কোটাবিরোধী আন্দোলন ‘ট্রাম্পকার্ড’

কোটাবিরোধী আন্দোলন ‘ট্রাম্পকার্ড’

সিরাজুল ইসলাম । সোমবার, ০৮ জুলাই, ২০২৪, আপডেট ১২:৫৫

সরকারি চাকরি থেকে কোটা তুলে দেওয়ার দাবিতে চলমান আন্দোলন বেগবান হচ্ছে। বিক্ষোভের কারণে কয়েকদিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা স্থবির হয়ে পড়ছে। রাজধানীর বাইরেও রাজশাহী, কুষ্টিয়া, গাজীপুর, ময়মনসিংহসহ কয়েকটি জায়গায় এই আন্দোলনের সমর্থনে বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থীরা। এরই মধ্যে এই আন্দোলনে বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল সমর্থন দিয়েছে। বিরোধী দল জাতীয় পার্টি এখনো সমর্থন দেয়নি। তবে দলটির নেতা গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদের জাতীয় সংসদে কোটার বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই কোটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী। এই পরিস্থিতিতে আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা। রাজনীতির ট্রাম্প কার্ড হিসেবে এই আন্দোলন লুফে নিতে পারেন সরকারবিরোধীরা। তারা এটাকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন তারা। আন্দোলন ইস্যুতে মুখ খুলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আন্দোলনকারীদের সমালোচনা করে তিনি বলেছেন, সরকার কোটা তুলে দিয়েছিল; কিন্তু হাইকোর্ট সেটা ফিরিয়ে দিয়েছে। আদালতের পক্ষ থেকেই সমাধান আসা উচিত।

সূত্র জানায়, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০১৮ সালের আন্দোলন হঠাৎ করেই দানা বেঁধেছিল। শেষ পর্যন্ত সরকার কোটা পদ্ধতি সংস্কার করতে বাধ্য হয়। আবার সেই কোটা পদ্ধতি পুনর্বহাল হয়। এরই প্রতিবাদে মাঠে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, এবার একইসঙ্গে চলছে দুটি আন্দোলন। সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় ‘প্রত্যয়’ স্কিম বাতিলের দাবিতে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি দিয়েছেন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এতে সমর্থন দিয়েছে কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা। আবার কোটাবিরোধী আন্দোলনের বিষয়টি আদালতের ব্যাপার হওয়ায় কঠোর অবস্থানে যেতে চাইছে না সরকার। কিন্তু আন্দোলনও ছড়িয়ে পড়ছে। আদালতের রায় নিয়ে নির্বাহী বিভাগ সিদ্ধান্তও দিতে পারছে না। আন্দোলন দমনও করতেও পারছে না। ফলে আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা আছে। একই সময়ে শিক্ষকদের আন্দোলনও চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। উভয় আন্দোলনে বিএনপি সমর্থন দেওয়ায় সহিংসতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সেজন্য ছাত্রলীগকে মাঠে নামতে বারণ করা হয়েছে। সময় নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কৌশল নিয়েছে সরকার।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন আমরা দেখেছি। সরকার বিষয়টি সমাধান করেছে। এখন কোটা পুনর্বহাল তো সরকার করেনি, করেছে আদালত। এর বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে নেত্রী (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) তার অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। এই আন্দোলনে বিএনপি কলকাঠি নাড়তে পারে। আন্দোলনে তারা সমর্থন দেওয়ায় সেই ধারণা প্রবল হয়েছে। বিএনপি-জামায়াত শিক্ষার্থীদের আন্দোলন রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে চাইলে পরিস্থিতি দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আন্দোলনের নামে শান্তি, স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে দেওয়া হবে না। ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত সফল হবে না। হতে দেওয়া হবে না। আমরা ঘটনাপ্রবাহের দিকে নজর রাখছি, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর একজন এবং সম্পাদকমণ্ডলীর দুই জন সদস্য বলেন, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ছাত্রলীগ মাঠে নেমেছিল। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়। ত্রিমুখী সংঘর্ষের ফলে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে সংযমী আচরণ করা হচ্ছে। আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহার চেষ্টা করা হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে সেটি চূড়ান্ত পর্যায়ে।

নেতারা বলেন, কোটাবিরোধী আন্দোলন নিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তিনি এই আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আন্দোলনে বিএনপি সমর্থন দিয়ে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। নেতারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল সোমবার সরকারি সফরে চীন গেছেন। ফিরবেন ১১ জুলাই। সেই পর্যন্ত পর্দার অন্তরালে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলতে পারে। তিনি দেশে ফেরার পর হয়তো বিষয়টি সুরাহার দিকে যেতে পারে।
আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, কোটার পক্ষে আদালতের রায় এসেছে। এর বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে সমাধান হলে ভালো হয়।

ছাত্রলীগের সহসভাপতি খাদেমুল বাশার জয় বলেন, কোটা আন্দোলনের প্রতি আমরা তীক্ষè নজর রাখছি। পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টা হলে ছাত্রলীগ করণীয় ঠিক করবে। বিএনপি-জামায়াত যাতে ফায়দা লুটতে না পারে; এ জন্য আমরা সতর্ক আছি। সূত্র জানায়, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০১৮ সালে ঢাকাসহ সারা দেশে বড় ছাত্র আন্দোলন হয়েছিল। তখন ৫৬ শতাংশ কোটা প্রচলিত ছিল। আন্দোলনের মুখে ওই বছরই প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে সরাসরি নিয়োগে কোটা পদ্ধতি তুলে দেয় সরকার। পরিপত্র জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পরে ওই প্রজ্ঞাপনকে চ্যালেঞ্জ করে ২০২১ সালে হাইকোর্টে রিট করা হয়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে চলতি বছরের ৫ জুন সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাসহ অন্য কোটা বাতিল করে জারি করা পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনরায় বহাল থাকবে বলে আদেশ দেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আবেদন করে। তবে হাইকোর্টের রায় আপাতত বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হলে রাষ্ট্রপক্ষকে লিভ টু আপিল (নিয়মিত আপিল) করতে বলেন আদালত। মামলার শুনানি মুলতবি রাখা হয়। আপিল বিভাগের আদেশের আগেই ২ জুলাই থেকে কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। তাদের চার দফা দাবির মধ্যে রয়েছে, ২০১৮ সালে ঘোষিত সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিল ও মেধাভিত্তিক নিয়োগের পরিপত্র বহাল রাখা; পরিপত্র বহাল সাপেক্ষে কমিশন গঠন করে দ্রুত সরকারি চাকরির সব গ্রেডে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাদ দেওয়া (সুবিধাবঞ্চিত ও প্রতিবন্ধী ব্যতীত); সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধা একাধিকবার ব্যবহার করা যাবে না এবং কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্য পদগুলোয় মেধা অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া; দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

প্রধানমন্ত্রী যা বলছেন: রোববার গণভবনে যুব মহিলা লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে কোটাবিরোধী আন্দোলন নিয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমি দেখেছি কোটা আন্দোলন! আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য যে কোটা, সেটা বাতিল করতে হবে, নারীদের কোটা বাতিল করতে হবে, অমুক-তমুক। সেটা একবার বাতিল করা হয়েছিল। আমার প্রশ্ন, যারা এর আগে কোটাবিরোধী আন্দোলন করেছিল, তারা পাবলিক সার্ভিস কমিশনের অধীনে কতজন পরীক্ষা দিয়েছিল? কতজন পাস করেছিল? সেই হিসাবটা বের করা দরকার। তারা দেখাক পরীক্ষা দিয়ে বেশি পাস করেছিল, মেয়েরা বেশি পাস করে বেশি চাকরি পেয়েছে কিনা, সেটা আগে তারা প্রমাণ করুক।’

তিনি বলেন, ‘হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে এভাবে আন্দোলন- এটা তো বিচারাধীন বিষয়। আমরা সরকারে থেকে কথা বলতে পারি না। হাইকোর্ট রায় দিলে সেখানথেকেই আসতে হবে। কিন্তু আন্দোলনের নামে পড়াশোনা-সময় নষ্ট করার যৌক্তিকতা আছে বলে আমি মনে করি না।’ এদিকে, শনিবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি এখন শিক্ষকদের আন্দোলনের ওপর ভর করবে। আবার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোটা আন্দোলনের ওপর ভর করবে। বিএনপি খালেদা জিয়াকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে আন্দোলনের ইস্যু খুঁজছে।

বিএনপির সমমর্থন: শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী আন্দোলন এবং সর্বজনীন পেনশন স্কিম প্রত্যাহারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের আন্দোলনকে ‘ন্যায্য’ ও ‘যৌক্তিক’ মনে করে বিএনপি। এ দুটি বিষয়ে দলটির নৈতিক সমর্থন থাকবে বলে জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শনিবার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির জরুরি সভা হয়। সেখানে ছাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পৃথক যৌক্তিক আন্দোলনে দলের নৈতিক সমর্থনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।

বিএনপি কোটাবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ভর করছে কি না- এমন প্রশ্নে মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, বিএনপি তো একটি রাজনৈতিক দল। দেশের ভেতরে যা হচ্ছে, তার প্রতিক্রিয়া তো বিএনপিকে দিতেই হবে। এটা ছাত্রদের আন্দোলন। এখানে বিএনপির সম্পৃক্ত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তাই বলে ন্যায্য আন্দোলনে নৈতিক সমর্থন করব না? তিনি বলেন, সরকারি চাকরিতে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, নারী, শারীরিক প্রতিবন্ধীসহ কিছু ক্ষেত্রে কোটা থাকতে পারে। সেটা কিছুতেই ৫৬ শতাংশ নয়। বড় জোর ৫ থেকে ১০ শতাংশ হতে পারে।

কোটাকে সংবিধান পরিপন্থী বলছেন জিএম কাদের: চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পদ্ধতি সংবিধান পরিপন্থি’ বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান জিএম কাদের। রোববার দুপুরে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, কোটাবিরোধী আন্দোলন অত্যন্ত যৌক্তিক আন্দোলন। সব সমাজের মানুষই বৈষম্য পছন্দ করে না। বৈষম্যময় সমাজকে সুষ্ঠু সমাজ বলা যায় না। বাঙালিরা বৃটিশ আমল থেকে বৈষম্যের শিকার হয়েছিল। তিনি বলেন, সংবিধানে সাম্যের কারণে কিছু মানুষকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সুযোগ দেওয়ার কথা আছে। যারা পিছিয়ে আছে, তারা যেন এগিয়ে যেতে পারে। পিছিয়ে পড়াদের কতটুকু সহায়তা দেওয়া হবে তাও সংবিধানে বলা আছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান বা তাদের উত্তরাধিকারদের কোটা পদ্ধতিতে সুযোগ দেওয়া সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রথমে মুক্তিযোদ্ধাদের যে তালিকা করা হয়েছিল, এখন তা ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি করা হয়েছে। এটা নিয়ে বহু কন্ট্রোভার্সি আছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে কত বয়স ছিল ২ থেকে ৩ বছর আবার কারো জন্মই হয়নি তারাও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। অনেকের মুক্তিযুদ্ধের অবদান নিয়ে সন্দেহ আছে। আবার অনেকেই মুক্তিযুদ্ধ করেছেন কিন্তু তারা বিভিন্ন কারণে তালিকাভুক্ত হতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধে অনেকেই জীবন দিয়েছেন, তাদের সন্তানরাও জীবন দিয়েছেন কিন্তু শিক্ষা ও রাজনৈতিক সচেতনতার কারণে তারা তালিকাভুক্ত হতে পারেননি। মুক্তিযোদ্ধাদের এককালীন সুবিধা দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু তা অন্য কাউকে বঞ্চিত করে বা বৈষম্যের শিকার করে নয়। যেখানে একজন চাকরি পাওয়ার জন্য উপযুক্ত তাকে বঞ্চিত করে অন্য কাউকে চাকরি দেওয়াটা স্বাধীনতাযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থি।

কোটা কী, কেন আন্দোলন: পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সমতার ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে কর্মসংস্থানসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধায় সারা বিশ্বে কোটা সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রচলিত। বাংলাদেশেও মহান মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই এই ব্যবস্থা শুরু হয়। তবে ২০১৮ সালে প্রচলিত কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। এক পর্যায়ে সরকার কোটা প্রথা বাতিলও করে। তবে সম্প্রতি সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। প্রতিবাদে আবারও শুরু হয়েছে আন্দোলন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোটা নিয়ে বিতর্কের কোনও কারণ নেই। তবে কোন ক্ষেত্রে, কারা কতটুকু পিছিয়ে আছেন, কত শতাংশ কোটা রাখা প্রয়োজন, তার হিসেবে মিলিয়ে কোটা পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন। এই হিসাব সরকারকেই করতে হবে। যৌক্তিকভাবে কোটা পুনর্বিন্যাস না করায় আগেও আন্দোলন হয়েছে। আবার আন্দোলনের পর যথাযথভাবে সংস্কার না হওয়ায় এবং বর্তমানে আদালতের রায় হওয়ায় কোটা বাতিল চেয়ে আন্দোলন করা হচ্ছে। একই আন্দোলন থেকে আবার প্রতিবন্ধী ও নারী কোটা সংরক্ষণেরও দাবি করা হচ্ছে।

কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের দাবি, কোটা কখনোই স্থায়ী হয় না, অন্তত চার-পাঁচ বছর পরপর সংস্কার হওয়া দরকার। কয়েক বছর পরপর দেখতে হয়, কোটা কতটা কার্যকর আছে। আর এই সংরক্ষিত কোটা সবসময় মেধার মূল্যায়নে অর্ধেকের কম হতে হবে, ৫০ শতাংশের বেশি সংবিধানসম্মত নয়। সংস্কারের আন্দোলন যৌক্তিক। তবে আদালতে বিচারাধীন বিষয় নিয়ে আন্দোলন করাও যায় না।

মুক্তিযুদ্ধের পর কোটা ব্যবস্থা চালু: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য উপহার হিসেবে কোটা চালু করেছিলেন। যদিও সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উপহারকে সরাসরি কোটা বলার সুযোগ কম। ওই সময় সরকারি কর্মচারী নিয়োগে মাত্র ২০ শতাংশ নেওয়া হয়েছিল মেধায় (সাধারণ), ৪০ শতাংশ জেলা কোটা এবং ১০ শতাংশ ছিল নারী কোটা। আর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য উপহার হিসেবে কোটা সংরক্ষণ করা ছিল ৩০ শতাংশ। ১৯৭৬ সালে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ জেলা কোটা থেকে ২০ শতাংশ কমিয়ে সাধারণদের জন্য ২০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশে উন্নীত করা হয়, মুক্তিযোদ্ধা কোটার ক্ষেত্রে ১৯৭২ সালের সমান ৩০ শতাংশ কোটা রাখা হয়। নারীদের জন্য ১০ শতাংশ পদ সংরক্ষিত থেকে যায়। ২০১৮ সালের আন্দোলনকারী ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ ছিল, কোনও পরিসংখ্যান ছাড়াই ১৯৭৬ সালের পর আবারও ১৯৮৫ সালে কোটা সংস্কার করা হয়। ওই বছর কোটা সংস্কার করে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে পাঁচ শতাংশ বাড়িয়ে সাধারণদের জন্য ৪৫ শতাংশ নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা কোটা আগের মতোই ৩০ শতাংশ রাখা হয়। এছাড়া জেলা কোটা ১০ শতাংশ ও নারীদের জন্য ১০ শতাংশ পদ সংরক্ষণ করা হয় আগের মতোই। আর প্রথমবারের মতো উপজাতি ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য পাঁচ শতাংশ কোটা রাখা হয়। কিন্তু কোনও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে কোটা ব্যবস্থার এ বিভাজন হয়নি। শুধু তাই নয়, কোটায় প্রার্থী না থাকলেও কোটার বাইরে শূন্যপদে কাউকে নিয়োগ দেওয়াও হয়নি। উল্টো অবৈধ সুযোগ নিয়ে অমুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি দেওয়ার অভিযোগও এসেছে অনেকবার। পরে ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য নতুনভাবে কোটা ব্যবস্থা চালু করেন। সবশেষ ২০০৯ সালের ২০ ডিসেম্বর জেলাভিত্তিক কোটা নির্ধারণ করা হয়। দেশের সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধার ছেলে ও মেয়ে, নাতি-নাতনি কোটা, জেলা কোটা, উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কোটা, পোষ্য কোটা ও নারী কোটাসহ বিভিন্ন কোটা রাখা হয়।

কোটা বিন্যাস: বর্তমানে সরকারি চাকরির নিয়োগে কোটার বিন্যাস হচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধা ৩০ শতাংশ (ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনি), নারী ১০ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ। এই ৫৫ শতাংশ কোটায় পূরণযোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে সেক্ষেত্রে ১ শতাংশ পদে প্রতিবন্ধী নিয়োগের বিধান রয়েছে। এর বাইরে বাকি ৪৫ শতাংশ সাধারণদের জন্য বরাদ্দ। সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত, বিভিন্ন করপোরেশন ও দফতরে সরাসরি নিয়োগে জেলার জনসংখ্যার ভিত্তিতে জেলা কোটা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। ২০০১ সালের আদমশুমারির পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে ২০০৯ সালের ২০ ডিসেম্বর জেলাওয়ারি কোটা ঠিক করে সরকার। ২০১০ সালের ৫ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত পরিপত্রে বলা হয়, জেলা কোটার (১০ শতাংশ) সব পদ জেলার প্রার্থীদের দিয়ে পূরণ সম্ভব না হলে জেলা কোটা জাতীয় মেধা তালিকা থেকে পূরণ করতে হবে। বিভিন্ন জেলার জন্য বরাদ্দ কোটায় যোগ্য প্রার্থী বিবেচিত না হলে, নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বিশেষ কোটার প্রার্থীদের দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা, নারী ও উপজাতীয়দের জন্য জাতীয় মেধা তালিকা প্রণয়ন করতে হবে। এরপর বিশেষ কোটার অধীন স্ব-স্ব কোটার প্রার্থীদের তালিকা থেকে তা পূরণ করতে হবে।

বিশিষ্টজনরা যা বলছেন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ২০১৮ সালে যখন আন্দোলন হলো, তখন সরকারের পক্ষ থেকে কোটা রহিত করা হলো। বিগত কয়েক বছর সেভাবেই সরকারি নিয়োগগুলো হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটা বিষয়ে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান রিট করায় আবারও সেই কোটা কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছেন। কোটা প্রথা রহিত করার সিদ্ধান্ত যেহেতু সরকারের। তাই সরকারের সিদ্ধান্ত বহাল রাখতে সরকার সুপ্রিম কোর্টে আপিলও করেছে। তরুণ প্রজন্মের ছেলে-মেয়ে ও চাকরি প্রত্যাশীদের আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্দোলনকারীরা কোটা সংস্কারের কথা বলছে, সংস্কার হতে পারে। কিন্তু যেহেতু বিষয়টি এখনও বিচারাধীন, তারা অপেক্ষা করতে পারতো।

কোটার যথাযথ প্রয়োগের বিষয় উল্লেখ করে উদাহরণ তুলে ধরে অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আছেন, ছাত্র আছেন; যারা কোটার সুবিধা নিয়েছেন। যে একবার ভর্তির ক্ষেত্রে সুযোগ পান তাহলে চাকরির ক্ষেত্রে আবার চান, সেটা ঠিক হবে না। যদি কেউ ভর্তির ক্ষেত্রে ব্যবহার করে, তাহলে চাকরির ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারবেন না। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী, মুক্তিযোদ্ধার পরিবার যারা আর্থিকভাবে অসচ্ছল এখানে নানাভাবে বৈজ্ঞানিকভাবে ক্যাটাগরি করা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে প্রয়োগ করা হয়। এখন যেটা দরকার আন্দোলনকারী ও সরকার বিষয়টি আলোচনা করে শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে যাওয়া।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মশিউর রহমান বলেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটা দেওয়া হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান দেখাতে। এখানে চাকরি দেওয়াটা বড় বিষয় না। যদি আমাদের শিক্ষার্থীরা এটি বুঝতে না পারে, তাহলে তাদের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হবে। যে মানুষটি জানতো মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে তিনি আর ফেরত না-ও আসতে পারেন, তারপরও একটি রাষ্ট্র তৈরিতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, তার পরবর্তী প্রজন্মকে সচ্ছল রাখা এই সম্মানটি দিতে হবে। তা না হলে আত্মত্যাগের জন্য ভবিষ্যতে কেউ থাকবে না। প্রতিবন্ধী ও সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষকে এগিয়ে নিতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কোটা রাখা হয়। ধরেন একজন প্রতিবন্ধী, তাকে যারা দেখাশোনা করেন, তারা কেউ বেঁচে নেই। তাহলে এই মানুষটিকে দেখবে কে? রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার ভরণপোষণ দেওয়া। তার জন্য এটি করবো না। অথচ সমাজের সচ্ছল মানুষ রাজউকের কাছে থেকে টাকার জোরে জমি কিনে নিলো, এই জমি তো দেশের সব জনগণের। তিনি তো প্রতিবন্ধীর কোটার চেয়েও বেশি সুবিধা নিলেন, তার বিরুদ্ধে তো আন্দোলন হয় না।’

সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান সোহরাব হোসাইন বলেন, আদালতে বিচারাধীন বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার এখতিয়ার নেই। আদলতের রায় হাতে পাইনি। আদালতের রায় এবং সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে বিধি যা চূড়ান্ত হবে আমরা তাই বাস্তবায়ন করবো।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading