশ্মীর নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার অরুন্ধতী রায় দেশটির নরেন্দ্র মোদী সরকারেরও একজন কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত। মোদি তৃতীয় মেয়াদে পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার পরপরই তার বিচারের অনুমতি দেওয়া হল।
বক্তব্যের ১৪ বছর পর অরুন্ধতীর বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্তে বিস্মিত ও বিভ্রান্ত আইনজীবীরা। তার বিরুদ্ধে আসলে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছিল, কিন্তু ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০২২ সালের মে মাসে ঔপনিবেশিক আমলের রাষ্ট্রদ্রোহ আইন স্থগিত করেছে। কিন্তু এখন বেআইনী কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইনের (ইউএপিএ) অধীনে বিচারের অনুমতি দেওয়ায় রাষ্ট্র ওই স্থগিতাদেশ এড়িয়ে গিয়ে মামলা এগিয়ে নিতে পারবে। রাষ্ট্রের এ পদক্ষেপকে অনেকে সমালোচকদের মুখ বন্ধ করার মোদির আরেকটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
লেখক অমিতাভ ঘোষ সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন: অরুন্ধতী রায়ের মামলা নিয়ে তাড়াহুড়ো একেবারেই বিবেকবর্জিত। তিনি একজন মহান লেখক এবং মতামত দেওয়ার অধিকার তার রয়েছে। এক দশক আগে তিনি যা বলেছিলেন তার জন্য তার বিচারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিবাদ হওয়া উচিত।
ইউডি/এজেএস

