বিশ্বজুড়ে আক্রান্তের হার বাড়ছে, আতংকের নাম পুরুষাঙ্গের ক্যানসার

বিশ্বজুড়ে আক্রান্তের হার বাড়ছে, আতংকের নাম পুরুষাঙ্গের ক্যানসার

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ২৩ জুন, ২০২৪, আপডেট ১২:৪৫

বিশ্বব্যাপী পুরুষাঙ্গের ক্যানসারে আক্রান্তের হার বাড়ছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। আবদুল্লাহ সিফাত’র প্রতিবেদন

ব্রাজিলে সাড়ে ৬ হাজার মৃত্যু: পুরুষাঙ্গের ক্যানসার একটি বিরল রোগ। বিশ্বব্যাপী এ ক্যানসারে আক্রান্তের হার বাড়ছে। লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলে গত এক দশকে এই ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ৬ হাজার ৫০০ জনের বেশি পুরুষের অঙ্গচ্ছেদ করতে হয়েছে। পুরুষাঙ্গের ক্যানসারের লক্ষণ শুরু হয় একটি ঘা দিয়ে। যা কিছুতেই নিরাময় হয় না এবং ওই ঘা থেকে তীব্র গন্ধযুক্ত স্রাব বের হতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে রক্তপাত হয় এবং পুরুষাঙ্গের রং পরিবর্তিত হয়ে যায়। এই ক্যানসার প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ক্ষত অপসারণ, রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপির মতো চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হওয়ার ভালো সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু যদি চিকিৎসা করা না হয়, তাহলে পুরুষাঙ্গের আংশিক বা সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ এবং আশপাশের যেমন অÐকোষও কেটে ফেলার প্রয়োজন হতে পারে। চিকিৎসকরা বলছেন, পুরুষাঙ্গের ক্যানসার একটি বিরল রোগ। তবে এটি প্রতিরোধযোগ্য। যৌনাচারের সময় জন্মনিরোধক (কনডম) ব্যবহার করা এবং ফিমোসিসের ক্ষেত্রে অগ্রভাগের ত্বক অপসারণে অস্ত্রোপচার করা পুরুষাঙ্গের ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। ফ্রিমলি হেলথ এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের ইউরোলজি বিভাগের ক্লিনিক্যাল লিড নিল বারবার বলেছেন, খতনা করানো জনগোষ্ঠীর মধ্যে পুরুষাঙ্গের ক্যানসারে আক্রান্তের কথা প্রায় শোনা যায় না। দুর্বল স্বাস্থ্যবিধি এবং পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগের নিচে সংক্রমণ, পাশাপাশি ফিমোসিসের মতো অবস্থা যা সামনের চামড়া তুলে নেওয়া কঠিন করে তোলে। অরক্ষিত শারীরিক সংসর্গ, বিশেষত কনডম ব্যবহার না করা এবং দুর্বল স্বাস্থ্যবিধি এই রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। আমেরিকার সেন্টারর্স ফর ডিজিজেস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) জানায়, প্রতিবছর সেখানে এইচপিভি-জনিত যৌনাঙ্গের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। যদিও এই ক্যানসারটি বিরল। এদের মধ্যে ৬৩ শতাংশের কারণ হিসাবে হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাসকে (এইচপিভি) দায়ী করা হয়। কাজেই লক্ষণের বিষয়ে সাবধান থাকতে হবে। যদিও এ রোগে আক্রান্ত হলে মৃত্যুঝুঁকি অনেক কম। কিন্তু মারাত্মক এক রোগ। এর থেকে সাবধান থাকতে হবে।

