স্কুলশিক্ষার্থীসহ দেশের ৫০ লাখ মানুষ জড়িত: অনলাইন জুয়া’র ভয়াল থাবা

স্কুলশিক্ষার্থীসহ দেশের ৫০ লাখ মানুষ জড়িত: অনলাইন জুয়া’র ভয়াল থাবা

উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ২৫ জুন, ২০২৪, আপডেট ১৪:০০

বাংলাদেশে জুয়া নিষিদ্ধ হওয়া সত্তে¡ও অনলাইনে জুয়া খেলার প্রচুর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, লোভে পরে নিঃস্ব হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। আরাফাত রহমান’র প্রতিবেদন

অপরাধের সাম্রাজ্য,প্রতারণার ফাঁদ: অনলাইন জুয়ার সঙ্গে দেশের ৫০ লাখ মানুষ জড়িত। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় মধ্যবয়সী হতে শুরু করে যুবসমাজ অবধি এমনকি স্কুলশিক্ষার্থীরাও এই ভয়ানক ফাঁদে পা দিয়াছে। ভয়াল এ থাবা থেকে দেশের তরুণ প্রজš§সহ সব-বয়সীদের রক্ষা করতে বারবার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টরা। বন্ধ করে দেওয়ার পরও কোনো না কোনো না কোনো ভাবে ফের বিভিন্ন জুয়া ও বাজির অসংখ্য প্ল্যাটফর্ম উš§ুক্ত হচ্ছে অনলাইনে। ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লোভনীয় অফারের নানা ভিডিও এবং বুস্ট করা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অধিকাংশ জুয়া বা বেটিং সাইটগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। এসব সাইটে বুঝে না বুঝে একটি মাত্র ক্লিকে অ্যাপস কিংবা ওয়েবসাইটের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে শুরুতে সদস্য টানতে অবলম্বন করা হচ্ছে নানা কৌশল। অল্প টাকায় লাখপতি হওয়া বা দ্বিগুণ মুনাফার লোভে অন্ধকার এ জগতে পা বাড়াচ্ছে মানুষ। একসময় লোভে পড়ে অতিরিক্ত অর্থ বিনিয়োগ করেন তারা। তখনই বেরিয়ে আসে আসল রূপ। মোটা অঙ্কের টাকা মুহূর্তেই হারিয়ে যায় জুয়ার বোর্ডে। লোভ আর নেশায় বুঁদ হওয়ার পরপরই হঠাৎ লাপাত্তা হয়ে যায় এসব নামসর্বস্ব ওয়েবসাইট। শুরু হয় আর্থিক, মানসিক ও শারীরিক ক্ষতি।

অনলাইনে শত শত জুয়ার সাইড রয়েছে। ওয়ানএক্সবেট, বেটউইনার, বেট৩৬৫, মেলবেট, প্যারিম্যাচ সাইডসহ শতাধিক সাইডে জুয়া হালে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এসব জুয়ার সাইটের বিজ্ঞাপন যেমন বাংলাদেশের কিছু বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে দেখা যায়, তেমনই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, বিশেষ করে ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলগুলোয় প্রচার হতেও দেখা যাচ্ছে। ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানসহ সিনেমা-নাটকের প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা- অভিনেত্রীদের এ জুয়ার বিজ্ঞাপনে দেখা যায়। এতে করে স্কুল, কলেজ, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ তরুণ প্রজন্ম প্রভাবিত হয়ে জুয়া খেলায় আসক্ত হচ্ছেন। এমনকি অনলাইনে বিভিন্ন জুয়ার অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে অ্যাকাউন্ট খোলা সহজ হওয়ায় অনেক অশিক্ষিত তরুণ-তরুণীও এসব জুয়া খেলায় জড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশে জুয়া নিষিদ্ধ হওয়া সত্তে¡ও এটি চলছে। অনলাইন জুয়া খেলার প্রচুর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যেখানে সাধারণ মানুষ মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিসের মাধ্যমে জুয়া খেলার টাকা লেনদেন করছেন। এই জুয়া সা¤প্রতিক সময়ে ডিজিটাল মাধ্যমে নতুন রূপ পেয়েছে। অনলাইনে জুয়ার অ্যাপসের সহজলভ্যতা রয়েছে। যে কেউ চাইলেই সহজেই সফটওয়্যার সেটআপ করে ঘরে বসেই অ্যাকাউন্ট করে এই অনলাইনে জুয়া খেলতে পারেন। আবার এই সব অনলাইন জুয়াতে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য জুয়ার সাইটগুলো কমিশনের ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের এজেন্ট নিয়োগ দিয়ে থাকে। যেখানে ঘরে বসেই মানুষ বিভিন্ন জুয়ার অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারছেন। এতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানার সুযোগ থাকছে না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেট ৩৬৫ ডটকম, ৮৮ স্পোর্টস ডটকম, রেবটওয়ে ডটকম, বেটফ্রিড ডটকম, ডাফাবেট ডটকম, বেটফেয়ার ডটকম, ইউনিবেট ডটকম, বেট ভিক্টর ডটকমসহ এমন অর্ধশতাধিক জুয়ার অনলাইন সাইট রয়েছে। এসব বেটিং সাইটের মাধ্যমে শুধু শিক্ষার্থী নয়, সর্বস্ব হারাচ্ছে লাখো তরুণ। সে সঙ্গে অল্প টাকায় অধিক লাভের নেশায় পড়ে বিপথগামী হচ্ছেন তারা।

বাড়ছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন: অনলাইন জুয়ায় যারা জড়িত তারা মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে মাসে ১৫০ কোটি টাকার বেশি অবৈধভাবে লেনদেন করে। এভাবে বছরে লেনদেন হয় ১ হাজার ৬০০ কোটি থেকে ২ হাজার কোটি টাকা। এই টাকা ভার্চুয়াল মুদ্রায় রূপান্তরিত করে এবং হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়। জুয়ার এমন ১৮৬টি অ্যাপ ও লিংকের তথ্য পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডির মতে, জুয়ার সাইট প্রতিনিয়ত বাড়ছে। পাশাপাশি বাড়ছে অস্বাভাবিক লেনদেনের এজেন্ট নম্বর সংখ্যাও। ফলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা লেনদেনের পরিমাণও বাড়ছে। এই জুয়ায় দেশের সব মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট নম্বরই ব্যবহƒত হয়। এ রকম প্রায় দেড় হাজার নম্বরের তথ্য পেয়েছে সিআইডি। এই অবৈধ লেনদেন বন্ধ করতে সিআইডি স¤প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংককে কিছু সুপারিশ দিয়েছে। সিআইডি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। দেশে কতগুলো জুয়ার সাইট ও অ্যাপ চালু আছে, তার সঠিক তথ্য নেই কোনো সংস্থার কাছে। দেশে ১৩টি প্রতিষ্ঠান মোবাইল ব্যাংকিংয়ে আর্থিক সেবা দিয়ে থাকে। এদের এজেন্ট নম্বরগুলো জুয়াড়িরা দৈনিক ভিত্তিতে এবং লাখে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা কমিশন ভিত্তিতে ভাড়া নেয়।

ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের পদক্ষেপ: অনলাইনে জুয়া ও হুন্ডি বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এর সঙ্গে অবৈধ অর্থ লেনদেনে জড়িত থাকার সন্দেহে তিন বছরে মোবাইল ফোনে আর্থিক সেবাদাতা কোম্পানির ৪৮ হাজার ৫৮৬টি ব্যক্তিগত হিসাব স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে হুøি সংশ্লিষ্টতা সন্দেহে এমএফএসের ৫ হাজার ২৯টি এজেন্টশিপ বাতিল এবং ১০ হাজার ৬৬৬টি এজেন্ট হিসাবের লেনদেন বøক করা হয়েছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী আর্থিক খাতের গোয়েন্দা সংস্থা হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) নেওয়া এসব পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। মাহমুদ আলী সংসদকে বলেন, এ পর্যন্ত এ সংক্রান্ত অভিযোগে ৫ হাজার ৭৬৬ জন এজেন্টের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সিআইডিতে তথ্য পাঠানো হয়েছে। হুøি লেনদেনে জড়িত সন্দেহে ৫ হাজার ২৯টি এমএফএস এজেন্টশিপ বাতিল এবং সংশ্লিষ্টতা সন্দেহে ২১টি মানিচেঞ্জার প্রতিষ্ঠান ও এদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ৩৯টি হিসাবের তথ্য সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে অবৈধ হুন্ডি, গেমিং, বেটিং, ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে এমএফএস কোম্পানিগুলো বিএফআইইউ এর নির্দেশনায় এ পর্যন্ত ১০ হাজার ৬৬৬টি এজেন্ট হিসাবের লেনদেন বøক করেছে। একই অভিযোগে ১০৯৬টি ওয়েবসাইট, ১৮২টি অ্যাপ এবং ফেইসবুক, ইউটিউব ও ইন্সটাগ্রামসহ ১০০২টি সোশাল মিডিয়া পেইজ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিটিআরসি ও সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সরবরাহ করা হয়েছে।

জুনাইদ আহমেদ পলক

সম্মিলিতভাবে ড্রাইভ দেওয়া হচ্ছে: অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে সম্মিলিতভাবে একটি ড্রাইভ দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। সোমবার (২৪ জুন) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা জানান প্রতিমন্ত্রী। অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে টাকা পাচার হচ্ছে- এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অনলাইন জুয়া নিয়ে আমরা মতবিনিময় করেছি। এটাতে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে আমাদের বিভিন্ন বয়সের ছেলেমেয়েরা। এমনকি অনেক বয়স্ক রিটায়ার্ড ব্যক্তিরাও এর মধ্যে আসছেন। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আমরা দেখেছি ৫০ লাখ মানুষ কীভাবে যেন এই অবৈধ জুয়ার সাইটগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। তিনি বলেন, আমরা জুয়ার সাইটগুলোকে বøক করার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি একটা সচেতনতা তৈরি করার চেষ্টা করছি। যেন সাধারণ মানুষ এ ধরনের কোনো প্রলোভনে পড়ে প্রতারিত না হন। আমাদের দেশের মুদ্রা যেন বিদেশে পাচার না হয়। একটা সচেতনতা আর একটা প্রযুক্তিগত প্রয়োগ, পাশাপাশি কঠোর আইনের প্রয়োগ। আমরা মোট ২ হাজার ৬০০টি জুয়ার সাইট বøক করেছি। এখন আমরা মোবাইল অ্যাপগুলো প্রতিনিয়ত ব্লক করছি। এটা কন্টিনিউয়াস প্রসেস, চলতে থাকবে।

নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন চায় পুলিশ: বর্তমান তথ্য-প্রযুক্তির যুগে জুয়ার ওয়েবসাইট নিয়ন্ত্রণ করাটা ‘অনেকটা অসম্ভব’ হিসেবে দেখছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারা বলছেন, এ বিষয়গুলো হচ্ছে বাউন্ডারি লেস ক্রাইম। যার নির্দিষ্ট কোনো গøি নেই। এক দেশে ওয়েবসাইট তৈরি করা হয়, আরেক দেশে চালানো হয় আর লেনদেন করা হয় আরেক দেশে। এগুলো সংঘবদ্ধ অপরাধ। এসব জুয়াকে কেন্দ্র করে আগে ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়েতে লেনদেন হতো। এখন দেশীয় বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে। এ সংক্রান্ত অ্যাপসের রেজিস্ট্রেশনও খুব সহজ করা হয়েছে। এজন্য অনলাইন জুয়াগুলো একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। প্রকাশ্যে সরঞ্জামাদি ব্যবহার করে জুয়া খেলা হলে ১৮৬৭ সালের পাবলিক জুয়া আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু অনলাইনে জুয়া খেলা হলে এই আইনে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। তাই অনলাইনে জুয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য নতুন আইন চান পুলিশ কর্মকর্তারা। সংস্থাটি বলছে, অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন করা হলে তা হবে যুগোপযোগী হবে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপির) সিআইডির সাইবার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. রেজাউল মাসুদ গণমাধ্যমকে বলেন, এটি নিয়ন্ত্রণে টাকা-পয়সার লেনদেন কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অপারেটররাই পারবেন এসব কার্যক্রম বন্ধ করতে। তারা যদি নির্দিষ্ট এজেন্ট কিংবা নির্ধারিত নম্বরের লেনদেন তদারকি করেন তাহলে অস্বাভাবিক ক্যাশ-ইন, ক্যাশ-আউট কিংবা টাকা ট্রানজেকশনের বিষয়টি ধরতে পারেন। তারা সচেষ্ট হলে অনলাইন জুয়া ৫০ শতাংশ বন্ধ হয়ে যাবে।

টাকা জোগাড়ে হত্যা, ঘটেছে আত্মহত্যাও: গত বছরের ৩ নভেম্বর আত্মহত্যা করেন ছোট পর্দার অভিনেত্রী হুমায়রা হিমু। পরে র‌্যাব জানায়, ওই আত্মহত্যার পেছনের কারণ অনলাইন জুয়া। বিগো লাইভ নামক একটি অ্যাপসের মাধ্যমে অনলাইনে জুয়া খেলতেন অভিনেত্রী হুমায়রা হিমু। বিগত তিন বছরে জুয়ায় বিপুল পরিমাণ অর্থ খুইয়েছেন তিনি। পরে আর্থিক সংকটে পড়ে যাওয়ায় বন্ধু মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন রুফি ওরফে উরফি জিয়ার কাছ থেকে নানা সময় টাকা নেন হিমু। সর্বশেষ হিমুর বাসায় জিয়াউদ্দিন এলে এসব বিষয় নিয়ে বাকবিতøার একপর্যায়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। ওই ঘটনায় হিমুর বন্ধু জিয়াউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ২৭ এপ্রিল চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় গলায় ফাঁস দিয়ে পিপলু দে নামে যুবক আত্মহত্যা করেন। নিহত পিপলু দে চন্দনাইশ উপজেলার কাঞ্চনগর এলাকার জগদিশ দে’র ছেলে। জানা যায়, অনলাইন জুয়ায় সব হারিয়ে লোহাগাড়ার বটতলী মোটরস্টেশনের ডা. মাহমুদুর রহমানের ভাড়া বাসায় আত্মহত্যা করেন তিনি। এছাড়াও চলতি বছরের ফেব্রæয়ারি মাসে রাজবাড়ীর কালুখালীতে বিকাশের এক এজেন্টকে হত্যার ঘটনা ঘটে। জানা যায়, অনলাইনে জুয়া খেলায় হেরে নগদ টাকা পাওয়ার আশায় বিকাশের এজেন্ট শরিফ খাঁনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। জড়িত থাকার অভিযোগে মো. তরিকুল ইসলাম (২০) নামের এক অনলাইন জুয়াড়িকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

মূলহোতারা থাকছেন আড়ালে-আবডালে: ওয়ার্ল্ড গ্যাম্বলিং মার্কেট রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২২ সালে শুধুমাত্র অনলাইন জুয়ার বাজারমূল্য ছিল ৬৩৫৩ কোটি মার্কিন ডলার। ২০২৩ সালে এর ব্যাপ্তি ১১.৭ শতাংশ বাড়বে বলে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে এর ব্যাপ্তি কেমন হবে? যদিও এখন পর্যন্ত এর সঠিক হিসাব জানা যায়নি। তবে অনলাইন জুয়ায় বাজারমূল্যের গ্রাফ ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়াকড়ির কারণে বেশ সতর্ক এসব কার্যক্রমের মূলহোতারা। এখন আর আগের মতো ঢাকঢোল পিটিয়ে এসব ছড়ানো হচ্ছে না। মূলহোতারা থাকছেন আড়ালে-আবডালে। বিদেশে থেকে খুব স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে পরিচালনা করছেন তাদের কার্যক্রম। অন্যদিকে, দেশে থাকা তাদের এজেন্টরা সুকৌশলে করছেন সহযোগিতা। বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকার মালিক হচ্ছেন তারা (দেশীয় এজেন্ট)। এ টাকার প্রায় শতভাগ লেনদেন হচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। কেন মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে অনলাইন জুয়া-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবাধ তথ্য-প্রযুক্তির নেতিবাচক সুযোগ কাজে লাগিয়ে অনলাইনে গড়ে তোলা হয়েছে অপরাধের বিরাট এ সাম্রাজ্য। পদে পদে দেওয়া হচ্ছে লোভনীয় অফার। যেগুলো মূলত টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ফাঁদ। সেই ফাঁদে পা দিয়ে শুধু অর্থ নয়, নৈতিক স্খলনও ঘটছে অনেকের। বারংবার কঠোরতা দেখিয়েও নানা ফাঁকফোকরে মহামারি নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না বলছেন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্টরা। ফলে দ্রæত ছড়িয়ে পড়ছে অনলাইন গ্যাম্বলিং (জুয়া), বেটিং (বাজি) আর ক্যাসিনো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত ও শক্ত তদারকি না করলে অনলাইনের এসব অপরাধ দমন করা কঠিন হয়ে যাবে। কারণ, তথ্য-প্রযুক্তির অবাধ ধারায় অধিকাংশ বেটিং, গ্যাম্বলিং, ক্যাসিনো ওয়েবসাইট ও অ্যাপস নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে দেশের বাইরে থেকে। তাই কঠোরতার পাশাপাশি তথ্য-প্রযুক্তির বিভিন্ন খাতে জোরদার করতে হবে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা। এছাড়া এসব কার্যক্রমে জড়িত দেশীয়দের মুখোমুখি করতে হবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির। তবেই কিছুটা হলেও কমতে পারে এসব কার্যক্রম।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, দীর্ঘ বছর ধরেই অনলাইন জুয়ার প্রবণতা আমরা দেখছি। বিশ্বকাপ কিংবা ঘরোয়া এবং এর বাইরে যে আয়োজনগুলো আছে, এগুলোকে কেন্দ্র করে অনলাইন জুয়ার যে প্রচারণার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ জড়িয়ে যাচ্ছে এবং এই জড়িয়ে যাওয়ার মধ্যে অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়; বাজিও ধরতে হয়। এই বাজি ধরাকে কেন্দ্র করেই অর্থের প্রয়োজন হয়। কখনো কখনো দেখা যায় যারা অনলাইন জুয়া বা বেটিংয়ে আসক্ত, তারা এই অর্থগুলো পরিবারের কাছ থেকে বা পড়াশোনাকেন্দ্রিক কোনো প্রয়োজনের কথা বলে নিয়ে অনলাইনে জুয়া খেলছে। আবার কোনো কিছু বিক্রি করেও অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হচ্ছে। আরেকটা বড় চিত্র দেখা যায় অনলাইন জুয়ায় যারা আসক্ত, তাদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ মাদক গ্রহণ এবং বিক্রি, চুরি, ছিনতাইয়ের সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে জুয়ার অর্থ সংগ্রহ করার জন্য। এই প্রভাব সবার মাঝেই পড়ে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান

অর্থপাচারের মহোৎসবে টিআইবি’র উদ্বেগ: অনলাইনে জুয়া, বেটিংয়ের প্রচার ও প্রসার এবং অর্থপাচারের মহোৎসবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একই সঙ্গে অবিলম্বে এসব বিজ্ঞাপন বন্ধ করাসহ যুগোপযোগী আইন প্রণয়ণেরও আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, চরম উদ্বেগের সঙ্গে আমরা লক্ষ করছি, দেশে অনলাইন জুয়ার বিজ্ঞাপনের মহোৎসব চলছে। আইনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে শুধু মুনাফার লোভে দেশকে চরম বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া কোনোমতেই দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে না। ইদানীং শহরের বিভিন্ন বিলবোর্ডেও অনলাইন জুয়ার সাইটের বিজ্ঞাপন প্রচারিত হতে দেখা যাচ্ছে। গত বছর উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশন; বিশেষ করে স্পোর্টস চ্যানেলসহ ডিজিটাল ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বাজি ও জুয়ার বিজ্ঞাপনের রমরমা প্রচার চলছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। টিআইবি মনে করে, শুধু অনলাইন জুয়ার মাধ্যমেই দেশ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকাও পাচার হয়ে যাচ্ছে, যা আরও বড় উদ্বেগের বিষয়। গণমাধ্যম ও অপরাধ তদন্ত বিভাগের সূত্রে জানা যায়, শহর থেকে গ্রামসহ সারা দেশে লাখ লাখ মানুষ বিশেষ করে তরুণ সমাজ অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। এর মাধ্যমেই বিপুল অঙ্কের টাকা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ই-ব্যাংকিং, ক্রেডিট কার্ড, ক্রিপ্টোকারেন্সিসহ বিভিন্ন মাধ্যমে পাচার হয়। অনলাইন জুয়ার অ্যাপসের বেশির ভাগই রাশিয়া, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে পরিচালনা করা হলেও বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে এগুলোর স্থানীয় এজেন্ট রয়েছে। এসব এজেন্ট মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে জুয়ায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের সঙ্গে টাকা আদান-প্রদান করে। ফলে এজেন্টদের মাধ্যমেই বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। অথচ চোখের সামনে হয়ে যাওয়া এই পাচার রোধে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটসহ (বিএফআইইউ) কোনও দায়িত্বশীল সংস্থারই কোনও কৌশলগত উদ্যোগ বা প্রচেষ্টার কথা জানা যায় না। একইভাবে সব নিয়ন্ত্রক সংস্থার চোখের সামনে চলছে এ-সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনের বিশাল ব্যবসা, যা অবৈধ ও অনৈতিক বলে জানান তিনি।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২৫ জুন ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, সরকার জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৩ প্রণয়নের উদ্যোগ নিলেও এখনও তা খসড়া পর্যায়েই রয়ে গেছে। অথচ বর্তমান প্রেক্ষাপটে জুয়া প্রতিরোধে কঠোর ও যুগোপযোগী আইন আরও আগেই প্রণীত ও প্রয়োগ হওয়া প্রয়োজন ছিল। এ অবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ, বিএফআইইউ, তথ্য ও স¤প্রচার মন্ত্রণালয়, নাগরিক অধিকার সংগঠনসহ সব অংশীজনের সঙ্গে পর্যালোচনার মাধ্যমে খসড়াটি অতি দ্রæত সংশোধন করে আইন প্রণয়ন ও অবিলম্বে প্রয়োগের জোর দাবি জানাচ্ছে টিআইবি। পাশাপাশি অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে এ সংক্রান্ত সব ধরনের বিজ্ঞাপন প্রচারের সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহŸান জানিয়েছে সংস্থাটি।

ইউডি/এজেএস

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading