রফতানি বাণিজ্যের বড় খাত হতে পারে চারকোল
উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৪, আপডেট ০০:২০
পাটকাঠি থেকে কার্বন দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। একইসঙ্গে আভাষ দিচ্ছে নতুন এক সম্ভবনার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর ব্যাপক চাহিদা থাকায় রফতানি বাণিজ্যে এক অপার সম্ভাবনা চারকোল।
বাংলাদেশে চারকোল উৎপাদন ও রফতানি বাণিজ্যের উপর বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন ইয়াং বাংলা ম্যানুফ্যাকচারীং ইন্ডাষ্ট্রীজ কোং , লিঃ এর চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ চারকোল ম্যানুফ্যাকচারার্স এন্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের উপদেষ্টা আতিকুর রহমান। গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাতকারে চারকোল সম্বন্ধে তিনি বিস্তারিত জানান যা পাঠকদের কাছে তুলে ধরা হল।
চারকোল কী, এর ব্যবহার এবং কত প্রতিষ্ঠান চারকোল উৎপাদনে কাজ করছে?
আতিকুর রহমান: চারকোল হচ্ছে পাটকাঠি থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত কার্বন পাউডার যা মূলত ফায়ার ওয়ার্কস উৎপাদনে কাচাঁমাল হিসাবে ব্যবহৃত হয়। প্রসাধনসামগ্রী ফেসওয়াস, ফটোকপিয়ারের কালি, পানির ফিল্টার ও বিষ ধ্বংসকারী ঔষধ-এমনকি জীবন রক্ষাকারী ঔষুধ তৈরিটে চারকোল ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন পণ্যের কাঁচামাল হিসেবেও চারকোল ব্যবহার করা হচ্ছে। মোট কথা, যেখানে কার্বনের ব্যবহার আছে, সেখানেই চারকোল ব্যবহার করা সম্ভব। এ জন্য বিশেষ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। পাটকাঠিকে বাণিজ্যিক কার্বনে রূপান্তরের মাধ্যমে অ্যাকটিভেটেড চারকোলে পরিণত করতে হয়। দেশে এখনও এ ধরনের কোন প্রতিষ্ঠান নেই। আমাদের কোম্পানি ইয়াং বাংলা ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাষ্ট্রিজ এ বিষয়ক একটি উদ্যোগ নিয়েছে। চীন ও ভারত থেকে এ জন্য প্রযুক্তি এবং মেশিনারিজ আমদানি করার প্রক্রিয়া চলছে। এতে অতিরিক্ত ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
দেশে চারকোলের বাণিজ্যিক পরিস্থিতি এখন কেমন? সম্ভাবনার কথাও জানতে চাই।
আতিকুর রহমান: দেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩০ লাখ টন পাটকাঠি উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে চারকোল উৎপাদন হয় মাত্র পাঁচ হাজার টন। বিভিন্ন কাজে এসব পাটকাঠি ব্যবহার করা হয়। তবে চারকোল উৎপাদনের মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি মুল্য সংযোজন করা সম্ভব। বিনিয়োগ সামর্থ্যরে অভাবে ৪০ শতাংশের বেশি ব্যবহার করা এখনও সম্ভব হচ্ছে না। পর্যাপ্ত বিনিয়োগ হলে বছরে অন্তত চার হাজার কোটি টাকা রপ্তানির সুযোগ আছে। গত অর্থবছরে ২০০ কোটি টাকার চারকোল রপ্তানি হয়েছে। চীন এখন পর্যন্ত প্রধান রপ্তানি বাজার হলেও জাপান, ব্রাজিল, তুরস্কো, যুক্তরাষ্ট্র, দ. কোরিয়া, তাইওয়ান, কানাডা, মেক্সিকোসহ বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে চারকোল।
বর্তমানে কত প্রতিষ্ঠান চারকোল উৎপাদনে কাজ করছে? বিনিয়োগের পরিমাণ কত?
আতিকুর রহমান: এখনও বৈচিত্র্যময় এ পণ্য উৎপাদনে বড় কোনো বিনিয়োগ নেই। বিনিয়োগের পরিমাণ হয়তো ৬০০ কোটি টাকার মতো হতে পারে। সারাদেশে ৪৫ প্রতিষ্ঠান চারকোল উৎপাদনে জড়িত। জামালপুর, মাগুরা, যশোর, নারায়গঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরিয়তপুর, গোপালগঞ্জ, চাঁদপুর, নাটোর, দিনাজপুর, ঝিনাইদাহ, নরসিংদী, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বাণিজ্যিকভাবে চারকোল উৎপাদন শুরু হযেছে। উদীয়মান খাত হিসেবে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ রপ্তানি বাণিজ্যি ও কর্মসংস্থানে বড় খাত হতে পারে চারকোল।
অভ্যন্তরীণ বাজারে চারকোলের ব্যবহার কতটা?
আতিকুর রহমান: বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে এখনও চারকোলের অভ্যন্তরীণ বাজার নেই। কারণ আগেই বলেছি যে, প্রক্রিয়ায় পাটকাঠিকে বাণিজ্যিক কার্বনে রূপান্তর করা হয় সে অ্যাকটিভেটেড চারকোল করার ব্যবস্থা এখনও দেশে গড়ে ওঠেনি। ফলে বিভিন্ন শিল্প কারখানায় কাঁচামাল হিসেবে ব্যাপক চাহিদা থাকলেও স্থানীয়ভাবে জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে এক ইপিজেডে বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠান অ্যাকটিভেটেড চারকোল করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
ক্সবচিত্র্যময় পণ্য হিসেবে চারকোল রপ্তানিতে সরকার কতটুকু প্রণোদনা দিয়েছে?
আতিকুর রহমান: হ্যাঁ, সরকারি সহায়তা পাচ্ছি আমরা। কিন্তু অত্যান্ত পরিতাপের বিষয় এই অর্থ বছরে নগদ সহায়তার পরিমান ২০ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশ নির্ধারন করা হয়েছে। তবে প্রধান সমস্যা অর্থ সংকট। এখনও এ খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ নেই। যেমন অ্যাকটিভেটেড চারকোলের জন্য বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। অর্থ সংকটে দেশে এখনও এ ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। এ ক্ষেত্রে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ পাওয়া গেলে বড় অঙ্কের রপ্তানি আয় কারার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সৃষ্টিরও বড় খাত হতে পারে চারকোল।
এই পণ্যের বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারণে কী ধরনের সমস্যা আছে?
আতিকুর রহমান: এখনও চারকোল রপ্তানী করতে গিয়ে আমরা জাহাজিকরণ সমস্যার সম্মুখীন হই। হাতে গোনা শুধু দুই একটি শিপিং কোম্পানী চারকোল পরিবহন করে। উদ্যোক্তারা বাণিজ্যিক উৎপাদনে কোনো দিকনির্দেশনা পাচ্ছেন না। এ ছাড়া একটা নির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলে উৎপাদন এবং বিপণন কার্যক্রমের পাশাপাশি কিছু নীতি সহায়তাও পাওয়া যেত। ইতিমধ্যে সরকার পাট অধিদপ্তরের মাধ্যমে চারকোল নীতিমালা প্রনয়ন করেছেন নীতিমালার নিরীক্ষে কার্য পরিচালনা করলে এই শিল্প অনেকদুর এগিয়ে যাবে।
বর্তমান অর্ন্তবর্তিকালীন সরকার গঠন হওয়ার পর বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এর দায়িত্ব প্রাপ্ত উপদেষ্টা ব্রিগ্রেডিয়ার এম সাখাওয়াত হোসেন এর সাথে আমরা সাক্ষাৎ করে চারকোল শিল্প উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য দাবী জানিয়েছি। একটা সুনির্দিষ্ট বাণিজ্যিক পরিকল্পনা হলে রপ্তানির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারেও চারকোলের বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হতে পারে। ব্যবহার বাড়লে কৃষক পাট উৎপাদন করে আগের চেয়ে বেশি লাভবান হবেন। এতে পাট উৎপাদনে কৃষক আগ্রহী হবেন।
ইউডি/কিফায়েত সুস্মিত