আক্রান্তের হার যেখানে বেশি: সা¤প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ব্রাজিলে প্রতি এক লাখ পুরুষের মধ্যে ২ দশমিক ১ জনের এই রোগ হয়, যা এ-যাবৎকালে সর্বোচ্চ হার। ব্রাজিলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ২১ হাজার ব্যক্তির পুরুষাঙ্গের ক্যানসার হওয়ার খবর নথিভুক্ত হয়েছে। এতে ৪ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আর গত এক দশকে গড়ে প্রতি দুই দিনে একজনের পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলতে হয়েছে। সংখ্যায় যা ৬ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি। ব্রাজিলের সবচেয়ে দরিদ্র রাজ্য মারানহাও। বিশ্বব্যাপী পুরুষাঙ্গের ক্যানসারে সর্বোচ্চ আক্রান্তের হার এই রাজ্যে বেশি। এখানে প্রতি এক লাখ পুরুষের মধ্যে ৬ দশমিক ১ জন পুরুষাঙ্গের ক্যানসারে আক্রান্ত। সাও পাওলোর এসি ক্যামার্গো ক্যানসার সেন্টারের ইউরোলজি বিভাগের চিকিৎসক থিয়াগো ক্যামেলো মুরাও বলেছেন, আংশিক অঙ্গচ্ছেদের ক্ষেত্রে, পুরুষাঙ্গ দিয়ে প্রস্রাব করায় কোনো জটিলতা হয় না। তিনি আরও বলেন, তবে সম্পূর্ণ অঙ্গচ্ছেদের ক্ষেত্রে মূত্রনালির ছিদ্রটি অÐকোষ ও মলদ্বারের মধ্যে পেরিনিয়ামে স্থানান্তর করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে রোগীকে টয়লেটে বসে প্রস্রাব করতে হয়।

২০৫০ সালের মধ্যে ৭৭% বাড়ার শঙ্কা : শুধু ব্রাজিলে পুরুষাঙ্গের ক্যানসার বাড়ছে তা নয়। সা¤প্রতিক গবেষণা অনুসারে, বিশ্বজুড়ে এই ক্যানসারে আক্রান্তের পুরুষের সংখ্যা বাড়ছে। ২০২২ সালে জেএমআইআর পাবলিক হেলথ অ্যান্ড সার্ভিল্যান্স জার্নাল ৪৩টি দেশের সর্বশেষ তথ্যসংবলিত একটি বড় মাপের বিশ্লেষণের ফলাফল প্রকাশ করেছে। এই ফলাফলে দেখা গেছে, ২০০৮ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে পুরুষাঙ্গের ক্যানসারে আক্রান্তের সর্বোচ্চ ঘটনা পাওয়া গেছে উগান্ডায়। ওই সময় দেশটিতে প্রতি ১ লাখ পুরুষের মধ্যে ২ দশমিক ২ জন এই ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। এর পরের অবস্থানে ছিল ব্রাজিল, প্রতি ১ লাখ পুরুষের মধ্যে ২ দশমিক ১ জন এবং থাইল্যান্ডে প্রতি ১ লাখ পুরুষের মধ্যে ১ দশমিক ৪ জন এই ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। আর সর্বনি¤œ অবস্থানে ছিল কুয়েত, এই দেশে প্রতি ১ লাখ পুরুষের মধ্যে শূন্য দশমিক ১ জন এই ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। চীনের সান ইয়াত-সেন বিশ্ববিদ্যালয়ের লেইওয়েন ফু ও তিয়ান তিয়ানের নেতৃত্বে একদল গবেষক গবেষণাটি করেছেন। তারা বলেছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এখনো পুরুষাঙ্গের ক্যানসারের উচ্চ প্রকোপ ও মৃত্যুর হার বেশি হলেও বেশির ভাগ ইউরোপীয় দেশে এ ঘটনা বাড়ছে। গবেষকেরা বলেছেন, ইংল্যান্ডে পুরুষাঙ্গের ক্যানসারে আক্রান্তের হার বেড়েছে। ১৯৭৯ থেকে ২০০৯ সালে প্রতি ১ লাখ পুরুষের মধ্যে ১ দশমিক ১ জন থেকে বেড়ে ১ দশমিক ৩ জনে দাঁড়িয়েছে। জার্মানিতে ৫০ শতাংশ বেড়েছে। দেশটিতে ১৯৬১ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে প্রতি ১ লাখ পুরুষের মধ্যে ১ দশমিক ২ জন থেকে বেড়ে ১ দশমিক ৮ জনে দাঁড়িয়েছে।গেøাবাল ক্যানসার রেজিস্ট্রি প্রেডিকশন টুলের তথ্য অনুসারে, এই পরিসংখ্যানগুলো শুধু উচ্চতর ক্যানসার ঝুঁকির কারণে করা হয়েছে। তারা ধারণা করছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী পুরুষাঙ্গের ক্যানসারের ঘটনা ৭৭ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যাবে। মূলত বয়স্ক পুরুষদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৬০ বছর বয়সী পুরুষদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এ ঘটনা ঘটেছে। ব্রাজিলিয়ান সোসাইটি অব ইউরোলজির চিকিৎসক মাউরিসিও ডেনার কর্ডেইরো বলেছেন, যৌন ভাইরাস হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাসের (এইচপিভি) ক্রমাগত সংক্রমণ এই রোগের ঝুঁকির প্রধান একটি কারণ। শারীরিক সংসর্গের সময় এইচপিভি সংক্রমণ হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এই সংক্রমণ মুখ ও পুরুষাঙ্গের ক্যানসারের কারণ হতে পারে। মাউরিসিও ডেনার কর্ডেইরো বলেন, সংক্রমণ ও ক্ষত প্রতিরোধে এইচপিভির বিরুদ্ধে গণটিকা দরকার। ব্রাজিলে এই টিকা দেওয়ার হার অনেক কম। ‘ব্রাজিলে ভ্যাকসিন সহজলভ্য হওয়া সত্তে¡ও মেয়েদের এইচপিভি টিকা দেওয়ার হার কম, মাত্র ৫৭ শতাংশ। আর পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ৪০ শতাংশের বেশি নয়। রোগ প্রতিরোধের জন্য টিকা দেওয়ার আদর্শ হার হলো ৯০ শতাংশ।’মাউরিসিও বিশ্বাস করেন, টিকা সম্পর্কে ভুল তথ্য, এর কার্যকারিতা সম্পর্কে ভিত্তিহীন সন্দেহ এবং টিকার প্রচারের অভাবে মানুষ সচেতন নয়, টিকা কম নিচ্ছে।

যেসব কারণে ঝুঁকি বাড়ে : ব্রিটেনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) ওয়েবসাইট অনুসারে, ধূমপান পুরুষাঙ্গের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। পুরুষাঙ্গ পরিষ্কার রাখতে অগ্রভাগের চামড়া (পুরুষাঙ্গ আচ্ছাদিত ত্বক) যদি টানতে সমস্যা হয় (ফিমোসিস), তাহলে পুরুষাঙ্গের ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। বিশেষজ্ঞরা জানান, মানুষ যখন পুরুষাঙ্গের আচ্ছাদিত ত্বক উন্মুক্ত করে না এবং সঠিকভাবে সামনের চামড়া পরিষ্কার করতে ব্যর্থ হয়, তখন এটি থেকে একধরনের ক্ষরণ হয়। ওই ক্ষরণ চামড়ার ভেতর জমা হয়। যা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের জন্য অত্যন্ত অনুক‚ল পরিবেশ তৈরি করে। আর যদি এটা বারবার ঘটে, তবে টিউমার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ক্যানসার রিসার্চ ইউকের মতে, পুরুষাঙ্গের ক্যানসারে আক্রান্ত ৯০ শতাংশের বেশি পুরুষ, যাঁদের রোগটি রোগ প্রতিরোধক্ষমতার অঙ্গ লিম্ফ নোডে ছড়িয়ে পড়েনি, তাঁরা পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় ধরে বেঁচে থাকেন।

লক্ষণগুলো কি : পুরুষাঙ্গে ক্যানসার এমন এক ধরনের ক্যানসার, যার ফলে পুরুষাঙ্গ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সময় মতো সঠিক চিকিৎসা না করালে পুরুষাঙ্গ সম্পূর্ণ বাদ পর্যন্ত দিতে হতে পারে। বেশিরভাগ পুরুষরা অনেক সময়ই যৌনাঙ্গের দিকে তেমন একটা নজর দেন না। গবেষকদের মতে, প্রতিদিন অন্তত একবার নিজের যৌনাঙ্গ ভাল করে লক্ষ্য করা উচিত। যৌনাঙ্গে কোনও রকম পরিবর্তন দেখলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার। বিশেষজ্ঞদের মতে, পেনাইল ক্যানসার বিরল। চিকিৎসকদের মতে, সময় মতো চিকিৎসা করাতে পারলে বেঁচে যাওয়া সম্ভব। সাধারণত পঞ্চাশোর্ধ্ব পুরুষরাই এই পেনাইল ক্যানসাওে আক্রান্ত হন। এই ক্যানসার প্রধানত তিন রকমের হয়। এক, স্কুয়ামাস সেল পেনাইল ক্যানসার, দুই, কারসিনোমা পেনাইল ক্যানসার ও তিন, মেলানোমা অফ দ্য পেনিস। এই তিন রকমের পেনাইল ক্যানসারের মধ্যে ৯০ শতাংশই হল, স্কুয়ানোমা পেনাইল ক্যানসার৷ এই ক্যান্সারে প্রথমে যৌনাঙ্গের কোষগুলি আক্রান্ত হয়, তার পর তা ছড়িয়ে যায় যৌনাঙ্গের চারদিকে। বেশ কিছু লক্ষণ দেখা যায় এই ধরনের ক্যানসারে৷ সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণটি হল, যৌনাঙ্গ থেকে রক্তপাত। ব্রিটেনের একাধিক ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের মতে, পেনাইল ক্যানসারে প্রথমে যৌনাঙ্গের উপরের চামড়া থেকে রক্ত বের হতে থাকে। এ ছাড়াও যৌনাঙ্গের ত্বক থেকে এক ধরনের তীব্র দুর্গন্ধ-যুক্ত তরল নির্গত হয়। যৌনাঙ্গে র‌্যাশও দেখা যায়।বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের লক্ষণ দেখা গেলেই, দেরি না করে চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হওয়া উচিত। ব্রিটেনের ক্যান্সার রিসার্চ প্রকাশিত একাধিক নথি বলছে, এই পেনাইল ক্যানসারের জন্য দায়ি হিউম্যান পেপিলোমা ভাইরাস (ঐচঠ)। সাধারণত পঞ্চাশের বেশি বয়সি পুরুষদের এই ধরনের ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা থাকে৷ তবে চল্লিশ বছরের কম বয়সিদেরও অনেক সময় পেনাইল ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে দেখা যায়।

দেশে আক্রান্তের হার বেশি কোন ক্যানসারে: ২০৫০ সালে সারা বিশ্বে ক্যানসারে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ৩৫ মিলিয়নে পৌঁছাবে, যা ২০২২ সালের সংখ্যার তুলনায় প্রায় ৭৭ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে এবং ২০৫০ সালে দেশে ২০২২ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি নতুন ক্যানসার রোগী শনাক্ত হতে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডবিøউএইচও)। এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, ১৮৫টি দেশ এবং ৩৬ ধরনের ক্যানসারের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশের বিষয়ে বলা হয়েছে, খাদ্যনালী, ঠোঁট, ওরাল ক্যাভিটি এবং ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত সবচেয়ে বেশি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির সাবেক সভাপতি মোল্লা ওবায়েদুল্লাহ বাকী গণমাধ্যমকে বলেন, ভেজাল খাবার ও জাংক ফুডের ব্যবহার, অলস জীবনযাপন, দূষণ এবং তামাক ও অ্যালকোহল ব্যবহার বাংলাদেশে ক্যানসারের রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ। হাইপার অ্যাসিডিটি পুরুষ এবং নারী উভয়ের মধ্যেই সাধারণ। এ কারণেই খাদ্যনালীর ক্যানসারের ঘটনা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেরিতে ক্যানসার শনাক্ত মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। ডবিøউএইচও আরও ভবিষ্যদ্বাণী করেছে যে ২০৫০ সালে সারা বিশ্বে ক্যানসারে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ৩৫ মিলিয়নে পৌঁছাবে, যা ২০২২ সালের সংখ্যার তুলনায় প্রায় ৭৭ শতাংশ বেশি।ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসারের (আইএআরসি) একটি সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে সংস্থাটি বলছে, প্রায় পাঁচজনের মধ্যে একজন তাদের জীবদ্দশায় ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। তাছাড়া প্রতি নয়জন পুরুষের মধ্যে একজন এবং ১২ জন নারীর মধ্যে একজন ক্যানসারে মারা যায়। গবেষণায় তামাক, অ্যালকোহল, স্থূলতা এবং বায়ু দূষণকে বিশ্বব্যাপী ক্যানসার রোগীর বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশের চিকিৎসকরা বলছেন, পুরুষদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যানসারের প্রকোপ বেশি এবং নারীদের মধ্যে স্তন ও জরায়ুর ক্যানসার সবচেয়ে বেশি। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ অ্যান্ড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক এম নিজামুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, দেশে ক্যানসারের পুরো চিত্র পেতে আমাদের শিগগিরই এ সংক্রান্ত গবেষণা শুরু করতে হবে। আমাদের কাছে হাসপাতাল-ভিত্তিক কিছু তথ্য আছে, কিন্তু তা সম্পূর্ণ নয়। ডবিøউএইচওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে আনুমানিক ৯.৭ মিলিয়ন মানুষ ক্যানসারে মারা গেছে। ডবিøউএইচও ১১৫টি দেশের সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করেছে যেখানে দেখা গেছে বেশিরভাগ দেশ সার্বজনীন স্বাস্থ্য কভারেজের অংশ হিসেবে ক্যানসার এবং এর পরিষেবাকে পর্যাপ্তভাবে অর্থায়ন করে না। আইএআরসি এর গেøাবাল ক্যানসার অবজারভেটরির নতুন তথ্যে দেখা গেছে যে, ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী যারা ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন ও মারা গেছেন তাদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ ১০ ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন।

প্রোস্টেট ক্যানসারের প্রবণতাও বাড়ছে: বিশ্বব্যাপী পুরুষের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ যে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়, সেটা হচ্ছে প্রোস্টেট ক্যানসার। সাধারণত যেসব পুরুষের বয়স ষাটের উপরে, তারাই বেশি প্রোস্টেট ক্যানসারে আক্রান্ত হন। আফ্রিকা, আমেরিকা, এশিয়ান আমেরিকান ও মধ্য আমেরিকানদের মধ্যেই প্রোস্টেট ক্যানসারের প্রবণতা বেশি। তবে বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশে প্রোস্টেট ক্যানসারের প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। পুরুষের মূত্রথলির নিচে মূত্রনালীর চার দিকে বাদাম আকৃতির একটি গ্রন্থি থাকে, এই গ্রন্থিকে বলা হয় প্রোস্টেট গ্রন্থি এবং এই গ্রন্থিতে ক্যান্সার হলে সেটাকে প্রোস্টেট ক্যানসার বলা হয়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে পুরুষের প্রোস্টেট গ্রন্থির আকার বাড়তে থাকে এবং প্রস্রাবে কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ ধরনের সমস্যাকে বয়সজনিত, সাধারণ প্রোস্টেট বৃদ্ধিজনিত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এ ধরনের সমস্যা নিয়ে প্রোস্টেট ক্যান্সারও প্রকাশ পেতে পারে। এজন্যই বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রতিটি পুরুষের নিয়মিত ফলোআপে থাকতে হয়, কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রোস্টেট ক্যান্সারের কোনো লক্ষণ থাকে না। সকল পুরুষই যেহেতু শরীরে টেস্টোস্টেরন নামক পুরুষ হরমোন বহন করেন, তাই বয়স বাড়ার সাথে সাথে পুরুষের প্রোস্টেট ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে থাকে। অর্থাৎ কোনো পুরুষই প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকিমুক্ত নয়। অন্যান্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে—
কিছুক্ষেত্রে যেমন- ঐচঈ১ ও ইজঈঅ ১, ২ জিন মিউটেশন যাদের মধ্যে রয়েছে, তারা প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। সাধারণত দেখা যায় ৪০ বছরের কম বয়সে প্রোস্টেট ক্যানসার হয় না বললেই চলে। তবে ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে প্রোস্টেট ক্যানসার বেশি দেখা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ৬০ শতাংশ রোগীর বয়স ৬৫ বছরের উপরে। যাদের পরিবারে ভাই, বাবা, চাচা, দাদা কেউ একজন প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন, সেসব পুরুষের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় নয়গুণ বেশি। যাদের মধ্যে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বেশি বা ওএঋ১বেশি আছে, তারা উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন। এ ছাড়াও আরও কিছু কারণ রয়েছে যেমন: স্থুলতা, যৌনবাহিত রোগ, যারা শারীরিক পরিশ্রম কম করেন, ধূমপান করেন, যারা তেল চর্বি মসলা জাতীয় খাবার, লাল মাংস ইত্যাদি বেশি খান এবং সবুজ সতেজ শাক-সবজি কম খান, তাদের মধ্যেও প্রোস্টেট ক্যান্সারের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। প্রাথমিক অবস্থায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো লক্ষণ থাকে না। স্থানীয়ভাবে বিস্তৃত অবস্থায় যে সকল লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে। ঘনঘন প্রস্রাব হওয়া ও প্রস্রাব হওয়ার পরও মনে হবে ক্লিয়ার হয়নি।থেমে থেমে প্রস্রাব হওয়া এবং ফোটায় ফোটায় ঝরা। প্রস্রাবের সাথে রক্ত বা শুক্রাণু যাওয়া। প্রস্রাব আটকে রাখতে না পারা। প্রস্রাবে ইনফেকশন হওয়া।
যারা প্রোস্টেট ক্যানসারের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন বা উপরোক্ত লক্ষণসমূহের মধ্যে কোনো একটা বিদ্যমান রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে শারীরিক পরীক্ষা, ডিজিটাল রেক্টাল এক্সামিনেশন ও চঝঅ পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা ধারণা করতে পারি, তার প্রোস্টেট ক্যান্সার থাকতে পারে কিনা। নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমরা বায়োপসি পরীক্ষা করি। এর পর কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হয়, শরীরের মধ্যে এর বিস্তৃতি কতদূর হয়েছে। বেশিরভাগ প্রোস্টেট ক্যান্সারের রোগীদের দেখা যায়, মেরুদÐের হাড়ের মধ্যে ছড়ানো অবস্থায় চিকিৎসকের কাছে আসে। তখন ক্যান্সারের চিকিৎসার পাশাপাশি হাড়ের চিকিৎসা করাও জরুরি হয়ে পড়ে। নতুবা হাড়ে তীব্র ব্যাথা এমনকি হাড় ভেঙেও যেতে পারে। চিকিৎসা পদ্ধতি বেশ জটিল। কিন্তু সঠিক সময়ে যথাযথ চিকিৎসা নিলে একজন প্রোস্টেট ক্যান্সার রোগী দীর্ঘদিন ভালো থাকতে পারেন।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২৩ জুন ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা

পুরুষের ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি কেন: পুরুষের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি নারীর চেয়ে বেশি। আর জিনগত পার্থক্যের কারণেই পুরুষদের ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। ‘জার্নাল অব দ্য ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউট’য়ে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। গবেষণা বলছে, নারীদের চেয়ে পুরুষের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। কারণ নারী ও পুরুষের ‘ডিএনএ’য়ের পার্থক্য রয়েছে।
তারা বলছেন, লিঙ্গ নির্ধারক ‘ওয়াই-ক্রোমোজোম’, যা শুধুই পুরুষের থাকে, তার নির্দিষ্ট কিছু জিন তাদের কার্যক্ষমতা হারালে পুরুষের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। ৯ হাজার ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর জিনের কার্যক্ষমতা নিয়ে গবেষণা চলানো হয়। গবেষণায় দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের কোষে থাকা ‘ওয়াই ক্রোমোজোম’য়ের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ জিন তাদের কার্যক্ষমতা হারানোর কারণে পুরুষের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে।
গবেষণার লেখক, স্পেনের বার্সেলোনা ইনস্টিটিউট ফর গেøাবাল হেলথ’য়ের হুয়ান রামোন গঞ্জালেজ বলেন, ভ্রণের লিঙ্গ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘ওয়াই ক্রোমোজোম’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে কিছু পুরুষের কোষ থেকে এই ‘ওয়াই ক্রোমোজোম’ পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন যায়। ফলে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। ‘ওয়াই ক্রোমোজোম’য়ের ছয়টি জিন মূলত ‘সেল-সাইকেল রেগুলেশন’ নিয়ন্ত্রণ করে, যার অবর্তমানে তৈরি হয় ‘টিউমার’। গবেষণা মতে, নারী ও পুরুষের মধ্যকার জৈবিক পার্থক্য বোঝা ক্যান্সারের প্রতিরোধ ও প্রতিষেধনের উপায় বের করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় আরও জানা যায়, জৈবিক বিভিন্ন বিষয়ের কারণেও পুরুষের ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি। জৈবিক দিক হলো ‘ওয়াই ক্রোমোজোম’, যার কারণেই একজন মানুষ পুরুষ হিসেবে জন্মায়। আর দূষিত উপাদানের প্রভাব, তামাক ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য সেবনও ‘ওয়াই ক্রোমোজোম’য়ের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

ইউডি/এজেএস

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading