কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কার্বন নির্গমন: পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা, বাড়ছে উদ্বেগ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কার্বন নির্গমন: পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা, বাড়ছে উদ্বেগ

উত্তরদক্ষিণ। সোমবার, ১১ নভেম্বর , ২০২৪, আপডেট ১৫:৩০

এআই প্রযুক্তির ঝুঁকি, তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে

আরাফাত রহমান: প্রযুক্তি ছাড়া যেমন আজকের বিশ্ব কল্পনা করা যায় না, তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ছাড়া কল্পনা করা যায় না আজকের প্রযুক্তি বিশ্বের কথা। এআই প্রযুক্তির নিত্য উৎকর্ষতায় অনেক অসাধারণ কাজ আজ হয়ে উঠেছে সাধারণ, অনেক অসম্ভব হয়ে উঠেছে সম্ভব। তবে এআই প্রযুক্তির আশীর্বাদের তালিকা যত দীর্ঘই হোক না কেন এআই প্রযুক্তির ঝুঁকির বিষয়টি এড়িয়ে যাবার কোনো সুযোগ নেই। সম্প্রতি এক গবেষণায় এমন এক ঝুঁকি তথা পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা উঠে এসেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাগুলো পরিশ্রম কমিয়ে দিলেও এটি পরিবেশবান্ধব নয়। বরং এআইয়ের কারণে কার্বন নির্গমন বাড়ছে। আর নতুন এক গবেষণা বলছে, এটি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। জটিল ও বাড়তি ক্ষমতা রয়েছে এমনসব এআই মডেলের প্রশিক্ষণ ও চালানোর জন্য একদিকে অনেক বেশি শক্তি প্রয়োজন, অন্যদিকে এগুলো ব্যবহারে রয়েছে মানুষের ব্যাপক আগ্রহ। আর এটিই গুরুতর পরিবেশগত পরিণতি বয়ে আনছে বলে সতর্ক করেছে নতুন এক গবেষণা পত্র।

‘রিভিজিট দ্য এনভারমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অফ আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স: দ্য ওভারলুকড কার্বন এমিশন সোর্স?’ শীর্ষক গবেষণাটি প্রকাশ হয়েছে ‘ফ্রন্টিয়ার্স অফ এনভারমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামের জার্নালে। গবেষণা বলছে, এআই সিস্টেমগুলো আরও ভাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক কম্পিউটিং ক্ষমতা দরকার হয়, এবং চালানোর জন্যও প্রয়োজন ব্যাপক শক্তির। উদাহরণ হিসেবে, ওপেনএআইয়ের বর্তমান জিপিটি-৪ আগের মডেলগুলোর তুলনায় ১২ গুণ বেশি শক্তি ব্যবহার করে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা। আরও ভয়ের বিষয় হল, এসব মডেলের প্রশিক্ষণ আসলে কাজের খুব ছোট একটি অংশ। আদতে এআই টুলগুলো চালানোর জন্য যে শক্তি দরকার হয়, তা একটি একক প্রশিক্ষণের তুলনায় ৯৬০ গুণ বলে অনুমান করা হয়।

গবেষকরা বলছেন, পরিবেশের ওপর এর প্রভাব বিশাল হতে পারে। এআই-সংশ্লিষ্ট কার্বন নির্গমনের ফলে এ খাতে বছরে এক হাজার কোটি ডলার খরচ হতে পারে। এ ছাড়া, এ ধরনের নির্গমন পরিমাপের উপায়গুলো মানসম্মত করার পাশাপাশি একটি সীমার মধ্যে রাখার জন্য সরকার ও নিয়ন্ত্রকদের কাছে নতুন নিয়ম তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন তারা। ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটির প্রধান গবেষক মেং ঝাং বলছেন, এআই-এর ক্ষমতা বাড়ার বিষয়টি এর পরিবেশগত প্রভাবে উদ্বেগজনক বৃদ্ধির প্রতিফলন। তিনি বলছেন, এআই খাতের জন্য পরিবেশবান্ধব চর্চা ও টেকসই মান গ্রহণ করার জরুরী প্রয়োজনের ওপরেই জোর দেয় এ গবেষণা। আমাদের লক্ষ্য হল, এআই-এর কার্বন ফুটপ্রিন্ট মোকাবেলায় সক্রিয় প্রবিধান তৈরির জন্য নীতিনির্ধারকদের কাছে প্রয়োজনীয় ডেটা পৌঁছে দেওয়া।

প্রসঙ্গত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কী,কীভাবে কাজ করে: কিছুদিন আগেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ছিল দূর ভবিষ্যতের একটি কাল্পনিক বিষয়। কিন্তু অতি স¤প্রতি এই দূরবর্তী ভবিষ্যতের বিষয়টি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হতে শুরু করেছে। তার প্রধান কারণ, পৃথিবীর মানুষ ডিজিটাল বিশ্বে এমনভাবে সম্পৃক্ত হয়েছে যে, হঠাৎ করে অচিন্তনীয় পরিমাণ ডেটা সৃষ্টি হয়েছে এবং সেই ডেটাকে প্রক্রিয়া করার মত ক্ষমতাশালী কম্পিউটার হাতে চলে এসেছে।

কার্বন নির্গমনের হার শূন্যে নামবে কী

সাদিত কবির : এক বছরেই কার্বন দূষণ বাড়তে থাকায় আংশিকভাবে এআইকে দোষারোপ করেছে গুগল, যেটি ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নির্গমনের হার শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষমাত্রা অর্জনে এই সার্চ জায়ান্টের প্রতিশ্রুতিকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে শূন্য কার্বন নির্গমনে পৌঁছানোর বিষয়টি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ও আমরা জানি এটি সহজ হবে না। সম্প্রতি প্রকাশিত নিজেদের ‘অ্যানুয়্যাল সাসটেইনিবিলিটি’ প্রতিবেদনে এ কথা স্বীকার করেছে গুগল। গুগল জানায়, এ লক্ষ্য অর্জনে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অপরিবর্তিত থাকবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এআইয়ের পরিবেশগত প্রভাবের ঝুঁকি বিষয়ে তাদেরকে অনেক বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যদিয়ে যেতে হবে। কারণ এ বিষয়টি জটিল এবং এ নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করাও কঠিন।

সার্চ ইঞ্জিন ও গুগল ওয়ার্কস্পেসের মতো কোম্পানিটির মূল পণ্যগুলোতে এআইকে ঢেলে সাজানোর জন্য ২০২২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পরিবেশে কার্বন নির্গমনের হার ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি ২০১৯ সালকে ভিত্তি হিসাবে ধরলে কার্বন নিঃসরণ বেড়েছে ৪৮ শতাংশ। এর পরিবেশগত কিছু কারণও খুঁজে পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করেছে গুগল। কোম্পানিটির দাবি, গুগলের বিভিন্ন ডেটা সেন্টারের এদের প্রতিদ্ব›দ্বীদের চেয়ে ১৮ গুণ বেশি বিদ্যুৎ সক্ষমতা রয়েছে এবং কোম্পানিটি জ্বালানি সাশ্রয়ী ট্রানজিট রাউটিং ও চরম আবহাওয়ার মডেলিংয়ের মতো পরিবেশগত সমস্যা সমাধানের জন্য এআই ব্যবহারের সম্ভাবনার কথা বলেছে। প্রতিবেদনের একটি অংশে রয়েছে, জলবায়ু সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য এআই অনেক বেশি আশা জাগাতে পারে। আসলে ২০৩০ সালের মধ্যে গোটা বিশ্বে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের হার পাঁচ থেকে ১০ শতাংশ কমিয়ে আনতে এআইয়ের ভ‚মিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।

এদিকে, গুগলের সমপর্যায়ের বিভিন্ন কোম্পানিও তাদের কার্বন নির্গমন নিয়ন্ত্রণে লড়াই করে চলেছে। ২০২০ সাল থেকে মাইক্রোসফটের কার্বন নিঃসরণ বেড়েছে ২৯ শতাংশ। অ্যামাজন নিজেদের ২০২২-২০২৩ সালের পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি। কোম্পানিটি বলেছে, ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে তাদের কার্বন নির্গমন ০.৪ শতাংশ কমেছে। তবে ২০১৯ সাল থেকে এখন পযন্ত সার্বিকভাবে কার্বন নির্গমন প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ দৈনিক ইন্ডিপেনডেন্ট। জ্বালানি কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এআইয়ের এই অগ্রগতি বিদ্যুত গ্রিড ও জলবায়ুর উপর চাপ সৃষ্টি করবে। ‘ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি’-এর তথ্য অনুসারে, ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বৈশ্বিক ডেটা সেন্টারে বিদ্যুতের চাহিদা দ্বিগুণ হবে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টারে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়বে ৫০ শতাংশ। ‘কর্নেল ইউনিভার্সিটি’র এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ফেংকি ইউ বলেছেন, এ বৃদ্ধির প্রবণতা অনেক বেশি গতিশীল। এটি এমন এক বিষয় যা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন।

চ্যাটজিপিটি’র ব্যবহার: বায়ুমণ্ডলে খারাপ প্রভাব

কিফায়েত সুস্মিত : যত দিন যাচ্ছে ততই অবাক করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। বাড়ছে মানুষের আনাগোনা। এআইয়ের জগতে বেশিরভাগ মানুষের যে প্রযুক্তির সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটছে তা হল চ্যাটজিপিটি। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিদিন ২০ কোটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় চ্যাটজিপিটিকে। যার জন্য প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ খরচ করে ওপেনএআই। স¤প্রতি এক রিপোর্টে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। ওপেনএআই উদ্ভাবিত আলোচিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের ফলে পরিবেশে খারাপ প্রভাব পড়ছে। এআই টুলের বিদ্যুৎ খরচ শুনে এমনটাই মন্তব্য করছেন অনেকে। সাধারণ ঘরে যে বিদ্যুৎ লাগে তার ১৭ হাজার গুণ বেশি বিদ্যুৎ খরচ হয় চ্যাটজিপিটির পিছনে। প্রতিদিন অসংখ্য ইউজারদের উত্তর দিতে হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে। আর তার জন্য ইউনিট ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ করে বিশ্বে আলোড়ন ফেলে দেওয়া এই প্রযুক্তি।

এক রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতিদিন ৫ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ খরচ করে চ্যাটজিপিটি। যা আমেরিকার সাধারণ ঘরের তুলনায় ১৭ হাজার গুণ বেশি। ব্যবহার যত বাড়বে তত বিদ্যুৎ খরচ আকাশ ছোঁবে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা। মূলত, এই ধরনের টুলকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য দরকার পড়ে কয়েক লাখ ডেটা। সেই সব ডেটা সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ করে চ্যাটজিপিটির মতো টুলগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আর গোটা প্রক্রিয়া সফল করার জন্য মূল শক্তি আসে বিদ্যুৎ থেকে। তাই পরিবেশবিদরা মনে করছেন, চ্যাটজিপিটির ফলে বায়ুমøলে খারাপ প্রভাব পড়ছে। এই নিয়ে উদ্বিগ্ন বহু বিজ্ঞানী ও গবেষক। ডেটা বিজ্ঞানী অ্যালেক্স ডি ভ্রিসের অনুমান, গুগল যদি প্রতিটি সার্চের জন্য জেনারেটিভ এআই ব্যবহার শুরু করে তাহলে বছরে প্রায় ২৯ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ খরচ হবে। যা কেনিয়া, গুয়াতেমালা এবং ক্রোয়েশিয়ার মতো দেশের বার্ষিক বিদ্যুৎ খরচকেও ছাপিয়ে যাবে। যদিও এটা ভবিষ্যৎ নয় বরং বর্তমানে ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে প্রতিটি এআই সার্ভার যে পরিমাণ শক্তি খরচ করছে তা ব্রিটেনে এক ডজন পরিবারের মিলিত শক্তির থেকেও বেশি।

যদিও তিনি বলেন, সামগ্রিক বিদ্যুৎ খরচ গণনা করা শক্ত। কারণ এআই মডেলগুলির পরিচালনা পরিবর্তনশীল এবং বড় বড় কোম্পানিগুলির মধ্যে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। চিপ প্রস্তুতকারী সংস্থা এনভিডিয়ার তথ্য অনুসারে, ২০২৭ সালের মধ্যে গোটা এআই সেক্টরে ৮৫ থেকে ১৩৪ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ খরচ হতে পারে। বর্তমানে স্যামসাং প্রায় ২৩ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ খরচ করে। গুগল এবং মাইক্রোসফট তাদের ডেটা নেটওয়ার্ক এবং সার্ভার পরিচালনার জন্য প্রায় ১০ থেকে ১২ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ খরচ করে। পরিবেশগত যে প্রভাব পড়ছে এর ফলে তা রুখতে হবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীর। কারণ ভবিষ্যতে এআই ব্যবহার ব্যাপক হারে বাড়তে চলেছে। আরও শক্তিশালী এবং দক্ষ প্রযুক্তি আসতে পারে। এখনই যদি উপযুক্ত পদক্ষেপ না নেওয়া হয় তাহলে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ সংকটের মুখে পড়তে পারে একাধিক দেশ।

পরিবেশগত প্রভাব কতটা: খতিয়ে দেখছেন গবেষকরা

আরেফিন বাঁধন : বিভিন্ন এআই টুল পরিবেশের ওপর কেমন প্রভাব ফেলছে, তা খতিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ বলে সতর্কবার্তা দিয়েছেন গবেষকরা। স¤প্রতি ‘রেডিওলজি’ (ইমেজিংয়ের মাধ্যমে রোগ শনাক্ত করার পদ্ধতি) খাতে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়তে দেখা গেছে, যা নিয়ে একটি গবেষণা প্রকাশ পেয়েছে অলাভজনক সংস্থা ‘রেডিওলজিক্যাল সোসাইটি অব নর্থ আমেরিকার (আরএসএনএ) জার্নাল ‘রেডিওলজি’তে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে, ‘গ্রিনহাউস গ্যাস (জিএইচজি)’ নির্গমনে বড় ভ‚মিকা রাখছে স্বাস্থ্যসেবা ও মেডিকাল ইমেজিংয়ের মত বিষয়গুলো। এক্ষেত্রে রেডিওলজি খাতের কর্মপদ্ধতির উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে বিভিন্ন এআই টুল, যেখানে ব্যবহার করা যেতে পারে অপ্টিমাইজড ইমেজিং প্রোটোকলের মত ব্যবস্থা। এর ফলে, চিকিৎসার ক্ষেত্রে স্ক্যানিংয়ের সময় কমে আসার পাশপাশি রোগীর ঝামেলা কমিয়ে আনা সম্ভব। এ ছাড়া, কম দামী ইমেজিং ব্যবস্থা ব্যবহারের প্রবণতা কমানোর ক্ষেত্রেও এসব এআই টুল কাজে লাগতে পারে।

তবে উদীয়মান এ প্রযুক্তি ব্যবহারের একটি নেতিবাচক দিকও রয়েছে। এ গবেষণার ভাইস চেয়ারম্যান, ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টোর সহযোগী অধ্যাপক কেট হ্যানেম্যান বলেন, মেডিকেল ইমেজিংয়ে অনেক বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়। তবে আমরা এসব তথ্য সংরক্ষণ (ডেটা স্টোরেজ) ও এআই টুলের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে সাধারণত চিন্তা করি না। তিনি আরও বলেন, এআই মডেলের উন্নয়ন ও বিস্তারে অনেক বিদ্যুৎ খরচ হয়। আর মেডিকেল ইমেজিং ও এআই প্রযুক্তির ক্ষেত্রে তথ্য সংরক্ষণের চাহিদাও দ্রæত বাড়ছে। এ গবেষণায় রেডিওলজিতে এআই টুল যোগ করার সুবিধা এবং পরিবেশের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাবের দিকগুলোতে নজর দিয়েছে গবেষণা দলটি, যেখানে এআইয়ের মাধ্যমে কাজের ধারা উন্নত করা, ছবি তোলার গতি বাড়ানো, চিকিৎসার খরচ কমানো এবং রোগীর অভিজ্ঞতাকে আগের চেয়ে উন্নত করার মত বিষয়গুলোতে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। হ্যানেম্যান বলেন, আমাদের সমন্বয় করে কাজ করতে হবে।

পাশাপাশি, পরিবেশের ওপর এআই টুলের নেতিবাচক প্রভাব কমিয়ে আনার সঙ্গে এর ইতিবাচক প্রভাবের ভারসাম্য আনার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের চ‚ড়ান্ত লক্ষ্য হল, রোগীর সার্বিক অবস্থার উন্নতি ঘটানো। তুলনামূলক কম শক্তি খরচ করে ও বর্জ্য উৎপাদনের মাত্রা কমিয়ে আনার মাধ্যমে আমরা এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চাই। এআই মডেল বিকাশে বিশাল পরিমাণ ‘ট্রেইনিং ডেটা’ প্রয়োজন, যেখানে বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে বছরে প্রায় শত কোটি চিকিৎসাবিষয়ক ছবি সংরক্ষণ করতে হয়। এর মধ্যে অনেক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই ক্লাউড স্টোরেজ ব্যবহার করে, যার মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য অফলাইনে সংরক্ষণ করা যায় এবং প্রয়োজন অনুসারে ডিজিটাল উপায়ে সেগুলোতে প্রবেশ করা যায়। হ্যানেম্যান বলেন, আমরা একে ক্লাউড স্টোরেজ বললেও তথ্যগুলো আসলে এমন স্থানে রাখা হয়, যেখানে প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ হয়। আর সেইসব ডেটা সেন্টার ঠাøা হতেও অনেক সময় লাগে।

সা¤প্রতিক গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, বিশ্বের সকল ডেটা সেন্টার থেকে যে পরিমাণ গ্রিনহাউজ গ্যাস বের হয়, তা পুরো এয়ারলাইন্স শিল্পের চেয়েও বেশি। এটা খুবই বিস্ময়কর। একটি ডেটা সেন্টারের অবস্থান এর স্থায়িত্বের ওপরও বড় প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে ডেটা সেন্টারটির অবস্থান এমন কোনও ঠাøা জলবায়ু বা স্থানে হয়ে থাকে, যেখানে নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস রয়েছে। ডেটা স্টোরেজের সামগ্রিক পরিবেশগত প্রভাব কমাতে গবেষকরা ডেটার বিভিন্ন উৎস ভাগ করে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, যেখানে অন্যান্য ডেটা সরবরাহক ও অংশীদারদের সহায়তায় বিদ্যুৎ খরচের বিষয়টি সমন্বয় করা যাবে।

জেফ্রি হিন্টন

এআই দুর্বলতা : ঝুঁকিতে ফেলতে পারে মানব জীবনকে

আশিকুর রহমান: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কী মানুষের জন্য বিপদজনক হয়ে উঠছে এমন প্রশ্ন সর্বত্রই ঘুরপাক খাচ্ছে। এই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে মূলত চ্যাটজিপিটি নামের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাজারে আসার পর। ভাষাভিত্তিক এই চ্যাটবট তার তথ্যভাøার বিশ্লেষণ করে প্রায় সব প্রশ্নেরই জবাব দিতে পারে। চ্যাটজিপিটি রচনা লিখতে পারে, চাকরির বা ছুটির আবেদন, যেকোনো রিপোর্ট তৈরি করতে পারে, এমনকি গান ও কবিতাও লিখতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই ক্ষমতা দেখে সারা বিশ্বের প্রযুক্তি বিষয়ক নীতি-নির্ধারক, বিনিয়োগকারী এবং নির্বাহীরা নড়ে চড়ে বসেন। এক হাজারের মতো ব্যক্তি এক খোলা চিঠিতে এই প্রযুক্তির ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, গবেষণায় এখনই রাশ টেনে না ধরলে সমাজ ও মানবজাতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে যাকে ‘গডফাদার’দের একজন বলে মনে করা হয় সেই জেফ্রি হিন্টন স¤প্রতি গুগল থেকে ইস্তফা দিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে আর কিছুকাল পরই চ্যাটবটরা মানুষের চেয়েও বুদ্ধিমান হয়ে যেতে পারে। তাহলে কি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স একসময় মানুষের মতো সৃষ্টিশীল হয়ে উঠবে? গুগলেরই টেকনিক্যাল ম্যানেজার তানজিম আহসান বলছেন, কম্পিউটার তো অনেকের মানুষের চেয়ে আজকের দিনেই বেশি বুদ্ধিমান।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থায় বড় এক নিরাপত্তা দুর্বলতা মানুষের জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ, এমনই উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়। গবেষকরা সতর্ক করেছেন, যেসব রোবটিক সিস্টেমে এআই ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেগুলো ভেঙে পড়তে পারে আর সেগুলো নিরাপদও নয়।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১১ নভেম্বর ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা

নতুন এই গবেষণায় বিভিন্ন লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল অথবা ‘এলএলএম’ খতিয়ে দেখেছেন গবেষকরা। এই এলএলএম প্রযুক্তির সাহায্যেই চ্যাটজিপিটি’র মতো এআই ব্যবস্থা কাজ করে। এমনকি রোবটিক্সের বেলাতেও একই ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার দেখা গেছে, যেখানে বাস্তব-জগতে নেওয়া সিদ্ধান্ত মেশিনের মাধ্যমে প্রয়োগ করে এটি।
ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়া পরিচালিত নতুন এ গবেষণা অনুসারে, ওই প্রযুক্তিতে এমন নিরাপত্তা ত্রুটি ও দুর্বলতা আছে, যার সুযোগ নিয়ে হ্যাকারদের পক্ষে এইসব সিস্টেমে প্রবেশ করা সম্ভব। ইউনিভার্সিটি’র অধ্যাপক জর্জ পাপাস জানান, আমাদের কাজে দেখা গেছে, এ মুহূর্তে বিভিন্ন লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বাস্তব জগতে ব্যবহারের মতো যথেষ্ট নিরাপদ নয়। এতে অধ্যাপক পাপাস ও তার সহকর্মীরা পরীক্ষা করে দেখেন, বর্তমানে ব্যবহার করা বেশ কিছু সিস্টেমের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এড়িয়ে এতে প্রবেশ করা সম্ভব। এর মধ্যে রয়েছে ‘সেলফ-ড্রাইভিং’ বা স্বচালিত গাড়ির ব্যবস্থা, যাকে দিয়ে গাড়িকে চৌরাস্তার মধ্য দিয়ে কোনো দিকে ভ্রক্ষেপ না করেই চালানোর ঝুঁকি রয়েছে। গবেষকরা এখন এই সিস্টেমগুলোর নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করছেন যাতে সে দুর্বলতাগুলো শনাক্ত করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যায়। তবে তারা সতর্ক করেছেন, এতে সুনির্দিষ্ট দুর্বলতার ‘প্যাচ’ তৈরির চেয়ে বরং এইসব সিস্টেম কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে চিন্তা করা উচিৎ।

এ গবেষণার সহ-লেখক বিজয় কুমার জানান, এ গবেষণাপত্রের ফলাফল থেকে এটা পরিষ্কার যে, এমন গুরুদায়িত্ব পালন করা সিস্টেম চালু করার বেলায় ‘সেইফটি-ফার্স্ট’ পন্থা অবলম্বণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর এআই-চালিত রোবটকে বাস্তব জগতে ছেড়ে দেওয়ার আগে আমাদের অবশ্যই এইসব দুর্বলতা নিয়ে কথা বলা উচিৎ। তিনি আরও জানান, আমাদের গবেষণা যাচাইকরণ ও বৈধতা নিয়ে এমন একটি কাঠামো বানাচ্ছে, যা বিভিন্ন রোবটিক সিস্টেম সংশ্লিষ্ট সামাজিক নীতিমালার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

ইউডি/এজেএস

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading