নেতানিয়াহুর বাড়িতে হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলা: মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত-এরপর কী হতে পারে?

নেতানিয়াহুর বাড়িতে হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলা: মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত-এরপর কী হতে পারে?

উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৪, আপডেট ১৫:৩০

মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি: উত্তাপ, উদ্বেগ

আসাদ এফ রহমান : মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির উত্তাপ কোন পথে এগোচ্ছে তা নির্ধারণ করা জটিল হয়ে পড়েছে। হামাস প্রধান সিনওয়ারের মৃত্যুর পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক জটিলতা, আরব বিশ্বের ঐক্য এবং মিসরের সামরিক শক্তির পুনরুত্থান ইসরায়েলের জন্য বিপদের শঙ্কা তৈরি করছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বাড়িতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। শনিবার (১৯ অক্টোবর) এই হামলা হয়। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, বাণিজ্যিক রাজধানী তেলআবিবের সিজারিয়ায় নেতানিয়াহুর বাড়িতে হিজবুল্লাহর ড্রোন আঘাত হেনেছে। তবে হামলার সময় নেতানিয়াহু, তার স্ত্রী এবং পরিবার সিজারিয়াতে ছিল না। এছাড়া এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি বলেও দাবি করেছে দখলদার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও নেতানিয়াহুর দপ্তর উভয়ই ড্রোন হামলার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। ড্রোনটি লেবানন থেকে ছোড়া হয়েছিল এবং এটি সরাসরি নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত বাড়িতে আঘাত হেনেছে। এটি লেবানন থেকে ৭০ কিলোমিটার উড়ে গিয়ে নেতানিয়াহুর বাড়িতে আছড়ে পড়ে। হামলার পর পর ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। এছাড়া একই সময় তেলআবিবে সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে। যে ড্রোনটি নেতানিয়াহুর বাড়িতে গিয়ে পড়েছে সেটির সঙ্গে আরও দুটি ড্রোন তেলআবিবে পাঠিয়েছিল হিজবুল্লাহ। তবে সেগুলো ঠেকিয়ে দেওয়ার দাবি করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। হামলার সময় গিলিলত সামরিক ঘাঁটিতেও সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে। তবে সেনাবাহিনীর পরবর্তীতে জানায় ড্রোনগুলো এই এলাকায় আসেনি।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে লেবাননে স্থল হামলা শুরু করে ইসরায়েল। এরপর থেকে ইসরায়েলের গভীরে ড্রোন ও রকেট হামলা শুরু করে হিজবুল্লাহও। এখন পর্যন্ত তারা যত হামলা চালিয়েছে সেগুলোর মধ্যে নেতানিয়াহুর বাড়িতে ড্রোন আছড়ে পড়ার বিষয়টিই সবচেয়ে বড়। যদিও নেতানিয়াহু ওই সময় বাড়িতে ছিলেন না বলে দাবি করা হচ্ছে, তবে তার বাড়িতে হামলার বিষয়টি হিজবুল্লাহর জন্য একটি ‘প্রতীকি’ জয় হিসেবে বলা যায়। কারণ নিরাপত্তার চাদরে বেষ্টিত নেতানিয়াহুর বাড়িতেও নিজেদের ড্রোন নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে সশস্ত্র এ গোষ্ঠী।
প্রসঙ্গত, ইরানের সমর্থন ও মদতপুষ্ট হিজবুল্লাহ বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী।

লেবাননভিত্তিক এই গোষ্ঠীটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৫ সালে। প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই এই গোষ্ঠীটি ইসরায়েল রাষ্ট্রকে ধ্বংসের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত ঘেঁষে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল অবস্থিত। এই অঞ্চলটি হিজবুল্লাহর প্রধান ঘাঁটি এবং গোষ্ঠীটির অধিকাংশ সামরিক স্থাপনার অবস্থান এখানে। গত ৭ অক্টোবর গাজা উপত্যকা নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী হামাসের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর হামাসের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া শুরু করে হিজবুল্লাহ। পাল্টা জবাব দেওয়া শুরু করে ইসরায়েলও। গত এক বছরে উভয় পক্ষের সংঘর্ষে লেবাননে প্রাণ হারিয়েছেন ২ হাজারেরও বেশি মানুষ। এই নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা ৫ শতাধিক। তবে আইডিএফের দাবি, এই নিহতদের মধ্যে ৯৪০ জন হিজবুল্লাহ কমান্ডার ও যোদ্ধা রয়েছে।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালিয়ে যাবে ইসরায়েল

আরেফিন বাঁধন : হিজবুল্লাহর ওপর নির্দয়ভাবে হামলা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, আমরা বৈরুতসহ লেবাননের সব জায়গায় হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালিয়ে যাব। এ হামলা চলবে নির্দয়ভাবে। ইসরায়েল হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ারকে হত্যার পর মধ্যপ্রাচ্যে এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের অবসান হবে বলে অনেকে আশা করছিলেন। কিন্তু তাদের এমন আশায় জল ঢেলে দিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। প্যালেস্টাইনের গাজা এবং লেবাননে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
নেতানিয়াহু বলেন, সিনওয়ারকে হত্যা একটি মাইলফলক। তবে যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন বলে জানান তিনি। এই যুদ্ধ গাজা থেকে এখন লেবানন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। দেশটির বড় একটি অংশে বোমা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েলিদের উদ্দেশে নেতানিয়াহু বলেন, আমার প্রিয়জনেরা, যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। হামাসের হাতে থাকা জিম্মিদের মুক্ত না করা পর্যন্ত লড়াই চলবে বলে জানান তিনি।

লেবাননে সম্মুখযুদ্ধে হত ৫ ইসরায়েলি সেনা: লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনীর চলমান অভিযানে ৫ ইসরায়েলি সেনা কর্মকর্তা ও সদস্য নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও এক সেনা কর্মকর্তা ও তিন সেনা। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এক বিজ্ঞপ্তিতে নিশ্চিত করেছে এ তথ্য। নিহত সেনা কর্মকর্তা ও সদস্যদের নাম-পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে। এরা হলেন মেজর ওফেক বাচার (২৪), ক্যাপ্টেন ইলাদ সিমান তোভ (২৩), স্টাফ সার্জেন্ট এলায়াশিভ এইতান ওইদার (২২), স্টাফ সার্জেন্ট ইয়াকোভ হিলেল (২১) এবং স্টাফ সার্জেন্ট ইয়েহুদা দিরোর ইয়াহালম (২১)। নিহতদের মধ্যে মেজর ওফেক বাচার ইসরায়েলের নেস জিওনা, ক্যাপ্টেন ইলাদ সিমান তোভ তিজোফিম স্টাফ সাজেন্ট এলায়াশিভ এইতান ওইদার জেরুজালেম, স্টাফ সার্জেন্ট ইয়াকোভ হিলেল জেরুজালেম এবং স্টাফ সার্জেন্ট ইয়েহুদা দিরোর ইয়াহালম হেবরনের বাসিন্দা ছিলেন।

নিহত এবং আহতদের সবাই ইসরায়েলের স্থলবাহিনীর গোলান ব্রিগেডের সদস্য ছিলেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে আইডিএফ। পৃথক এক বার্তায় আইডিএফের মুখপাত্র রিয়ার অ্যাডমিরাল ড্যানিয়েল হ্যাগারি জানিয়েছেন, দক্ষিণ লেবাননের একটি গ্রামে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সঙ্গে মুখোমুখী যুদ্ধে নিহত হয়েছেন এই ৫ ইসরায়েলি সেনা কর্মকর্তা ও সদস্যরা। এ অভিযানে বেশ কয়েক জন হিজবুল্লাহ যোদ্ধাকে বন্দি করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি

সিনওয়ারের হত্যাকাণ্ডের বদলা জোরালো হবে : ইরান

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেছেন, হামাস ছিল এবং থাকবে। হামাসের প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ার নিহত হওয়ার পর এক বিবৃতিতে তিনি এ কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইয়াহিয়া না থাকলেও হামাস টিকে থাকবে। খামেনি বলেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য এই মুহূর্তে তাকে হারানোটা হামাসের জন্য অবশ্যই বেদনাদায়ক। এটা তাদের জন্য বেদনাদায়ক। কিন্তু সিনওয়ারের শাহাদাতের কারণে হামাস একেবারেই শেষ হয়ে যাবে না। তিনি আরও বলেন, ইয়াহিয়া সিনওয়ার প্রতিরোধ ও সংগ্রামের এক উজ্জ্বল মুখ ছিলেন। দৃঢ় সংকল্পের সঙ্গে তিনি অত্যাচারী ও আগ্রাসী শত্রুদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন।

এদিকে, প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ারের হত্যাকাণ্ডে ওই অঞ্চলে প্রতিরোধ আরও জোরালো হবে বলেছে জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধিদল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে ইরানের প্রতিনিধিদল বলেছে, প্রতিরোধ শক্তিশালী হবে। তিনি (সিনওয়ার) যুবক ও শিশুদের জন্য আদর্শ হয়ে থাকবেন, যারা তার দেখানো পথ ধরে প্যালেস্টাইনকে মুক্তির দিকে নিয়ে যাবে। যত দিন দখল ও আগ্রাসন চলবে, তত দিন প্রতিরোধও জারি থাকবে। শহীদেরা অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে বেঁচে থাকবেন। গত আগস্টে তেহরানে গুপ্তহত্যায় ইসমাইল হানিয়া নিহত হওয়ার পর হামাসের রাজনৈতিক শাখার নতুন প্রধান হিসেবে নিয়োগ পান ইয়াহিয়া সিনওয়ার। তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গত বছরের ৭ অক্টোবর চালানো নজিরবিহীন হামলার মূল কারিগর ছিলেন বলে মনে করা হয়।

কোনো জিম্মিকে মুক্তি দেবে না হামাস: এদিকে, প্যালেস্টাইনি স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাস জানিয়েছে, গাজায় যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত গত বছরের ৭ অক্টোবর থেকে তাদের হাতে আটক থাকা আর কোনো জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া হবে না । ইসরায়েলি হামলায় হামাসপ্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ার নিহত হওয়ার পর শোক জানানোর পাশাপাশি সংগঠনটির পক্ষ থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। হামাসের কর্মকর্তা খলিল আল-হায়া এক ভিডিও বার্তায় বলেন, গাজায় আমাদের মানুষদের ওপর ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আর কোনো জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া হবে না। এটাই হামাসের সর্বশেষ অবস্থান।

যুদ্ধের নতুন এক অধ্যায় শুরু করছে হিজবুল্লাহ

সাদিত কবির: লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ বলেছে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নতুন এক অধ্যায় শুরু করছে তারা। হিজবুল্লাহর দাবি, তারা প্রথমবারের মতো ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে বড় আকারে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। তখন থেকে লেবাননের দক্ষিণে ও পূর্বে হিজবুল্লাহর ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। গত মাসে লেবাননে একটি স্থল অভিযান পরিচালনা করে ইসরায়েলি বাহিনী। আর এর পর থেকে লেবাননের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে কাছাকাছি অবস্থান থেকে লড়াই চলছে।

হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, ইসরায়েলি শত্রুদেরপক্ষের সঙ্গে চলমান সংঘাত একটি নতুন এবং ক্রমবর্ধমান অধ্যায়ে রূপান্তরিত হয়েছে বলে ঘোষণা দিচ্ছে হিজবুল্লাহ। আগামী দিনগুলোতে বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে এ ঘোষণার প্রতিফলন দেখা যাবে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে হিজবুল্লাহ।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা বেড়েছে উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, দক্ষিণ লেবাননের গ্রামগুলোতে ইসরায়েলের স্থল অভিযান মোকাবিলা করার জন্য শত শত যোদ্ধা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। রকেট হামলা দিন দিন বাড়ছে উল্লেখ করে বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রথমবারের মতো মোতায়েন করা হয়েছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর বৈরুতে ইসরায়েলের হামলায় হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহ নিহত হন।

জো বাইডেন

আমেরিকা যেভাবে সঙ্গ দিচ্ছে ইসরায়েলকে

আরেফিন বাঁধন : সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘনীভ‚ত হচ্ছে, ইরান-ইসরাইল সঙ্কট। একইসঙ্গে হিজবুল্লাহর সঙ্গেও ইসরায়েলের চলছে সম্মুখ যুদ্ধ। অন্যদিকে, গাজায় আগ্রাসন চলছেই। এর মধ্যে, গত ১ অক্টোবর ইসরাইলের ভ‚খন্ড লক্ষ্য করে ইরানের ‘ট্রæ প্রমিস-২’ অভিযানের পর প্রতিশোধের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে তেল আবিব। এমন পরিস্থিতিতে ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে দেশটিতে একটি উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র-প্রতিরোধী ব্যবস্থা টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) পাঠায় আমেরিকা। শুধু তাই নয়, এই নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেখভাল করতে পাঠিয়েছে ১০০ জন মার্কিন সেনাও। এতে ব্যালিস্টিক মিসাইলেরর বিরুদ্ধে ইসরায়েলেকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে। একদিকে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে আমেরিকা। অন্যদিকে একই সময়ে ইসরায়েলে সেনা মোতায়েন এবং ক্ষেপণাস্ত্র-বিরোধী ব্যবস্থাও মোতায়েন করেছে দেশটি। এছাড়াও এটি পরিচালনা করার জন্য ১০০ সৈন্য পাঠানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাইডেন অন্য দেশের সক্রিয় যুদ্ধ অঞ্চলে বেআইনিভাবে মার্কিন সেনা মোতায়েন করেছেন। যদিও এখানে কোনো প্রত্যক্ষ এবং স্পষ্ট মার্কিন স্বার্থ ঝুঁকির মধ্যে নেই। বাস্তবতাকে বাইডেন প্রশাসন এমনভাবে উপস্থাপন করতে চাইছে, যেন ইসরায়েলের আত্মরক্ষায় সতায়তা দিচ্ছে। তবে উল্টো তারা উত্তেজনা বৃদ্ধিতে ভ‚মিকা রাখছে। তারা মনে করছেন, আত্মরক্ষার কথা বলেই হোক আর আক্রমণের কথা বলেই হোক, ইসরায়েলকে আমেরিকার অস্ত্র দেওয়ার মানেই হলো উত্তেজনা বাড়ানো। যদিও বাইডেন মুখে যুদ্ধের বিরুদ্ধে থাকার কথা বলছেন। হামাস ও হিজবুল্লাহ নেতাদের হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান ইসরাইলে শত শত মিসাইল নিক্ষেপ করার দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে এই ঘোষণা এলো। যদিও যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান বার্তা দিয়েছে তারা যেন তাদের সেনাদের ইসরায়েলে না পাঠায়। এতে তাদের সেনারা ঝুঁকিতে পড়বে। পেন্টাগন বলেছে, ইরানের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে শীর্ষ মিত্র ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার অংশ হিসেবেই এই সামরিক সহায়তা দিয়েছে জো বাইডেনের প্রশাসন।

পেন্টাগনের মুখপাত্র প্যাট রাইডার বলেছেন, থাড ব্যাটারি মোতায়েন ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য সহায়ক হবে। থাড ব্যাটারি পরিচালনা করতে সাধারণত অন্তত ১০০ সেনা প্রয়োজন হয়। আমেরিকার সবচেয়ে বড় অস্ত্র নির্মাতা লকহিড মার্টিন থাড ব্যবস্থা তৈরি ও সুসংহত করে। থাডগুলোকে স্বল্প, মাঝারি ও মধ্যপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে গুলি করার জন্য ডিজাইন করা। তবে কত দ্রæত এই ব্যবস্থা ইসরায়েলে মোতায়েন করা হবে তা জানাননি মার্কিন কর্মকর্তারা। এর আগে ২০১৯ সালে প্রশিক্ষণ ও বিমান প্রতিরক্ষা মহড়ার জন্য একটি থাড ব্যাটারি ইসরাইলে পাঠিয়েছিল আমেরিকা। ১৫০ থেকে ২০০ কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রকে আকাশেই উড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে থাডের। ছ’টি লঞ্চার বিশিষ্ট হাতিয়ারকে ট্রাকে করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায়। থাডে আছে ৪৮টি ইন্টারসেপ্টর, রেডিও ও রাডার সরঞ্জাম। এটিকে চালানোর জন্য বিশেষ বাহিনী দরকার হয়।

অন্তহীন যুদ্ধ ধ্বংসের পথ প্রশস্ত করবে

শহীদ রানা : আলোচনা কোনো সমাধান নয়। উত্তর গাজার চার লাখ বাসিন্দাকে দুটি বিকল্প দিতে হবে-হয় অনাহারে মরো অথবা জায়গা ছেড়ে পালাও। এটাই ইসরায়েলের যুদ্ধে লক্ষ্য অর্জনের একমাত্র উপায়। এমন পরিকল্পনার কথাই জানিয়েছিলেন ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গিওরা এইল্যান্ড। তিনি ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সাবেক প্রধান। অবসর নেওয়ার পর জাতীয় নিরাপত্তা অধ্যয়ন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক ছিলেন তিনি। এইল্যান্ডের পরিকল্পনা ইসরায়েলি সেনাবাহিনী, সংসদ এবং সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক সমর্থন পায়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, তিনি এইল্যান্ডের পরিকল্পনা গভীরভাবে অধ্যয়ন করছেন। নিজের প্রধান সহকারী রন ডারমারকে গত ডিসেম্বরে বলেছেন ‘গাজা সাফ’ করার উপায় খুঁজে বের করতে। সে অনুযায়ী কাজ এগোচ্ছে। গাজার মধ্য দিয়ে একটা করিডর তৈরি করেছে ইসরায়েল। সেখানে সৈন্যদের বিপুলসংখ্যায় মোতায়েন করা হয়েছে। এর ফলে এখন গাজার উত্তর থেকে দক্ষিণে যাওয়া কার্যত বন্ধ হয়ে যায় প্যালেস্টাইনিদের। এরই মধ্যে নির্বিচার হত্যাকাøও চলছে। অবিরাম গোলাগুলি, তাঁবুতে দুই হাজার পাউন্ডের বোমা ফেলা তো চলছেই। সঙ্গে হাজির হয়েছে ইসরায়েলিদের সর্বশেষতম কিলিং মেশিন-বিস্ফোরণকারী রোবট। তারপরও জাবালিয়ার লোকেরা তাদের বাড়ি থেকে সরে আসছেন না। তাদের ভাষ্য, দক্ষিণে মারা যাওয়ার চেয়ে গাজা শহরে থেকে মরা ভালো। মৃত্যু তো মৃত্যুই।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২০ অক্টোবর, ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা

ইসরায়েলের পরিকল্পনার নেপথ্যে যারা: উত্তর গাজার জন্য ইসরায়েলের পরিকল্পনা সফল হলে দক্ষিণ লেবানন হবে পরবর্তী শিকার। ইসরায়েলের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেইর বেন শাব্বাত বলেছেন, লেবাননে ইসরায়েলের বর্তমান অভিযানের তিনটি বিকল্প ছিল-ইসরায়েলের সামরিক নিয়ন্ত্রণে একটি নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা, একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, যা সীমান্তে ইসরায়েলের পছন্দের শাসক বসাতে দেবে আর পুরো সীমান্ত বরাবর জমি খালি করা। শাব্বাত নিজে শেষ বিকল্পের পক্ষে। তার মতে, এই বিকল্পের সুবিধা হলো এতে তুলনামূলকভাবে খরচ কম। আর এর মাধ্যমে বার্তা দেওয়া, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলে ভিটেমাটিছাড়া হতে হবে। ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকা কোনো জায়গা আক্রমণ করলে ইসরায়েল খোদ নিজে এসে হাজির হবে প্রতিশোধ নিতে। সর্বোপরি, ধর্মীয় জায়নবাদীরা তো দাবি করেনই যে তাঁদের জেরুজালেম বিস্তৃত দামেস্ক পর্যন্ত।

এই পরিকল্পনার প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে? আরব বিশ্বের প্রতিটি মানুষের একটি স্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া। যারা যুদ্ধ দেখছেন পাশে দাঁড়িয়ে, কাল তারাও বাধ্য হবেন যুদ্ধে নামতে। ইসরায়েল তার সীমানা বাড়িয়েই যাচ্ছে। এই হুমকি সেখানকার প্রতিটি দেশকে জড়িয়ে ফেলবে। জর্ডান একসময় ইসরায়েলের সঙ্গে তার শান্তি চুক্তি ছিন্ন করবে। ইরান ও হিজবুল্লাহ লড়বে জীবনের জন্য। আর যে যুদ্ধের কথা বলা হচ্ছে, তা কোনো শাসক হটানোর যুদ্ধ নয়। এই যুদ্ধে সিরিয়া, জর্ডান, ইরাক ও ইরানের সুন্নি ও শিয়াদের আত্মপরিচয় জড়িয়ে যাবে। এই যুদ্ধ হবে তাদের প্রত্যেকের জন্য নিজের অস্তিত্বের লড়াই। ২০০১ সালে তালেবানের পতন ঘটাতে আমেরিকানদের কয়েক সপ্তাহ লেগেছিল। আর আমেরিকানদের তাড়াতে তালেবানের লেগেছিল ২০ বছর। ২০০৩ সালের এপ্রিলে বাগদাদে সাদ্দাম হোসেনের মূর্তি নামাতে আমেরিকানদের লেগেছিল তিন সপ্তাহ। ইরাকে আমেরিকানদের যুদ্ধ পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হতে লেগেছিল আরও আট বছর সময়।

ইউডি/এজেএস

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading