সমুদ্রে ফেলা সিগারেটের ফিল্টার থেকে হতে পারে মরণব্যাধি ক্যানসার
উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ০১ জুলাই, ২০২৪, আপডেট ১৩:০০
সমুদ্রের ধারে বসে সিগারেট খেয়ে ফিল্টার ফেলছেন পানিতে অথবা তীরে। মনের অজান্তেই এমন মস্ত বড় ভুল অহরহ করছেন অনেকেই। কারণ এসব ফিল্টার ধ্বংস হতে সময় লাগে ১৮ থেকে ২০ বছর। ততদিনে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিনত হয়ে এই ফিল্টার চরম ঝুঁকিতে ফেলছে সমুদ্রের জীববৈচিত্র, এমনকি মানবদেহের। হতে পারে ক্যানসারের মতো মরণব্যাধীও। বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইন্সটিউটের করা এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমন ভয়ংকর চিত্র।
সমুদ্র পাড়ে বসে মুখে জ্বলন্ত সিগারেট। এতে কেউ সুখটান দিলেও, কেউ কেউ ধোঁয়ায় উড়ান জীবনের টেনশন। কিন্তু, সিগারেট পোড়া শেষে যখনই ফিল্টারটি সৈকতে ফেলা হয়, তখনই টেনশন বাড়ে সমুদ্রের। কেননা, সাগরে পড়ার পর শুরু হয় ফিল্টারের প্রাণঘাতি যাত্রা।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, সমুদ্র দূষণকারী বর্জ্যের মধ্যে সিগারেট ফিল্টার সবচেয়ে ভয়াবহ। কেননা, একটি ফিল্টার সাগরে নিঃশেষ হতে লাগে ১৮ থেকে ২০ বছর। এরপর সেগুলো মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। একটি ফিল্টার থেকে ১৫ হাজার প্লাস্টিক ফাইবার বের হয়। প্রত্যেকটি ফাইবার থেকে ১০০টি করে মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি হয়।
সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিউটের এনভায়রমেন্টাল ওশানোগ্রাফি ও ক্লাইমেট বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আবু শরীফ মো. মাহবুব-ই-কিবরিয়া বলেন, এই যে ফাইবারগুলো বের হবে এগুলো একটা পর্যায়ে গিয়ে ভেঙে প্রতি ফাইবার থেকে প্রায় ১০০ মাইক্রোপ্লাস্টিক বের হয়ে যায়।
কক্সবাজার সৈকতের ১৮টি পয়েন্টে গবেষণা করেছেন সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিউটের বিজ্ঞানীরা। তথ্য বলছে সৈকতের সুগন্ধা, লাবনী, কলাতলী, দরিয়ানগর, পাটোয়ারটেকসহ কয়েকটি পয়েন্টে পাওয়া বর্জ্যের মধ্যে ৫০ থেকে ৯৭ শতাংশ সিগারেট ফিল্টার।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, সিগারেট ফিল্টারে নানা রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা পরবর্তীতে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়ে মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনছে মাছসহ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যে। তার প্রভাব পড়ছে মানবস্বাস্থ্যেও।
সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিউটের এনভায়রমেন্টাল ওশানোগ্রাফি ও ক্লাইমেট বিভাগের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সুলতান আল নাহিয়ান বলেন, সিগারেটের বার যেটা দিয়ে তৈরি সেলুলেড অ্যাসিটেট যেটা, এছাড়াও এর মধ্যে আর্সেনিক, লেড, নিকোটিনের অবস্থান পাওয়া যায়। এগুলো সবগুলোই আমাদের মানবদেহে ক্যানসার তৈরি করে।
সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিউটের এনভায়রমেন্টাল ওশানোগ্রাফি ও ক্লাইমেট বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আবু শরীফ মো. মাহবুব-ই-কিবরিয়া বলেন, যখন মাছ ফিল্টার বা মাইক্রোপ্লাস্টিকটা খেয়ে ফেলে তখন সে আর অন্য কোনো খাদ্য গ্রহণ করতে পারে না। মাইক্রোপ্লাস্টিক তখন তার পেটের মধ্যে কেমিক্যাল রিঅ্যাকশন তৈরি করে ফেলে। এতে করে স্বল্প সময়ে ওই মাছের মৃত্যু হয়ে যেতে পারে। লং টার্ম হিসেব করলে আমাদের খাদ্যচক্রে একটি প্রভাব ঢুকে গেল।
এই দূষণ কমাতে সচেতনতার পাশাপাশি প্রশাসনকে কঠোর হওয়ার পরামর্শ পরিবেশকর্মীদের। তবে প্রশাসন বলছে, ফিল্টার ছোট বর্জ্য হওয়ায় বালির ভেতর থেকে তুলে আনা কঠিন।
কক্সবাজার বাপার সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেন, সরকারের উচিত সমুদ্র সৈকতের নিরাপদ জায়গাটাতে যেন কেউ বিষাক্ত সিগারেট গ্রহণ না করে এবং এখানে যেন কেউ প্লাস্টিক বহন না করে। সেদিকে প্রশাসনের উদ্যোগ নেয়া উচিত।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইয়ামিন হোসেন বলেন, আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি, ট্যুরিস্টরা যদি আমাদের সাহায্য করে সেক্ষেত্রে কাজটি আমাদের জন্য অনেক সহজ হবে। আশা করছি আমরা সবাই মিলে ক্লিন রাখতে পারব।
শুধুমাত্র সৈকত নয়, জনবসতির নালা নর্দমা এবং বিভিন্ন নদীর মাধ্যমেও সিগারেট ফিল্টার চলে যাচ্ছে সাগরে।
ইউডি/এআর

