কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

উত্তরদক্ষিণ। শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৪, আপডেট ১৪:৩০

এআই প্রযুক্তি আশীর্বাদ না অভিশাপ

প্রযুক্তি ছাড়া যেমন আজকের বিশ্ব কল্পনা করা যায় না, তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ছাড়া কল্পনা করা যায় না আজকের প্রযুক্তি বিশ্বের কথা। এআই প্রযুক্তির নিত্য উৎকর্ষতায় অনেক অসাধারণ কাজ আজ হয়ে উঠেছে সাধারণ, অনেক অসম্ভব হয়ে উঠেছে সম্ভব। তবে এআই প্রযুক্তির আশীর্বাদের তালিকা যত দীর্ঘই হোক না কেন এআই প্রযুক্তির ঝুঁকির বিষয়টি এড়িয়ে যাবার কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ করে এই প্রযুক্তির বর্ধিত চাহিদা ও জনপ্রিয়তার প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন এআই-এর ঝুঁকি সম্পর্কে আরও সচেতন হওয়া এবং এআই প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার সুনিশ্চিত করা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে যাকে ‘গডফাদার’দের একজন বলে মনে করা হয় সেই জেফ্রি হিন্টন সম্প্রতি গুগল থেকে ইস্তফা দিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে আর কিছুকাল পরই চ্যাটবটরা মানুষের চেয়েও বুদ্ধিমান হয়ে যেতে পারে। তাহলে কি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স একসময় মানুষের মতো সৃষ্টিশীল হয়ে উঠবে? গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের কৃত্রিম-বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক উপদেষ্টামøলী এক বছর বিচার-বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনার পর তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ঝুঁকি এবং এর পরিচালনায় বিদ্যমান অসঙ্গতিগুলোর মোবাবেলায় সাতটি সুপারিশ প্রস্তাব করেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কী,কীভাবে কাজ করে: কিছুদিন আগেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ছিল দূর ভবিষ্যতের একটি কাল্পনিক বিষয়। কিন্তু অতি স¤প্রতি এই দূরবর্তী ভবিষ্যতের বিষয়টি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হতে শুরু করেছে। তার প্রধান কারণ, পৃথিবীর মানুষ ডিজিটাল বিশ্বে এমনভাবে সম্পৃক্ত হয়েছে যে, হঠাৎ করে অচিন্তনীয় পরিমাণ ডেটা সৃষ্টি হয়েছে এবং সেই ডেটাকে প্রক্রিয়া করার মত ক্ষমতাশালী কম্পিউটার আমাদের হাতে চলে এসেছে। এই ডেটা বা তথ্যকে প্রক্রিয়া করার জন্য বিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তিবিদরা এমন একটি পদ্ধতি বেছে নিয়েছে যেটি মানুষের মস্তিষ্কের মতো করে কাজ করে। চিন্তাশক্তি, বুদ্ধি কিংবা বিশ্লেষণ ক্ষমতা মানুষের সহজাত। কিন্তু একটি যন্ত্রকে মানুষের মতো বুদ্ধিমত্তা দিয়ে, সেটিকে চিন্তা করানো কিংবা বিশ্লেষণ করানোর ক্ষমতা দেওয়ার ধারণাটিকে সাধারণভাবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বলা হয়।

সাধারণভাবে এটা নিউরাল নেট নামে পরিচিত। সহজভাবে বলা যায় এর একটি ইনপুট স্তর এবং আউটপুট স্তর রয়েছে যার মাঝখানের স্তরটি হচ্ছে ‘লুক্কায়িত’ স্তর। প্রথমে এই নিউরাল নেটকে ইনপুট এবং তার সাথে যুক্ত আউটপুট ডেটা দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তখন ‘লুক্কায়িত’ স্তরটি এমনভাবে পরিবর্তিত হতে থাকে যেন প্রশিক্ষণের জন্য দেওয়া ইনপুটের জন্য সত্যি আউটপুটটি পাওয়া যায়। একবার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েগেলে এই নিউরাল নেটকে সম্পূর্ণ নতুন ইনপুট দিলেও সেটি সম্ভাব্য সঠিক আউটপুটটি দিতে পারবে। যত বেশি ডেটা দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, নিউরাল নেটটি তত ভালো কাজ করবে। একটি লুক্কায়িত স্তর না রেখে একাধিক স্তর দিয়ে এই নেটকে আরো অনেক বুদ্ধিমান করা সম্ভব। তখন নেটটি নিজেই ডেটা ব্যবহার করে শিখে নিতে পারবে। এই প্রক্রিয়ার নাম ‘ডিপ লার্নিং’ এবং বলা যেতে পারে একটি সত্যিকারের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সবচেয়ে কাছাকাছি একটি প্রক্রিয়া।

অসঙ্গতি মোকাবেলায় জাতিসংঘের ৭ সুপারিশ

সম্প্রতি জাতিসংঘের কৃত্রিম-বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক উপদেষ্টামøলী এক বছর বিচার-বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনার পর তাদের চ‚ড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ঝুঁকি এবং এর পরিচালনায় বিদ্যমান অসঙ্গতিগুলোর মোকাবেলায় সাতটি সুপারিশ প্রস্তাব করেছে। বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে গত বছর জাতিসংঘ ৩৯ সদস্যের এক উপদেষ্টামøলীর উপর সুপারিশমূলক প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব অর্পন করে। এবারে সাতটি সুপারিশ সম্বলিত প্রতিবেদনটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে চলতি মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতিসংঘের সম্মেলনে।
প্রতিবেদনে উপদেষ্টারা আহ্বান জানিয়েছেন একটি প্যানেল তৈরি করে দেয়া যার কাজ হবে এআই সম্পর্কে নিরপেক্ষ ও নির্ভরযোগ্য জ্ঞান ও তথ্য প্রদান করা। পাশাপাশি প্যানেলটি এআই ল্যাব ও প্রযুক্তি বিশ্বের সাধারণের মধ্যে বিদ্যমান তথ্যগত অসামঞ্জস্যতার বিষয়টি নিয়েও কাজ করবে।

২০২২ সালের নভেম্বরে ওপেনএআই চ্যাটজিপিটি নামক জেনারেটিভ এআই-ভিত্তিক চ্যাটবটটি নিয়ে আসার পর সারা পৃথিবীতেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। তবে একইসাথে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুল তথ্য, ভুয়া খবর ছড়ানোসহ কপিরাইটযুক্ত ম্যাটেরিয়ালের অধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনা প্রতিনিয়ত উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সারা পৃথিবীতে এআই প্রযুক্তির ক্রমাগত প্রসারের প্রেক্ষাপটে এর নিয়ন্ত্রণ অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে এখন পর্যন্ত হাতে গোনা কয়েকটি দেশই কেবলমাত্র এআই প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আলাদা করে আইন তৈরি করেছে। এদিক থেকে সবার চেয়ে এগিয়ে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। তারা একটি বিশদ এআই অ্যাক্ট প্রণয়ন করেছে। আমেরিকায় এআই নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি এখনও স্বেচ্ছা সম্মতি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে চীন সামাজিক স্থিতিশীলতা বজার রাখার পাশাপাশি এআই প্রযুক্তির উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রেখেছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর সামরিক বাহিনীতে এআই প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য প্রণীত ‘ব্লুপ্রিন্ট ফর অ্যাকশন’ সমর্থন করে ৬০টি দেশ। উক্ত ব্লুপ্রিন্টটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক ছিলো না। তাই আমেরিকা সমর্থন জানালেও চীনের সমর্থন মেলেনি।

এআই প্রযুক্তি-ভিত্তিক নিত্যনতুন টুল ও ফিচার নিয়ে আসছে বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। ফলে ভবিষ্যতে জনগণের মতামত না নিয়েই তাদের উপর ইচ্ছেমতো এআই প্রযুক্তি চাপিয়ে দেয়ার ঝুঁকি থেকে যায় বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে জাতিসংঘ। এআই প্রযুক্তির পরিচালনার বিষয়ে নতুন একটি নীতিনির্ধারণী সংলাপ আয়োজনেরও সুপারিশ করেছে জাতিসংঘ। উক্ত সংলাপের মাধ্যমে একটি এআই স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ করা হবে এবং এআই সক্ষমতার উন্নয়নে বৈশ্বিক একটি নেটওয়ার্কও তৈরি করা হবে। এর ফলে সামগ্রিকভাবে এআই পরিচালনায় সক্ষমতা অর্জন করা যাবে। জাতিসংঘের অন্যান্য সুপারিশের মধ্যে রয়েছে, একটি বৈশ্বিক তহবিল তৈরি করা যাতে করে সক্ষমতা ও সহযোগিতার মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে সেটা কমিয়ে আনা যায়। পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি বৈশ্বিক এআই ডেটা ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করার কথাও উল্লেখ করা হয়ছে সুপারিশে। পরিশেষে, জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনে উল্লেখিত প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নে সহায়তা ও সমন্বয়ের জন্য ছোট পরিসরে একটি এআই অফিস স্থাপনের প্রস্তাবও করা হয়েছে।

প্রযুক্তির এই সংস্করণের যত ভালো-মন্দ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানব জীবনে যেভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে, সেগুলো হলো-এআই জটিল সমস্যা বিশ্লেষণ করতে পারে এবং মানুষের চেয়ে দ্রুত সমাধান খুঁজে পেতে পারে। এটি ডেটাতে প্যাটার্ন শনাক্ত করতে পারদর্শী, যা বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশনে কার্যকর। এআই মানুষের ভাষা বুঝতে এবং তৈরি করতে পারে, সিরি এবং অ্যালেক্সার মতো ভয়েস সহকারীকে সক্ষম করে। এটি ছবি এবং ভিডিওতে বস্তু, মুখ এবং এমনকি আবেগ চিনতে পারে। রোবট সমাবেশ এবং স্বায়ত্তশাসিত যানবাহনের মতো কাজের জন্য এআই উৎপাদন এবং সরবরাহে ব্যবহƒত হয়। এআই ক্রিয়াকলাপগুলোকে স্ট্রিমলাইন করে এবং ডেটা বিশ্লেষণের মতো অনেক কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সময় এবং প্রচেষ্টাকে হ্রাস করে, যা ব্যবসাগুলোকে আরও দক্ষ হতে দেয়। ই-কমার্স এবং বিষয়বস্তু সুপারিশের জগতে এআই ব্যক্তিগতকৃত পণ্যের পরামর্শ এবং ব্যক্তিগত পছন্দ অনুসারে তৈরি সামগ্রীকে ক্ষমতা দেয়। এআই রোগ নির্ণয়, ওষুধ আবিষ্কার এবং এমনকি রোবটিক সার্জারিতে সহায়তা করে, শেষ পর্যন্ত জীবন বাঁচায় এবং স্বাস্থ্যসেবার ফল উন্নত করে। সিরি এবং গুগল অ্যাসিস্ট্যান্টের মতো ভার্চুয়াল সহকারীরা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে, রিমাইন্ডার সেট করে এবং এমনকি স্মার্ট হোম ডিভাইসগুলো নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের জীবনকে সহজ করে তোলে। এআই স্বায়ত্তশাসিত যানবাহনে নিযুক্ত করা হয়, রাস্তার নিরাপত্তা বৃদ্ধি করে এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকির নিরীক্ষণ ও প্রতিক্রিয়া জানাতে নজরদারি ব্যবস্থার জন্য ব্যবহƒত হয়।


কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানব জীবনে যেভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, সেগুলো হল- এআই সিস্টেমগুলো পক্ষপাতদুষ্টতাকে স্থায়ী এবং প্রসারিত করতে পারে, যা অন্যায্য এবং বৈষম্যমূলক ফলের দিকে পরিচালিত করে। এটি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ যে, এআই সিস্টেমগুলো ন্যায্য এবং নিরপেক্ষ হওয়ার জন্য ডিজাইন এবং প্রশিক্ষিত। এআই সিস্টেমগুলো অস্বচ্ছ এবং বোঝা কঠিন হতে পারে, যার ফলে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির অভাব দেখা দেয়। এআই সিস্টেমগুলো বিপুল পরিমাণে ব্যক্তিগত ডেটা সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ করতে পারে, যা গোপনীয়তা এবং নজরদারি সম্পর্কে উদ্বেগের দিকে পরিচালিত করে। এটি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ যে, এআই সিস্টেমগুলো গোপনীয়তার অধিকারকে সম্মান করে এবং শুধু বৈধ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। এআই সিস্টেমগুলো ব্যর্থ হলে বা ত্রæটিপূর্ণ হলে গুরুতর পরিণতি হতে পারে, যার ফলে নিরাপত্তা এবং নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। এআই সিস্টেমগুলো স্বায়ত্তশাসিতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে এবং পদক্ষেপ নিতে পারে, যার ফলে নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিতা সম্পর্কে উদ্বেগ দেখা দেয়। এটি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ যে, মানুষ এআই সিস্টেমের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে এবং সেগুলো উপকারী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। এআই সিস্টেমগুলো মানুষের মর্যাদা এবং অধিকারের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে, যা তাদের নৈতিক প্রভাব সম্পর্কে উদ্বেগের দিকে পরিচালিত করে। এটি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ যে, এআই সিস্টেমগুলো মানুষের মর্যাদা এবং অধিকারকে সম্মান করে এবং এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যা মানুষের মঙ্গলকে উন্নীত করে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিপ্লবের নেপথ্যে

সাম্প্রতিককালে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের জগতে বড় ধরনের বিপ্লব ঘটে গেছে। অনেক কাজই এখন একটি যন্ত্র মানুষে চেয়েও দ্রæত এবং নিখুঁতভাবে করে দিতে পারে। হঠাৎ করেই এই অগ্রগতির কারণ কী? কিভাবে এটি সম্ভব হলো? গুগলের একজন টেকনিক্যাল ম্যানেজার তানজিম আহসান গণমাধ্যমকে বলছেন সুপার কম্পিউটিং পাওয়ারের কারণে এই অসম্ভব সম্ভব হয়েছে। এক সময় ধারণা করা হতো- একই ধরনের যেসব কাজ বারবার করতে হয় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের পক্ষে শুধু সেসব কাজই করা সম্ভব। এই প্রযুক্তি মানুষের করে দেওয়া প্রোগ্রামের বাইরে যেতে পারবে না। কিন্তু চ্যাটজিপিটির মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এখন অনেক কিছুই করা সম্ভব যা মানুষ ভাবতেও পারেনি। চ্যাটজিপিটির সাথে রসিকতা করলে সে বুঝতে পারে। শুধু তাই নয়, ব্যবহারের সাথে সাথে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন নতুন জিনিস শিখতেও পারে এবং এর মধ্য দিয়ে সে নিজেকে আরো বেশি সমৃদ্ধ করতে থাকে। প্রযুক্তিবিদরা বলছেন বর্তমানে আমরা যেভাবে জীবন-যাপন করি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে তা নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে – ভালো বা মন্দ উভয় অর্থেই। কিন্তু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স জগত ও পৃথিবীর নেতৃত্ব যাদের হাতে তারা এর জন্য কতোটা প্রস্তুত? প্রযুক্তিবিদরা বলছেন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আগামীতে পৃথিবীকে কোন দিকে নিয়ে যাবে, তা নির্ভর করবে কোম্পানিগুলো এই প্রযুক্তি তৈরিতে কতটা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়, তার ওপর। তারা বলছেন এ ধরনের প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ এবং অপব্যবহার বন্ধে কর্তৃপক্ষকে আইনগত সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
তথ্যপ্রযুক্তিবিদ জাকারিয়া স্বপন গণমাধ্যমকে বলছেন, সারা বিশ্বেই এআই প্রযুক্তি এখন স্পর্শকাতর বিষয়। কিন্তু সেই বিচারে এর সঙ্গে যেসব নেতারা যুক্ত তারা এর জন্যে প্রস্তুত নন। তারা রিয়্যাক্ট করছে কিন্তু এই পরিস্থিতি কিভাবে সামাল দিতে হবে তার জন্য তারা তৈরি নয়। অনেক দেশ তো বুঝতেই পারছে না এই পরিস্থিতির সঙ্গে তারা কিভাবে নিজেদের মানিয়ে নেবে।

বিশ্বব্যাপী বছরে জিডিপি ১.২ % বৃদ্ধির সম্ভাবনা

ম্যাককিনসে গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের একটি সমীক্ষা অনুসারে বলা যায় যে, ২০৩০ সালের দিকে ওপেন এআই বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক উৎপাদন ১৩ ট্রিলিয়ন ডলার অবদান রাখতে পারে। এই অনুমানের উপর ভিত্তি করে যে, অও ব্যবহারের ফলে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী জিডিপি ১.২ % বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যাইহোক, একই সমীক্ষাটি চাকরির স্থানচ্যুতির সম্ভাবনাকেও তুলে ধরেছে এবং পরামর্শ দেয় যে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩৭৫ মিলিয়ন কর্মী অও ত্বরান্বিত হওয়ার কারণে পেশা পরিবর্তন করবে বা নতুন দক্ষতা অর্জন করতে বাধ্য হবে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম ভবিষ্যদ্বাণী করেছে যে, এ আই ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ৯৭ মিলিয়ন নতুন চাকরি তৈরি করবে, যদিও কিছু বিদ্যমান চাকরি স্থানচ্যুত হতে পারে। উপরন্তু, অও ব্যবসাগুলোকে নতুন বাজারে প্রসারিত করতে এবং নতুন পণ্য বিকাশে সাহায্য করবে, যার ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ঘটবে। অও এর সাথে সহযোগিতা কর্মক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, কারণ এটি আরও ভাল সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু মানুষের অন্তর্দৃষ্টি, সৃজনশীলতা এবং সহানুভ‚তি প্রতিস্থাপন করতে পারে না।

মানুষের জন্যে কতটা বিপদজনক হতে পারে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কী মানুষের জন্য বিপদজনক হয়ে উঠছে এমন প্রশ্ন সর্বত্রই ঘুরপাক খাচ্ছে। এই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে মূলত চ্যাটজিপিটি নামের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাজারে আসার পর। ভাষাভিত্তিক এই চ্যাটবট তার তথ্যভাøার বিশ্লেষণ করে প্রায় সব প্রশ্নেরই জবাব দিতে পারে। চ্যাটজিপিটি রচনা লিখতে পারে, চাকরির বা ছুটির আবেদন, যেকোনো রিপোর্ট তৈরি করতে পারে, এমনকি গান ও কবিতাও লিখতে পারে।

জেফ্রি হিন্টন


কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই ক্ষমতা দেখে সারা বিশ্বের প্রযুক্তি বিষয়ক নীতি-নির্ধারক, বিনিয়োগকারী এবং নির্বাহীরা নড়ে চড়ে বসেন। এক হাজারের মতো ব্যক্তি এক খোলা চিঠিতে এই প্রযুক্তির ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, গবেষণায় এখনই রাশ টেনে না ধরলে সমাজ ও মানবজাতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে যাকে ‘গডফাদার’দের একজন বলে মনে করা হয় সেই জেফ্রি হিন্টন সম্প্রতি গুগল থেকে ইস্তফা দিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে আর কিছুকাল পরই চ্যাটবটরা মানুষের চেয়েও বুদ্ধিমান হয়ে যেতে পারে। তাহলে কি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স একসময় মানুষের মতো সৃষ্টিশীল হয়ে উঠবে? গুগলেরই টেকনিক্যাল ম্যানেজার তানজিম আহসান বলছেন, কম্পিউটার তো অনেকের মানুষের চেয়ে আজকের দিনেই বেশি বুদ্ধিমান।

তথ্যপ্রযুক্তিবিদগণ বলছেন, এই ভয় অনেকটাই মানসিক। এটা হচ্ছে অজানাকে ভয় পাওয়ার মতো ভয়। চ্যাটজিপিটির মতো জেনারেটিভ এআই নিয়ে উদ্বেগ ঠিক এই কারণেই। এই এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের সুলিখিত উত্তর তৈরি করা সম্ভব। এর ফলে একজন ছাত্রকে সুশিক্ষিত করে তোলার যে মূল লক্ষ্য সেটা ব্যাহত হতে পারে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা

প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। এর গাণিতিক তত্ত¡ অনেক আগে আবিষ্কার হলেও, এই বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগের জন্য ম্যাথম্যাটিক্যাল মডেলের অভাব ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে কম্পিউটিং পাওয়ার বৃদ্ধির পাশাপাশি, এই প্রযুক্তি সহজলভ্য হয়ে ওঠার কারণে এই খাতের নেতারা এর নেতিবাচক দিক নিয়েও সতর্ক থাকতে চাইছেন। আরো একটি শঙ্কার কারণ হচ্ছে যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কারণে অনেক মানুষের চাকরি হুমকির মুখে পড়বে। গোল্ডম্যান স্যাকসের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে সারা বিশ্বে ৩০ কোটি মানুষের চাকরি খেয়ে ফেলবে এআই। আরেকটি আন্তর্জাতিক সমীক্ষা বলছে প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ আশঙ্কা করছে যে আগামী তিন বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে তারা চাকরি হারাবেন। তাহলে কি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মানুষের জন্যে ভয়ের কারণ হতে পারে? গুগলের একজন টেকনিক্যাল ম্যানেজার তানজিম আহসান গণমাধ্যমকে বলছেন, এটা মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন। ভয়ের কারণ কিছুটা থাকতেই পারে। কারণ এর ফলে মানুষের প্রয়োজনীয়তা অনেক জায়গাতেই কমে যাবে। তিনি মনে করেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যতোই অগ্রগতি হোক না কেন মানুষের প্রয়োজন কখনোই ফুরাবে না। কারণ এসব কিছুই করা হচ্ছে মানুষের জন্য।

আয়ারল্যান্ডের তথ্যপ্রযুক্তিবিদ নাসিম মাহমুদ মনে করেন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স একসময় মানুষের চেয়ে বুদ্ধিমান না হলেও, সে যে ক্ষমতাশীল হয়ে উঠবে এনিয়ে তার কোনো সন্দেহ নেই। জেফ্রি হিন্টন কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে যেসব উন্নতি হচ্ছে – তার বিপদ সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, এআইয়ের ক্ষেত্রে তিনি যেসব কাজ করেছেন তার জন্য তিনি অনুতাপও প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন এআই চ্যাটবট থেকে এমন কিছু বিপদ হতে পারে যা রীতিমত ভয়ংকর। তাহলে মানুষের সঙ্গে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের এই প্রতিযোগিতা কি কখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে?

(প্রতিবেদনটি লিখেছেন- সাদিত কবির, শহীদ রানা, রিন্টু হাসান, পারভেজ আহমেদ ও মহোসু)

ইউডি/এজেএস

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading