শুভ উদ্যোগ : সাইবার নিরাপত্তা আইন সংস্কার

শুভ উদ্যোগ : সাইবার নিরাপত্তা আইন সংস্কার

উত্তরদক্ষিণ। মঙ্গলবার, ০১ অক্টোবর, ২০২৪, আপডেট ১৪:৫৫

আটটি ট্রাইব্যুনালে চলছে ৫৮১৮টি মামলা

আশিকুর রহমান: অবশেষে আলোচিত সাইবার নিরাপত্তা আইনের সংস্কারের শুভ উদ্যোগ শুরু হয়েছে। আলোচিত সাইবার নিরাপত্তা আইনে দায়ের হওয়া ‘স্পিচ অফেন্স’ সম্পর্কিত মামলাগুলো দ্রুত প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এসব মামলায় কেউ গ্রেপ্তার থেকে থাকলে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের মুক্তি দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন; ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইনের অধীনে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত সময়ে দেশের আটটি সাইবার ট্রাইব্যুনালে ৫ হাজার ৮১৮টি মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে ডিজিটাল মাধ্যমে মত প্রকাশের কারণে দায়ের হওয়া মামলাগুলোকে ‘স্পিচ অফেন্স’ এবং কম্পিউটার হ্যাকিং বা অন্য কোনো ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে জালিয়াতিকে ‘কম্পিউটার অফেন্স’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকার স্পিচ অফেন্স-সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১৩৪০টি স্পিচ অফেন্স সম্পর্কিত মামলার মধ্যে বিচারাধীন ৮৭৯টি মামলা আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত প্রত্যাহার করা হবে। তদন্তাধীন ৪৬১টি মামলা চ‚ড়ান্ত রিপোর্ট দাখিলের মাধ্যমে দ্রæত নিষ্পত্তির জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হবে। এসব মামলায় কেউ গ্রেপ্তার থাকলে তিনি এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে মুক্তি পাবেন বলে জানিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। প্রসঙবগত, আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল গত রবিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, সাইবার নিরাপত্তা আইন ‘অচিরেই’ সংস্কারের উদ্যোগ নেবে অন্তর্বর্তী সরকার। সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টে একটা রিফর্ম প্রয়োজন। দ্রুতই সে বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। আমি আমার মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে কাজ করব।

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম জানান, বর্তমানে ‘স্পিচ অফেন্স’ সম্পর্কিত মোট ১৩৪০টি মামলা চলমান রয়েছে, যার মধ্যে ৪৬১টি মামলা তদন্তাধীন এবং ৮৭৯টি মামলা দেশের আটটি সাইবার ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। স্পিচ অফেন্স সম্পর্কিত মামলাগুলোর মধ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের অধীনে ২৭৯টি, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে ৭৮৬টি এবং সাইবার নিরাপত্তা আইনের অধীনে ২৭৫টি মামলা রয়েছে।
উল্লেখ্য, দেশের সাংবাদিক, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবীদের পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বিরোধিতার মধ্যেই ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সংসদে পাশ হয়েছিল ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট। তার পর সেই প্রতিবাদ সামাল দিতে ২০২৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর করা হয় সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট। আসলে এ আইনটি পুরনো আইনই নতুন নামে করা হয়। তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না।

সকল কালো আইনের তালিকা হচ্ছে: সাইবার নিরাপত্তা আইনসহ বাংলাদেশে বিদ্যমান সব কালো আইনের তালিকা করা হয়েছে এবং শিগগিরই এসব কালো আইন বাতিল ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সংশোধন করা হবে। গত ১১ সেপ্টেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এই তথ্য জানান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি জানান, সন্ত্রাস দমন আইন ও ডিজিটাল/সাইবার নিরাপত্তা আইনে দায়েরকৃত মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হচ্ছে। সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডসহ বহুল আলোচিত ৫টি হত্যাকান্ডের তদন্ত ও বিচার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ও দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তির জন্য সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। ড. ইউনূস উল্লেখ করেন, দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিচার বিভাগের বড় সংস্কারের কাজে হাত দিয়েছে। যোগ্যতম ব্যক্তিকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেওয়ায় মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। আপিল বিভাগের বিচারপতি নিয়োগ, অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগসহ অনেক অতি গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ এবং অন্যান্য নিয়োগ সবকটাই সম্পন্ন হয়েছে। সংবাদমাধ্যম ও মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা ইতোমধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা সবাইকে বলে দিয়েছি, আপনারা মন খুলে আমাদের সমালোচনা করেন। আমরা সবার মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। মিডিয়া যাতে কোনও রকম বাধা-বিপত্তি ছাড়া নির্বিঘ্নে তাদের কাজ করতে পারে সেজন্য একটি মিডিয়া কমিশন গঠন করা সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন।

পুরোপুরি বাতিল করা উচিত হবে না

শহীদ রানা: দ্রুতই সাইবার নিরাপত্তা আইন সংশোধন বা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। তবে এটি পুরোপুরি বাতিল করা উচিত হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। গত রবিবার ঢাকার আগারগাঁওয়ে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর কার্যালয়ে ‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তথ্য অধিকার: এনজিওদের সহায়ক ভ‚মিকা’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় তিনি একথা বলেন। ‘তথ্য অধিকার ফোরাম’ ও ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। আসিফ নজরুল বলেন, সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টে একটা রিফর্ম প্রয়োজন, দ্রæতই সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে। ড. আসিফ নজরুল বলেন, সাইবার নিরাপত্তা আইন পুরোপুরি বাতিল করা উচিত হবে না। কারণ এটি মূলত দুই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের জন্য তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ‘কম্পিউটার অফেন্স’ (কম্পিউটার ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটন) এবং অন্যটি ‘স্পিচ অফেন্স’। ‘স্পিচ ওফেন্স’ বাতিল করা সম্ভব হলেও ‘কম্পিউটার ওফেন্স’ বাতিল করা সঠিক হবে না।

ড. আসিফ নজরুল

তথ্য অধিকার নিয়ে সচেতনতার অভাব: তথ্য অধিকার নিয়ে ‘সচেতনতার অভাব’ রয়েছে বলেও মন্তব্য করে আইন উপদেষ্টা বলেন, এ অধিকার কিন্তু অন্যান্য অধিকারের মতো নয়। তথ্য অধিকার ছাড়া সব অধিকার মূল্যহীন। তাই তথ্য অধিকার নিয়ে একটি আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। রাষ্ট্রের আইন, বিচার ও শাসন বিভাগ যদি ঠিক না থাকে, তাহলে তথ্য কমিশন বা মানবাধিকার কমিশনের কোনও কার্যক্ষমতা থাকবে না। একথা উল্লেখ করে আসিফ নজরুল বলেন, যারা তথ্য অধিকারের কথা বলেন, তাদের সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলতে হবে, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধেও কথা বলতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলতে হবে। জনগণ জানে, বিগত সরকার বিচার বিভাগকে কীভাবে নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে তৈরি করে ফেলেছিল, সংসদকে লুটপাটের, অন্যায়-অবিচারের ফোরাম হিসেবে তৈরি করেছিল।
সবার এসব বিষয়ে সোচ্চার হওয়া উচিত বলে মনে করেন আইন উপদেষ্টা। তার মতে, দুঃশাসনের সময়ে প্রতিবাদ করাটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার। প্রতিবাদ সবসময়ই বজায় রাখতে হবে। এমনকি আমাদেরও যদি কোনও ভুল হয় তারও প্রতিবাদ জানাতে হবে।

বাতিল কিংবা সংস্কারের সুপারিশ এবিএ’র

পারভেজ আহমেদ: বাংলাদেশের তিনটি ত্রুটিপূর্ণ সাইবার নিরাপত্তা আইনের বাতিল অথবা সংস্কার চেয়েছে আমেরিকান বার অ্যাসোসিয়েশন সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস (এবিএ)। তিনটি আইনের মধ্যে রয়েছে- সাইবার নিরাপত্তা আইন (সিএসএ), ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ) এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনে (আইসিটি অ্যাক্ট)। আইনজীবীদের আমেরিকাভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থাটি তিনটি আইন সংস্কারে কিছু সুপারিশও করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সংস্থাটি ত্রæটিপূর্ণ তিনটি আইন সংস্কার অথবা বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে। বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ দমনে নিপীড়নমূলক উল্লিখিত আইনগুলো নিয়ে সম্প্রতি নিজেদের ওয়েবসাইটে ‘বাংলাদেশ: ফ্লড সাইবারক্রাইম রিজিম রিকোয়ারস রিপিল অর রিফর্ম, সেপ্টেম্বর ২০২৪’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। ওই প্রতিবেদনে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে এসব আইন সংক্রান্ত বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।

সুপারিশে বলা হয়েছে- সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিলের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে অন্তর্বর্তী সরকার। বিকল্প হিসেবে আইনটির বিশেষ করে ২১, ২৫, ২৮, ২৯ ও ৩১ ধারায় মৌলিক সংশোধন আনতে পারে। এছাড়া যথোপযুক্ত হলে মানবাধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনে করা অবশিষ্ট মামলাগুলো খারিজ করতে পারে সরকার।
সুপারিশে আরও বলা হয়েছে, জাতিসংঘ নির্যাতনবিরোধী সনদে (সিএটি) বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, যেসব ঘটনায় নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো দ্রæত ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে সরকারের তদন্ত করা উচিত।

আমেরিকান বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিবেদনে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাকস্বাধীনতা চর্চার জন্য মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষার্থীসহ বহু মানুষকে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনে দায়েরকৃত মামলায় গ্রেপ্তারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেই ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত আনুমানিক ১ হাজার ৪৩৬টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় ৫ হাজার ২৮৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।

হয়রানির কাজেই হয়েছে ব্যবহার : সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর ফারুক গণমাধ্যমকে বলেন, এটি একটি কালা কানুন। তাই আমরা এ আইনটি বাতিলের দাবি করেছি শুরু থেকেই। এ আইনের উদ্দেশ্য হলো-বাকস্বাধীনতা, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও ভিন্নমতের মানুষকে দমন। এ আইনটি হয়রানির কাজেই সরকার ও সরকারের লোকজন ব্যবহার করেছে। তার কথায়, আইনটি বাতিল করা প্রয়োজন। তবে আগের মামলাগুলো কী হবে। সবই কী প্রত্যাহার হবে, না যাচাই-বাছাই করা হবে তার জন্য সময় দেওয়া প্রয়োজন। আর যদি আইন ও সাংবিধানিক সংস্কার হয়, তাহলে একসঙ্গেই করা যায়। কিন্তু সাইবার অপরাধ দমনে নগারিকদের জন্য প্রয়োজনীয় আইন লাগবে। আর্টিক্যাল ১৯ বলছে-শুধু ২০২১ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বাংলাদেশে যত মামলা হয়েছে, তার মধ্যে ৪০ শতাংশ মামলাই হয়েছে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীসহ সরকারি দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নামে কট‚ক্তির কারণে। ফেসবুকে পোস্ট বা মন্তব্য করার দায়ে এ আইনে মামলা হয়েছে ৯০৮টি। এই আইনে বাকি ৫২৮টি মামলা হয়েছে ধর্মীয় অনুভ‚তিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে।

সবচেয়ে বেশি অভিযুক্ত রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক

সাদিত কবির: ডিজিটাল বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) সম্প্রতি একটি ওয়েবিনারে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৫ বছরের চিত্র নিয়ে কঠিন পরীক্ষা’ নামে একটি গবেষণা প্রকাশ করে। সেখানে ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা ১ হাজার ৪৩৬টি মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সংবাদপত্র, আদালতের নথি, আইনজীবী, ভুক্তভোগী ও ভুক্তভোগীর স্বজনদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ গবেষণা হয়েছে। এগুলোকে এ গবেষণার উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠন করা সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান ও আমেরিকার ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড অধ্যাপক আলী রীয়াজ এ গবেষণার প্রধান গবেষক ছিলেন। ওয়েবিনারে গবেষণার তথ্য-উপাত্ত তিনি তুলে ধরেন। তাতে দেখা যায়, পাঁচ বছরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা মামলায় ৪ হাজার ৫২০ জন অভিযুক্ত এবং ১ হাজার ৫৪৯ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। এ সময় মাসে গড়ে মামলা হয়েছে প্রায় ২৪টি এবং গ্রেপ্তার হয়েছে প্রায় ২৬ জন।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ

অভিযুক্তের মধ্যে ৩২ শতাংশের বেশি রাজনীতিবিদ, ২৯ দশমিক ৪০ শতাংশ সাংবাদিক। এ ছাড়া অভিযোগকারীর প্রায় ৭৮ শতাংশই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এসব মামলায় শাস্তি হয়েছে খুবই কম। তারপরও জেলে থাকতে হয়। হয়রানির শিকার হতে হয়। এ মামলার আসামি লেখক মুশতাক আহমেদ ২০২১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারিতে কারাগারেই মারা যান। আলী রীয়াজ বলেন, মামলায় দেশের কোনো জেলা বাদ যায়নি। সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে ঢাকায়। এ ছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা মামলায় ২৮ শিশুকে অভিযুক্ত করা হয় এবং ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

উদ্বেগ বাড়িয়েছে যেসব বিষয়: গবেষণায় তিনি কিছু উদ্বেগজনক বিষয় তুলে ধরেন। এগুলো হলো স্বচ্ছতার অভাব, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, বিচার-পূর্ব আটক, শিশু-কিশোরদের আইনের আওতায় আনা এবং আইনের স্বেচ্ছাচারী ব্যবহার। গবেষণায় সুপারিশের মধ্যে রয়েছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে আটক ব্যক্তিদের জামিন এবং গত পাঁচ বছরে এই আইনের অধীনে করা মামলাগুলো পর্যালোচনার জন্য নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা। সাংবাদিকদের অভিযুক্ত হওয়ার বিষয়ে আলী রীয়াজ বলেন, এখন সাংবাদিকতার অনেক চ্যালেঞ্জ। মালিকানা, নিজেদের দলীয়করণ এবং ডিএসএর মতো আইন। ডিএসএ শুধু সাংবাদিকতার ওপরই প্রভাব ফেলছে না। এটা একাডেমিক, গবেষণার ওপরও প্রভাব ফেলছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা, কোয়ালিশন (জোট) করতে হবে। সেটা না হলে প্রতিক‚ল পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি হবে।

আইন বিশ্লেষকদের মতে যত সমস্যা

রিন্টু হাসান: সাইবার নিরাপত্তা আইনের সমস্যাগুলো নিয়ে আইন বিশ্লেষকরা যে বিষয়গুলো চিহ্নিত করেছেন তাহলো-আইন ও নীতিমালার অধীনে গঠিত ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সির কার্যক্রমের প্রতি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় বা সংস্থাগুলো কর্তৃক তত্ত্বাবধায়ের ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত থাকা, একই বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে একাধিক মামলা করার প্রবণতা, বিচার-পূর্ব কারাবাসের সময় সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট নীতির অনুপস্থিতি, বিচার-পূর্ব কারাবাসকে পরবর্তী সময়ে শাস্তি হিসেবে গণ্য করা, অপরাধের বিপরীতে ধারাগুলোর শাস্তির বিধান বেশিরভাগ মাত্রাতিরিক্ত, অসম, অনুপাতহীন এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ থাকা, সাইবার ট্রাইব্যুনালের আদেশ বা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ না থাকা এবং মিথ্যা হয়রানিমূলক কোনও মামলার প্রতিকার আইনে না থাকা।

মানবাধিকারকর্মী রেজাউর রহমান লেনিন গণমাধ্যমকে বলেন, সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া ছিল অবৈধ এবং বেআইনি, নাগরিকদের অংশগ্রহণবিহীন এই আইনটি প্রস্তাব করা হয়েছিল এবং খুব দ্রুত খসড়াটি আইনে পরিণত করা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, সাইবার নিরাপত্তা আইনটি জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কর্মকাø এবং অপরাধমূলক কর্মকণ্ডের মধ্যে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রায় সব ধারার সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা ও অপ্রতুলতা রয়েছে। আইনে অনেক অপরাধের সংকীর্ণ সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে এবং অপরাধের অভিপ্রায় সম্পর্কে পর্যাপ্ত নজর রাখা হয়নি। এবং আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত চুক্তির বিকশিত মানগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করা হয়নি।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ০১ অক্টোবর ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা

মামলা ও গ্রেফতারের ক্ষেত্রে পুলিশের অবাধ ক্ষমতা: আইন ও সালিশকেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ফারুক ফয়সাল বলেন, এই আইনটিতে পুলিশকে অবাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে মামলা ও গ্রেফতারের ব্যাপারে। তারা এই আইনের আওতায় অনুভ‚তির কথা বলে যে কাউকে গ্রেফতার করতে পারে। আবার যে কেনো সংবাদমাধ্যমের প্রকাশনা বা সম্প্রচার কৌশলে বন্ধ করে দিতে পারে। সাধারণ মানুষের মোবাইল ফোন চেক করতে পারে। এই আইনটি ফিলিপাইনের একটি কালো আইনের কপি পেস্ট। ওই দেশের আদালত তাদের দেশে আইনটি বাতিল করলেও আমাদের দেশে এখনো বহাল আছে। আর ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি সাজ্জাদ আলম খান বলেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের বেশ কিছু ধারা উপধারা আছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে যায়। আমরা আগেও ওই ধারাগুলো বাতিলের দাবি করেছি। এখনো বাতিলের দাবি জানাই। আর্টিক্যাল নাইনটিনের বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক শেখ মঞ্জুর ই আলম বলেন, আইন সংস্কারের কথা সরকার বলছে। তারা সংবিধান সংস্কারের কথা বলছে। তবে তাদের অগ্রাধিকার কোথায় তা আমরা এখনো বুঝতে পারছি না। সরকার যে এ আইনটি বাতিল বা সংস্কারের দ্রুত কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে তা আমার জানা নেই। তবে আমি দ্রæত উদ্যোগ চাই। তিনি বলেন, তবে এটা নিয়ে কাজ করতে হবে। পুরোনো মামলাগুলোর কী হবে। সাইবার অপরাধ দমনের আইন কেমন হবে। সব কিছু ভাবতে হবে। তবে প্রচলিত আইনটি রাখা যাবে না। এটা নিবর্তনমূলক আইন।

ইউডি/এজেএস

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading