চলতি বছর মৃত্যু ছাড়াল ২০০ , আক্রান্তের সংখ্যা ৪১ হাজার ছুঁইছুঁই : ভয়াবহ রূপ নিতে পারে ডেঙ্গু

চলতি বছর মৃত্যু ছাড়াল ২০০ , আক্রান্তের সংখ্যা ৪১ হাজার ছুঁইছুঁই : ভয়াবহ রূপ নিতে পারে ডেঙ্গু

উত্তরদক্ষিণ। শনিবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৪, আপডেট ১৫:৩০

বাড়ছে রোগীর সংখ্যা, মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনক

আসাদ এফ রহমান: দেশজুড়ে বাড়ছে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। মৃত্যুর হারও আশঙ্কাজনক। গত আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে রোগী বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। এতে রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর জায়গা হচ্ছে না। এডিস মশাবাহী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গত একদিনে আরও দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ২০১ জনের মৃত্যু হলো। শুক্রবার (১১ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, গত একদিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৪৯০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এরমধ্যে ঢাকা সিটি করপোরেশনের ২২৫ জন এবং বাকিরা ঢাকার বাইরের। এ সময়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন ৪৬১ জন। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪০ হাজার ৮৯৫ জন। এর মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৩৭ হাজার ১৭২ জন। থেমে থেমে বৃষ্টি এবং ধীরগতির মশক নিধন কার্যক্রমে অক্টোবরেও ডেঙ্গু আক্রান্তের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার শঙ্কা করছেন কীটতত্ত¡বিদরা। আগের আট মাসের সমান মৃত্যু ছিল এক মাসেই। তবে অক্টোবরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ সেপ্টেম্বরের অবস্থাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। অক্টোবরে ডেঙ্গু আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।

ডেঙ্গু এখন সিজনাল নয় সারা বছরই হচ্ছে: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ড. আতিকুর রহমান জানান, ডেঙ্গু এখন সিজনাল নেই, সারা বছরই হচ্ছে। বৃষ্টি শুরু হলে এটা বাড়ছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশা নিরোধক ওষুধ ব্যবহারের পাশাপাশি সিটি করপোরেশনে পক্ষ থেকে সব জায়গায় প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। একইসঙ্গে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। কীটতত্ত¡বিদ ড. মনজুর চৌধুরী বলছেন, মশা নিধনে শুধু জেল-জরিমানা আর জনসচেনতনা বাড়িয়ে কাজ হবে না। সঠিকভাবে জরিপ চালিয়ে দক্ষ জনবল দিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
গত সেপ্টেম্বরজুড়ে এক মাসেই ১৯ হাজার ২৪১ জন রোগী ভর্তির পাশাপাশি মৃত্যু হয়েছে ৮৩ জনের। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরের ৯ মাসের মধ্যে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে সেপ্টেম্বরে। সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুতে ৮৩ জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, যা ৯ মাসের মোট মৃত্যুর প্রায় ৫০ শতাংশ। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মোট মারা গেছেন ১৬৩ জন। অন্যদিকে, গত ৯ মাসে দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ৩০ হাজার ৯৩৮ জন। যেখানে ১৯ হাজার ২৪১ জনই আক্রান্ত হয়েছে সেপ্টেম্বরে, যা মোট আক্রান্তের প্রায় ৬০ শতাংশ।

প্রতি বছর বর্ষাকালে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। ২০২৩ সালের জুন মাস থেকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। গেল বছর দেশে তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেন। এর মধ্যে ঢাকায় এক লাখ ১০ হাজার ৮ জন এবং ঢাকার বাইরে চিকিৎসা নিয়েছেন দুই লাখ ১১ হাজার ১৭১ জন। আক্রান্তদের মধ্যে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন তিন লাখ ১৮ হাজার ৭৪৯ জন। গত বছর এক হাজার ৭০৫ জন মশাবাহিত এই রোগে মারা গেছেন, যা দেশের ইতিহাসে এক বছরে সর্বোচ্চ মৃত্যু। এর আগে ২০১৯ সালে দেশব্যাপী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন। ওই সময় চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীসহ প্রায় ৩০০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২০ সালে করোনা মহামারিকালে ডেঙ্গুর সংক্রমণ তেমন একটা দেখা না গেলেও ২০২১ সালে সারাদেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন ২৮ হাজার ৪২৯ জন। ওই বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এছাড়া ২০২২ সালে ডেঙ্গু নিয়ে মোট ৬২ হাজার ৩৮২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ওই বছর মশাবাহিত রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে ২৮১ জন মারা যান।

এ এফ হাসান আরিফ

গণসচেতনতার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে

পারভেজ আহমেদ: ডেঙ্গু রোগী বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে মন্ত্রণালয় সচেতন রয়েছে। এটি কমাতে বাড়িঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাসহ গণসচেতনতার ওপর জোর দিয়ে কাজ চলছে। এমন মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা এ এফ হাসান আরিফ। সম্প্রতি রাজধানীর জলাবদ্ধতা কমানোর বিষয়ে আন্ত:মন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে একথা বলেন তিনি।
স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা বলেন, ঢাকার জলাবদ্ধতা পুরনো সমস্যা। অন্তর্র্বতী সরকারের বয়স মাত্র দুই মাস। ফলে এই সরকারের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে এটির সমাধান দেয়া সম্ভব নয়। তবে সিটি করপোরেশন, ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে জলাবদ্ধতা কমানোর চেষ্টা চলছে। হাসান আরিফ আরও বলেন, জলাবদ্ধতা কমানোর জন্য জনসচেতনতার ওপর জোর দিতে হবে। যত্রতত্র ময়লা, পলিথিন ব্যাগসহ আবর্জনা ফেলায় এই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এগুলো বন্ধে জনগণকে আরও কিভাবে সচেতন করা যায় তা নিয়ে আলোচনা চলছে। এ সময় শিগগিরই এর কিছু সুফল পাওয়া যাবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ১০ টিম : এদিকে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ১০টি সমন্বয়ক ও তদারক কমিটি। প্রতিটি কমিটিতে মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ৭ জন অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ কর্মকর্তা রয়েছেন। মশক নিধন অভিযান বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগের সকল সিটি কর্পোরেশন এবং ঝুঁকিপূর্ণ পৌরসভায় কাজ করছে ৩ হাজার ২১৪ জন মশককর্মী। চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় মশক নিধন অভিযান কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সমন্বয় ও নিবিড়ভাবে তদারকি করতে ইতোমধ্যে ১০টি টিম গঠন করা হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ৪টি টিম এবং উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ৩টি টিম কাজ করছে। নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনসহ অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন এলাকায় কাজ পরিচালনার জন্য পৃথক একটি টিম গঠন করা হয়েছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনসহ সারাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা সংক্রান্ত স্থানীয় সরকার বিভাগের এক জরুরি সভায় কমিটিগুলো গঠন করা হয়।

এছাড়াও, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা সাভার, দোহার, তারাব, রূপগঞ্জ ও অন্যান্য পৌরসভার জন্য আরও একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ডেঙ্গুরোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলার কাজ সমন্বয় এবং তথ্য সংগ্রহের জন্য ৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটিতে স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্মসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের টিম প্রধান করা হয়েছে। গঠিত টিমগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিদিন কমপক্ষে ৩টি ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব এলাকা পরিদর্শন এবং ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম মনিটরিং ও তদারকি করছেন। স্থানীয় সরকার বিভাগের তথ্য সংগ্রহ কমিটির কাছে নিয়মিতভাবে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় নেওয়া পদক্ষেপ এবং অভিযান পরিচালনা সংক্রান্ত সচিত্র প্রতিবেদন দাখিল করছেন। এই কমিটি ডেঙ্গু রোগের সংক্রমণ থেকে নাগরিকদের রক্ষা করতে জনসচেতনতা সৃষ্টি, মশার প্রজননস্থল বিনষ্ট, পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং লার্ভা ও মশা নিধনসহ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।

বেশি আক্রান্ত হচ্ছে ডেন-২ ধরনে

আরাফাত রহমান : গত দুই বছরের মতো এবারও মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে ডেঙ্গুর ডেন-২ সেরোটাইপ বা ধরনে। তবে গত দুই বছর ঢাকাসহ দেশের মানুষ এই ডেন-২ সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ায় তাদের মধ্যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। সরকারের রোগতত্ত¡, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউিট (আইইডিসিআর) এ বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু আক্রান্ত ৫০ জন রোগীর নমুনা বিশ্লেষণ করেছে। এ পরীক্ষায় দেখা যায় ৬৯ দশমিক ২০ শতাংশ মানুষ ডেঙ্গুরোগীর ধরন ছিল ডেন-২। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত¡বিদ ড. কবিরুল বাশার গণমাধ্যমকে বলেন, গত সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু সংক্রমণের যে চিত্র আমরা দেখছি তা দেখে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে অবস্থা খারাপ। অক্টোবরেও ডেঙ্গু আমাদের ভোগাবে। এখন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাটা জোরদার করা দরকার। বৃষ্টি মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি করবে। সম্ভাব্য সব প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত প্রায় ৩১ হাজার রোগীর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৫ হাজারই (১৮ শতাংশ) শিশু। আর এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ২৩ শিশুর। আক্রান্তদের মধ্যে পূর্ণবয়স্ক মানুষ বেশি হলেও শিশুর (১৫ বছর পর্যন্ত) সংখ্যা মোট আক্রান্তের ১৮ শতাংশ। চলতি বছরে শিশু হাসপাতালে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া পাঁচ শিশুর মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে সেপ্টেম্বরে। আর ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ২৪৮ জন। বাংলাদেশে ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪ এই চার ধরনের ডেঙ্গুতে মানুষ আক্রান্ত হয়। এবার যেসব শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছে তাদের ৮৭ শতাংশই ‘ডেন-২’ জিনগত ধরনে আক্রান্ত। বাকি ১৩ শতাংশ শিশু আক্রান্ত হচ্ছে ‘ডেন-৩’ ধরনে। প্রশ্ন হলো ডেঙ্গু থেকে আমাদের মুক্তি কিভাবে? করোনা মহামারীতেই আমাদের নিজেদের স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে অবহেলা স্পষ্ট ছিল। তাছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতাও প্রশ্নবিদ্ধ। তাহলে এর সমাধান কোথায়? এর কার্যকরী সমাধান সম্ভব টিকা প্রয়োগে। শরীরেই যদি প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে তাহলে রোগ হবে না।

আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে ভুল বুঝাবুঝি: আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যার বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফজলে শামসুল কবির গণমাধ্যমকে বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে একটি ভুল বুঝাবুঝি হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে যে সংখ্যা দেয়া হয় তা হাসপাতালের রোগী কেন্দ্রীক। দেশের সবচেয়ে বড় বড় হাসপাতালগুলোর অবস্থান ডিএসসিসিতে হওয়ায় এখানে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেশি দেখানো হয়। এরপরও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশা নিধনে আমাদের কার্যক্রম সঠিকভাবেই চলছে। তিনি আরও বলেন, এবার কিন্তু একটি অসময়ে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এই সময়ে এমন বৃষ্টিপাত গত ৪/৫ বছরে দেখা যায়নি। এই অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের কারণে কার্যক্রমে বিঘœ সৃষ্টি হচ্ছে। এরপরও আমরা দৃঢ়ভাবে আশাবাদী, যেটুকু এখন আছে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেলে দ্রæততম সময়ের মধ্যে এটা সম্পূর্ণ শূণ্যের কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারবো।

উদ্বেগ বিশ্বজুড়ে, টিকা কতদূর?

আরাফাত রহমান : প্রতি বছর পৃথিবীজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর কারণ ডেঙ্গু। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডবিøউএইচও) সতর্ক করে বলেছে যে, চলতি বছরই আক্রান্ত রোগীর হিসেবে ডেঙ্গু রেকর্ড করতে যাচ্ছে। ভয়ংকর ব্যাপার হলো, বিশ্বে মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। পৃথিবীর প্রায় শতাধিক দেশেই ছড়িয়েছে ডেঙ্গু। তবে বাংলাদেশে একটু বেশিই বিস্তার করেছে এডিস মশা। ডব্লিওএইচও জানায়, বিশ্বের বৃষ্টিবহুল ও উষ্ণ অঞ্চলগুলোতে এই রোগ দ্রæত গতিতে ছড়িয়ে পরছে। ইউরোপীয় সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন এন্ড কন্ট্রোল বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপের উত্তর ও পশ্চিম দিকে এডিস অ্যালবোপিকটাস প্রজাতির মশার বিস্তার ঘটছে। এই প্রজাতির মশা ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের বাহক। অর্থাৎ বিশ্ব উষ্ণ হওয়ার সাথে সাথে বিশ্বজুড়েই মশার উপদ্রব এবং বংশ বিস্তার বাড়ছে যা উদ্বেগজনক। যেহেতু এখন ডেঙ্গু কেবল একটি ঋতু ভিত্তিক সমস্যা না বা এর আক্রান্ত এবং মৃত্যু বাড়ছে সেহেতু টিকাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকরী উপায়। যদিও এটি সময়সাপেক্ষ। কিন্তু এটাই সবচেয়ে কার্যকরী।

ইতিমধ্যেই ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশ্বব্যাপী অগ্রগতি হয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে জাপানের তাকেদা ফার্মাসিউটিক্যালসের তৈরি টিকা ‘কিউডেঙ্গা’র অনুমোদন দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। দুই ডোজের এই টিকা শুধুমাত্র ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সীদের জন্য অনুমোদন দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এর আগে সানোফি-এ্যাভেন্টিজের তৈরি ডেঙ্গু টিকা ‘ডেঙ্গাভেস্কিয়া’র অনুমোদন দিয়েছে কয়েকটি দেশ। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ডেঙ্গু রোগের টিকার দ্বিতীয় পর্যায়ের সফল পরীক্ষা হয়েছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ও আমেরিকার ভারমন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউভিএম) লার্নার কলেজ অব মেডিসিনের গবেষকেরা এই টিকার সফল ট্রায়াল (পরীক্ষা) করেছেন। বাংলাদেশে আইসিডিডিআরবির সহায়তায় ‘টিভি০০৫’ নামে একটি ডেঙ্গু টিকার ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা চালাচ্ছে আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ। এই পরীক্ষার প্রথম দুই ধাপে তারা সফলতা পেয়েছে। তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা সফল হলে এর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হবে। গণমাধ্যম থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব : ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশের ব্যর্থতার কারণ কী? বিশ্লেষকগণ বলছেন, জনগণকে সচেতন করা, বিভিন্ন বাসা বাড়িতে ডেঙ্গু বিস্তারের স্থান বিনষ্ট করা, জরিমানা করা এবং ওষুধ ছিটিয়ে কার্যক্রমগুলো চোখে পড়েছে। ব্যয় হয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। কিন্তু কাজের কাজ যে কিছুই হয় নি তা বোঝা যায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা দেখলেই। এখানেও রয়েছে দুর্নীতি, এখানেও রয়েছে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব। তারা বলছেন, যে দেশগুলো ডেঙ্গু মোকাবিলায় সফল হয়েছে সেই দেশগুলো কি করেছে সেসব বিবেচনায় না নিয়ে অকার্যকর পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে জোর দেওয়া হয়েছে বেশি। মশার প্রজনন ধ্বংস করা দরকার সবার আগে। ওষুধের কার্যকারিতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। আদৌ সেসব ওষুধে মশা কতটুকু মারা যায় সেটিও প্রশ্নবিদ্ধ। অথচ টাকা ঠিকই গেছে। ছিল সমন্বয়ের অভাব। এ বছর যদি ডেঙ্গুকে মহামারী হিসেবে না দেখতে চাই তাহলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সব পক্ষের সমন্বয় দরকার।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১২ অক্টোবর ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা

ঢাকার হাসপাতালের মেঝেও রোগীতে ঠাসা

আশিকুর রহমান : রাজধানীর ১৮টি সরকারি হাসপাতালকে ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। এসব হাসপাতালে বর্তমানে ভর্তি রোগী হাজারেরও ওপর। রাজধানীর নির্ধারিত সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে আট হাজার ২৩৯ ডেঙ্গু রোগী। এর মধ্যে শুধু চারটি হাসপাতালেই চিকিৎসা নিয়েছে মোট চার হাজার ৯৩৪ রোগী, যা ঢাকার সরকারি হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর ৬০ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সরকারি এই বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে গতকাল পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার ডেঙ্গু রোগী। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এক হাজার ৫০০ জন, মিটফোর্ড হাসপাতালে ৮৩১ জন ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজে ৪৪৩ জন ভর্তি হয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চতুর্থ তলায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় পুরুষ ডেঙ্গু ওয়ার্ডে মেঝে ও করিডর রোগীতে ঠাসা। মেঝেতে পা ফেলা দায়। কোনো জায়গা নেই। ওই ওয়ার্ডের কর্তব্যরত একজন নার্স গণমাধ্যমকে জানান, ২০ শয্যার এই ওয়ার্ডে বর্তমানে ভর্তি আছে ৬২ জন। শয্যার বিপরীতে এই সংখ্যা তিন গুণের বেশি। রোগী সামাল দিতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। শয্যা ফাঁকা নেই মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। রাজধানীর এই তিন হাসপাতালে ভর্তি রোগী, স্বজন ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেশির ভাগ রোগী ঢাকার বাসিন্দা হলেও বাইরে থেকে আসা ২০ শতাংশের বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে এসব হাসপাতালে।

চিকিৎসাসেবা বিকেন্দ্রীকরণ করা এখন জরুরি: এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসাসেবা বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি বলে মনে করছেন সরকারের রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, ঢাকা শহরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় সব রোগী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আসছে চিকিৎসার জন্য। মাধ্যমিক হাসপাতাল বা প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসাব্যবস্থা থাকলে এর কয়েক গুণ বেশি রোগীর সেবা দেওয়া যেত। মৃত্যুর সংখ্যাও অনেক কমানো যেত।
মূলত স্বল্প খরচে চিকিৎসাসেবা মেলায় সরকারি হাসপাতালগুলোয় বেশি রোগী ভর্তি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সত্যজিৎ সাহা গণমাধ্যমকে বলেন, জ্বর, শরীর ব্যথা বা মাথা ব্যথা, পেটের সমস্যা নিয়ে রোগীরা বেশি আসছে। কিছু রোগী উপসর্গ ছাড়াও আসছে। তবে গত বছরের তুলনায় মানুষের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে মনে হচ্ছে। রোগীরা জ্বর আসার দুই দিনের মধ্যে পরীক্ষা করে পজিটিভ হলে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।

ইউডি/এজেএস

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading